08/08/2026
বাতেনবিমুখ জাহেরী বিদ্যার অন্তরধারী মানুষ জীবিত থেকেও মৃত
কালামেপাকে বলা হয়েছে-
وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ (۱۹) وَلَا الظُّلُمَاتُ وَلَا النُّورُ (۲۰) وَلَا الظَّلُ وَلَا الْحَرُورُ (۲۱) وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَن يَشَاءُ وَمَا أَنتَ بِمُسْمِعُ مَّن فِي الْقُبُورِ (۲۲)
একজন চক্ষুষ্মান ব্যক্তি ও একজন অন্ধ ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না; না আঁধার ও আলো (সমান হতে পারে); ছায়া ও রোদও (তো সমান) নয়; (একইভাবে) একজন জীবিত (অন্তরধারী) মানুষ ও একজন মৃত (অন্তরধারী) মানুষও সমান নয়; আল্লাহতায়ালা যাকে ইচ্ছা তাকে (জীবিত অন্তরধারীকেই হেদায়েতের বাণী) শোনান, (হে হাবীব) আপনি কখনোই এমন (মৃতপ্রাণ) মানুষদেরকে কিছুই শোনাতে পারবেন না, যারা (দুনিয়ার হায়াতে থেকেও মৃত অন্তরে) কবরের অধিবাসী। ফাতির: ১৯-২২ আয়াত
মুমিনগণ দুনিয়ায় বাস করে দেহগতভাবে এবং মনোগতভাবে বাস করে আখেরাতের ভাবনায় ও মহব্বতে বিভোর থেকে। যেরূপ লাইলী-মজনুর কাহিনীতে মজনু বাস করে লাইলীতে এবং লাইলী বাস করে মজনুতে মনোগতভাবে, কিন্তু তারা দেহগতভাবে বাস করতো এই দুনিয়াতেই। অনন্ত জিন্দীগির পথের পথিকদের চিন্তা-চেতনা ও আরাধনা এমনই অবস্থার হয়ে থাকে।
আবার মুমিনগণ বাহ্যদৃষ্টি দ্বারা দুনিয়ার বস্তুসামগ্রীর জাহেরীরূপ দেখলেও ঈমান ও, ইয়াক্বীনের সমন্বিত অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা দুনিয়াসহ আখেরাতের বাতেনীরূপ দেখে থাকেন। আর এরূপ দৃষ্টি-ধারীদের জন্য জাহেরী বিদ্যা বা আমলের দলিল মুখ্য কোনো বিষয় নয়। বাহ্যদৃষ্টি যার ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার জন্য চিকিৎসা বিধান হলো কত কি ঔষধ প্রয়োগসহ চশমা ব্যবহার কিংবা কখনো অপারেশন করা। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি যার ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার একমাত্র চিকিৎসা হলো আল্লাহর স্মরণ, হালাল ভক্ষণ ও দ্বীনি ইলম- যার ডাক্তার হলেন ওলীয়ে কামেল পীর-মুর্শীদগণ। দুনিয়ার বড় বড় ওলী-আউলিয়াগণ জাহেরী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, এমন কি নবী-রাসূলগণও কোনো মাদ্রাসা পাশ মুফতী-মাওলানা ছিলেন না। কিন্তু বাতেনী বিদ্যায় তাঁরা জ্ঞানের মহাসাগর। যাদের মর্মে কালামেপাকের এই কথা প্রযোজ্য যে,
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاتَيْنَهُ حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
- অতঃপর সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো, তখন আমি তাকে নানারকম জ্ঞান-বিজ্ঞান (হিকমাত) ও সাধারণ জ্ঞান (ইলম) দান করলাম; আর আমি এভাবেই নেক্কার (মুমিন) লোকদেরকে পুরস্কার দিয়ে থাকি।-ইউসুফ: ২২ আয়াত
