26/07/2026
যে রহস্যগুলোর উত্তর আজও খুঁজে চলেছে বিজ্ঞান
প্রকৃতি তার সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণীকে টিকে থাকার জন্য এমন কিছু অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দিয়েছে, যা শুনলে যেকোনো মানুষের চোখ কপালে উঠবে। মরুভূমির তীব্র দাবদাহ হোক কিংবা গভীর সাগরের হিমশীতল অন্ধকার—পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় এমন কিছু জীব বসবাস করে যাদের শারীরিক গঠন এবং বেঁচে থাকার কৌশল সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।
১. অমরত্ব এবং পুনর্জন্মের অলৌকিক ক্ষমতা
মানুষ চিরকাল অমরত্ব লাভ করার স্বপ্ন দেখে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে যারা তত্ত্বগতভাবে বা শারীরিকভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী।
অমর জেলিফিশ (Turritopsis dohrnii): প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো এই বিশেষ প্রজাতির জেলিফিশ। এরা বার্ধক্যের কারণে স্বাভাবিক নিয়মে মারা যায় না। যখন এই জেলিফিশগুলোর বয়স বেড়ে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা চরম খাদ্যসংকট বা পরিবেশগত প্রতিকূলতার মুখে পড়ে, তখন তারা নিজেদের কোষগুলোকে একদম প্রাথমিক বা পলিপ (Polyp) অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'ট্রান্সডিফারেন্সিয়েশন' (Transdifferentiation)। এর মাধ্যমে পুরানো কোষগুলো ভেঙে নতুন কোষ তৈরি হয় এবং জেলিফিশটি তার জীবনচক্র আবার নতুন করে শুরু করে। ফলে জৈবিকভাবে এদের কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নেই।
প্ল্যানারিয়ার রিজেনারেশন ক্ষমতা: সমতল কৃমি বা প্ল্যানারিয়া (Planaria) প্রজাতির কৃমিগুলোর শরীর কাটার পর পুনরায় তৈরি হওয়ার এক অসামান্য ক্ষমতা রয়েছে। আপনি যদি একটি প্ল্যানারিয়াকে লম্বালম্বি বা আড়াআড়িভাবে কয়েক টুকরো করে কেটে ফেলেন, তবে কাটা প্রতিটি অংশ থেকে সম্পূর্ণ নতুন এবং পূর্ণাঙ্গ প্ল্যানারিয়া জন্ম নেবে! এমনকি এদের মস্তিষ্কের অংশ কেটে ফেললেও সেটি আবার নিখুঁতভাবে পুনর্গঠিত হতে পারে।
পরিবেশ ও চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার কৌশল
পৃথিবীর এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে সাধারণ কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু কিছু প্রাণী এমন সব কায়দাকানুন রপ্ত করেছে যা চরম বিপদের মুখেও তাদের জীবন রক্ষা করে।
টার্ডিগ্রেড বা ওয়াটার বিয়ার (Tardigrade): অণুবীক্ষণিক এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সহনশীল জীব। এদের আকার মাত্র ১ মিলিমিটারের কাছাকাছি হলেও এদের সহ্যক্ষমতা অবিশ্বাস্য। এরা জলের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে বা চরম শুষ্ক অবস্থায় নিজেদের শরীরের সমস্ত বিপাকীয় কার্যকলাপ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় 'ক্রিপ্টোবায়োসিস' (Cryptobiosis)। এই অবস্থায় এরা পরম শূন্য তাপমাত্রা অর্থাৎ প্রায় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ঠান্ডায়, এমনকি ফুটন্ত জলের চেয়েও বেশি তাপমাত্রায় (১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, মহাশূন্যের মারাত্মক ভ্যাকুয়াম এবং মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয়তার মধ্যেও এরা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে সক্ষম।
