27/06/2026
#অনাহুত_বসন্ত
#কানিজ_ফাতেমা
#পর্ব_৫
দরজার সামনে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। তৃষার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে ওঠে।মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ওর।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
“ মেঘলা কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল?তার কথাগুলোর কতটুকু শুনেছে?
এই প্রশ্নগুলো তৃষার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।তৃষা তড়িঘড়ি নিজেকে সামলে নিল।
মুখাবয়বে স্বাভাবিকতার আবরণ টেনে আনে,
“ মেঘলা তুমি এখানে?
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না।শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তৃষার দিকে।মেঘলা ঘরের ভেতরে ঢুকল,
“ আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে মনে হয়।
তৃষা অবাক হওয়ার ভান করে,
“ মানে?
মেঘলার কন্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে,
“ এত গোপনে কার সাথে কথা বলছিলে?
তৃষার মুখ শক্ত হয়ে গেল,
“ আমার ব্যক্তিগত ফোন নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে নাকি তোমার কাছে?
মেঘলা শান্ত গলায় শুধায়,
“ ব্যক্তিগত কথা অবশ্যই তোমার থাকতে পারে। কিন্তু যখন সেই কথা একটা পরিবারের ক্ষতির কারণ হতে পারে, তখন প্রশ্ন করার অধিকার আমার আছে।
তৃষা হেসে উঠল।
“ তুমি নিজেকে কী ভাবছো মেঘলা? এই বাড়ির মালিক?
“ না,আমি এই বাড়ির বউ।রাফিনের স্ত্রী যাকে সরিয়ে দিয়ে তুমি জায়গা নিতে এসেছো।
তৃষার ঠোঁটে কটাক্ষের হাসি ফুটে ওঠে,
“ তুমি নামের মাত্র ওর স্ত্রী।কিন্তু বাস্তবতা হলো রাফিন তোমাকে চায় না।
মেঘলা তীক্ষ্ণ জবাব ছুঁড়ে দেয়,
“ রাফিন আমাকে ভালোবাসে কি না, সেটা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর বিষয়। তোমার এই বিষয়ে কথা বলার কোন অধিকার নেই।
মেঘলার এহেন কথায় তৃষা হতবাক হয়ে যায়।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না,এই সেই মেঘলা, যে এতদিন মাথা নিচু করে সব অপমান সহ্য করেছে? যে তার কথায় চুপ করে চোখের পানি ফেলত?
আজ সেই মেয়েটাই তার চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।
তৃষার চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল।সে মনে মনে ভাবল,
“ এই মেয়েটার এত সাহস হলো কী করে? এতদিন তো একটা কথার জবাবও দিত না।
এক মুহূর্তের জন্য তৃষার ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হলো। মেঘলার শান্ত গলার দৃঢ়তা তাকে অপ্রস্তুত করে দিল।কিন্তু পরমুহূর্তে নিজের ভাবনা সামলে নিল তৃষা।
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি এনে বলল,
“বাহ, বেশ পরিবর্তন হয়েছে দেখছি। কয়েকটা কথা বলতে শিখেই নিজেকে অনেক বড় ভাবতে শুরু করেছো?আমি তো ভাবতাম তুমি শুধু কাঁদতে জানো। আজ দেখছি জবাবও দিতে পারো।
মেঘলা কাষ্ঠ হাসে,
“ অনেক সময় মানুষ বদলাতে চায় না তৃষা। পরিস্থিতি তাকে বদলে দেয়।
তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।কারণ সে বুঝতে পারছে,আগের মেঘলাকে সে যত সহজে আঘাত করতে পারত, এই নতুন মেঘলাকে তত সহজে ভাঙা যাবে না।
তৃষা কন্ঠে নিপাত জোর এনে বলে,
“ তুমি চার বছরেও এই বাড়িতে নিজের জায়গা বানাতে পারো নি। আর এখন এসেছো জায়গা দখল করতে।
“ জায়গা কেউ দখল করে নেয় না তৃষা। জায়গা অর্জন করতে হয়। আমি আমার স্বামীর মনে আর এই সংসারে জায়গা অর্জন করে নেব। আমি রাফিনের স্ত্রী, ছিলাম, আছি আর সারা জীবন থাকবো।
তৃষা রাগে মুখ ঘুরিয়ে নেয়,
“ তোমার মতো মেয়েরা শুধু চোখের পানি ফেলতে পারে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না।
কথাটা শুনে মেঘলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।একসময় এমন কথা শুনলে হয়তো সে চুপ করে চোখের পানি ফেলত। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিত। কিন্তু আজ আর নয়।
মেঘলার কন্ঠে ধেয়ে আসে অদম্য দৃঢ়তা,