কাজেই এরূপ মুমিন বান্দাদেরকে আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা বা পথ প্রদর্শক) জ্ঞানে যথাযথ ভক্তি-তাজিম-সম্মান করতে হয়। কারণ, হাদীস মতে, মুমিন কখনো অপবিত্র হয়না।' এর মানে তারা মহাপবিত্রতম সত্ত্বার ওলী বা বন্ধু বিধায় তারাও পবিত্র হয়ে থাকেন। কারণ, পবিত্র হওয়া ছাড়া পবিত্রতম সত্ত্বার সাথে মিলন বা বন্ধুত্ব গড়া সম্ভব নয়। তাই আল্লাহর ওলী-আউলিয়াদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে তাঁদের অন্তর্লব্ধ হিকমাতময় জ্ঞানের ও পবিত্রতার মানদণ্ডে। জাহেরী বিদ্যার বাহাদুরী ও সার্টিফিকেট দ্বারা ওলী নির্ণয় করা যায় না। যে কারণে মাদ্রাসা পাশ করে ওলী হওয়া বা নবী হওয়া শর্তযুক্ত নয়।
হে ভক্তগণ। এরূপ মনোভাবাপন্ন পথের পথিক হওয়া তোমদেরও অবশ্যই কর্তব্য। কারণ, তুমি তরিকতের পথের পথিক; এর মানে তুমি দুনিয়ায় থেকেও দুনিয়ার মায়া মহব্বত থেকে তুমি মুক্ত, ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো। কারণ, তরিকতের ভাষায় তুমি মরার আগেই মৃত। মৃতের আবার দুনিয়ার চিন্তা-ভাবনা কিসের?
তরিকতের অগ্রপথিকরা শয়নকালে মৃত্যুকে বালিশের নীচে রেখে ঘুমাতে যেতেন এবং জাগ্রত হয়েই আবার মৃত্যুকে চোখের সামনে রেখে চলনে-বলনে শামিল হতেন। যেন তারা মৃত্যুকেই বড় বেশী মহব্বত করতেন যে, কত তাড়াতাড়ি তোমার ডাকে সারা দিয়ে আমি আমার অনন্ত সাথী মাশুকে ইলাহীর সান্নিধ্যে চলে যেতে পারি।
এরূপ চিন্তা-চেতনা পথের পথিক তুমি তখনই হতে পারবে যখন তোমার নফসে আম্মারাকে তুমি কতল করতে পারবে বা তার একান্ত সহযোগী ইবলিসকে মুসলমান বানাতে পারবে নফসের কামনা-বাসনাসমূহকে জ্যন্ত কবর দিয়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার দুনিয়ার মায়া ছাড়তে না পারবে, দুনিয়াবী চিন্তা-চেতনার কামনা-বাসনাসমূহকে কবর দিতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি আখেরাতের পথে এক পাও অগ্রসর হতে পারবে না।
আর দুনিয়াবিমুখ হওয়ার একমাত্র মূলমন্ত্র হলো আল্লাহওমুখী হওয়া এবং স্বীয় মুর্শীদমুখী হওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তা না হতে পারলে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার দাবীকৃত আল্লাহর স্মরণ এবং মুর্শীদের স্মরণ করা সবই কথার কথা মাত্র। সত্যিকারভাবে মুরিদ আল্লাহ ও স্বীয় মুর্শীদের স্মরণকারী তখনই হতে পারবে যখন তুমি দুনিয়াবী কামনা-বাসনাসমূহকে স্বীয় মুর্শীদের কৃপার উপর ছেড়ে দিতে পারবে। যখন জানবে যে আমার মুর্শীদের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা; আমার মুর্শীদ আমাকে যে হালতে রাখেন তাতেই আমি রাজি-খুশী ও সুখী। এটাই প্রকৃত মুরিদ হওয়ার লক্ষণ, পীরের হাতে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করার প্রমাণ, যেন তুমি তোমার পীরের ইচ্ছেকর্মের হাতে সমর্পিত এক জিন্দা লাশ। যখন তুমি এ অবস্থায় উপনীত হতে পারবে তখনই তোমার মুর্শীদের ফায়েজ ও নেকদৃষ্টি লাভের তুমি অধিকারী হতে পারবে এবং পারবে আল্লাহর রহমত লাভের উপযোগী হতে।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী পীরকে প্রথম খোদা বলে অভিহিত করেছেন।
