21/09/2026
দুই গজ মাটিও জুটল না! শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের করুণ পরিণতি!
একসময় দিল্লির আকাশে উড়ত মুঘল সাম্রাজ্যের পতাকা। ১৫২৬ সালে বাবরের হাত ধরে ভারতে যে সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গির, শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের মতো সম্রাটদের হাত ধরে তা ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ইতিহাসের চাকা কখনও একই জায়গায় থেমে থাকে না। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই বিশাল সাম্রাজ্যের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক বৃদ্ধ মানুষ—বাহাদুর শাহ জাফর।
তিনি ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। কিন্তু তাঁর হাতে তখন আর সেই সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতা ছিল না। দিল্লির লাল কেল্লায় তিনি সম্রাটের মর্যাদা বহন করতেন ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে তাঁর শাসন অনেকটাই নামমাত্র হয়ে পড়েছিল। কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া ভাতার ওপর নির্ভর করেই চলত তাঁর জীবন। তবে তাঁর আর একটি পরিচয় ছিল, যে পরিচয়টি হয়তো তাঁর সম্রাট পরিচয়ের থেকেও বেশি স্থায়ী হয়ে আছে—তিনি ছিলেন একজন কবি।
জাফরের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি যেন এখানেই। যে মানুষটি ছিলেন এক সাম্রাজ্যের শেষ প্রতীক, তিনিই ছিলেন একজন সংবেদনশীল কবি। আর তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন তাঁর নিজের কবিতার মতোই—বিষাদ, বিচ্ছেদ, অপমান আর হারিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ কাহিনি।
১৮৫৭ সাল। ভারত তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অধীনে। কোম্পানির সেনাবাহিনীতে কর্মরত ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে নানা কারণে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছিল। এরই মধ্যে এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র বিতর্ক। কার্তুজের মুখ দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো এবং সেগুলিতে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে—এমন বিশ্বাস বহু হিন্দু ও মুসলমান সিপাহির মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
১০ মে মীরাটে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর তা দ্রুত দিল্লির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লিতে পৌঁছে বিদ্রোহীরা এমন একজন প্রতীকী নেতার প্রয়োজন অনুভব করল, যাঁর নামকে সামনে রেখে তারা নিজেদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে। সেই কারণেই তাদের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে লাল কেল্লার বৃদ্ধ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দিকে।
জাফর তখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাঁর হাতে ছিল না শক্তিশালী সেনাবাহিনী, ছিল না আধুনিক অস্ত্র, ছিল না এমন কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতা যার মাধ্যমে তিনি বিশাল এক বিদ্রোহ পরিচালনা করতে পারেন। প্রথমদিকে তিনি এই দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, যেখান থেকে সরে যাওয়ার পথ আর সহজ ছিল না।
বিদ্রোহীরা তাঁকে নিজেদের নেতা হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। দিল্লি তখন উত্তাল। রাস্তায় রাস্তায় ব্রিটিশবিরোধী উত্তেজনা। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনার মাঝেও জাফরের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অসহায়। দিল্লির আর এক মহান কবি মির্জা গালিব তাঁর সমকালীন লেখায় সেই বিপর্যস্ত সময়ের ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছিলেন। যে দিল্লি একসময় ছিল সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র, বিদ্রোহ এবং ব্রিটিশ প্রতিশোধের মধ্যে সেই শহরই পরিণত হয়েছিল আতঙ্ক ও ধ্বংসের নগরে।
অবশেষে ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লি পুনর্দখলের জন্য এগিয়ে এল। ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লির পতন ঘটে। শহরে শুরু হয় ব্যাপক দমন ও প্রতিশোধ। আর সেই সময়েই নিজের রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন বৃদ্ধ সম্রাট।
২০ সেপ্টেম্বরের দিকে বাহাদুর শাহ জাফর হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস—যে বংশ দিল্লিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী শাসন করেছিল, সেই বংশের শেষ সম্রাট নিজের রাজপ্রাসাদে নয়, আশ্রয় নিচ্ছেন তাঁরই পূর্বপুরুষের সমাধিতে।
সেখানেই তাঁকে বন্দি করেন ব্রিটিশ অফিসার উইলিয়াম হডসন। এরপর আসে আরও ভয়াবহ ঘটনা। জাফরের পুত্র মির্জা মুঘল ও মির্জা খিজির সুলতানসহ কয়েকজন রাজপুত্রকে হডসন হত্যা করেন। দিল্লির মুঘল দরবারের জন্য এটি ছিল কার্যত শেষ অধ্যায়ের সূচনা।
বাহাদুর শাহ জাফরকে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলো। তাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিদ্রোহীদের সমর্থন এবং ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ আনা হয়। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে জাফর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ আদালতের সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো—বৃদ্ধ সম্রাটকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না। তাঁকে ভারত থেকে নির্বাসিত করা হবে। তখন তাঁর বয়স প্রায় তিরাশি বছর।
