17/04/2026
এক ঐতিহাসিক ঘটনা পড়ুন। দারুণ এক জিহাদের পরিকল্পনা। এক কথায় দুর্দান্ত। যেখানে নবী (সা:) অভাবনীয় এক মাইন্ড গেইম খেলেছিলেন আল্লাহর সাহায্যে। পড়ুন।
মদিনার ইয়াহুদিদের এক গোত্র বনু কুরাইযার এবং মক্কার মুশরিকরা মিলিত হয়েছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। ইয়াহুদি গোত্র কুরাইযারদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি ছিল। কিন্তু সেই চুক্তি তারা লঙ্ঘণ করে মক্কার কাফিরদের সাথে মিলিত হয়।
এই অবস্থায় কুফফারদের হারানোর জন্য নবী(সাঃ) কৌশল করতে থাকলেন। এবং এজন্য তার এক বুদ্ধিমান মুজাহিদের দরকার যে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এমন সময় এক সাহাবী এগিয়ে এলেন, নাম নুসাইম ইবনে মাসউদ (রাঃ)। নুসাইম ইয়াহুদি থেকে মুসলিম হয়ে নবীজির মুজাহিদ দলে যুক্ত হয়েছে। নুসাইমের মুসলিম হওয়ার খবর ইয়াহুদিরা জানত না। ইয়াহুদির ভাবত নুসাইম এখনো ইয়াহুদিই আছে।
নুসাইম যখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এগিয়ে এলো নবীজি বললেন, ‘ মনে রেখো, যুদ্ধ মানেই কৌশলে লক্ষ্যবিন্দুতে পৌছে যাওয়া’।
নুসাইম ইবনে মাসউদ (রাঃ) সাথে সাথে ইয়াহুদি সম্প্রদায় বনু কুরাইযার নিকট চলে গেলেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নুসাইম ইবনে মাসউদ ইয়াহুদিদের স্বজন ছিলেন। এ কারণে অতি সহজে তাদের কাছে গিয়ে তিনি বললেন, ‘'তোমাদের প্রতি আমার কতটা টান আর মুহাব্বত রয়েছে তা তোমরা ভালো করেই জানো।
তারা বলল, তা তো অবশ্যিই।
নুসাইম বললেন, মক্কার কুরাইশদের সাথে আপনাদের তাল মিলালে হবে না। তাদের ব্যাপার আর আপনাদের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই এলাকা আপনাদেরই। আপনাদের ধন-সম্পদ, বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন সব এখানে। এই এলাকা ছেড়ে আপনারা কোনোদিনো অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। অপরদিকে মক্কার কুরাইশরা তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে এখানে লড়াই করার জন্য এসেছে। আর আপনারাও তাদের সঙ্গ দিয়েছেন। অথচ এখানে তাদের বাড়ি ঘর কিছুই নেই। যদি তারা কোনো সুযোগ পায়, তবে সেটা কাজে লাগাবে। আর যদি কিছু না পায় তবে লেজ গুটিয়ে আপনাদের ছেড়ে মক্কায় চলে যাবে।
তখন এখানে থাকবেন কেবল মুহাম্মদ (সাঃ) এবং থাকবেন আপনারা। ইচ্ছা মতো তিনি তখন আপনাদের থেকে প্রতিশোধ নিবেন।
তারা বলল, তাইতো! এখন কী করা যায়?
নুসাইম বললেন, আপনাদের কাছে মক্কার কুরাইশদের জিনিসপত্র বন্ধক রাখুন। তাদেরকে বলুন জিনিসপত্র যেন আপনাদের কাছে বন্ধক রাখে। যতক্ষণ না তারা তাদের জিনিসপত্র আপনাদের কাছে বন্ধক রাখবে তাদের সঙ্গ নিয়ে যুদ্ধ করবেন না।
মদিনার ইয়াহুদি গোত্ররা এই বুদ্ধিতে বেশ খুশি হলেন। নুসাইমের বুদ্ধির প্রশংসা করলেন’'।
এরপর নুসাইম সোজা গেলেন কুরাইশদের কাছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে বললেন, ‘'তোমাদের প্রতি আমার কতটা মুহাব্বত আর ভালোবাসা রয়েছে আর তোমাদের আমি কতটা সম্মান করি তা কী তোমরা জানো?
