23/11/2025
৭৯ খ্রিস্টাব্দ। ইটালির ক্যাম্পানিয়া অঞ্চল।
শহরটা ছিল আজকের দিনের নেইপলসের কাছাকাছি। এক পাশে সমুদ্র, গাঢ় নীল আর শান্ত। অন্য পাশে পাহাড়, তার গা ঘেঁষে থাকে সবুজ জলপাই গাছের বহর। ওপরে আকাশ; উজ্জ্বল, বিস্তৃত। মাঝখানে পম্পেই।
চোখ ধাঁধানো এই নাগরিক সভ্যতার শুরু খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ আর সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে পৌঁছে যায় খ্যাতির শিখরে, হয়ে উঠে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম অভিজাত নগরী। রাজকীয় ভিলা, চোখ ধাঁধানো সব স্থাপত্য, আর বিচিত্র নকশার ফোয়ারা দিয়ে সাজানো ছিল শহরটা। বিশাল বিশাল মন্দির বানানো হয়েছিল রোমান দেবতা জুপিটার আর অ্যাপোলোর সম্মানে। ঘর আর বাজারে পূজা হতো দেবতা ডায়োনাইসাসের। পম্পেইয়ের মাটিতে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জাতের আঙ্গুর ফলতো। ওখানকার আঙ্গুরমদের সুনাম ছিল পুরো রোমান সাম্রাজ্য জুড়ে। ডায়োনাইসাস মদ আর মত্ততার দেবতা। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি বিশেষ ভক্তি ছিল শহরের লোকের।
আমোদপ্রমোদের জন্য ছিল অ্যাম্পফিথিয়েটার। গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, হিংস্র পশু শিকার, রথের প্রতিযোগিতা, নাটক-উৎসবের নানা আয়োজন হতো সেখানে। পম্পেই ছিল একাধারে ব্যবসা, সংস্কৃতি, পর্যটন আর বিনোদনের কেন্দ্র। নাগরিক জীবনের সব উপকরণ মজুত ছিল সেখানে।
তবে এসব ছাপিয়ে উঠে আসতো আরেকটা পরিচয়। প্রায় বিশ হাজার অধিবাসীর এই শহরে সময় যেন একটু দ্রুত ছুটত। সবসময় আবেগ, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের উঁচু তারে বাঁধা থাকতো জায়গাটা। শহরের মোড়ে মোড়ে ছিল মদের দোকান আর পতিতালয়। অবাধ, মুক্ত যৌ-ন-তা ছিল পম্পেইয়ের সংস্কৃতি। ঘরের দেয়াল, বাগানে ফোয়ারার নকশা, গণস্নানাগারের ছাদ-সব জায়গাতে ছিল প-র্নো-গ্রা-ফি-ক ছবি। সেইসব ছবিতে ফুটে উঠতো স-ম-কা-ম, উ-ভ-কা-ম আর গ-ণ-যৌ-ন-তা-র দৃশ্য। পম্পেইয়ের যৌ-ন-তা-র বাজারে সব বৈধ ছিল। হাত বাড়ালে মিলতো সবই। নিজেকে হারিয়ে ফেলার পর খুঁজে পেয়ে আবারও হারিয়ে ফেলার জন্যই যেন তৈরি হয়েছিল শহরটা। আর তাই এখানে মন্ত্রমুগ্ধের ছুটে আসতো নানা দেশ থেকে নানান রকমের মানুষ। তারুণ্যের বাঁধভাঙ্গা উল্লাসের কেন্দ্র ছিল পম্পেই।
তবে চাঁদের বুকে কালিমার মতো একটা সমস্যা ছিল। দিগন্ত আড়াল করে থাকা ভিসুভিয়াস পর্বত। প্রায় ১৭ বছর আগে, ৬৩ খ্রিষ্টাব্দে এই ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাতেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পম্পেই। ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছিল আগের চেয়েও আকর্ষণীয়, আরও মনোমুগ্ধকর রূপে।
৭৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রায় পুরোটা বছরটা জুড়ে ভিসুভিয়াসের হম্বিতম্বি চলছিল। হঠাৎ মাঝরাতে গর্জে উঠে অস্তিত্ব জানান দিতো। হালকা ভূমিকম্প নাড়া দিয়ে যেত মাঝেমধ্যে। ধীরে ধীরে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়লো, কমলো মাঝখানের বিরতি। একসময় দেখা গেল ছাইরঙ্গা ভিসুভিয়াস পর্বতের ওপরটা ধোঁয়াতে ঢেকে গেছে। কিন্তু ততদিনে অভ্যাস হয়ে গেছে পম্পেইয়ের লোকেদের। ভিসুভিয়াসের তর্জন গর্জনকে খুব একটা গুরুত্ব দিলো না তারা। জীবন্ত আগ্নেয়গিরিকে পাশে রেখে জীবনের চেনা স্রোতের ওপর ভরসা করে নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে লাগলো।
আর তারপর... একদিন সকালে ব্যাপারটা ঘটলো।
প্রচণ্ড শক্তিতে সেকেন্ডে পনেরো লক্ষ টন গলিত পাথর, গুড়ো হয়ে যাওয়া আকরিক আর তরল আগুন ছুড়ে দেওয়া হলো মাটি থেকে প্রায় ২১ মাইল উঁচুতে। নিঃসরিত হলো হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চাইতে এক লক্ষ গুণ বেশি তাপশক্তি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা পৌঁছে গেল ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মা-রা গেল হাজারো মানুষ। প্রচণ্ড তাপের কারণে সৃষ্ট থার্মাল শকে, তীব্র খিচুনিতে, তাদের শরীরগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেঁকে গেল। তারপর সব চাঁপা পড়লো ২১ ফিট গভীর আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে।