এটা আসলে শরিয়তী পর্দাবৃত কথা, এর মূল হাকীকত হলো মুর্শীদই চুড়ান্ত খোদা। তা না হলো প্রথম খোদা, দ্বিতীয় খোদা, তৃতীয় খোদার একটি শেরেকী স্থর ভাবনা এসে যায়। বিষয়টি হচ্ছে মুর্শীদে খোদার পথ ধরেই মুশীদে রাসূল ও মুশীদে মাবুদকে পেতে হয়। তাই মূল মারেফতে প্রত্যেক মুরিদের আপন আপন মুর্শীদই হলেন তার জন্য খোদা। আল্লাহ জাহেরী সত্ত্বায় তাঁর নবী-রাসূল ও নায়েবে রাসূলদের মাঝেই বিরাজিত। (সূরা রূম ৩০ আয়াত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলেই এর জবাব পাওয়া যাবে।)
অর্থাৎ, 'সুতরাং (হে নবী আপনি!) আপন মুখমন্ডল সোজা রাখুন আল্লাহর ইবাদতের জন্য; একমাত্র তাঁরই হয়ে (তাঁরই স্বভাবধর্মে অটল-অবিচল থেকে)। আল্লাহর স্থাপিত বুনিয়াদ (ফিতরাত বা স্বভাবধর্ম), যার উপর মানুষকে (তিনি) সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর বানানো বস্তুকে (তথা তাঁর স্বভাবধর্মকে) বিকৃত করো না; এটাই (সহজ-সরল-সত্য-সঠিক) সোজা ধর্ম; কিন্তু বহুলোকই (আল্লাহর স্বভাবধর্মের এ বিষয়টি) জানে না।' এর মানে যা আল্লাহর স্বভাবধর্ম তাই মানব ধর্ম এবং আল্লাহর স্বভাব দ্বারাই মানব স্বভাব প্রতিষ্ঠিত বিধায় মানুষ আল্লাহময় হয়ে যায়; এরূপ আল্লাহওয়ালারাই তাঁর ওলীতে পরিণত হয়ে যায়। জাতে জাতে মিল ছাড়া, সম পর্যায়, সম মানের মিল ছাড়া প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে না বিধায় আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব হওয়া মানে উভয়ই একই সত্ত্বার স্বরূপে বিদ্যমান হয়ে যায়। যে কারণে ওলীদের হাত, পা, কর্ণ, চক্ষু, মুখ ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহর হয়ে যায়- যা হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত।
আল্লাহ বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর নিজ বান্দাগণের মধ্যে হতে যাকে চান তাকেই কেবলমাত্র স্বীয় রহমতের মধ্যে শামিল করে নেন। অর্থাৎ যে বান্দার স্বভাব আল্লাহর স্বভাবময়, যার প্রতি আল্লাহর ওলীগণ সন্তুষ্ট সে বান্দার প্রতিই মূলতঃ আল্লাহপাকও সন্তুষ্ট এবং তাকেই তিনি স্বীয় রহমতের ছায়ায় ঠাঁই দেন। হাদীসে বলা হয়েছে- আউলিয়ায়ি তাহতা কাবায়ি লাইয়ারিফুহুম গাইর- আমার
বন্ধুগণ আমার কাবার আবরণে আবৃত, আমি ব্যতীত অপর কেউ তাঁদেরকে চিনতে পারে না।' কারণ, অন্য হাদীসে বলা হয়েছে- পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটি বস্তু দ্বারা ঢেকে রাখা হয়েছে; যার একটি হলো- আল্লাহ তাঁর ওলীদেরকে সাধারণ লোকালয়ে ঢেকে রাখেন, যাদেরক সাধারণেরা চিনতেই পারে না। পক্ষান্তরে রহমত বঞ্চিতরা থাকে তাঁর হেদায়েত থেকে বঞ্চিত, যদিও থাকে তারা দুনিয়াদারদের কাছে ধন্য ধন্য। এমনটাই দুনিয়াতে থেকেও বেহেশত-দোযখে বাস করার নামান্তর।
আমাদের এই দেহেতেই বেহেশত-দোযখ ভাবনা-অনুভূতি বিদ্যমান রয়েছে।
নিজেকে তুমি যখন আল্লাহতে এবং নিজ পীরে ফানা বা সমর্পণ করে দেবে তখন দেখতে শত দুঃখ-কষ্টে থাকলেও তোমার মাঝে বিরাজমান আনন্দ অনুভূতি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। যেমন তোমার প্রেমাস্পদ তোমার কাছে থাকলে জগতের কোনো দুঃখই দুঃখ বলে মনে হয় না। তেমনি হলো অন্তরে বেহেশত ভাবনা-চিন্তা অনুভূতির বিষয়টি। ঠিক তার বিপরীত হলো অন্তরের দোযখ অনুভূতি। তুমি যত বিত্ত বৈভবেই থাকো কেন, তোমার মাশুকে ইলাহী যদি তোমার মনোজগতে বা অন্তরজগতে না থাকে তখন তোমার অন্তরে শান্তি থাকবে না; তখন তোমাকে করুণ সুরে গাইতে ইচ্ছে করবে- চন্দন পালংকে শুয়ে একা একা কি হবে, জীবনে তোমায় যদি পেলাম না।' এই পেলাম না বলতে দুনিয়াদাররা মনে করে জীবনসঙ্গী পাওয়া, আর তরিকতের পথের পথিকরা মনে করে আল্লাহকে এবং মুর্শীদকে পাওয়ার বেদনা-বিধুর প্রেমগাঁথা কথামালা। কবিও তাই এভাবে বলেছেন-
কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক, মানুষেতেই সুরাসুর ॥
তাই মানুষের মাঝে বিরাজমান এই স্বর্গ-নরক অনুভূতির শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে তোমাকে কামেল মুর্শীদের হাতে বায়াত হয়ে সেই মর্মে দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়া চাই। কারণ, আল্লাহর রহমতে শামিল হতে হলে রহমতপ্রাপ্তদের দলভুক্ত হওয়া চাই। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তদের দলভুক্ত না হওয়া যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার কোনো ইবাদত-বন্দেগীই কবুল হওয়ার যোগ্য হবে না। কামেল পীরের পায়রবী করা ভিন্ন প্রকৃতপক্ষে ইবাদত-বন্দেগী করার তওফিকই নসীব হবে না।
হে ভক্তগণ। বুখারী শরীফে বর্ণিত দুই প্রকার বিদ্যার মর্মবাণী একটু গভীরভাবে চিন্তা করো। কত ভয়ংকর কথা যে, দ্বিতীয় প্রকার মারেফত বিদ্যা প্রকাশ করলে স্বয়ং নবী (সাঃ)-কেই তাঁর এতো মহব্বতের শিষ্য-সাহাবারা গলা কেটে ফেলবেন বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন। তাই মারেফত যথাতথা বলার বিষয় নয়; মারেফতের সম্পর্ক রয়েছে একান্তই আল্লাহর সাথে। যেমন- কেউ যদি প্রশ্ন করে তুমি কি আল্লাহকে দেখেছো? তখন তার উত্তরে হ্যাঁ বা না কিছুই বলার দরকার নেই। কারণ, এর উত্তর জানার বা বুঝার অধিকার রয়েছে একমাত্র আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির।
দুনিয়াদার কাফের-মুশরিক-মুনাফিকদের কাছে আল্লাহকে দেখা না দেখার উত্তর দেয়া সমান কথা। যে কারণে, কালামেপাকে রূহ সম্পর্কে এক ইহুদীর প্রশ্নের উত্তরে নবী (সাঃ)-কে আল্লাহপাক বলতে বলেছেন, বলুন, রূহ আল্লাহপাকের আদেশ মাত্র।' তাই রূহের পরিচয় যেমন ইহুদীর কাছে দিয়ে লাভ নেই তেমনি আল্লাহর পরিচয়ও যার তার সামনে দিয়ে লাভ নেই। বড়জোর একান্ত কাছের আল্লাহওয়ালাদের কাছে আকারে-ইঙ্গিতে কিছুটা বলা যেতে পারে, যেমনটা নবী (সাঃ)ও করেছিলেন। হাদীস মতে যে ব্যক্তি 'লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে (অন্তরে ধারণ করবে) সে বেহেশতবাসী। 'মান ক্বালা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ফাদাখালাল্ জান্নাহ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সে বেহেশতবাসী হবে।'
