14/08/2026
বিদেশে পাঠানোর আগে সন্তানকে স্বনির্ভর হতে শেখান—অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা কঠিন
⏱️ লেখাটি পড়তে আনুমানিক ৮–১০ মিনিট সময় লাগতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে সময় নিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল। আর আগ্রহ না থাকলে অনুগ্রহ করে এড়িয়ে যেতে পারেন।
আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখছি—বাংলাদেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে আসেন, তাঁদের বাস্তব জীবন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অনেক সুন্দর। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কঠোর পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিজের কাজ নিজে করার মানসিকতা। শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা পর্যাপ্ত টাকা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এলেই সবকিছু সহজ হয়ে যায় না। এখানে এসে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এমন কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যার জন্য তাঁরা আগে থেকে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
এই সমস্যার পেছনে পরিবেশগত ও অভ্যাসগত—দুই ধরনের কারণই রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করতে আসা অনেক শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান। দেশে থাকার সময় তাঁদের একটি নির্দিষ্ট জীবনযাত্রার অভ্যাস তৈরি হয়। আমাদের সমাজে নিজের কাজ নিজে না করে অন্যকে দিয়ে করানোর প্রবণতা বেশ প্রচলিত। একান্ত প্রয়োজন না হলে অনেক ছাত্রছাত্রী শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে চান না। কেউ কেউ শুধু টিউশনি বা আরামদায়ক কাজকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন; কিন্তু শারীরিক শ্রমের কাজকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন।
অনেকেই নিজের দৈনন্দিন কাজও নিজে করেন না—যেমন বাজার করা, রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, নিজের ব্যবহৃত জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা কিংবা নিজের খাবার তৈরি করা। এসব কাজের জন্য তাঁরা বাবা-মা, পরিবারের অন্য সদস্য বা গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল থাকেন।
আমাদের দেশে এমন অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা নিজের হাতে গ্লাসে পানি ঢেলে খেতেও অভ্যস্ত নয়। মা-বাবা বা পরিবারের অন্য কেউ পানি এগিয়ে দেন, খাবার পরিবেশন করেন এবং ব্যবহারের পর জিনিসপত্রও গুছিয়ে রাখেন। অনেককে বড় বয়স পর্যন্ত মা ভাত মেখে খাইয়ে দেন।
অনেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, দুপুরে ঘুম থেকে ওঠেন এবং নিজেদের সুবিধামতো অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করেন। পরিবারও ভালোবাসার নামে তাঁদের অধিকাংশ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়।
কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এসে হঠাৎ করেই সেই পরিচিত পরিবেশ বদলে যায়।
এখানে সব সময় সাহায্য করার মতো মা-বাবা, ভাই-বোন বা গৃহকর্মী পাশে থাকেন না। নিজের রান্না, বাজার, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, বিল পরিশোধ, যাতায়াত, পড়াশোনা এবং চাকরি—সবকিছু নিজেকেই সামলাতে হয়। যে তরুণ দেশে নিজের হাতে গ্লাসে পানি ঢেলে খাওয়ার অভ্যাসও তৈরি করেনি, তার জন্য এই পরিবর্তন মোটেও সহজ নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা সন্তানদের যে ধরনের জীবনযাপনে অভ্যস্ত করছি, সেটি কি সত্যিই তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য ভালো?
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ স্টুডেন্ট ভিসাধারী শিক্ষার্থী কোর্স চলাকালে প্রতি দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং নির্ধারিত কোর্স বিরতিতে সীমাহীন সময় কাজ করতে পারেন। তবে ব্যক্তির ভিসার শর্ত ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত VEVO থেকে নিজের ভিসার শর্ত যাচাই করা।
বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী শুরুতেই অফিসে বসে করার মতো পেশাগত কাজ পান না। তাঁদের রেস্টুরেন্টের কিচেন, ক্লিনিং, ওয়্যারহাউস, ডেলিভারি, রাইডশেয়ার, কাস্টমার সার্ভিস, সুপারমার্কেট বা অন্যান্য ক্যাজুয়াল কাজে যুক্ত হতে হয়। প্রচলিত ভাষায় এগুলোর অনেকটিকেই “odd jobs” বলা হয়।
এসব কাজের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সময় মেনে চলা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, দ্রুত কাজ করা এবং শারীরিক পরিশ্রম করার প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে কাজের জায়গায় সঠিকভাবে যোগাযোগ করা, সহকর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং গ্রাহকদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করাও জরুরি।
