14/11/2025
আমরা প্রতিদিন যে পৃথিবীতে বাস করি, তার কোড কে লেখে? আমরা ভাবি, আমরাই সিস্টেম তৈরি করছি। কিন্তু কী হবে যদি আমি বলি, আমরা সবাই এমন একটি মাস্টার-সিস্টেমের মধ্যে বাস করছি যার কোড লেখা হয়েছিল একশ বছরেরও বেশি আগে এবং সেই কোডের মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয়, এর মূল উদ্দেশ্য, নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ?
আমি দুপুরে দ্য ফেডারেল রিজার্ভ ইনসাইড দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অন আর্থ নামের একটি ডক্যুমেন্টারি দেখছিলাম। টাইটেলটি এমনিতেই যথেষ্ট বোল্ড, কিন্তু আমি যা দেখলাম, তা যেকোনো টাইটেলের চেয়েও অনেক বেশি বোল্ড এবং অন্ধকার।
আমি কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস দেখতে বসিনি। আমি দেখছিলাম একটি গ্লোবাল কন্ট্রোল মেকানিজমের ব্লুপ্রিন্ট। একজন অ্যানালিস্ট হিসেবে আমি সিস্টেমের নকশা বা আর্কিটেকচার দেখতে পছন্দ করি।
আর আমি যা দেখলাম, তা হলো একটি নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা সিস্টেম, যা ভুল করার জন্যই তৈরি হয়েছে, কারণ প্রতিটি ভুল দিনশেষে সিস্টেমের মালিকদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দেয়।
আমি আজ সেই বিশ্লেষণই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। এটা কোনো অর্থনীতির ক্লাস নয়। এটা হলো ক্ষমতার অ্যানাটমি।
ভিডিওটির শুরুতেই যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা হয় তা হলো, ফেডারেল রিজার্ভ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি প্রাইভেট কার্টেল। ১৯১৩ সালে জেকিল আইল্যান্ডের একটি গোপন বৈঠকে আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকাররা একত্রিত হয়ে এই সিস্টেমটির খসড়া তৈরি করেন। কেন?
কারণ তারা একটি বিশৃঙ্খল, মুক্ত বাজারকে ভয় পেতেন।
তারা এমন একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা চেয়েছিলেন যা বাজারকে স্থিতিশীল করার নামে আসলে তাদের নিজেদের স্বার্থকেই রক্ষা করবে। তারা এমন একটি সিস্টেম চাইল যা সরকারকে তাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য করবে এবং একই সাথে, তাদেরকেই টাকা ছাপানোর একচেটিয়া ক্ষমতা দেবে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হেইস্ট বা ডাকাতি.. কোনো ভল্ট থেকে নয়, বরং একটি পুরো জাতির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব থেকে।
তারা এমন একটি ব্যাকডোর তৈরি করেছিল, যা দিয়ে তারা পুরো সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সিস্টেমটির প্রথম বড় পরীক্ষা, এবং প্রথম তথাকথিত ব্যর্থতা ছিল ১৯২৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা। স্কুল-কলেজে আমাদের শেখানো হয় এটি ছিল বাজারের পতন। কিন্তু ভিডিওটি যে ডেটা তুলে ধরে, তা ভিন্ন গল্প বলে। ১৯২০-এর দশকে এই ফেডারেল রিজার্ভই সস্তা ঋণ দিয়ে বাজারে একটি কৃত্রিম বুদবুদ বা বাবল তৈরি করে।
এরপর, যখন সঠিক সময় এলো, তারা হঠাৎ করে ঋণের লাগাম টেনে ধরে (মানি সাপ্লাই সংকুচিত করে)। এটি কোনো ভুল ছিল না। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত পার্জ বা শুদ্ধি অভিযান। এই পতনের ফলে কারা লাভবান হয়েছিল? সাধারণ মানুষ নয়। লাভবান হয়েছিল সেই গুটিকয়েক শক্তিশালী ব্যাংক, যারা ফেড সিস্টেমটি তৈরি করেছিল।
তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রকৃত সম্পদ, কোম্পানি, জমি, সোনা, কয়লার দামে কিনে নিয়েছিল। গ্রেট ডিপ্রেশন ছিল একটি ফোর্সড ওয়েলথ ট্রান্সফার বা জোরপূর্বক সম্পদ স্থানান্তর, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ঘটানো হয়েছিল। এটি ছিল সিস্টেমের প্রথম সফল স্ট্রেস টেস্ট, তারা দেখল যে তারা পুরো জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েও নিজেদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে পারে।