“ ঠিক বলেছো তৃষা, আমি অনেক কেঁদেছি।কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো, চোখের পানি দুর্বলতার চিহ্ন নয়। কখনো কখনো সেই কান্নাই একজন মানুষকে শক্ত হতে শেখায়।আমি চুপ ছিলাম বলে ভেবো না, আমি কিছু বুঝতাম না। তোমরা আমার নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবেছো, এটাই তোমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। এই সংসার আমার, রাফিন আমার স্বামী। এই পরিবারের ভালো-মন্দে আমারও অধিকার আছে। চার বছর ধরে তিলে তিলে একটু একটু করে সংসারটা গড়েছি। রাফিন টা শূন্য পকেট থেকে এই পর্যন্ত টেনে আনতে সহায়তা করেছি। আর তুমি সুযোগ বোঝো ওকে মাঝপথে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। আজ ওর টাকা-পয়সা দেখে আবার নিজের স্বার্থে ফিরে এসেছ। তুমি যদি ওকে সত্যিই ভালবাসতে তাহলে কখন ওর জীবন থেকে চলে যেত না। আবার চলে গিয়ে দ্বিতীয়বার ওর জীবন আর সংসার নষ্ট করতে ফিরে আসতে। একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো, আমার এই সাজানো সংসার ভাঙার চেষ্টা করো, তাহলে এবার আমার বজ্র রূপ দেখবে তুমি।
তৃষা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছে না। যে মেয়েকে সে দুর্বল ভেবেছিল, সে-ই এখন তার সবচেয়ে বড় বাঁধা হতে যাচ্ছে। পরমুহূর্তেই তৃষা নিজের মুখের ভাবটা দ্রুত বদলে ফেলল সে।সে জানে, এখন যদি মেঘলার সামনে নিজের ভয় প্রকাশ করে ফেলে, তাহলে তার এতদিনের সাজানো পরিকল্পনায় ফাটল ধরবে। তৃষা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগ আর অস্থিরতা আড়াল করল তৃষা।
তৃষা চোখ সরু করে মেঘলার দিকে তাকায়। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে,
“ তোমার এত বড় সাহস, তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছো?তোমাকে আমি…
তৃষা রাগে মেঘলার দিকে এগিয়ে গেল।কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ কি হয়েছে?
রাফিনের কণ্ঠ শুনে তৃষার পা থেমে গেল।এক মুহূর্তেই তার মুখের রাগ উধাও হয়ে গেল।চোখের পলকে নিজেকে বদলে নেয় সে। অসহায় মুখ করে রাফিনের দিকে তাকায়।তৃষা আর কিছু না বলে দ্রুত রাফিনের কাছে এগিয়ে গেল।
পরক্ষণেই তার হাত জড়িয়ে ধরে ফ্যাতফ্যাত করে কেঁদে উঠল,
“ রাফিন তুমি এসেছ। আর একটু দেরি করে, তোমার বউ আমাকে মেরেই ফেলতো। আমি তো ওর কাছে একটু শরবত চেয়েছিলাম, কিন্তু মেঘলা আমার সাথে এমন ব্যবহার করছে।আমি বুঝতেই পারছি না, ও আমাকে এত অপছন্দ করে কেন?
রাফিন নিশ্চুপ হয়ে রইল।তার দৃষ্টি আটকে গেল তৃষার ওপর।ওর ভেতরে একটা অস্বস্তি খচখচ করে উঠল।কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল তার।তৃষা তো একটু আগে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। কোনোভাবেই তাকে কাছে আসতে দিচ্ছিল না।এমনকি তার স্পর্শেও বিরক্তি দেখাচ্ছিল,সেই মেয়েটাই এখন তার বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।,এই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তৃষার এত বড় পরিবর্তন?
রাফিনের ভ্রু কুঁচকে গেল,মনের ভেতর একটা প্রশ্ন জেগে উঠল,
“ তৃষা কে কেন যেন আমি ঠিক চিনে উঠতে পারছি না।নাকি এটা আমার মনের ভুল।
রাফিনের ভাবনার মাঝেই তৃষা ঠোঁট উল্টে জোরে কেঁদে উঠল,
“ চুপ করে আছো কেন রাফিন? তুমি ওকে কিছু বলবে না?বুঝেছি,তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। সবটাই তোমার অভিনয় ছিল। আমি এত কষ্ট পাচ্ছি, আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো।
কথাটা বলেই তৃষা হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিল।রাফিন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।সে বুঝতে পারছে না,তৃষার কান্নাটা সত্যি, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।আগে হলে হয়তো কোনো প্রশ্ন না করেই মেঘলাকে দোষ দিত।কিন্তু আজ কেন যেন তার মনটা থেমে গেল।
কারণ কিছুক্ষণ আগের তৃষার আচরণ আর এখনকার আচরণের মধ্যে একটা অদ্ভুত অমিল সে নিজেও টের পাচ্ছে।
মেঘলা নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখে যাচ্ছে।তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে।
মেঘলা মনে মনে আওড়ায়,
“ অনেক নাটক জানো তুমি, তাই না তৃষা।এইবার তো আসল নাটক শুরু হবে।
#চলবে...