11/12/2025
'বিশ্বাস' ব্যাপারটার কোনো সার্বজনীনতা নেই, কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, কোনো যুক্তি নেই, কোনো প্রমাণ নেই। মানুষের জন্মভূমি, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক চাপ– এই চারটি জিনিসই মূলত নির্ধারণ করে মানুষ কোন 'বিশ্বাস' ধারণ করবে। অর্থাৎ 'বিশ্বাস' ব্যাপারটা আপেক্ষিক এবং ব্যক্তিনির্ভর।
অথচ এই আপেক্ষিক, অপ্রমাণিত বিশ্বাসকে বিশ্বাসকারীরা এমনভাবে ‘পবিত্র’ বানিয়ে ফেলেছে যে– কেউ যদি একটু প্রশ্ন করে, অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে বা প্রচলিত অন্ধ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, তৎক্ষণাৎ "বিশ্বাসে আঘাত" তকমা দিয়ে তাকে সহিংসতার টার্গেট বানানো হয়।
মানুষ জন্মগতভাবে কোনো 'বিশ্বাস' নিয়ে জন্মায় না। পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, ভয়, শাস্তি ও পুরস্কারের মাধ্যমে 'বিশ্বাস' মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই কারণেই পৃথিবীতে হাজার রকম বিশ্বাস, হাজার রকম মতবাদ। যদি সত্যি কোনো 'বিশ্বাস' শতভাগ সত্য হতো, তাহলে পৃথিবীতে এত বিভাজন থাকতো না। কিন্তু সমস্যা হলো– এই আপেক্ষিক, অযৌক্তিক জিনিসটাকেই বিশ্বাসকারীরা সত্যের জায়গায় বসিয়ে ফেলেছে। এটা শুধু অজ্ঞতাই না, এটা বিপজ্জনক।
"বিশ্বাসে আঘাত"– আবেগের উপর দাঁড়ানো একটি সহিংস রাজনৈতিক অস্ত্র। যার কোনো প্রমাণ-পরীক্ষা নেই, যা সম্পূর্ণ অনুভূতিনির্ভর, সেই শব্দকে ব্যবহার করা হয়— মানুষ হত্যার জন্য, গণপিটুনি বৈধ করার জন্য, সংখ্যালঘুর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য; লেখক, শিক্ষক, শিল্পী ও চিন্তাশীলদের উপর হামলার জন্য, যুক্তিকে দমন করার জন্য। যেখানে মানুষের জীবন তুচ্ছ, আর 'বিশ্বাস' অমূল্য, সেখানে সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না।
কোনো 'বিশ্বাস' প্রশ্নাতীত হলে সেটি ধর্ম নয়, সেটি ক্ষমতার অস্ত্র। বিশ্বাসকে যত অপ্রশ্নযোগ্য করা হয়, ততই তার সাথে ক্ষমতার রাজনীতি জড়িয়ে যায়। ইতিহাস বলে–
▪️ ইনকুইজিশন মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে "বিশ্বাসে আঘাত" বলে।
▪️ চার্চ বিজ্ঞানীর মুখ বন্ধ করেছে।
▪️ গ্যালিলিওকে কারাবন্দি করা হয়েছিল “ধর্ম আঘাতের” জন্য।
▪️ সক্রেটিসকে বিষপান করানো হয়েছিল “দেবতাদের অশ্রদ্ধা”র অভিযোগে।
▪️ আধুনিক পৃথিবীতে ব্লাসফেমি ল’ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক হাতিয়ার।
বিশ্বাসকারীরা যখনই "বিশ্বাসে আঘাত" ইস্যু খাড়া করেছে, প্রতিবারই নিরপরাধ মানুষকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে, গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিত্রশিল্পী, লেখক কেউ রেহাই পায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা স্ক্রিনশট দিয়ে হিংস্রতা ছড়ানো হয়েছে। আইন নিজের প্রমাণভিত্তিক কাঠামো হারিয়েছে। এগুলোর সবকিছুর শেকড় একটাই– অন্ধবিশ্বাস + জনরোষ = সংগঠিত বর্বরতা
যে 'বিশ্বাস' নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে হিংস্রতা ও দমননীতি চায়, সেটি কোনো পবিত্রতা নয়, সেটি ভয়ঙ্কর দুর্বলতা।
একজন মানুষ তার নিজের মতো বিশ্বাস করুক, তাতে কিছুই আসে যায় না। কিন্তু বিশ্বাসের কারণে অন্যকে চুপ করানো, জবাবদিহি বন্ধ করা, রাষ্ট্রকে ধর্মীয় অনুভূতির জিম্মি বানিয়ে ফেলা, এগুলো হচ্ছে সভ্যতার সরাসরি ধ্বংস।
যেখানে বিশ্বাসের সমালোচনা করলে মানুষ হত্যাকাণ্ড ঘটে, সেখানে মূল সমস্যা বিশ্বাস নয়– সমস্যা হলো বিশ্বাসে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতালিপ্সা, অজ্ঞতা ও সামাজিক হিংস্রতা।
বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে না দিলে সমাজ অন্ধ হয়ে যায়, রাষ্ট্র ভঙ্গুর হয়, মানুষ পশুতে পরিণত হয়। আর যখন মানুষের উপর বিশ্বাসের শাসন কায়েম হয়, তখন রাষ্ট্রে শুধু আগুন, রক্ত আর অরাজকতাই চলে।