সিস্টেমের বিবর্তনের পরবর্তী ধাপটি ছিল আরও ধূর্ত। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন যখন ডলারকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেন, তখন তিনি কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করেননি। তিনি ফেডারেল রিজার্ভকে তার শেষ শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
সোনা ছিল একটি ফিজিক্যাল অ্যাঙ্কর বা বাস্তব নোঙ্গর। এটি নিশ্চিত করতো যে আপনি কেবল ততটুকুই ছাপাতে পারবেন, যতটুকু সম্পদ আপনার কাছে আছে। কিন্তু সোনা থেকে বিচ্ছেদের পর, ডলার একটি ফিয়াট বা আজ্ঞাবাহী মুদ্রায় পরিণত হলো। এর মূল্য আর কোনো বাস্তব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল রইলো না। এর মূল্য নির্ভরশীল হলো কেবল ফেডারেল রিজার্ভের বিশ্বাসের ওপর এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, আমেরিকান সামরিক শক্তির ওপর।
এই পদক্ষেপটিই পেট্রোডলার সিস্টেমের জন্ম দেয়। আমেরিকা বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব) সাথে চুক্তি করে যে, তেল কেবল মার্কিন ডলারেই বেচাকেনা হতে হবে। এর মানে কী? এর মানে হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশকে, হোক সে বন্ধু বা শত্রু, তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলার অর্জন করতে হবে।
আর সেই ডলার ছাপানোর ক্ষমতা কার হাতে? ফেডারেল রিজার্ভের হাতে। এটি কোনো অর্থনৈতিক নীতি ছিল না এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
ফেডারেল রিজার্ভ রাতারাতি শুধু আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পুরো বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিণত হলো। তারা এখন শুধু ঋণ নয়, তারা এখন পুরো বিশ্বের ডিমান্ড বা চাহিদা প্রিন্ট করতে পারে।
আপনি যদি এই সিস্টেমের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু। এটিই হলো সেই ডার্ক ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স, যার কেন্দ্রে বসে আছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু এই অসীম ক্ষমতা ব্যবহারের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যখন আপনি কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই টাকা ছাপাতে পারেন, তখন সেই টাকার মূল্য হ্রাস পায়।
১৯৭০-এর দশকে ঠিক তাই ঘটলো, যা গ্রেট ইনফ্লেশন নামে পরিচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধের খরচ মেটাতে এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে ফেড এবং সরকার একসাথে সিস্টেমকে সস্তা টাকায় ভাসিয়ে দেয়। ফলাফল? লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল।
তখন সিস্টেমকে রিসেট করার জন্য মঞ্চে আনা হয় পল ভলকারকে। ভলকার যা করেছিলেন তা ছিল একটি নৃশংস সার্জারি। তিনি মুদ্রাস্ফীতিকে থামাতে সুদের হার ২০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যান।
এটি কাজ করেছিল, কিন্তু এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারায়, ব্যবসা দেউলিয়া হয়। ভলকারকে একজন নায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যিনি মুদ্রাস্ফীতিকে হত্যা করেছেন।
কিন্তু আমার বিশ্লেষণ ভিন্ন। ভলকার আসলে প্রমাণ করেছেন যে, ফেড সিস্টেমকে (অর্থাৎ ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে) রক্ষা করার জন্য তার নিজের দেশের নাগরিকদের যেকোনো স্তরে কোরবানি দিতে প্রস্তুত। এটি ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা সিস্টেমের স্বাস্থ্য নাগরিকের স্বাস্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল একটি ঠান্ডা, ডেটা-ড্রিভেন কন্ট্রোল এক্সারসাইজ।
এরপরেই আসে আমাদের আধুনিক যুগ, অ্যালান গ্রিনস্প্যানের যুগ। গ্রিনস্প্যানকে বলা হতো মায়েস্ট্রো। কিন্তু তিনি ছিলেন সেই আর্কিটেক্ট, যিনি সিস্টেমের বর্তমান বাগ-টিকে একটি ফিচার-এ পরিণত করেছেন।
তিনি গ্রিনস্প্যান পুট নামে একটি নীতির জন্ম দেন। এর সহজ অর্থ হলো ওয়াল স্ট্রিটের বড় ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট ফার্মগুলো যদি কোনো বড় ঝুঁকি নিয়ে লাভ করে, তবে লাভ তাদের। আর যদি তারা ঝুঁকি নিয়ে লোকসানে পড়ে এবং সিস্টেম ধসে পড়ার উপক্রম হয়, তবে ফেডারেল রিজার্ভ টাকা ছাপিয়ে তাদের বাঁচিয়ে দেবে (বেইল আউট)।
