28/11/2025
সূরা কাহাফে একসঙ্গে হযরত মূসা (আঃ)ও খিজির (আঃ)তিনটি রহস্যময় ঘটনা।
পবিত্র কোরআনের ১৮ তম সূরা আল কাহাফ। কাহাফ মানে গুহা। এ সূরার আয়াত সংখ্যা ১১০। মক্কায় অবতীর্ণ এই সুরায়, গুহাবাসীদের বিবরণ স্থান পেয়েছে। সরল পথের আলোচনা করে মোহাম্মদ (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) খিজির (আঃ)–এর সঙ্গে সফর করার সময় তিনটি ঘটনা সংঘটিত হয়।
প্রথম ঘটনায় খিজির (আঃ) একটি নৌকা ছিদ্র করে ফেলেন, অথচ নৌকার মালিক বিনা ভাড়ায় তাঁকে নৌকায় উঠিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ঘটনায় তিনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেন। তৃতীয় ঘটনায় তিনি একটি দেয়াল উঠিয়ে দেন। ঘটনা তিনটি দেখে হযরত মূসা (আঃ) চুপ থাকতে পারলেন না। তখন খিজির (আঃ) ঘটনাগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন। হযরত মূসা (আঃ) বুঝতে পারলেন আল্লাহ কীভাবে কাউকে কাউকে অন্তর্দৃষ্টি দেন,যাতে তাঁরা সুদূরপ্রসারী অর্থে এমন কাজ করতে পারেন যাকে আপাতদৃষ্টিতে বোধগম্য বলে মনে হয় না।
সব জ্ঞানের অধিকারী কেবলই আল্লাহ। তাই জ্ঞান নিয়ে অহংকার করা অনুচিত।
এ সুরায় দুটি কাহিনি এসেছে ৬০ থেকে ১০১ আয়াতে। সে দুটি হলো মুসা (আঃ)ও খিজির (আঃ) ঘটনা।একবার আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) কে তাঁর সঙ্গী (ইউশা’ বিন নূন) বললেন, "দুই সমুদ্রের মিলনস্থল (মাজমা’ আল-বাহরাইন) না পৌঁছা পর্যন্ত আমি থামব না। প্রয়োজনে আমি বছরের পর বছর চলতে থাকব।" তিনি জানতেন, সেই স্থানেই তিনি আল্লাহর এক বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন বান্দার (খিজির আঃ) সাক্ষাৎ পাবেন।
দীর্ঘ পথ চলার পর যখন তাঁরা দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে পৌঁছালেন, তখন তাঁরা নিজেদের সঙ্গে আনা মাছের কথা ভুলে গেলেন। মাছটি অলৌকিকভাবে সুড়ঙ্গের মতো পথ তৈরি করে সমুদ্রে নেমে গেল। তাঁরা আরও কিছু দূর যাওয়ার পর মূসা (আঃ) ক্লান্ত হয়ে তাঁর সঙ্গীকে বললেন, “আমাদের খাবার আনো; আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা তো কাহিল হয়ে পড়েছি।”
তখন তাঁর সঙ্গী বললেন, “আপনি কি লক্ষ্য করেছিলেন, আমরা যখন পাথরের ওপর বিশ্রাম করছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই আমাকে সে কথা বলতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটা আশ্চর্যরকমভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিল।”
মূসা (আঃ) বললেন, “আমরা তো এই জায়গারই খোঁজ করছিলাম!”
তাঁরা তখন নিজেদের পায়ের চিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং এক বিশেষ বান্দার দেখা পেলেন—যিনি ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহপ্রাপ্ত এবং যাঁর কাছে ছিল বিশেষ জ্ঞান। এই বান্দাটিই ছিলেন খিজির (আঃ)।
অঙ্গীকার ও শর্ত
মূসা (আঃ) তাঁকে বললেন, “সত্য পথের যে বিশেষ জ্ঞান আপনাকে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দেবেন—এই শর্তে কি আমি আপনাকে অনুসরণ করব?”
খিজির (আঃ) বললেন, “তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য রাখতে পারবে না। যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তুমি কেমন করে ধৈর্য ধরবে?”
মূসা (আঃ) দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, “আল্লাহ্ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল দেখতে পাবেন, আর আপনার কোনো আদেশ আমি অমান্য করব না।”
খিজির (আঃ) শর্ত দিলেন, “আচ্ছা, তুমি যদি আমাকে অনুসরণ করই, তবে আমাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন কোরো না, যতক্ষণ না আমি সেই সম্বন্ধে তোমাকে কিছু বলি।”
“অতঃপর তারা উভয়ে চলতে লাগল। পরে যখন তারা নৌকায় আরোহণ করল তখন সে (খিজির আঃ) তা বিদীর্ণ করে দিল। সে (মূসা আঃ) বলল, আপনি কি আরোহীদের (সাগরে) নিমজ্জিত করার জন্য তা ছিদ্র করে দিলেন? আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করেছেন।”-(সূরা কাহাফ: ৭১)
তিনটি রহস্যময় ঘটনা
১. নৌকায় ছিদ্র: শর্ত মেনে তাঁরা চলতে শুরু করলেন। যখন তাঁরা একটি নৌকায় উঠলেন, তখন নৌকার মালিকরা কোনো ভাড়া না নিয়েই তাঁদের দয়া করে পার করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ খিজির (আঃ) সেই নৌকাটিতে ছিদ্র করে দিলেন।
মূসা (আঃ) নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না এবং বলে উঠলেন, “তুমি কি সওয়ারিদেরকে ডোবানোর জন্য ওর মধ্যে ফুটো করলে? এ তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে!”