১৮৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দিল্লি ছাড়লেন বাহাদুর শাহ জাফর। কিন্তু এবার তিনি সম্রাট হিসেবে নয়—বন্দি হিসেবে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর জীবিত দুই পুত্র মির্জা জওয়ান বখত ও মির্জা শাহ আব্বাস, পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং অনুচর। যাত্রার শুরুতে দলের সদস্যসংখ্যা ছিল ৩১। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে সেই সংখ্যা কমে ১৫-তে দাঁড়ায়।
ভাবুন একবার—যে বংশের সম্রাটেরা একসময় রাজকীয় শোভাযাত্রায় দিল্লির রাস্তায় বের হতেন, সেই বংশের শেষ সম্রাট এবার নিজের রাজধানী ছাড়ছেন বন্দি অবস্থায়।
দিল্লি থেকে তাঁর যাত্রাপথ ছিল এলাহাবাদ, মির্জাপুর হয়ে বাংলার দিকে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা পৌঁছলেন ডায়মন্ড হারবারে। সেখান থেকেই জাহাজে করে শুরু হলো সমুদ্রযাত্রা—গন্তব্য রেঙ্গুন।
ডায়মন্ড হারবার থেকে জাহাজে চেপে তিনি চলে গেলেন রেঙ্গুনের পথে। ভারতের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক যেন সেদিনই শেষ হয়ে গেল।
রেঙ্গুনে পৌঁছে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল না কোনও রাজপ্রাসাদ। ছিল না দরবার, ছিল না কবিদের আসর, ছিল না দিল্লির লাল কেল্লা। ছিল একটি ছোট কাঠের বাড়ি। প্রথমদিকে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ছোট ঘরে রাখা হয়। পরে শ্বেদাগোন প্যাগোডার কাছে চার কামরার একটি কাঠের বাড়িতে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
সমকালীন বিবরণ অনুযায়ী, চারটি কক্ষের প্রতিটির আয়তন ছিল প্রায় ১৬ ফুট বাই ১৬ ফুট। অর্থাৎ পুরো বাড়ির আয়তন ১৬ বর্গফুট ছিল না; প্রতিটি ঘরই ছিল প্রায় ১৬ ফুট বর্গাকার।
আরও কঠিন ছিল তাঁর বন্দিজীবনের নিয়ম। কাগজ, কালি ও কলম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। যে মানুষটি সারাজীবন কবিতা লিখেছেন, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিজের মনের কথা লিখে রাখার স্বাধীনতাটুকুও ছিল না।
দিল্লিতে বন্দি অবস্থায় তিনি কখনও কাঠকয়লা দিয়ে দেওয়ালে কবিতার পঙ্ক্তি লিখতেন—এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু রেঙ্গুনে তাঁর শেষ জীবনের সব কথা ইতিহাস আমাদের জানায় না। তবু তাঁর কবিতা বেঁচে আছে। আর তাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে থাকা সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
“কিতনা হ্যায় বদনসিব জাফর দফন কে লিয়ে,
দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মেঁ।”
অর্থাৎ—কতই না দুর্ভাগা জাফর, প্রিয়জনের শহরে সমাধিস্থ হওয়ার জন্য দুই গজ জমিও জুটল না। এই কয়েকটি লাইনের মধ্যে যেন বন্দি হয়ে আছে তাঁর সমগ্র নির্বাসনের বেদনা। দিল্লি তাঁর শহর। মুঘল সাম্রাজ্য তাঁর পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। আর তবুও মৃত্যুর পর সেই দিল্লির মাটিতে তাঁর জায়গা হলো না।
১৮৬২ সাল। রেঙ্গুনে নির্বাসিত জীবনের পাঁচ বছরের মাথায় জাফরের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৭ নভেম্বর ১৮৬২ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাহাদুর শাহ জাফর। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দিল্লি থেকে বহু দূরে, নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত অবস্থায়, নিজের সাম্রাজ্য হারিয়ে তাঁর জীবনের অবসান হলো।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন ইতিহাস তাঁর প্রতি নিষ্ঠুরতা থামায়নি।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে কোনও বড় জনসমাবেশ বা স্মৃতিচিহ্ন তৈরি হোক, তা চাইছিল না। তাই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। তাঁর কবরটিকেও এমনভাবে আড়াল করা হয়েছিল, যাতে সময়ের সঙ্গে তার চিহ্ন মুছে যায়।
ফলে শেষ মুঘল সম্রাটের কবরও একসময় কার্যত হারিয়ে যায়।
বিশ শতকের গোড়ায় রেঙ্গুনের মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে তাঁর কবরের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয় এবং সেখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। কিন্তু সেটিই যে তাঁর প্রকৃত সমাধি—তা নিয়ে নিশ্চিততা ছিল না।
তারপর কেটে যায় আরও বহু বছর।
১৯৯১ সালে রেঙ্গুনে তাঁর মাজারের পিছনে নির্মাণকাজের সময় মাটি খোঁড়ার সময় শ্রমিকদের হাতে উঠে আসে একটি পুরনো ইটে বাঁধানো কবর। পরবর্তী অনুসন্ধানে সেটিকেই বাহাদুর শাহ জাফরের প্রকৃত সমাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অর্থাৎ, মৃত্যুর প্রায় ১২৯ বছর পর তাঁর আসল কবর আবার সামনে আসে।
বাহাদুর শাহ জাফরের জীবন তাই শুধু একজন পরাজিত সম্রাটের গল্প নয়। এটি এক সাম্রাজ্যের পতনের গল্প। একটি শহরের ধ্বংসের গল্প। একজন বৃদ্ধ কবির নির্বাসনের গল্প। আর সেই মানুষের গল্প, যিনি মৃত্যুর আগেই বুঝে গিয়েছিলেন—ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কখনও কখনও সিংহাসন হারানো নয়, বরং নিজের মাটিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার হারানো।
আর তাই আজও তাঁর সেই আক্ষেপ কানে বাজে—
“দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মেঁ…”
প্রিয় শহরের মাটিতে দুই গজ জায়গাও জুটলো না।
Copy post