যে ছেলেমেয়ে দেশে নিজের ঘর পরিষ্কার করেনি, রান্না করেনি কিংবা পরিবারের কোনো দায়িত্ব নেয়নি, সে হঠাৎ করে বিদেশে এসে একই সঙ্গে পড়াশোনা, কাজ এবং সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক।
তখন অনেকের কাছে জীবনকে অসহনীয় মনে হয়। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কেউ পড়াশোনায় পিছিয়ে যান, আবার কেউ কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। কেউ কেউ বুঝতেই পারেন না—কোন কাজটি আগে করবেন, কীভাবে সময় ভাগ করবেন কিংবা সীমিত আয়ের মধ্যে খরচ নিয়ন্ত্রণ করবেন।
এ জন্য সমস্যার সমাধান অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর নয়; প্রস্তুতি শুরু করতে হবে বাংলাদেশে থাকতেই।
সন্তানকে দিয়ে নিজের বিছানা গোছানো, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, বাজার করা, সাধারণ রান্না শেখা, সময়মতো ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠা, গণপরিবহন ব্যবহার করা এবং নিজের অর্থের হিসাব রাখা—এসব ছোট ছোট অভ্যাস তৈরি করাতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর অন্তত কয়েকটি সাধারণ খাবার রান্না করা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা, নিজের জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখা, একটি সাধারণ বাজেট তৈরি করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এসব জানা উচিত। এগুলো কোনো শাস্তি নয়; এগুলো প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা।
বাবা-মা হিসেবে আমরা অনেক সময় মনে করি, সন্তানকে কোনো কাজ করতে না দেওয়াই তাকে সুখে রাখা। সন্তানকে ভালোবাসি বলেই তার সব কাজ নিজেরা করে দিই। কিন্তু সেটি প্রকৃত সুখ নয়। বরং সব দায়িত্ব নিজেরা পালন করে সন্তানকে পরনির্ভরশীল করে তুললে আমরা অজান্তেই তার ভবিষ্যৎকে কঠিন করে দিই।
বিশ্ব এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। উন্নত দেশগুলোর অনেক পরিবারে ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নিজের কাজ নিজে করতে শেখানো হয়। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী তারা ঘরের কাজে অংশ নেয়, নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখে এবং একটি নির্দিষ্ট বয়সে পার্টটাইম কাজও করে।
এতে তারা শুধু টাকা আয় করে না; সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, যোগাযোগ, দলগত কাজ, গ্রাহকসেবা এবং অর্থের মূল্যও শেখে। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে কিছু কেনার অভিজ্ঞতা সন্তানকে অর্থের প্রকৃত মূল্য বুঝতে সাহায্য করে।
অস্ট্রেলিয়ার অনেক পরিবারে ছেলেমেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর স্বাধীনভাবে বসবাস শুরু করে অথবা বাবা-মা তাদের ধীরে ধীরে আলাদা জীবন পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করেন। অবশ্যই সব পরিবার একই নিয়ম অনুসরণ করে না। কারও সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে, আবার কেউ পড়াশোনা বা চাকরির প্রয়োজনে আলাদা হয়ে যায়।
এর অর্থ এই নয় যে বাবা-মা সন্তানদের ঘৃণা করেন, সম্পর্ক ছিন্ন করেন কিংবা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যান। বরং এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, সন্তান যেন জীবনের বাস্তবতা বুঝতে শেখে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে এবং দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধান নিজেই করতে শেখে।
স্বাধীনভাবে থাকলেও সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। তারা নিয়মিত যোগাযোগ করে, দেখা করে, একসঙ্গে সময় কাটায় এবং পারিবারিক অনুষ্ঠান বা ছুটির দিনে একসঙ্গে খাবার খায়। প্রয়োজন হলে বাবা-মা সন্তানকে সহযোগিতাও করেন। তবে সন্তানের দৈনন্দিন দায়িত্ব সব সময় নিজেরা পালন করেন না।
আমার কাছে এই অভ্যাসের ইতিবাচক দিক রয়েছে। কারণ জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া খুবই প্রয়োজন। সন্তান যদি ছোটবেলা থেকেই নিজের দায়িত্ব নিতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমস্যা সমাধান করতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যতে একা থাকা, পড়াশোনা করা, চাকরি করা কিংবা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা তার জন্য অনেক সহজ হয়।
স্বাধীনতা মানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের জীবন পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করা।
এ প্রসঙ্গে একটি ছোট ঘটনা বলি।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত একটি বাংলাদেশি পরিবারের স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে গল্পের ছলে এক মহিলা তার মাকে বলেছিলেন, “আপনার ছেলে তো এখন বয়স অনুযায়ী পার্টটাইম কাজ করার উপযুক্ত হয়েছে।”
কথাটি শুনে মা বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমার ছেলেমেয়ে কাজ করবে—আপনি এটা ভাবলেন কীভাবে?”
তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখে সহজ-সরল ওই মহিলা কিছুটা বিব্রত হয়ে গেলেন। অথচ তিনি অসম্মানজনক কিছু বলেননি। তিনি শুধু বোঝাতে চেয়েছিলেন, পড়াশোনার ক্ষতি না করে বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী কিছু দায়িত্ব নেওয়া কিংবা আইনসম্মত পার্টটাইম কাজ করা অস্ট্রেলিয়ার অনেক পরিবারের স্বাভাবিক জীবনধারার অংশ।
অবশ্যই সব রাজ্য বা টেরিটরিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাজের নিয়ম এক নয়। কাজটি বয়সের উপযোগী ও নিরাপদ হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও শিক্ষাগত বাধ্যবাধকতা মেনে করতে হবে। এখানে মূল আলোচনার বিষয় কোনো নির্দিষ্ট বয়স নয়; বরং কাজ ও দায়িত্বকে অসম্মানজনক মনে করার মানসিকতা।
নিরাপদ পরিবেশে, পড়াশোনার ক্ষতি না করে এবং প্রচলিত নিয়ম মেনে পার্টটাইম কাজ করলে একজন তরুণ দায়িত্ববোধ, সময় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, দলগতভাবে কাজ করা এবং অর্থের মূল্য সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। কাজ করা লজ্জার বিষয় নয়; সৎ কাজ মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়।
যে মা সন্তানের কাজ করাকে অপমান বা লজ্জার বিষয় মনে করেন, তিনি সম্ভবত ভালোবাসা থেকেই এমনটি ভাবছেন। তাঁর হয়তো অর্থের অভাব নেই। কিন্তু অর্থ থাকলেই সন্তানকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে—এই ধারণাটি সঠিক নয়।
কারণ জীবনের প্রতিটি সমস্যা টাকা দিয়ে সমাধান করা যায় না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় গৃহকর্মীর ওপর নির্ভর করে জীবন চালানো সাধারণ পরিবারের জন্য সহজ বা বাস্তবসম্মত নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সন্তানকে সুখ দেওয়ার অর্থ কী? সারাদিন বসে থাকা? কোনো দায়িত্ব না নেওয়া? নিজের কাজও অন্যকে দিয়ে করানো? কাজ করা কি সত্যিই এত খারাপ?
কাজ মানুষকে ছোট করে না। সৎভাবে করা কোনো কাজই অসম্মানের নয়। কাজের ধরন দিয়ে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করা উচিত নয়। বরং কাজ না শেখানো, দায়িত্ব না দেওয়া এবং বাস্তব জীবন থেকে সন্তানকে দূরে রাখাই তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
কঠিন শোনালেও সত্য হচ্ছে, অতিরিক্ত আদর ও নির্ভরশীলতার পরিবেশ তৈরি করে অনেক বাংলাদেশি বাবা-মা সন্তানদের জীবনদক্ষতার দিক থেকে একপ্রকার অক্ষম করে তুলছেন। পরে সেই সন্তান যখন একা বিদেশে আসে, তখন সাধারণ কাজগুলোও তার কাছে পাহাড়সম কঠিন মনে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার একজন হাইস্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী যেসব সাধারণ দায়িত্ব ও কাজ সহজে সামলাতে পারে, বাংলাদেশ থেকে আসা কোনো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীও সেগুলো করতে হিমশিম খান। কারণ স্থানীয় ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই কাজের পরিবেশ, সময়ানুবর্তিতা, স্বাধীন চলাফেরা এবং নিজের দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে পরিচিত।
অস্ট্রেলিয়ায় অনেক শিল্পের অ্যাওয়ার্ডে ২১ বছরের কম বয়সী কর্মীদের জন্য বয়সভিত্তিক “junior rate” থাকতে পারে। এই হার সংশ্লিষ্ট অ্যাওয়ার্ড, বয়স, দায়িত্ব ও কাজের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তবে সব কর্মক্ষেত্রে জুনিয়র রেট প্রযোজ্য নয়।
ফলে কোনো নিয়োগকর্তা যদি একজন প্রশিক্ষিত, উদ্যমী ও কর্মঠ জুনিয়র কর্মীকে সংশ্লিষ্ট আইন ও অ্যাওয়ার্ড মেনে নিয়োগ করতে পারেন, তাহলে বেশি বেতন দিয়ে একজন অনভিজ্ঞ প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীকে কেন নিয়োগ করবেন—সেই প্রশ্নও আসতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক চাকরিপ্রার্থীকে তাই নিজের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, নির্ভরযোগ্যতা, ইতিবাচক আচরণ এবং কাজ শেখার আগ্রহের মাধ্যমে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে হয়।
আরেকটি বিষয় আমি প্রায়ই লক্ষ্য করি। কিছু বাংলাদেশি কর্মী কাজে গিয়ে এমন মুখ করে থাকেন, যেন কাজ করা তাঁদের জন্য বিরাট শাস্তি। তাঁদের চেহারা ও আচরণে ক্লান্তি, বিরক্তি এবং অনীহা স্পষ্ট থাকে। মনে হয়, কাজ করতে করতে জীবনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে অনেক স্থানীয় তরুণকে কাজের জায়গায় হাসিমুখে দেখা যায়। কাজ সহজ না হলেও তারা সহকর্মীদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে যোগাযোগ করে, গ্রাহকদের স্বাগত জানায় এবং দায়িত্বকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা কাজকে সব সময় শাস্তি মনে করে না; অনেকেই কাজের মধ্যেও শেখা, অভিজ্ঞতা ও আনন্দ খুঁজে নেয়।
