07/09/2026
🇧🇩 ১৯৬৪ সালের ঢাকা—তিন তরুণীর সাহস বদলে দিয়েছিল ইতিহাস
আজ বুয়েটের ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু একসময় প্রকৌশল পড়তে চাওয়াটাই ছিল মেয়েদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
সময়টা ১৯৬৪ সাল।
তিন তরুণী—খালেদা শাহরিয়ার কবির, মনোয়ারা বেগম ও শিরীন সুলতানা—স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রকৌশলী হওয়ার।
তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (EPUET)—আজকের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।
কিন্তু তাঁদের সামনে প্রথম বাধা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজাতেই।
সে সময় স্থাপত্য বিভাগে নারী শিক্ষার্থীরা পড়তে পারলেও প্রকৌশলের অন্যান্য বিভাগে তাঁদের ভর্তি নেওয়া হতো না। বিশেষ করে পুরকৌশল (Civil Engineering) মেয়েদের জন্য ‘অনুপযুক্ত’ বলে মনে করা হতো।
কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল—পুরকৌশলে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয়, এমনকি সাভারে এক মাসের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পেও থাকতে হয়। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের জন্য এমন পরিবেশ গ্রহণযোগ্য হবে না—এটাই ছিল কর্তৃপক্ষের যুক্তি।
কিন্তু তিন তরুণী পিছিয়ে যাননি।
তাঁদের প্রশ্ন ছিল খুবই সহজ—
«“সংবিধানে কোথায় লেখা আছে যে মেয়েরা প্রকৌশল পড়তে পারবে না?”»
তাঁরা অন্তত ভর্তি পরীক্ষায় বসার সুযোগ দাবি করেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁদের দৃঢ়তার কাছে কর্তৃপক্ষকে নতি স্বীকার করতে হয়। তিনজনই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং উত্তীর্ণ হন।
কিন্তু বাধা তখনো শেষ হয়নি।
প্রথম বর্ষের পর খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা পুরকৌশল পড়তে চাইলে আবারও আপত্তি ওঠে। পরিবারের সম্মতি নিয়ে তাঁরা কর্তৃপক্ষকে বোঝান যে সাভারের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পেও তাঁরা অংশ নিতে প্রস্তুত।
অবশেষে অনুমতি মেলে।
অন্যদিকে মনোয়ারা বেগম বেছে নেন কেমিকৌশল (Chemical Engineering)।
এভাবেই তাঁরা হয়ে ওঠেন ইপুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষার্থী।
👩🎓 ১৯৬৮ সালে খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁরা হয়ে ওঠেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।
আর ১৯৭০ সালে মনোয়ারা বেগম কেমিকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই তাঁদের সংগ্রাম থেমে থাকেনি।
খালেদা শাহরিয়ার কবির ১৯৬৯ সালে প্রকৌশল পেশায় যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তিনি তৎকালীন East Pakistan Water and Power Development Authority-তে যোগ দেন—যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে রূপ নেয়।
কর্মজীবনে তিনি ধাপে ধাপে নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হন।
তিস্তা ব্যারাজসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পানি উন্নয়ন প্রকল্পেও তাঁর কাজের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
দুঃখজনকভাবে, ২০ জানুয়ারি ২০২১ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
🌸 তাঁদের গল্প শুধু তিনজন নারীর গল্প নয়।
এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন একটি মেয়ের প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নকেও সমাজ ও প্রতিষ্ঠান নানা যুক্তিতে থামিয়ে দিতে চাইত।
কিন্তু খালেদা, মনোয়ারা ও শিরীন প্রশ্ন করেছিলেন—
“কেন মেয়েরা পারবে না?”
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তাঁরা নিজেদের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের হাজারো মেয়ের জন্য একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
আজ বুয়েটের ক্লাসরুমে যখন অসংখ্য নারী শিক্ষার্থী পাশাপাশি বসে প্রকৌশল পড়েন, তখন তাঁদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এই তিন সাহসী তরুণীর ইতিহাস।
🇧🇩 তাঁরা শুধু প্রকৌশলী ছিলেন না—তাঁরা ছিলেন পথপ্রদর্শক।
খালেদা শাহরিয়ার কবির • মনোয়ারা বেগম • শিরীন সুলতানা
তিনটি নাম, একটি স্বপ্ন, আর একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের শুরু।
#বাংলাদেশেরইতিহাস #বুয়েট #খালেদাশাহরিয়ারকবির #মনোয়ারাবেগম #শিরীনসুলতানা #নারীরঅগ্রযাত্রা #বাংলাদেশ