29/10/2025
#মুক্তিযুদ্ধ
#বাংলাদেশেরইতিহাস
ন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আ্নীত তেইশটি অভিযোগের বিচার হয়েছিলো। বিচারের রায়ে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা তেইশটি অভিযোগের মধ্যে নয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটাতে তাঁর পাঁচ থেকে বিশ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছিলো। চারটে অভিযোগ, অভিযোগ ৩ (নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা), অভিযোগ ৫ (সুলতানপুর বণিকপাড়া গণহত্যা), অভিযোগ ৬ (উনসত্তরপাড়া গণহত্যা) ও অভিযোগ ৮ (আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মোজাফফর আহমেদকে অপহরণের পর হত্যা) এ তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয় আদালত।
বিবাদীপক্ষের আপিলের কারণে এই মামলা আপিলেট ডিভিশনে যায়। সেখানে শুধুমাত্র ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিশ বছরের দণ্ড মওকুফ পান তিনি। বাকি সবগুলো অভিযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়কে সঠিক বলে রায় দেয় আপিলেট ডিভিশন।
আজকে এখানে আমরা অভিযোগ ৩, অর্থাৎ নূতন চন্দ্র সিংহের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করবো।
নিজের মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি বলে তাঁর মনে একটা ক্ষোভ এবং আক্ষেপ ছিলো। রাউজানে তখন কোনো মেয়েদের স্কুল ছিলো না। তিনি কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। এই বিদ্যালয় ছিলো সম্পূর্ণ আবাসিক। বিদ্যালয়ে ডাকঘর ছিলো, টেলিফোন ছিলো, জেনারেটর ছিলো, বলতে গেলে প্রত্যন্ত একটা অঞ্চলে তিনি মেয়েদের জন্য যতখানি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় পড়ালেখার জন্য সেটা করেছিলেন। এর বাইরে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়েরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। শিক্ষিত, মার্জিত, বিনয়ী, দয়ালু এবং দানশীল ব্যক্তিটিকে সবাই ভালবাসতো।
একাত্তরের অনিশ্চিত এবং ভীতিকর সময়ে অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক। শুধু শিক্ষকই নন, আরও অনেক পেশার প্রথিতযশা মানুষজন আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে। প্রবল ঝড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত পাখিরা যেমন আশ্রয় খোঁজে বটবৃক্ষের কাছে, সেরকম অসংখ্য সাধারণ মানুষ এসে আঁকড়ে ধরেছিল তাঁকে সামান্য একটু নিরাপত্তার জন্য। জান-মাল, ইজ্জত-সম্মান, আর প্রাণ রক্ষার তাগিদে। চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে সবাই যখন দেশ ছেড়ে সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে, কেউ কেউ তাকে অনুরোধ করে বলেছে “চলেন দাদা, চলে যাই। পরিস্থিতি ভালো হলে ফিরে আসবেন। তারপর না হয় জনসেবা করবেন।“ নূতন চন্দ্র সেইসব কথা শুনেন নাই। এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছেন। কোথায় যাবেন তিনি এই মাটি ছেড়ে? কোথায় পালাবেন প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে? কিসের মায়ায়? কার জন্য? তিনি কোথাও যাননি। এই না যাওয়াটাই কাল হয়েছিলো তাঁর জন্য।
১৩ই এপ্রিল ১৯৭১, সকাল ৯টা থেকে ১০টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি আর্মি গহিরার কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে এসে উপস্থিত হয়। তারা সরাসরি ঢুকে পড়ে নূতন চন্দ্র সিংহের বসত ভিটায়। নূতন চন্দ্র তখন মন্দিরে (যা হিন্দুদের বাসগৃহস্থিত প্রার্থনালয়) প্রার্থনারত অবস্থায় ছিলেন। পাকিস্তান আর্মি যখন তাঁর বাড়িতে এলো তাঁর স্বভাবসুলভ অতিথি পরায়ণতা দেখাতে এক বিন্দু ভুল করেননি তিনি। উঠোনে চেয়ার সাজিয়ে রেখেছিলেন তাদের জন্য। তাঁর অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলো মিলিটারি। কিন্তু যাওয়া হয় নি। কারণ, সাথে ছিলো মৃত্যুদূত, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধিতা করা কনভেনশনাল মুসলিম লীগের নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর বড় সন্তান।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন সেনাদের বুঝাচ্ছিলো এই বলে যে, তাঁর বাবার নির্দেশ আছে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করার জন্য। এই নির্দেশনা শুনে পাকিস্তান আর্মি নূতন চন্দ্র সিংহের উপর গুলি চালায়। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। নূতন চন্দ্র খানিকটা নড়ে উঠলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজের হাতে পুনরায় গুলি করে নিশ্চিত করেন নূতন চন্দ্র সিংহের মৃত্যু! ঘটনার পর সেই স্থান ত্যাগ করে সবাই।
বিএনপির মহাসচি মির্জা ফখরুল কি চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ডের খবর জানেন না? তিনি কি জানেন না ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিলো ওখানে? কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো হিন্দুদের উপর? হিন্দুদের একটাই মাত্র অপরাধ ছিলো তারা সত্তরের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ভোট দেয়নি।
আমি জানি না ঠিক কোন কারণে তাঁর ধারণা হলো যে সাকা চৌধুরীকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে? উচ্চ পদে থাকলে মানুষকে অনেক বিবেচক হতে হয়, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। বিএনপির মহাসচিব যখন এই ধরনের বেফাঁস মন্তব্য করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই লাভবান হয় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত। জামায়াত তাদের ঘন এবং হালকা দুই ধরনের অনুসারীদেরই বোঝাতে সক্ষম হয় যে একাত্তর বিষয়ক সবকিছুই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সাজানো ঘটনা। যুদ্ধাপরাধ বলে কিছু নেই, রাজাকার-আলবদর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। যা আছে তা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসার রাজনীতি। সেই প্রতিহিংসায় বলি হয়েছে কিছু নিরীহ ও নিরপরাধ আলেম-ওলামা এবং দেশপ্রেমিক(!) মানুষ।
সংগৃহিত