22/08/2026
যদি প্রবাসীদের কল্যাণের কাজ বেসরকারি এনজিওকে করতে হয়, তবে জণগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি সংস্থাগুলোর প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়?
বাংলাদেশে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রবাসী এবং তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণ, অধিকার রক্ষা এবং আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য রাষ্ট্র গঠন করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিশেষায়িত সংস্থা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডসহ বিএমইটি ও অন্যান্য দপ্তর।
কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের জনগণের টাকায় চলা এই প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড এর প্রয়োজনটা আসলে কতটুকু?
অসংখ্য উদাহরণ ও ঘটনা রয়েছে। তবে তার মধ্যে মোহাম্মদ ফরিদের ঘটনাটি একটি জ্বলন্ত ও নির্মম উদাহরণ।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে জানলাম গত ১৮ আগস্ট তুরস্ক থেকে দেশে ফেরেন দুই পা হারানো মোহাম্মদ ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা এবং মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের কারণে তিনি নিজের পরিবার বা বাড়ির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছিলেন না।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এভিয়েশন সিকিউরিটি এক কর্মী ফরিদকে বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে পাঠান।
এরপর ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অধীনে পরিচালিত সেই প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ফরিদকে পাওয়া মাত্রই খুব সুন্দরভাবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। আর এভাবেই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের "খুব সুন্দরভাবে" তাদের দায়িত্ব পালন শেষ করে।
শুধু ফরিদ নন; এর আগেও গুরুতর অসুস্থ, মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা নানা কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন যত মানুষই বিমানবন্দরে এসেছেন, বিমানবন্দরের যেকোনো সংস্থাই কর্মীরা এরকম কাউকে পাওয়া মাত্রই চোখ বন্ধ করে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশনই তাঁদের শেল্টার হাউসে থাকার ব্যবস্থা করে, খাওয়ার ব্যবস্থা করে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা প্রদান করে এবং দ্রুততার সঙ্গে নিজেদের নেটওয়ার্ক খাটিয়ে পরিবারকে খুঁজে বের করে তাঁদের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করে।
সেই প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ন্যূনতম দায়িত্বও পালন না করে তাঁকে সোজা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের কাছে পাঠিয়ে দেয়!
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে তাদের শেল্টার হাউসে থাকার সুযোগ করে দেয়, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা প্রদান করে এবং একই সঙ্গে তাঁর পরিবারকে খুঁজে বের করার জন্য দ্রুততার সঙ্গে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ব্র্যাক মাইগ্রেশন তাদের চমৎকার কর্মদক্ষতা ও তৎপরতার মাধ্যমে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই ফরিদের পরিবারকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। এরপর গত ২০ আগস্ট ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়।
কী অদ্ভুত ব্যাপার, পরিবার খুঁজে পাওয়ার পর ব্র্যাকের সেই অনুষ্ঠানে ঠিকই হাজির হলেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক ( যুগ্ম সচিব )এ টি এম মাহবুবুল করিম এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম।
ন্যূনতম লজ্জা থাকলে যে অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের মুখ দেখানোরই কথা নয়, তাঁরা দিব্যি সেখানে উপস্থিত হয়ে নিজেদের চেহারা দেখালেন ও বাহবা কুড়ানোর উৎসবে মেতে উঠলেন।
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র এই লোকগুলোকে বেতন দেয়, জনগণের টাকায় তাদের জীবন চলে। অথচ কী নিখুঁত নির্লজ্জতায় তাঁরা নিজেদের কাজটা একটা এনজিওর হাতে তুলে দিয়ে কেবল ফটোসেশনের সময় ঠিকই হাজির হয়ে যান।
যাঁদের বেতন আসে এই সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো টাকায়, একটুও কি তাদের লজ্জা করে না?
আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা আজ নিশ্চিত করার সময় এসেছে।
যদি এই কাজ বেসরকারি এনজিওকে করতে হয়, তবে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ আর এই সরকারি সংস্থাগুলোর প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়?