30/03/2024
-এবারের রোজার ঈদটা আমি বাবার বাসায় করবো, দ্বিতীয় রোজার দিন রান্না করতে করতে শাশুড়ি মাকে বললাম।
-তুমি চলে গেলে এখানকার মেহমান কে সামলাবে?
-মেহমান বলতে তো নীতু আর ওর হাসবেন্ড, ওরা তো ঘরের মানুষ। নীতু আমার ননদ, আমার বিয়ে হয়েছে ছয় বছর ।
এই প্রথম বাবার বাড়ি ঈদ করবো বলে মনস্থির করেছি, আমি রুবি, একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করি। আমার স্বামী সৈকত যশোরে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে আছে। বিয়ের পর থেকে তার কাছ থেকে আমি কোন অব*হেলা পাইনি, অবশ্য ভালোবাসার আদিখ্যেতাও পাই না , মানুষ টা এমনই। প্রতিবেলায় ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিবে, প্রতি সপ্তাহে বাড়ি চলে আসে, আমার কাছে এটাই ভালোবাসা । তবে মানুষটা একটু অন্যরকম, রে*গে গেলে সেটা ভাষায় প্রকাশ করবে না কিন্তু অন্য কোনভাবে বুঝিয়ে দেবে যে সে আমার উপর রে*গে আছে।
আমার জন্য বুঝতে খুব সম*স্যা হয় আমি তো আর জ্যোতিষী না যে সে কি কারণে রে*গে আছে এটা জেনে যাব তবুও নিজে থেকে সরি বলে সব মিটমাট করে নেই। এটুকু ছাড়া আর সবই ঠিকঠাক, আমি ভালোই আছি। আমাদের চার বছরের এক রাজপুত্র আছে।
-তো তুমি বলতে চাইছো ওদের যত্নের প্রয়োজন নেই? শাশুড়ি মা বলে উঠলেন
-আপনি তো আছেন মা আর তাছাড়া নীতু তো প্রত্যেক রোজার ঈদ এখানেই করে। আমি কখনোই যাইনা, আমারও তো ইচ্ছে করে বাবা মায়ের সাথে ঈদ করতে।
মা আর কিছু বললেন না, রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। ডাইনিং রুমে বসে সৈকত সবই শুনতে পেল, সেদিন ছিল শুক্রবার।
পরের সপ্তাহে সৈকত বাড়ি এলো না। এমনিতে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে আমার সাথে ঠিকঠাক যোগাযোগ আছে। জানতে চাইলাম, কেন আসবেনা উত্তরে পেলাম ইচ্ছে করছে না। বিয়ের ছয় বছরে এই প্রথম কোন একটা শুক্রবার ওকে ছাড়া আমাকে কাটাতে হবে। তবে অন্যবারের মতো আমি বিভ্রান্ত হলাম না, এবারে বুঝে গেলাম ওই যে গত সপ্তাহে শাশুড়ি মায়ের সাথে সামান্য কথা কা*টাকা*টি হয়েছে সেটার কারণেই এত কিছু, আমি কিছুই বললাম না।
পরের দিন অফিসের একটা ইফতার পার্টি ছিল । আমি যথারীতি সেখানে যোগদান করলাম। দুই একটা ছবিও তোলা হলো। সুন্দর করে সেগুলো সৈকতকে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলাম। তার দুদিন পর অনেক রকম ইফতার বানিয়ে টেবিল সাজিয়ে আমি, ছেলে আর শাশুড়ি মা মিলে ইফতার করলাম। ইফতারের টেবিলেই মায়ের কাছে ফোন এলো সৈকতের।
আমি শুধু এপাশের কথা শুনতে পাচ্ছি.....
