26/04/2026
আজ আমরা যাত্রা শুরু করব চীনের কুবুচি মরুভূমি থেকে। এমন একটা জায়গা যেটাকে মানুষ একসময় শুধু মরুভূমি বলতো না। বলতো মৃত্যুর সমুদ্র। কারণ এখানে জীবন মানেই ছিল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ একর জমি নিঃশব্দে বালুর নিচে চাপা পড়ে যেত। উর্বর জমি চোখের সামনেই মরুভূমিতে পরিণত হতো। গাছপালা শুকিয়ে যেত আর মানুষ বাধ্য হতো নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে। চারদিকে শুধু বালুর ঢেউ আর জ্বলন্ত বাতাস। আর এমন এক নীরবতা যেটা বোঝাতো এখানে জীবন টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল এই মরুভূমি কিন্তু
থেমে ছিল না। এটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ একর জমি বালুর নিচে হারিয়ে যাচ্ছিল। গোটা গ্রাম কৃষি জমি রাস্তা সবকিছু যেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। আর এই প্রক্রিয়ার একটা নামও আছে ডেজার্টিফিকেশন সহজভাবে বললে যেখানে আগে জীবন ছিল সেখানে ধীরে ধীরে শুধু মরুভূমি তৈরি হয়ে যায় আর কুবুচি ছিল এর সবচাইতে বড় উদাহরণগুলোর একটা একসময় এই মরুভূমি এমন গতিতে ছড়াচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল এটাকে আর থামানো সম্ভব না তবে চীন থেমে থাকেনি তারা বারবার চেষ্টা করেছে এই মরুভূমিকে থামানোর গাছ লাগিয়েছে স্যান্ড কন্ট্রোল স্টেশন তৈরি করেছে বড়
বড় প্রজেক্ট চালু করেছে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বালুর এই মহাসমুদ্রকে আটকানো যাচ্ছিল না। যতই চেষ্টা করা হোক মনে হচ্ছিল এই লড়াইটা তারা ধীরে ধীরে হারছে। মরুভূমির একটা ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য আছে। এটা একবার বাড়তে শুরু করলে তাকে থামানো খুবই কঠিন। ঠিক তখনই একজন মানুষ এমন একটা আইডিয়া নিয়ে সামনে এল যেটা শুনে সবাই প্রথমে হেসে ফেলেছিল। তার নাম ওয়ান ভ্যানবিয়াও। সে শুরু করল এক অদ্ভুত কাজ। নিজের সব সঞ্চয় খরচ করে ঋণ নিয়ে সে শুরু করে এক পাগলামি। সে নিয়ে আসে 100রও বেশি বুলডোজার, 300 শ্রমিক। দিনের পর দিন 18 ঘন্টা ধরে কাজ
চলতে থাকে। মরুভূমির বালুর উপর শুকনো ঝোঁপ দিয়ে ছোট ছোট স্কয়ার বানাতে লাগলো। আর সেই স্কয়ারের ভেতরে লাগাতে শুরু করল উইলো গাছ। এই গাছটা কোন সাধারণ গাছ না। এর শিকর মাটির অনেক গভীরে প্রায় 300 ফুট পর্যন্ত গিয়ে পানি খুঁজে নিতে পারে। মানে যেখানে অন্য কোন গাছই বাঁচতে পারে না সেখানে এই গাছ একটা সুযোগ তৈরি করে নিতে পারে কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ না মরুভূমির তীব্র বাতাস এতটাই শক্তিশালী যে এই নতুন গাছগুলো টিকে থাকাই কঠিন বাতাস বালু উড়িয়ে নিয়ে যায় আর সেই সাথে মাটির ভেতরের সামান্য আদ্রতা টুকুও শুকিয়ে ফেলে ফলে গাছ বাঁচার
আগেই মারা যায় তাই ওয়াং একটা নতুন কৌশল ব্যবহার করে সে ঝোপ দিয়ে চারপাশ ঘিরে দেয় যেন বাতাস সরাসরি আঘাত করতে না পারে আর ভেতরে আদ্রতা ধরে রাখা যায়। এই ছোট্ট আইডিয়াটাই ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনের শুরু করে। মানুষ তখনো হাসছিল। এই লোকটা পাগল। মরুভূমিতে গাছ লাগাচ্ছে। কিন্তু সে থামেনি। একদিন দুইদিন না। টানা সে কয়েক বছর ধরে একই কাজ করে যায়। ধীরে ধীরে কিছু গাছ টিকে কিছু শেকর মাটির গভীরে পৌঁছালো। বালু একটু একটু করে থামতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল হয়তো অসম্ভবটা একটু একটু করে সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু তখনই সামনে এলো আরেক
বড় সমস্যা। গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত যত্ন দরকার। নতুন ডালগুলোকে কেটে দিতে হবে। না হলে গাছ শক্ত হবে না, বড় হবে না। আর এই বিশাল মরুভূমিতে এই কাজ করা প্রায় অসম্ভব। মানুষ দিয়ে করাতে গেলে তার খরচ আকাশ ছোঁয়া। আর সময়ও লাগবে অফুরন্ত। তাহলে এই কাজ করবে কে? এত বড় জায়গায় এত কষ্টের মধ্যে কে সামলাবে এই গোটা সিস্টেম? আর ঠিক এখানেই হঠাৎ কল্পনা একটা নতুন মোড় নেয়। যেটা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। যে কাজটা মানুষ দিয়ে করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল সেই কাজটাই করা শুরু করল ছোট্ট একটা প্রাণী খরগোশ। এখানে আনা হলো এক বিশেষ
