27/08/2026
ঐক্যের আহ্বান।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠٣﴾
অনুবাদ: "আর তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশিকে (কুরআন ও দ্বীনকে) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো—যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা প্রীতি সৃষ্টি করে দিলেন; ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা তো আগুনের (জাহান্নামের) গর্তের একদম প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলে, অতঃপর তিনি তা থেকে তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হও।"
— সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩
তাফসিরে জালালাইন
এই আয়াতে بِحَبْلِ اللَّهِ (بحبل الله - আল্লাহর রশি) বলতে আল্লাহর দেওয়া দ্বীন এবং পবিত্র কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুমিনকে দ্বীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং মতভেদ ও দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন। একই সাথে জাহেলিয়াতের যুগের চরম শত্রুতা মুছে দিয়ে অন্তরে ইসলামী ভাতৃত্ব সৃষ্টির জন্য আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বলা হয়েছে।
তাফসিরে মা'আরিফুল কুরআন
একটি সমাজের বা জাতির ধ্বংসের সবচেয়ে প্রধান হাতিয়ার হলো অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে একটি বিশেষ উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন—পাহাড়ের চূড়া থেকে যেন কেউ নিচে পড়ে না যায়, সেজন্য যেমন মজবুত রশি ধরে ঝুলে থাকতে হয়; তেমনি এই ফিতনাময় পৃথিবীর আযাব ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো 'আল্লাহর রশি' বা কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে থাকা।
,(فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ)
কোনো মানুষের সাধ্যের বিষয় নয়। টাকা-পয়সা, ক্ষমতা বা বাহ্যিক কোনো চুক্তি দিয়ে মানুষের অন্তর জয় করা যায় না; এটি সম্পূর্ণ আরশের মালিকের একক খোদায়ী কুদরত
মুছন্নিফ রহ: আয়াতে حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ (আগুনের গর্তের প্রান্ত) বলে জাহেলিয়াতের যুগের সেই ভয়াবহ অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। মানুষ যখন শিরক ও অসভ্যতার অন্ধকারে ডুবে থাকে, সে যেন এক অদৃশ্য জাহান্নামের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকে। ইসলাম এসে মানুষকে কেবল পরকালের আজাব থেকেই বাঁচায়নি, বরং দুনিয়াতেও পারস্পরিক কাটাকাটি ও আত্মঘাতী যুদ্ধ থেকে রক্ষা করে শান্তির সুশীতল ছায়ায় নিয়ে এসেছে। উম্মতে মুহাম্মাদীর শক্তি হলো তাদের ঈমানী ঐক্য; আর যখনই এই ঐক্য নষ্ট হয়ে বিভেদ তৈরি হয়, তখনই আসমানী রহমত উঠে যায়।
ইসলামের আলো মদীনায় পৌঁছানোর আগে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে প্রায় ১২০ বছর ধরে টানা ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল (যা ইতিহাসে 'বুআছের যুদ্ধ' নামে পরিচিত)। সামান্য ঘোড়া দৌড় বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া সেই শত্রুতায় বংশের পর বংশ রক্ত ঝরিয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। তাদের হৃদয়ে একে অপরের প্রতি এমন চরম ঘৃণা ও বিষ জমে ছিল যে, তারা মনে করত কিয়ামত পর্যন্ত এই রক্তপাত বন্ধ হবে না। কিন্তু বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মদীনায় তাশরিফ আনলেন এবং তাঁদের মধ্যে কালিমাহ ও কুরআনের সুতো বেঁধে দিলেন, তখন এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটল! শতাব্দীর শত্রুতা এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। যারা গতকাল পর্যন্ত একে অপরের কলিজা চিবিয়ে খেতে চাইত, তারা আজ নিজের পরম প্রিয় সম্পদ ও ঘরবাড়ি ভাই হিসেবে অন্যজনকে অর্ধেক ছেড়ে দিতে লাগল! তবে