- হ্যাঁ হ্যাঁ বৌমা অনেক রকম ইফতার তৈরি করেছে আজকে, আচ্ছা তুই রাখ আজান হয়ে যাবে এখনই।
পরের দিন দুই বান্ধবী সহ বেশ কিছু ঈদ শপিং করলাম। ওর ফোন এলে বললাম শপিংয়ে আছি পরে কথা বলছি।
না আমি তাকে ইগ*নোর করিনি শুধু এতোটুকু বোঝাতে চেয়েছি যে তুমি আমার একমাত্র পৃথিবী নও, তুমি যদি অকারনে আমার উপর মে*জাজ দেখাতে পারো আমারও অনেক অপশন আছে। তুমি ইগ*নোর করে যাবে আর আমি বালিশ ভেজাবো সেরকম মেয়ে আমি নই। পরের সপ্তাহে সে যথারীতি এসে উপস্থিত, আমাকে আর কিছুই করতে হয়নি।
তখন বিয়ের একদম পরপর। বিয়ের ছুটি কাটিয়ে অফিসে মাত্র জয়েন করেছি। ক্লান্ত বি*ধ্বস্ত শরীরে ঢাকা শহরের অসহনীয় জ্যাম পার করে বাড়ি পৌঁছলাম। বাড়ি ঢুকতেই শাশুড়ি মা বললেন,
- আমাকে এক কাপ চা করে দাও তো। আমি হাসিমুখেই বললাম,
- আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি মা, খুব টায়ার্ড লাগছে তারপর করছি।
-আমার মাথা ব্যথা করছে এখন আর তুমি হাতমুখ ধোবে, ফ্রেশ হবে, চেঞ্জ করবে তারপর চা বানাবে, নিজের মা হলে পারতে?
আমি ব্যাগ রেখে সোফায় বসে গেলাম
চোখে চোখ রেখে বললাম,
- আপনার মেয়ে অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরলে সঙ্গে সঙ্গে আপনি নিজে কি পারতেন তাকে বলতে আমায় এক কাপ চা বানিয়ে দাও বরং উল্টো নিজে চা বানিয়ে বসে থাকতেন তা কি করেছেন?
নতুন বউয়ের মুখে এ ধরনের কথা শুনে সে হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকলো।
এরপর থেকে আমাকে আর এই ধরনের কোন কথা শুনতে হয়নি। তার মানে এই নয় যে উনি আমার জন্য চা বানিয়ে বসে থাকেন। আমি আমার মত করে ফ্রেশ হই তারপর নিজের দায়িত্ব পালন করি।
এক সন্ধ্যায় ব্যস্ততা সেরে বাড়িতে মাকে ফোন দিলাম। এমনিতেও আমি সময় পাইনা, অফিসে খুব ব্যস্ততা তাছাড়া বাড়ির কাজকর্ম সামলাতে হয় সবমিলিয়ে ফোন দেয়ার তেমন একটা সময় হয় না। মা ফোন ধরে বললেন,
- তোর সাথে পরে কথা বলছি
-কেন মা, তুমি কি ব্যস্ত?
-না আমি একটা সিরিয়াল দেখছি, সিরিয়াল টা শেষ হোক তারপর তোর সাথে কথা বলছি। মা ফোন কে*টে দিলেন। মা ফোন করলেন প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে। আমি রুমেই বসে ছিলাম....
-হ্যাঁ রুবি বল, কেমন আছিস?
