26/05/2026
সাভারে শামীম কান্ড: পুলিশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, ঘটনার নেপথ্যে যে রহস্য!
সাভার প্রতিনিধি: ঢাকার সাভার পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ড এবং সাভার সদর ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নং ওয়ার্ডের চাঁপাইন, দেওগাঁও ও রাজাসন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং গঠন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, কনট্রাক্ট কিলিং, মাদক ব্যবসা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, সাভার সদর ইউনিয়নের দেওগাঁও পশ্চিমপাড়া এলাকার মতিউর রহমানের দুই ছেলে মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ‘ফেন্সি সামির’ এবং মো. হৃদয় হোসেন ওরফে ‘ফর্মা হৃদয়’ দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
সূত্রের দাবি, তারা সাভার পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম মিয়ার অনুসারী হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং তাদের দ্বারা আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে মাহাবুব সামির ও হৃদয়ের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তারা সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মনজুরুল আলম রাজীবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে আন্দোলন দমনে মাঠে সক্রিয় ছিলেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পরবর্তীতে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা কিছুদিন এলাকা থেকে গা ঢাকা দেন। এরপর টাকার বিনিময়ে নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে এলাকায় পুনরায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
সূত্রের দাবি, নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে তারা বিতর্কিত কিছু বিএনপি নেতার হয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং এলাকায় আধিপত্য ফিরে পায়। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং চারটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও তিনটি অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়। একটি ঘটনায় মামলা হয়, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আলোচিত রুবেল হত্যার মামলায় মাহবুব সামির ও ফর্মা হৃদয় এজাহার নামীয় আসামি এবং পরে উচ্চ আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের মাধ্যমে এলাকায় ফিরে এসে পুনরায় অপরাধ কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়।
এরপর এলাকায় চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি এবং অর্থ আদায়ের চাপ বৃদ্ধি পায় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী শামীম হোসেন, যিনি রিকশা গ্যারেজ ও ব্যাটারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তার ব্যবসার ওপর নজর পড়ে মাহাবুব হোসেন সামির ও তার ভাই হৃদয়ের। শামীমকে ঘিরেও মাদক কান্ডের বিতর্ক রয়েছে।
সূত্রমতে, সাভারের এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার নাম ব্যবহার করে শামীম এর কাছে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ দাবি করে আসছিল মাহাবুব সামির ও তার বাহিনীর লোকজন। অর্থ না পেয়ে শামীম হোসেনকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দেখানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সাংবাদিককে ব্যবহার করে ব্যবসায়ী শামীম হোসেনের বিরুদ্ধে অধিক প্রচারণা চালানো হয়।
এসব কান্ডে ব্যার্থ হয়ে পরবর্তীতে শামীমকে পরিকল্পিতভাবে এক কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের হিরোইন দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করে মাহাবুব, ঋদয় ও তার বাহিনীর লোকজন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চতুরতায় উল্টো ধরা পড়ে যায় মূল অভিযুক্ত ঋদয়।
গত ১৩ এপ্রিল রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সাভার থানাধীন পশ্চিম রাজাসন বিরুলিয়া রোড আমতলা পালোয়ানপাড়া এলাকায় শামীম হোসেনের গ্যারেজের সামনে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ মো. হৃদয় হোসেন ওরফে ‘ফর্মা হৃদয়’কে গ্রেফতার করে র্যাব। এরপর থেকেই মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামির ও শামীম হোসেনের মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছে যায়।
পরবর্তীতে হৃদয়ের জামিনের কথা বলে শামীম হোসেনের কাছে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় চাপ ও হয়রানি বৃদ্ধি পায়। এ সময় কথিত সাংবাদিক এস এ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। সূত্রমতে, তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি শামীম হোসেনকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চটকদার উপস্থাপন করে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেন এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করেন।
স্থানীয়দের দাবি, সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে থাকেন। সাদ্দাম হোসেন এই ঘটনায় শামীম হোসেনের কাছে ৬ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
সেই চাঁদার টাকা নেওয়ার জন্য গত শুক্রবার (২২ মে) সকাল থেকে কথিত সাংবাদিক এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন, দেশ টিভির ঢাকা স্টাফ তাইফুর রহমান তুহিন, ক্যামেরাম্যান ও গাড়িচালকসহ কয়েকজন শামীম হোসেনের গ্যারেজে অবস্থান নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর মাহাবুব হোসেন সামিরের পক্ষের লোকজন ও কিশোর গ্যাং সদস্যরা ঘটনাস্থলে হাজির হয়। এ সময় দুই পক্ষের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে কথিত সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেন ও তাইফুর রহমান তুহিনকে পিটিয়ে আহত করা হয়। এতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়। এই সুযোগ কাজে লাগায় মাহাবুব সামির।
এরপর ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে গ্যারেজ মালিক শামীম হোসেন নিজেই ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে ঘটনাস্থলে ডাকেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনকে আটক করে এবং আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরবর্তীতে মামলা রুজু করা হয় এবং আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়।
এই ঘটনার পর পরিকল্পিত ভাবে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, পুরো ঘটনাটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং প্রভাব এবং সাংবাদিকতার অপব্যবহারের জটিল সমীকরণের ফল।
এদিকে সূত্রের দাবি, মাহাবুব হোসেন সামির পরবর্তীতে ঘটনার দায় এড়িয়ে ভিন্নভাবে ঘটনাকে উপস্থাপন করেন এবং মামলার দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। মূলত সাংবাদিকরা মাহবুব হোসেন সামিরের সহযোগিতা চাইলে সাংবাদিকদের পক্ষে মামলার বাদী মো: ফখরুল ইসলাম মজুমদারকে ভুল তথ্য দিয়ে মাহবুব হোসেন সামিরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক ব্যক্তিদের এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলা হওয়ার পর ব্যবসায়ী শামীম হোসেন পলাতক থাকার সুযোগে তার রিকশা গ্যারেজ থেকে ১২টি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা জোরপূর্বক নিয়ে যায় মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামির।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ঘটনার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখিয়ে প্রশাসন ও পুলিশকে পরিকল্পিত ভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, এই পুরো পরিস্থিতিকে ঘিরে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে প্রভাব বিস্তার বজায় রাখা। এসব অভিযোগ বিভিন্ন “স্থানীয় সূত্রের” বরাতে জানা গেছে, তবে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তরা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।