মক্কার কাফের ও ইহুদীরা এই জান্নাতী ভালোবাসা সহ্য করতে পারছিল না। একবার মদীনার এক চতুর ইহুদী নেতা (শামাস ইবনে কায়েস) আউস ও খাজরাজ গোত্রের কতিপয় সাহাবীকে একসাথে বসে হাসিমুখে গল্প করতে দেখে হিংসায় জ্বলে উঠল। সে এক ইহুদী যুবককে পাঠাল এবং বলল—"তুমি ওদের মাঝে গিয়ে বসে বুআছের যুদ্ধের সেই পুরোনো রক্তক্ষয়ী কবিতার ছন্দগুলো গেয়ে শোনাও, যাতে ওদের পুরোনো আক্রোশ জেগে ওঠে।" যুবকটি গিয়ে যখন পুরোনো যুদ্ধের কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল, অমনি আউস ও খাজরাজের তরুণ সাহাবীদের রক্ত গরম হয়ে উঠল! পুরোনো অভিমান জেগে উঠল, তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো এবং একপর্যায়ে তারা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, "অস্ত্র নাও! কঙ্কণময় ময়দানে আজই আমাদের আবার ফয়সালা হবে!" এই খবর বিশ্বনবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছানো মাত্রই তিনি চাদর সামলে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে দৌড়ে তাদের মাঝে তাশরিফ আনলেন। সাথে ছিলেন মুহাজির সাহাবাগণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ব্যথাভরা ও মহিমাময় কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললেন:
«يَا مَعْشَرِ الْمُسْلِمِينَ، اللهَ اللهَ! أَبِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ، بَعْدَ إِذْ هَدَاكُمُ اللهُ لِلإِسْلامِ، وَأَكْرَمَكُمْ بِهِ، وَقَطَعَ بِهِ عَنْكُمْ أَمْرَ الْجَاهِلِيَّةِ؟»
(হে মুসলিম সমাজ! আল্লাহকে ভয় করো! আল্লাহকে ভয় করো! আমি স্বয়ং তোমাদের মাঝে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তোমরা আবার সেই জাহেলিয়াতের পুরানো অহংকার ও ডাক ডাকছ?! অথচ আল্লাহ তোমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন এবং জাহেলিয়াতের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন!)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই ডাক শোনার সাথে সাথে সাহাবীদের বিবেক জেগে উঠল। তাঁরা বুঝতে পারলেন এটি ছিল শয়তানের এক মারাত্মক চক্রান্ত। সাহাবীরা সাথে সাথে হাত থেকে তলোয়ার ফেলে দিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় ক্ষমা চাইতে লাগলেন। ঠিক সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তেই জিবরাঈল (আ.) সূরা আলে ইমরানের এই ১০৩ নম্বর আয়াতটি নিয়ে নাজিল হলেন।
(তাফসীরুল কুরআনিল আযীম', খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৮৮-৯১)
ঐক্যের আহ্বান করে কবি ইকবাল লিখে গেছেন
منفعت ایک ہے اس قوم کی نقصان بھی ایک
ایک ہی سب کا نبی، دین بھی، ایمان بھی ایک
حرمِ پاک بھی، قرآن بھی، اللہ بھی ایک
کچھ بڑی بات تھی ہوتے جو مسلمان بھی ایک
فرقہ بندی ہے کہیں اور کہیں ذاتیں ہیں
کیا زمانے میں پنپنے کی یہی باتیں ہیں؟
জাতি হিসেবে মুসলমানের লভ্য-ক্ষতি উভয় একই,
নবী বলো, ধর্ম বলো, ঈমান বলো—তাহাও একই।
কুরআন বলো, কাবা বলো, আল্লাহ্ বলো—তাহাও একই,
তবে কি যে কঠিন ছিল তারা ও যদি হতো একই!
কিন্তু কোথাও সার্থ-অভিমান, কোথাও আবার দলাদলি,
এসব কি আর ভবের মাঝে মহান হওয়ার ক্রিয়াবলী?
ঐক্যের নমুনাও দেখিয়ে গেছেন ইকবাল রহি:
آ گیا عین لڑائی میں اگر وقتِ نماز
قبلہ رو ہو کے زمیں بوس ہوئی قومِ حجاز
ایک ہی صف میں کھڑے ہو گئے محمود و ایاز
نہ کوئی بندہ رہا اور نہ کوئی بندہ نواز
بندہ و صاحب و محتاج و غنی ایک ہوئے
تیرے دربار میں پہنچے تو سبھی ایک ہوئے
যুদ্ধে রত এমন সময় হলে তাদের ওয়াক্তে নামাজ,
কিবলামুখী সেজদা করে ধন্য হতো কওমে হেজাজ।
এক সফেতে ভুক্ত হতো গজনবী মাহমুদ ও আয়াজ,
ফরক নাহি থাকতো পাশে বান্দা কিংবা বান্দা নওয়াজ।
ধনী, গরীব, আমীর, মুনীব—সবাই তখন এক হয়েই তো
আসতো যখন তোমার কাছে!
বই : নাফাহাতুল কুরআন (প্রকাশিতব্য)
লেখক : মুহাম্মাদ বেলায়েত হুসাইন