কাঠবিড়ালীর শীতনিদ্রা এবং কোষ রক্ষা: কিছু প্রাণী শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমিয়ে থাকে, যাকে হাইবারনেশন (Hibernation) বলা হয়। এই সময়ে তাদের হৃৎস্পন্দন এবং শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ মাসব্যাপী নিষ্ক্রিয়তার পরও তাদের পেশি দুর্বল হয় না বা হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় না। এই রহস্য ভেদ করতে পারলে তা ভবিষ্যতে মানুষের মহাকাশ ভ্রমণ বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
৩. রঙের জাদুকর ও নিখুঁত ছদ্মবেশ
প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য শিকারীর হাত থেকে বাঁচা বা নিজে শিকার ধরার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করার কোনো বিকল্প নেই। আর এই ক্ষেত্রে কিছু প্রাণী একেবারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
অক্টোপাস এবং কাটলফিশের ত্বকের জাদু: অক্টোপাস এবং কাটলফিশ হলো পৃথিবীর অন্যতম সেরা ছদ্মবেশী শিল্পী। এদের ত্বকে কোটি কোটি বিশেষ ধরনের কোষ থাকে, যাদের বলা হয় 'ক্রোমাটফোর' (Chromatophores)। পেশির সংকোচনের মাধ্যমে এরা চোখের পলকে ত্বকের রঙ এবং প্যাটার্ন পরিবর্তন করে চারপাশের পরিবেশের সাথে পুরোপুরি মিশে যেতে পারে। সমুদ্রের তলদেশের বালি, পাথর কিংবা প্রবাল প্রাচীরের সাথে এদের পার্থক্য করা মানুষের তো বটেই, অনেক শিকারীর পক্ষেই অসম্ভব হয়ে ওঠে।
টিকটিকি ও গিরগিটির দ্বিমুখী দৃষ্টি: কিছু প্রজাতির গিরগিটি বা টিকটিকির চোখ দুটি একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ভিন্ন দিকে পরিচালনা করতে পারে। অর্থাৎ এদের একটি চোখ যদি সামনের দিকে তাকায়, তবে অন্য চোখটি পিছন বা ওপরের দিকে তাকাতে পারে। এর ফলে এরা একই সাথে সামনে এবং পেছনের পুরো দৃশ্য দেখতে পায় এবং চারপাশের বিপদ সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকে।
৪. শারীরিক শক্তির চরম বহিঃপ্রকাশ
আকারে ছোট বা সাধারণ মনে হলেও কিছু প্রাণীর পেশিশক্তি বা গতি এমন যে তা যেকোনো আধুনিক যন্ত্রকেও হার মানাতে পারে।
ডাঙ্গার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী গণ্ডার বিটল (Rhinoceros Beetle): নিজের শরীরের ওজনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভারী বস্তু বহন করার দিক দিয়ে এই পোকাটি বিশ্বরেকর্ড ধারী। একটি গণ্ডার বিটল পোকা তার নিজের ওজনের প্রায় ৮৫০ গুণ বেশি ভারী বস্তু অনায়াসে পিঠে বহন করে টেনে নিয়ে যেতে পারে। মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করলে, একজন সাধারণ মানুষ যদি এই ক্ষমতার অধিকারী হয়, তবে সে একসাথে প্রায় ছয় থেকে সাতটি বড় আকারের হাতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারত!
চিতাবাঘ ও ফ্লি-এর বাউন্সিং জাম্প: ফ্লি (Flea) বা চিল বা এজাতীয় ক্ষুদ্র পোকাগুলো নিজেদের শরীরের আকারের তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ উঁচুতে লাফ দিতে পারে। মানুষের উচ্চতার সাথে তুলনা করলে একজন মানুষের পক্ষে একটি আস্ত বহুতল ভবন এক লাফে পার করার সমান।
প্যারাগ্রিন ফ্যালকনের অবিশ্বাস্য গতি: আকাশ থেকে যখন কোনো শিকার ধরার জন্য প্যারাগ্রিন ফ্যালকন বা শাহিন পাখি নিচের দিকে ডাইভ দেয়, তখন তার গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম প্রাণী, যার গতি যেকোনো আধুনিক রেসিং কারকেও পেছনে ফেলে দিতে পারে।