04/09/2026
মুসল্লিদের চোখের পানিতে ভিজে গেলো ভেনিসের পিরাগেত্তো পার্ক!
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভেনিসের ম্যাসত্রের পিরাগেত্তো পার্কে- মসজিদুল ইত্তিহাদের মুসল্লিরা জুমার নামাজ পড়ে আসছেন। কারণ, স্থানীয় প্রশাসন ভিয়া পিয়াভেস্থ মসজিদটি বন্ধ করে দিয়েছে।
পার্কে নামাজ আদায় করা মুসল্লিদের বক্তব্য হলো- প্রশাসন বিকল্প ব্যবস্থা না করে, সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর উপাসনালয় বন্ধ করে দিতে পারে না। এটা কোনো সভ্য আইন/আচরণ নয়।
আজ (শুক্রবার) সাড়ে বারোটার দিকে ইমাম সাহেবের বয়ান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে- একজন ইতালীয় ইউটিউবারের নেতৃত্বে ৪-৫ জনের একটা দল নামাজের স্থানে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তারা অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। শুকরের মাংস মেশানো স্যান্ডউইচ ছুড়ে মারতে থাকে। নামাজের পার্টির উপর উঠে নাচতে থাকে। ইমাম সাহেবের জায়নামাজের উপর গিয়ে পাড়াতে থাকে। মুসল্লিদের কয়েকজন তাদেরকে ডেকে এক পাশে নেয়ার চেষ্টা করেন। বিনয়ের সাথে বলেন, আপনাদের কিছু বলার থাকলে নামাজের পরে বলবেন। অথবা পুলিশকে জানাতে পারেন।
তারা কোনো কথায় নিবৃত না হলে- মুসল্লিদের একজন টেলিফোনে পুলিশকে পরিস্থিতি জানান এবং নিরাপত্তা চান।
পুলিশকে জানানোর প্রায় আধাঘন্টা পর- তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ দলে ৪-৫ জন কারাবিনিয়েরি এবং দুজন সেনা সদস্য ছিলেন। তাদের হস্তক্ষেপে বিশৃঙ্খলাকারীরা নামাজের পার্টি থেকে সরে গেলেও গালাগাল করা, উস্কানি দেয়া বন্ধ করে না। পুলিশের উপস্থিতিতেই তারা চিৎকার করে গালাগাল করতে থাকে, উস্কানি দিতে থাকে। এর মধ্যেই ইমাম সাহেব খুতবা শেষ করে নামাজ শুরু করেন। নামাজের মধ্যে সূরা পড়তে পড়তে ইমাম সাহেব কেঁদে ফেলেন। তখন হাজার খানেক মুসল্লির পুরো জামাতে কান্নার রোল পড়ে যায়। তারা সেজদায় গিয়ে 'হাউমাউ' করে কাঁদতে থাকেন। তখনো থেমে থাকে না ইউটিউবার এবং তার সাথে থাকা কয়েকজন নারী। তারা চিৎকার করে উস্কানিমূলক কথা বলতে থাকে, গালাগালি দিতে থাকে, নামাজরত মুসল্লিদের সামনে গিয়ে গান গাইতে থাকে।
পুলিশ তখন পাশে দাঁড়িয়ে রিলাক্স মুডে শুটিং দেখছিলো। কয়েকজন সাংবাদিক তাদের ক্যামেরায় বন্দি করছিলেন- উস্কানিদাতা এবং নামাজরত মুসল্লিদের ছবি।
সালাম ফিরিয়ে ইমাম সাহেব মোনাজাত ধরেন। তখন আবারো পুরো পার্ক জুড়ে কান্নার রোল পড়ে। সবাই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। ইমাম সাহেব কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন।
এ সময় পুরো পরিবেশটা ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয়, প্রকৃতিও কাঁদছিলো মাজলুম মুসল্লিদের সাথে।
ইমাম সাহেবের মোনাজাত শেষ হতেই কয়েকজন তরুণ মুসল্লী এগিয়ে যান উস্কানিদাতাদের দিকে। তারা উস্কানিদাতাদের পরিচয় জানতে চান। কিন্তু উস্কানিদাতারা তাদের চোখে পেপার স্প্রে করে দৌড়ে পালায়। একজন মুসল্লী খানিকটা আহত হন। এতে মুসল্লিদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। তখন পুলিশ দৌড়ে গিয়ে উত্তেজিত মুসল্লিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
