09/08/2024
আইন,সংবিধান,নির্বাহী ও বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে
২য় অংশ
দেশের সর্বপ্রকারের ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম, অরাজকতা, অপচয়, বিশৃঙ্খলা, অপরাধমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদি বন্ধের দায়িত্ব কার? সকলেই
একবাক্যে জবাব দেবেন, সরকারের। সরকার বলতে আমরা কাকে বুঝব? সরকার বলতে আমরা বুঝব এমন এক সংস্থাকে যে সংস্থা আইন তৈরি করে, সরকার গঠন করে, সরকারের আইন ও প্রশাসনযন্ত্র সহ সকল সংস্থাকে পরিচালনা করে। আমরা জানি যে একজন নির্বাচিত “প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে” বাংলাদেশের “নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে”। আবার সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ধারায় যা বলা হয়েছে তা হলো “যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন”। তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল সংস্থা কী? এর উত্তর একটাই তা হল, পার্লামেন্ট তথা জাতীয় সংসদ। এক কথায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে ন্যস্ত। শুধু তাই নয়, আইন অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপ্রধান), সংসদের স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারও সংসদ সদস্যগণই নির্বাচিত করে থাকেন। সংবিধানের ৫৫(২) ধারা মতে “প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান-অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে” যেমন বলা আছে, তেমনি ৫৭(২) ধারা মতে বলা হয়েছে যে “সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন”। আবার সেখানেই শেষ নয়, সংবিধানের ৫৫(৩) ধারায় বলা
হয়েছে যে “মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন”। সহজেই অনুমেয় যে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি এক ব্যক্তির ক্ষমতা জাহির বা খেয়ালখুশি প্রদর্শন বুঝায় না। যার ফলাফল আমরা দেখলাম। তাছাড়াও, একটি বিশেষ বিষয় হল এই যে, জনগণ সংসদ সদস্য ছাড়া আর কাউকেই নির্বাচিত করেন না⎯না প্রধানমন্ত্রী, না মন্ত্রী⎯এঁদের নির্বাচন ও রাখা বা না রাখার দায়িত্ব সংসদ সদস্যগণের। তাহলে আমরা খুব সঠিকভাবেই বলতে পারি যে সকল প্রকারের ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম, অরাজকতা, অপচয়, বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি সহ সকল প্রকারের অপরাধমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদি সহ সকল প্রকারের সামাজিক অনাচার-অবিচার,
অযথার্থ ও আপ্রত্যাশিত দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে জনগণ ও রাষ্ট্রকে রক্ষার দায়িত্ব হল জাতীয় সংসদের তথা সংসদ-সদস্যগণের। যা বর্তমানে অনুপস্থিত। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বও সংসদ-সদস্যগণের। জনগণের কর্মের সংস্থান করার দায়িত্বও সংসদ-সদস্যগণের, কারণ, রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিতে
নাগরিকগণের জন্যে “কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার” সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত বিষয়। বর্তমান পর্বে এটাই মূল প্রাসঙ্গিক বিষয় হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশে এখন যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে তা হল বুর্জোয়া তথা পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা হল বুর্জোয়া অর্থাৎ, ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রভুত্বের এক ধরন। বুর্জোয়া তথা পুঁজিবাদী গণতন্ত্র হল সংখ্যালঘু শোষকদের গণতন্ত্র, পুঁজিপতি তথা ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্রস্বরূপ। আমরা এও জানি যে আমাদের দেশে যে পার্লামেন্ট কার্যকরী তা হল বুর্জোয়া পার্লামেন্ট অর্থাৎ, পুঁজিবাদী পার্লামেন্ট। এ পার্লামেন্ট ধনীক শ্রেণীর অর্থনীতির তথা
মুনাফার নামে লুটপাটের বিলোপ করবে না, পুঁজিবাদের বিলোপ করবে না, শ্রেণীতে শ্রেণীতে, ধনী দরিদ্রে, বুর্জোয়া প্রলেতারিয়েতে (শ্রমিক শ্রেণী) সমাজের বিভাগ তা লোপ করবে না। আমরা জানি যে, এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক সমাজের বুর্জোয়া ভিত্তির বদল ঘটায় না, পুঁজির প্রভুত্ব বিলোপ করে না। আমরা আরও জানি যে, পুঁজিবাদের আমলে রাষ্ট্রের অন্যান্য রূপের মতোই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও শ্রমিক শ্রেণী সহ মেহনতী জনগণকে দমনের যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তা যত ‘সার্বজনীন’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’, ‘কল্যাণব্রতী’ আর ‘বিশুদ্ধ’ই হোক না কেন, তা পার্লাামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে কয়েক বছরে (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর) একবার করে নিপীড়িতদের স্থির করতে দেয়া হয় নিপীড়ক শ্রেণীর তথা শাসক শ্রেণীর ঠিক কোন প্রতিনিধিটি পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে ও তাদেরই দমন করবে। আর এখন তারা সেটাও মেনে চলতে পারছে না। অর্থাৎ অসাংবিধানিক ভাবে তা চলছে।