তারা বলল, হ্যা। জানি।
নুসাইম বললেন, মদিনার ইয়াহুদিরা মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের সাথে যেই ওয়াদা ভঙ্গ করেছিল তার জন্য এখন ভীষণ লজ্জিত। তাদের মাঝে এখন পরিকল্পনা হয়েছে যে- ইয়াহুদিরা এখন তোমাদের সব জিনিসপত্র বন্ধক নিবে। তারপর সব মুহাম্মদের(সাঃ) হাতে তুলে দিবে। এরপর তোমাদের বিরুদ্ধে তারা মুহাম্মদের সঙ্গে মিলে যাবে। সুতরাং, যদি তারা তোমাদের কাছে জিনিসপত্র বন্ধক চায় তবে তোমরা তাদের বন্ধক দিবে না।
তারা বলল, তোমরা বক্তব্যের সাথে আমরা একমত।
এরপর বেশ কিছুদিন কেটে যায়। পঞ্চম হিজরীরর শাওয়াল মাসের শনিবারের রাতে মক্কার কুরাইশরা ইয়াহুদির কাছে বলে পাঠালো, এটা আমাদের থাকার জায়গা নয়। আমাদের ঘোড়া এবং উটগুলো আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। সুতরাং তাড়াতাড়ি যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও! মুহাম্মদের(সাঃ) এর সঙ্গে আমরা এখন সরাসরি সংঘাতে নামব।
কুরাইশদের এই সংবাদ শুনে ইয়াহুদিরা ফিরতি সংবাদ পাঠাল, আজকে তো শনিবার। আর তোমরা তো জানই শনিবার দিনের প্রতি অবহেলার কারণে আমাদের পূর্ববর্তী কী হয়েছিল? ( কুরান আসহাবে সাবাতের ঘটনা। যেখানে ইহদিদের আল্লাহ শনিবারে মাছ ধরতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু তবুও অবাধ্য হয়ে ধরেছিল এবং আল্লাহ তাদের আযাব দিয়ে ধ্বংস করেছিল)। তাছাড়া তোমরা যতক্ষণ না তোমাদের আসবাবপত্র আমাদের সঙ্গে না পাঠাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের সঙ্গ মিলে মুহাম্মাদের (সাঃ) এর বিরুদ্ধে লড়াই করব না।
ইয়াহুদিদের এই জবাব নিয়ে যখন দূত এলো কুরাইশের কাছে, তখন কুরাইশরা বলাবলি করতে লাগল, নুসাইম আমাদের সত্য বলেছে।
তখন কুরাইশরা ইয়াহুদির কাছে সংবাদ পাঠালো, আমরা তোমাদের কাছে কাউকে পাঠাব না। কিছুই পাঠাব না। সুতরাং তোমরা নিজেরাই আমাদের সঙ্গে মুহাম্মদের (সাঃ) বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ো।
এই সংবাদ শুনে ইয়াহুদিরা বলল, নুসাইম আমাদেরকে সত্য বলেছে।
*
এভাবে একদলের প্রতি অপর দলের বিশ্বাস উঠে গেল। তাদের মৈত্রীতে বিভেদ এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো। তাদের মাঝে সম্পর্ক উত্তপ্ত হলো। তাদের মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
এদিকে নবী সল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন- ‘হে আল্লাহ। কিতাব নাযিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আপনি কুফফার বাহিনীগুলোকে পরাজিত করুন! হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে পরাজিত করুন। তাদেরকে ভীত-কম্পিত করে তুলুন’।
এটা ছিল সেই সময় যখন আল্লাহ তার রাসুল এবং মুজাহিদদের দোআ কবুল করেছিলেন। তারপর মুশরিকদের সারিতে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলার ঝড় বয়ে গেল।
তখন মহান আল্লাহ বাস্তবেই প্রবল ঝড় এবং দমকা বাতাস বইয়ে দিলেন। এতে করে কুফফারদের তাবু সব উড়ে গেল। চুলার উপর রাখা হাড়ি-পাতিল, খাবার দাবার সব উলটে গেল। এর ফলে কুফফারদের ভীত নড়বড়ে হয়ে গেল।
এরই মধ্যে মহান আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন ফেরেস্তাদের এক বাহিনী। তারা এসে কুফফারদের কম্পিত করে তুললেন। তাদের অন্তরে ঢেলে দিলেন প্রচন্ড ত্রাস এবং ভয়।
নবী (সাঃ) একজনকে পাঠালেন কুফফারদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। কুফফার লেজ গুটিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মুসলিমদের বিজয় হয়েছে। সেই সাহাবী ফিরে নবীজিকে এই সুসংবাদ দিলেন।
উপস্থিত সকল মুজাহিদ আনন্দে তাকবির দিলেন, আল্লাহু আকবার।
নবী (সাঃ) বললেন, কুফফারদের মুকাবিলায় আল্লাহই যথেষ্ট। এভাবে আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। তার বাহিনীকে সম্মানিত করলেন।
হকের উপর থাকা দলকে আল্লাহ সম্মানিত করবেনই। এটা আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ বিজয় দিবেনই, যারা আল্লাহর রাস্তায় থাকে এবং তাওয়াক্কুল করে।
আল্লাহ আমাদের হকের পথে রাখুক, বিজয়ী দলের পথে রাখুক...।