-সরি মা, আমি একটু গেম খেলছি তোমার সাথে পরে কথা বলছি। আমি লাইন কে*টে দিলাম বুঝতে পারছি ব্যাপারটা মা অনুধাবন করতে পেরেছেন।
বিয়ের আগে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। সৈকত ব্যাপারটা জানে অবশ্য এটা নিয়ে তার কোন সম*স্যা নেই। লুবনা, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড প্রথম যেদিন বিয়ের পরে আমার বাড়িতে এসেছিল হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে সৈকতের সামনেই আমাকে বললো,
-তুই কিন্তু জিতেছিস সিয়ামকে ছেড়ে দিয়ে, সিয়াম হচ্ছে আমার এ*ক্স
আমি খানিকটা অপ*মানিত বোধ করলাম। লুবনা চলে যাবার সময় আবার সৈকত কে বললো,
-শক্ত করে ধরে রাখবেন আমার বান্ধবীকে, বলা তো যায় না কখন পাখি উড়ে যায় । লুবনা এমন ভান করলো যেন সে হাস্যরস করছে। সৈকতের চোখ মুখ সেদিন গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য লুবনার বিয়েতে আমি আর সৈকত দুজনেই গিয়েছিলাম। স্টেজে গিয়ে যখন ওর সাথে ছবি তুলছিলাম তখন ওর হাজব্যান্ড কে বললাম,
-আরে রাফি ভাই আপনার কথা অনেক শুনেছি লুবনার মুখে, শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক হলো ।ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আমি জানি রাফির সাথে লুবনার ব্রেকআপ হয়ে গেছে এবং এটাও জানি এই ভদ্রলোকের কারণেই হয়েছে। ইনি সম্পদশালী, এস্টাবলিস্ট।
-কিন্তু আমি তো রাফি নই আমার নাম শফিক, শফিকুর রহমান।
-উফ আমি সরি, আমি আসলে দুষ্টামি করছিলাম আমিও হাস্যরস করতে করতে নিচে নেমে আসলাম।
আমার ছেলের যেদিন জন্ম হলো ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল রক্তদাতা রেডি রাখতে। রক্ত লাগবেই এমন কোন কথা নেই কিন্তু হাতের কাছে থাকাটা ভালো।
আমার রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ আমার বোনেরও তাই। ওকে আগে থেকেই বলে রাখা হয়েছিল। বাচ্চার পজিশন উল্টা হওয়ার কারণে আগে থেকেই আমরা সি*জারিয়ানের প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছিলাম এবং ডাক্তার নির্দিষ্ট ডেট দিয়ে দিয়েছিল। আমার বোন কুয়েটে পড়াশোনা করে। ওকে সৈকত ফোন দিয়ে বললো ওই দিন উপস্থিত থাকার জন্য ।ও কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো
- ভাইয়া আমার তো পরীক্ষা চলছে তাহলে সেমিস্টার ড্রপ হয়ে যাবে
-আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি পরীক্ষা দাও আমি এদিকে ম্যানেজ করছি ,চিন্তা করো না
আল্লাহর রহমতে রক্তদাতা ম্যানেজ হয়েছিল কিন্তু রক্ত লাগেনি। আমার বাচ্চা সুস্থ সবল ভাবে জন্ম নিয়েছিল। ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে দেখলাম আমার ছোট বোন সেন্টমার্টিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল।
বোনের বিয়ে ঠিক করা থেকে সবকিছুতেই উপস্থিত ছিলাম শুধু বিয়ের দিন উপস্থিত হইনি। ফোনের পরে ফোন আসছিল।
আমি হাই তুলে বলেছিলাম,
- অফিসে ছুটি পেয়েছি তো তাই ফ্যামিলি সহ সেন্টমার্টিন এ ঘুরতে যাব প্ল্যান করেছি, কাপড় গোছাচ্ছি। ছোট বোনের বিয়েতে বড় বোন উপস্থিত হয়নি এটা নিয়ে অনেক কানাঘুসা হয়েছিল তাতে আমার কিছুই যায় আসে না । আমার অতি দুঃখের সময় যে উপস্থিত থাকতে পারেনা তার খুব সুখের সময় আমি উপস্থিত না থাকলেই বা কি।
অনেকেই বলে আমি রি*ভেঞ্জ প্রিয় মানুষ। হয়তো তাই আবার হয়তোবা না। মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষদেরকে বুঝিয়ে দিতে হয় নিজের মূল্যটা।
কাউকে কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় কাছের মানুষের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, কোন কথা কোথায় বলতে হবে। কখন পাশে থাকতে হবে কখন না থাকলেও চলবে। আমি সাধারণ অতি সাধারণ কিন্তু আমি আমাকে ভালবাসি, যদি প্রশ্ন করা হয় আমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি উত্তর হবে নিজেকে কারণ যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না নিজের মূল্যায়ন করতে পারে না সে সব জায়গাতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে।।
©