এটি ছিল একটি খোলা নিমন্ত্রণ। ফেড আক্ষরিক অর্থেই ওয়াল স্ট্রীটকে বলছিল, তোমরা জুয়া খেলো। আমরা তোমাদের হারতে দেবো না। এই নীতির সরাসরি ফল হলো ২০০০ সালের ডট-কম বাবল এবং তার চেয়েও ভয়াবহ, ২০০৮ সালের গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস।
এই ক্রাইসিসটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল সেই গ্রিনস্প্যান পুট নামক করাপ্টেড কোডের যৌক্তিক পরিণতি। ব্যাংকগুলো জানতো তারা এমন সব বিষাক্ত ফিনান্সিয়াল প্রোডাক্ট (যেমন সাবপ্রাইম মর্টগেজ) তৈরি করছে যা টিকবে না। কিন্তু তারা কেয়ার করেনি। কারণ তারা জানতো, ফেড তাদের বাঁচাবে।
এবং ফেড ঠিক তাই করেছে। ২০০৮ সালে যখন সিস্টেমটি প্রায় ধসে পড়ে, তখন বেন বারন্যাঙ্কির নেতৃত্বে ফেড কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (QE) নামে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেয়।
এটি একটি গালভরা নাম, যার আসল অর্থ হলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার শূন্য থেকে তৈরি করে সেই ব্যাংকগুলোকে দেওয়া, যারা এই পতনটি ঘটিয়েছিল। তারা সাধারণ মানুষকে (যারা বাড়ি হারিয়েছিল) বেইল আউট করেনি, তারা সিস্টেমের অপরাধীদের বেইল আউট করেছে।
এখানেই আমার আসল অবসেসন কাজ করে। একজন ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে আমি প্যাটার্ন দেখি। আর ২০০৮ সালের পর থেকে প্যাটার্নটি খুবই স্পষ্ট। আমরা আর ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের অধীনে বাস করছি না। আমরা বাস করছি এমন একটি সিস্টেমে, যা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।
এটি একটি সেন্ট্রালাইজড কন্ট্রোল ম্যাট্রিক্স। এই সিস্টেমটি উৎপাদনশীলতা বা উদ্ভাবনকে পুরস্কৃত করে না এটি পুরস্কৃত করে সিস্টেমের সাথে ঘনিষ্ঠতাকে।
এই ভিডিওটি দেখার পর আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, ফেডারেল রিজার্ভ একটি অর্থনৈতিক টুল নয় এটি একটি ক্ষমতার অস্ত্র। এটি এমন একটি অপারেটিং সিস্টেম যা দুটি শ্রেণির জন্য দুটি ভিন্ন নিয়ম সেট করেছে। একটি নিয়ম তাদের জন্য, যারা সিস্টেমের কোড লেখে (ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, অভিজাত শ্রেণি), এবং আরেকটি নিয়ম আমাদের জন্য, যারা সেই সিস্টেমের ইউজার মাত্র।
তারা সস্তা ঋণ দিয়ে বাবল তৈরি করে, সাধারণ মানুষকে সেই বাবলে বিনিয়োগ করতে প্রলুব্ধ করে, তারপর সুদের হার বাড়িয়ে সেই বাবল ফাটিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেই সম্পদগুলো আবার কিনে নেয়। এটি একটি চক্র। গ্রেট ডিপ্রেশন থেকে ২০০৮ এবং এমনকি কোভিড-১৯ এর সময়কার অভূতপূর্ব মানি প্রিন্টিং, এই সবই একই অ্যালগরিদমের ভিন্ন ভিন্ন পুনরাবৃত্তি।
এই ডক্যুমেন্টারিটি আমার কাছে শুধু একটি ভিডিও ছিল না, এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখায় যে প্রকৃত ক্ষমতা দৃশ্যমান টেকনোলজিতে নয়, বরং অদৃশ্য অর্থনৈতিক কোডে নিহিত।
আমি জানি এই বিশ্লেষণটি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু একজন অ্যানালিস্ট হিসেবে আমার কাজ আপনাকে স্বস্তি দেওয়া নয়, আমার কাজ হলো আপনাকে সেই প্যাটার্নগুলো দেখানো, যা অন্যরা দেখতে পায় না বা দেখতে চায় না। আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে অবসেসড, কারণ আমি বিশ্বাস করি যে, সিস্টেমকে পরিবর্তন করার প্রথম ধাপ হলো সিস্টেমটি আসলে কীভাবে কাজ করে তা বোঝা।
আমি যা শেয়ার করলাম, তা ভিডিওটির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমার নিজস্ব বিশ্লেষণ। আমি নিশ্চিত, এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে আপনিও এই সিস্টেমের ভেতরের ডার্ক ডিজাইনটি ধরতে পারবেন। আপনি কি মনে করেন, এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো পথ আছে? নাকি আমরা এই ম্যাট্রিক্সের ভেতরেই চিরকাল বন্দী থাকব? আপনার সুচিন্তিত মতামত জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।