অর্থাৎ যে ব্যক্তি জিন্দা দিলে এরূপ হাকীকী কালেমা উচ্চারণ করবে সে-ই বেহেশতবাসী হবে বুঝানো হয়েছে; তাই বলে নির্জীব দিলের মৌখিক কালেমা উচ্চারণকারিগণ নন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে যেয়ে বহু হিন্দু পাকিস্তানি সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ে তাদের কথামতো মুসলমান প্রমাণ দিতে যেয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য কালেমা শরীফ পড়েছে, তাই বলে কি তারা মুসলমান হয়ে গেছে? না; অর্থাৎ প্রকৃত মুসলমান হতে হলে চাই মনে-প্রাণে কালেমার আন্তরিক স্বীকৃতি দান। আর যদি আমরা তা করতে না পারি তবে আমরা কিসের মুসলমান, কিসের ঈমানদার হলাম? এরূপ 'মুসলেন্দু' (অর্ধেক মুসলমান অর্ধেক হিন্দু) চরিত্রের ইসলামের অনুসারী আমরা! হায় আফসোস! আমরা ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েও, মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েও, শুধু মাত্র কালেমা শরীফের যথার্থ জ্ঞানের অভাবে ও যথার্থ স্বীকৃতি দানের অভাবে আমাদের অনেককেই ঈমানহারা হয়ে মরতে হবে! ইসলামের অনুসারীদেরকে ঈমানের মানদণ্ডে বিচার করতে গেলে ঠক বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাওয়ার মতো দশা হবে।
এক হাদীস মতে তিনি (সাঃ) মারেফতের বর্ণনা হযরত ওমর (রাঃ)-র সামনেও প্রকাশ করতে চাননি। অর্থাৎ, হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ তাঁর প্রিয় ভক্ত-আশেক ও খলিফা হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহে আলাইহি- কে লিখেছেন যে, 'একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবিদের কাছে হাকীকতের গভীর তত্ত্ব ও মারেফতের গুঢ় রহস্য বর্ণনা করছিলেন। সে মজলিসে হযরত আলী, হযরত আবু বকর, হযরত ওসমান, ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত আনাস, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত বেলাল প্রমুখ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন। হযরত ওমর সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। হাকীকত ও মারেফতের গভীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলাকালে হযরত ওমর সেখানে হাজির হলেন। হযরত ওমরকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলোচনা বন্ধ করে দিলেন। এতে সাহাাবিগণ বিস্মিত হলেন এবং মনে করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয় তো হযরত ওমরের সামনে হাকীকত ও মারেফতের গভীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চান না। তখন হযরত আবু বকর আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কাছে হাকীকতের তত্ত্ব আলোচনা করলেন, কিন্তু ওমরের কাছে এসব গুঢ় রহস্য গোপন রাখলেন- এর প্রকৃত কারণ কী?
উপস্থিত সকল সাহাবিদের প্রতি লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি মারেফতের গুপ্তভেদ ওমরের কাছে গোপন করিনি, বরং ব্যাপারটা হচ্ছে এ রকম যে, কোনো দুগ্ধপোষ্য শিশুকে যদি ঘৃত পরিপক্ব হালুয়া ও গোস্ত ইত্যাদি ভারি খাদ্য খাওয়ানো হয় তাহলে নিশ্চয়ই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়বে। আবার শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হলে এসব খাদ্য শরীরের পুষ্টিসাধন করে।পানাহারের কোনো দ্রব্যই তখন আর তার অনিষ্ট করতে পারে না।'কাজেই মারেফতের উপযোগ্যতা বুঝতে হলে এতটুকু ইঙ্গিতই যথেষ্ঠ।
📖মহামুর্শীদ মহানবী (সাঃ)
✍️সাইয়্যেদ শাহ সূফি বেলাল নূরী আল সুরেশ্বরী। 🌹