অবশ্যই সবাই একরকম নয়। বাংলাদেশিদের মধ্যেও অসংখ্য পরিশ্রমী, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ আছেন। একইভাবে সব স্থানীয় কর্মীও সব সময় হাসিমুখে কাজ করেন—এমন নয়। আমি শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে দেখা একটি প্রবণতার কথা বলছি।
এটাও মনে রাখতে হবে, কাজকে সম্মান করার অর্থ অন্যায্য আচরণ বা শোষণ মেনে নেওয়া নয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও অস্ট্রেলিয়ার অন্য কর্মীদের মতো কর্মক্ষেত্রের আইনি অধিকার ও সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য।
সঠিক বেতন না দেওয়া, বেআইনিভাবে অতিরিক্ত কাজ করানো, অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করানো, বৈষম্য করা বা ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার হলে তাকে চুপ করে না থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া উচিত।
স্বাভাবিক পরিশ্রমকে শাস্তি মনে করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিজের অধিকার রক্ষা করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাই যারা অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসতে চান, তাঁদের উদ্দেশে আমার পরিষ্কার কথা—যদি নিজের কাজ নিজে করার মানসিকতা না থাকে, যদি শারীরিক পরিশ্রমকে ছোট মনে করেন, যদি সময় মেনে চলতে না পারেন এবং যদি প্রতিটি কাজে অন্যের সাহায্য প্রত্যাশা করেন, তাহলে অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে নিজের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নিয়ে আবার ভাবুন।
কারণ এই দেশে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে পরিশ্রম করে জীবন চালায়। স্থানীয় অস্ট্রেলিয়ানরাও কাজ করেন—কেউ অফিসে, কেউ নির্মাণকাজে, কেউ দোকানে, কেউ রেস্টুরেন্টে, আবার কেউ পরিবহন বা পরিচ্ছন্নতার কাজে। এখানে শুধু বসে খাওয়া এবং প্রতিটি কাজ অন্যকে দিয়ে করানোর সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অংশ নয়।
সন্তানকে ভালোবাসুন, তার প্রয়োজন পূরণ করুন এবং তাকে ভালো শিক্ষা দিন—কিন্তু তাকে বাস্তব জীবন থেকে দূরে রাখবেন না। বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিন। নিজের কাজ নিজে করতে শেখান। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সময় ব্যবস্থাপনা, অর্থের হিসাব এবং সৎ পরিশ্রমের মূল্য শেখান।
ছেলে বা মেয়ে—দুজনকেই সমানভাবে এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিন। ছেলেদের রান্না বা ঘর পরিষ্কার করতে শেখানো এবং মেয়েদের বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ, অর্থের হিসাব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, কাজ কোনো শাস্তি নয়; কাজ জীবনেরই একটি অংশ। অলসতা কখনো দীর্ঘমেয়াদি সুখ বয়ে আনতে পারে না। আত্মনির্ভরশীলতা, শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমই একজন মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার শক্তি দেয়।
আমাদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাদের জীবনযুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। কারণ বিদেশে যাওয়ার জন্য শুধু ভিসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার এবং বিমান টিকিট যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন সঠিক মানসিক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার সাহস।
আজ থেকেই সন্তানকে ছোট ছোট দায়িত্ব দিন। কারণ নিজের কাজ নিজে করতে শেখানো মানে তাকে কষ্ট দেওয়া নয়—বরং ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার যোগ্য করে তোলা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি সম্পূর্ণভাবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে লেখা। কাউকে আঘাত করা, ছোট করা বা অসম্মান করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বাস্তব একটি বিষয় তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।
লেখাটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত কমেন্টে জানানোর অনুরোধ রইল। আমি যথাসাধ্য আপনাদের প্রশ্ন ও মন্তব্যের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। অনুগ্রহ করে এমন গঠনমূলক ও তথ্যবহুল মন্তব্য করুন, যা পড়ে অন্যরাও কিছু জানতে ও শিখতে পারেন।
Australia visa
সকল খবর সবার আগে জানতে হলে এই পেইজ এর সাথে যুক্ত হন।