এ সময় কয়েকজন তরুণ মুসল্লী পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এটা তোমাদের কেমন আচরণ? আমরা আইন মেনে পার্কে নামাজ পড়ছিলাম, কয়েকজন উগ্র মানুষ আমাদের সাথে অসভ্য আচরণ করলো, কিন্তু তোমরা তাদের বাধা দিলে না। বরং পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্রয়ের হাসি হাসলে। এর দ্বারা তোমরা তোমাদের পোশাকের সাথে বেইমানি করেছ। তোমরা নিরপেক্ষতা হারিয়েছো।
এ সময় পুলিশের পাশাপাশি কয়েকজন মুসল্লী উত্তেজিত তরুণদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তারা পার্ক ছেড়ে চলে যান।
এর আগেও ওই পার্কে নামাজের সময়ে উস্কানিমূলক আচরণ করা হয়েছে। একজন নারী নামাজ চলাকালে ইমাম সাহেবের মুখের সামনে গিয়ে গালাগালি করেছে। সেদিনও মুসল্লিরা সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, আজও দিয়েছেন।
ভেনিসে মসজিদ নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা এবং স্নায়ুযুদ্ধ চলছে সংখ্যালঘু মুসলিম অভিবাসী এবং কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে। এমন একটা সময়ে পার্কের খোলা জায়গায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের নামাজের স্থানে পুলিশি নিরাপত্তা ছিলো না কেনো? পুলিশের কাছে কি কোনো গোয়েন্দা তথ্য ছিলো না?
গোয়েন্দা তথ্য যদি নাও থাকে, এটাতো কমন সেন্সের বিষয়! বর্তমান সময়ে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে- এটা বুঝতে কি অনেক বুদ্ধি লাগে?
পুলিশকে কল করার পরেও এতো সময় লাগলো কেনো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে? তাদের উপস্থিতিতে উস্কানিদাতারা অসভ্যতা করলো, পুলিশ তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করলো না কেনো? পুলিশও কি চেয়েছিলো- একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক?
অন্য এক লেখায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম, ভেনিসের নতুন মেয়র পার্ক মেরামতের দোহাই দিয়ে- ওখানে হয়তো জুমার নামাজ বন্ধ করে দেবেন। সে কথা প্রায় সত্যি হতে চলেছে। ইতোমধ্যে মেয়র ঘোষণা দিয়েছেন, পিরাগেত্তো পার্ক মেরামত করা হবে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি ইতালির উচ্চ আদালত মসজিদুল ইত্তেহাদ বন্ধের পক্ষে রায় বহাল রেখেছে। এখন তাদের ইউরোপীয় আদালতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
নামাজের পর ইমাম সাহেবের সাথে কিছুটা সময় কাটাই। তার সাথে টুকটাক কথা বলে মনের চাপ কমানোর চেষ্টা করি।
তিনি বলেন, পুলিশের সামনে ওরা আমাদের নামাজে বাধা দিলো, অথচ পুলিশ কিছু বলল না!
আমি বললাম, পুলিশকে এই প্রশ্ন করলে তারা বলবে, এটাই তো গণতন্ত্র! কারো স্বাধীনতায় আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারিনা।
ইমাম সাহেব বলেন, দুইটা টেবিলে পাশাপাশি দুইজন মানুষ বসে আছে। একজন মদ পান করছে, অন্যজন দুধ। এটা যার যার স্বাধীনতা হতে পারে, কিন্তু দুধের মধ্যে মদ ঠেলে দেয়া বা মদের মধ্যে দুধ ঢেলে দেয়া কি স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র হতে পারে?
আমি বললাম, এখানেই কবি নীরব! গণতন্ত্র বা অধিকার ইউরোপের সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য নয়! এটা বারবার প্রমাণ করেছে, করছে উগ্র ডানপন্থীরা।
উত্তরে ইমাম সাহেব বললেন, এতোগুলো মানুষের মধ্যে- যদি একজন মানুষেরও চোখের পানি আল্লাহ কবুল করে নেন, তাহলেই আমরা কামিয়াব হবো ইনশাল্লাহ। আল্লাহ মাজলুমের চোখের পানি বৃথা যেতে দেন না।