প্রজাতির খরগোশ। রেক্স র্যাবিট। এই খরগোশ গুলোকে বলা হয় হোয়াইট গোল্ড। কারণ তাদের লোম এতটাই নরম, এতটাই মূল্যবান যে একটা ভালো মানের চামড়া প্রায় 30 ডলার পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। যেখানে একটা খরগোশ বড় করতে খরচ পড়ে মাত্র 2 ডলার। মানে একটা প্রাণী থেকেই 15 গুণেরও বেশি রিটার্ন। তবে এটা কিন্তু আসল গল্প না। আসল গল্প লুকিয়ে আছে তাদের ছোট্ট একটা অভ্যাসে। রেক্স খরগোশ গুলো আবার উইলো গাছের নতুন এবং কোমল ডাল খেতে খুবই পছন্দ করে। আর যখন এই খরগোশ গুলো গাছের নতুন ডাল খাওয়া শুরু করল তখন গাছের মূল কান্ডটা আরো মোটা এবং শক্ত আর
স্থায়ী হতে লাগলো। মানে যে কাজটা মানুষকে বারবার করে করতে হতো। ডাল কেটে গাছকে শক্ত করা সেটাই এই খরগোশ গুলো নিজেরাই একদম সহজে করে ফেলছিল। এখানেই শেষ না। এই খরগোশ গুলোর আরেকটা বড় অবদান ছিল তাদের বর্্য। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে কিন্তু তাদের গোবর খুবই শক্তিশালী প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই শুকনো এবং মৃত প্রায় মাটির ভেতরে আবার প্রাণ ফিরতে লাগলো। আরো একটা চমক ছিল। এই খরগোশগুলো ঘাস খেত। কিন্তু ঘাসের বীজ পুরোপুরি হজম করতে পারতো না। ফলে তাদের মাধ্যমে সেই বীজ আবার মাটিতে ফিরে আসতো।
আর কিছুদিন পর দেখা যায় যেখানে আগে শুধু বালু ছিল সেখানে ধীরে ধীরে ঘাস জন্মাতে শুরু করেছে। একটা ছোট্ট সাইকেল তৈরি হয়ে গেল। প্রকৃতি আর প্রাণী দুইজনই একসাথে কাজ করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে বালু থামতে লাগল। মাটির ভেতরের আদ্রতা ধরে থাকতে শুরু করল। বাতাস আর আগের মতো বালু উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারছিল না। আর কয়েক বছরের মধ্যেই যে জায়গাটা একসময় মৃত মরুভূমি ছিল সেটাই ধীরে ধীরে সবুজ হওয়া শুরু করল। এখানেই কিন্তু শেষ না। এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশেই থেমে থাকেনি। মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষদের এই
খরগোশ পালনের জন্য উৎসাহ দেয়া হয়। প্রতিটা ঘর ছোট ছোট ফার্মে পরিণত হতে শুরু করে। খরগোশের লোমগুলো বিক্রি হতে লাগলো। গাছ থেকেও কাঁচামাল আসতে শুরু করল। আর মানুষ ধীরে ধীরে আয় করতে লাগলো। একসময় যারা এই মরুভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল তারা আবারো ফিরে আসতে শুরু করল। বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। আর একটা সময় এসে দেখা যায় কুবুচি মরুভূমির একটা বড় অংশ সবুজে ঢেকে গেছে। যে জায়গাটাকে একসময় শুধু মৃত্যুর সাগর বলা হতো। একসময় যারা এই জায়গা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল তারা আবার ফিরে এলো। কিন্তু ওয়াং এখানেই
থামেনি। মরুভূমির মাঝখানে তৈরি করল বিশাল এক সোলার পাওয়ার প্লান্ট। 1 লাখ 96,000 প্যানেল দিয়ে একটা দৌড়ানো ঘোড়ার আকৃতি। এই প্লান্ট বছরে 2.3 বিলিয়ন কিলোয়াট ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যা প্রায় 4 লাখ মানুষের জন্য যথেষ্ট। তবে এখানেও একটা টুইস্ট আছে। এই প্যানেলগুলো শুধু বিদ্যুৎ তৈরি করে না। এগুলো বাতাসের গতিও 50% কমিয়ে দেয়। সেই সাথে প্যানেলগুলোর নিচে ছায়াও তৈরি করে। আর সেই ছায়ার নিচে আবার ঘাস জন্ম নেয়। আর সেই ঘাস খেতে শুরু করে খরগোশ ভেড়া হাঁস মানে একটা নতুন ইকোসিস্টেম তৈরি হয় যেখানে প্রযুক্তি আর
প্রকৃতি একসাথে কাজ করে এবং আজ এই মডেল শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ না স্পেন আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্য অনেক দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করেছে এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই মানুষ আপনাকে নিয়ে যতই হাসাহাসি করুক আপনাকে আপনার লক্ষ্যে অটুট থাকা উচিত অন্যের হাসির জন্য নিজের স্বপ্ন কেন বাদ দিবেন কারণ কারণ আজ পর্যন্ত যারা বড় হয়েছে তাদের সবাইকে নিয়েই প্রথমে সবাই হেসেছিল। এখন সিদ্ধান্ত আপনার।
Four Twenty 420