খিজির (আঃ) মনে করিয়ে দিলেন, “আমি কি বলিনি যে তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য রাখতে পারবে না?”
মূসা (আঃ) ক্ষমা চাইলেন, “আমার ভুলের জন্য আমার অপরাধ ধরবেন না, আর আমার ওপর আর বেশি কঠোর হবেন না।” (সুরা কাহাফ: ৭৯)
২. নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা: এরপর তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। চলতে চলতে পথে এক ছেলের সাথে দেখা হলো, আর খিজির (আঃ) তাকে খুন করলেন।
মূসা (আঃ) এবার আরও বেশি বিচলিত হয়ে বললেন, “তুমি এক নিষ্পাপ লোককে খুন করলে, যে কাউকে খুন করেনি। তুমি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে!”
খিজির (আঃ) এবারও একই কথা বললেন, “আমি কি বলিনি তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য রাখতে পারবে না?”
মূসা (আঃ) তখন বললেন, “এর পর যদি আমি তোমাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করি, তবে তুমি আর আমাকে সাথে রাখবে না। আমার ওজর-আপত্তি শেষ হয়েছে।” (সুরা কাহাফ: ৮০-৮১)
৩. পারিশ্রমিক ছাড়া দেয়াল নির্মাণ: তাঁরা তৃতীয়বারের মতো পথ চললেন। যখন তাঁরা এক জনপদের বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছুলেন, তখন তাঁরা তাদের কাছে কিছু খাবার চাইলেন; কিন্তু সেখানকার লোকেরা তাঁদের আতিথেয়তা করতে রাজি হলো না। এরপর তাঁরা সেখানে একটি পড়ে যাওয়া দেয়াল দেখতে পেলেন, যা খিজির (আঃ) নিজ হাতে মেরামত করে শক্ত করে দিলেন।
মূসা (আঃ) শেষবারের মতো প্রশ্ন করে বসলেন, “তুমি ইচ্ছা করলে অবশ্যই এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতে।”
খিজির (আঃ) বললেন, “এখানেই তোমার ও আমার সম্পর্কচ্ছেদ হলো।” (সুরা কাহাফ: ৮২)
যে-বিষয়ে তুমি ধৈর্য রাখতে পারলে না। আমি তার অর্থ বলে দিচ্ছি।
ঘটনার তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা
বিদায়ের আগে খিজির (আঃ) সেই তিনটি কাজের রহস্য উদঘাটন করলেন:
নৌকা ছিদ্র করার কারণ: "নৌকার ব্যাপার—সেটা ছিল কয়েকজন গরিব লোকের, ওরা সাগরে তাদের জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি ইচ্ছা করে নৌকাটায় ত্রুটি ঢুকিয়ে দিলাম, কারণ ওদের সামনে ছিল এক রাজা, যে জোর করে সব ভালো নৌকা ছিনিয়ে নিত।" (নৌকাটি সামান্য ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় গরিব মালিকরা সেটিকে রাজার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেন)।
শিশু হত্যার কারণ: "আর ছেলেটির বাবা-মা ছিল বিশ্বাসী। আমার আশঙ্কা হয়েছিল, তার অবাধ্যতা ও অবিশ্বাস তাদেরকে বিব্রত করবে। তারপর আমি চাইলাম যেন তার পরিবর্তে ওদের প্রতিপালক ওদেরকে এক সন্তান দেন, যে পবিত্রতায় হবে আরও বড় ও ভক্তি-ভালোবাসায় হবে আরও অন্তরঙ্গ।" (এই কাজটি ছিল বিশ্বাসী বাবা-মাকে ভবিষ্যতের কঠিন পরীক্ষা থেকে রক্ষা করার জন্য)।
দেয়াল নির্মাণের কারণ: "আর এই দেয়ালটি ছিল শহরের দুই এতিমের। তার নিচে ছিল ওদের গুপ্তধন। আর ওদের পিতা ছিল এক সৎকর্মপরায়ণ লোক। সেজন্য তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলেন যে, ওরা যেন সাবালক হয় ও তারপর ওরা ওদের ধন উদ্ধার করে। আমি নিজ থেকে কিছু করিনি। তুমি যে-বিষয়ে ধৈর্য রাখতে পারনি, এটাই তার ব্যাখ্যা।”
এভাবে মূসা (আঃ) বুঝতে পারলেন, জ্ঞান কেবলই আল্লাহর হাতে। আল্লাহ কীভাবে কাউকে কাউকে এমন অন্তর্দৃষ্টি দেন, যাতে তাঁরা সুদূরপ্রসারী কল্যাণের জন্য এমন কাজ করতে পারেন, যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ যুক্তিতে বোধগম্য হয় না।
শিক্ষা: সব জ্ঞানের অধিকারী কেবলই আল্লাহ। তাই জ্ঞান নিয়ে অহংকার করা অনুচিত। আল্লাহর বিধানে যা আপাতদৃষ্টিতে মন্দ মনে হয়, তার পেছনেও সুদূরপ্রসারী কল্যাণ থাকতে পারে।