আগুনের নদীর নিচে সমাধি হলো পম্পেইয়ের। রাতারাতি উধাও হয়ে গেল প্রাণবন্ত জনপদ। এভাবেই কেটে গেল দেড় হাজার বছর কিংবা আরও বেশি। তারপর হঠাৎ একদিন কোনো এক রাজার প্রাসাদ বানাতে গিয়ে পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেল একদল নির্মাণশ্রমিক। শুরু হলো হারানো শহরের খোঁজ।
ভিসুভিয়াসের লাভা আর ছাই প্রস্তরীভূত করে ফেলেছিল পম্পেইকে। পুরু ছাই আর আগ্নেয় পাথরের প্রলেপে অবিকল সংরক্ষিত ছিল সবকিছু। বিচিত্রভাবে তরল আগুন যেন জমিয়ে রেখেছিল শহরটাকে। মাটি খুঁড়ে প্রথম যেসব নিদর্শন পাওয়া গেল, তার মধ্যে ছিল পম্পেইয়ের আদিম উল্লাসের প-র্নো-গ্রা-ফি-ক চিত্রকর্ম।
পম্পেইয়ের ঘটনা দুইভাবে দেখা যায়।
এক দৃষ্টিকোণ থেকে পম্পেই এক রোমান ট্র্যা-জে-ডি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধ্বং-স হয়ে গেছে প্রাণবন্ত এই নগরী। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বিশ্বের। প্রগতিশীল ও সেক্যুলার মানুষদের।
অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, পম্পেইয়ের এই পরিণতি জনপদের লোকেদের সীমালঙ্ঘন আর অবক্ষয়ের শা-স্তি। ইতিহাসের পাতায় চিরদিন অগ্নিসমাধির শহর হিসেবে পরিচিত হবে পম্পেই। তার অস্তিত্ব মুছে গেছে, রয়ে গেছে ধ্বংসের শিক্ষা।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, পম্পেই ধ্বংসের সাথে সেখানকার মানুষের যৌ-ন-তা-র কোনো সম্পর্ক নেই। যৌ-ন-তা মানুষের জীবনযাত্রার কেবল একটা অনুষঙ্গ। আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের সাথে এর যোগসূত্র খুঁজে বের করা অযৌক্তিক। একটা সমাজ ও সংস্কৃতির ব্যাপার, আরেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর সবাই জানে, দুটো একেবারেই আলাদা জিনিস। পম্পেইয়ের অধিবাসীরা যদি কোনো ভুল করে থাকে তবে সেটা হলো, দিনের পর দিন ভিসুভিয়াসের গর্জনকে উপেক্ষা করা। শিক্ষা নিতে হলে এখান থেকে নেওয়া উচিৎ।
অন্যদিকে একজন বিশ্বাসী পম্পেইয়ের মিল খুঁজে পাবে কুরআনে বর্ণিত এক সম্প্রদায়ের ঘটনার সাথে। কুরআনে নবী লূত আলাইহিস সালামের কথা বলা হয়েছে। তাঁকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যারা যৌ-ন বিকৃতিতে আসক্ত ছিল। এ জনপদের পুরুষেরা একে অপরের সাথে যৌ-ন-তা-য় লিপ্ত হতো। নবীর সব শিক্ষা আর হুশিয়ারি তারা তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করেছিল। মহান আল্লাহ ভ-য়-ঙ্ক-র আ-যা-ব দিয়ে তাদের ধ্বং-স করে দেন। কুরআন ও হাদীসে এই আযাবের বর্ণনা এসেছে।
প্রথমে তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া হয়। তারপর পুরো জনপদকে শূন্যে তুলে উলটো করে সজোরে ছুড়ে ফেলা হয় মাটিতে। আর তারপর শুরু হয় আসমান থেকে উত্তপ্ত পাথরবৃষ্টি। বিরামহীন আ-যা-ব। এই সম্প্রদায় আল্লাহর সৃষ্টির নিয়মকে উলটে দিয়েছিল। নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌ-ন-তা-র বদলে বিকৃত যৌ-ন-তা-কে বেছে নিয়েছিল তারা। তাই শা-স্তি হিসেবে তাদের জনপদকে উলটে দেওয়া হয়।
'সুতরাং আস্বাদন করো আমার শাস্তি এবং ভীতিপ্রদর্শনের পরিণাম।'
সূরা আল ক্বমার, আয়াত ৩৯
সবশেষে মৃ-ত সাগরের পাড়ে পড়ে ছিল কওমে লূত; মৃ-ত ও অভিশপ্ত।
- আসিফ আদনান হাফি.
উপরিউক্ত লেখাটি মুহতারাম আসিফ আদনান ভাইয়ের "অবক্ষয়কাল" বইয়ের অংশ থেকে নেওয়া। যেখানে একটি অভিশপ্ত জাতির ধ্বংসের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা তার সাথে আমাদের আজকের দিন মিলিয়ে দেখি।
হাদিসে এসেছে যে যখন চারিদিকে পাপাচার বৃদ্ধি পাবে তখন ভূমিকম্প হবে। আল চারিদিকে অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, মদ, জিনা, জুয়া ও অশ্লীলতার সমাহার। আমরাও কি সেই অভিশপ্ত জাতিগুলোর মতো হতে চলেছি?
আর পম্পাইয়ের ভিসুভিয়াস পর্বতের তর্জন-গর্জনকে তারা যেভাবে উপেক্ষা করেছিল, গতকাল এবং আজকের মৃদু ভূমিকম্পকে আমরাও সেরকম উপেক্ষা করছি না?
তাই ভাই আমার, বোন আমার। চোখ বন্ধ করে একবার চিন্তা করুন, আজকে আপনি মারা গেলে কেউ আপনাকে মনে রাখবে না। তাই ফিরে আসুন।
- Zikrullah