19/10/2025
কে এই ড. আবু বাকর মুহাম্মদ জাকারিয়া?
তাঁর কতটুকু ইলমি যোগ্যতা আছে?
শাইখের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:-
Abubakar Muhammad Zakaria
শাইখ ডক্টর আবুবকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া (হাফেজাহু্ল্লাহ) পি.এইচ.ডি (আকীদাহ), মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সৌদি আরব। সহযোগী অধ্যাপক, আল-ফিকহ বিভাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।
আমরা তাকে চিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আল ফিকহ বিভাগের অধ্যাপক এতটুকুই। কিন্তু বিস্ময়কর ও বিরল প্রতিভার অধিকারী এ ব্যাক্তিত্বের আরো অসংখ্য পরিচয় আছে সেগুলো হলঃ---
১- তিনি কামিলে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে সারা বাংলাদেশে ১ম স্থান অর্জন করেছিলেন।
২- তাঁর রচিত, অনুদিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০০ এর মত।তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ বেশ কিছু গবেষণা কর্মে অংশগ্রহণ করেছেন । ইফাবা তাঁর একটি বইও প্রকাশ করেছে ।
৩- বাংলাদেশ থেকে যারা মদীনায় পড়তে গিয়েছে তিনি তাদের প্রথম সাঁড়ির একজন । বর্তমানে মদীনাতে প্রতি বছর বাংলাদেশি প্রায় ৫০/৬০ জন ছাত্রকে নেয় । কিন্তু তিনি যখন পড়তে গিয়েছিলেন তখন মাত্র ৪-৫ জন ছাত্রকে নেওয়া হতো । তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখে মদীনাতে পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
৪- মদীনায় তিনি যে সকল বড় বড় আলিমদের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ---
ক) গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ, কাবা শরীফের তারাবীহর সাবেক ইমাম,সৌদী আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শাইখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমিন
খ) মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস বিভাগের প্রাক্তন প্রধান শাইখ আমান আল-জামী
গ) সউদী আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শাইখ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আল জিবরীন
ঘ) প্রায় অর্ধশতাব্দী হজ্বে আরাফার খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আবদুল আযিয বিন আবদুল্লাহ আলেশাইখ
ঙ) সৌদী আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শাইখ ড. সালিহ বিন ফাউজান আল ফাউজান
চ)মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন চ্যান্সেলর ও মসজিদে নববীর মুহাদ্দিস শাইখ আবদুল মুহসিন আল আব্বাদ
ছ)শাইখ আবুবকর জাবির আল জাযায়েরী
জ)মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিবগণ যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মসজিদে নববীর প্রধান ইমাম ও খতিব শাইখ ড. আলী আব্দুর রহমান আল হুযাইফী
ঝ) শাইখ আলী নাসের ফাক্বীহী
ঞ) শাইখ সুলাইমান আল রুহাইলী,
ট) শাইখ ইবরাহীম আর রুহাইলী
ঠ) শাইখ আবদুর রায্যাক আল আব্বাদ
ড) শাইখ মুহাম্মদ আস সুদাইস
ঢ) শাইখ সাউদ আব্দুল আযীয আল খালাফ
ণ) শাইখ মুহাম্মদ আস শানকীত্বী
৫- শায়খকে যারা সনদ দিয়েছেন তাঁরা হলেনঃ--
ক) মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা ফ্যাকাল্টির ডিন শাইখ ড. সালিহ বিন সা'দ আস সুহাইমী
খ) শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান
গ) মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস বিভাগের প্রাক্তন প্রধান শাইখ ড.রাবী বিন হাদী উমাইর আল মাদখালী হাফিঃ এর ছেলে শাইখ মুহাম্মদ বিন রবী আল মাদখালী
ঘ) শাইখ আহমাদ আতিয়্যাহ আল- গামেদী
৬- শায়খের সাথী-বন্ধু যারা মাসজিদুল হারাম কিংবা মসজিদে নববী কিংবা মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন:
ক) শাইখ সালেহ আস সিন্ধি
খ) শাইখ আব্দুল কারীম আর রুহাইলী
গ) শাইখ আব্দুল্লাহ শামসান
৭- তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় ৫ম স্থান অধিকার করেন এবং মাস্টার্সে ১ম স্থান অধিকার করেন ।
৮- তিনি বর্তমানে সৌদী আরবস্থ আকীদা সমিতির সদস্য
৯- মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা অনুষদের সাবেক ডিন শাইখ ড.সালিহ বিন সা'দ আসসুহাইমির মত বিশ্ববিখ্যাত আকিদার ইমাম থেকে তিনি আকিদার সনদ প্রাপ্ত হন।আলহামদুলিল্লাহ।
১০- বাংলাদেশ সহ সারা পৃথিবীর ১৯০টি দেশের প্রায় ৩৫ হাজার ছাত্র মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । কিন্তু এর ভিতরে খুব সামান্য সংখ্যক ছাত্রই মাস্টার্স ও পিএইচডি করার জন্য চান্স পেয়েছে।এ পর্যন্ত বাংলাদেশের শত শত মাদানী ছাত্রের মধ্যে মাত্র ৩ জন ছাত্র পিএইচডি করে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করতে পেরেছেন।
তাঁরা হচ্ছেন
- শাইখ ড. আবুবকর মুহাম্মদ যাকারিয়া,
- শাইখ ড. মানযূরে ইলাহী ও
- শাইখ ড. মোহাম্মাদ সাইফুল্লাহ। আর এত কম সংখ্যক ছাত্র পিএইচডিতে চান্স পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পিএইচডিতে চান্স পাওয়ার জন্য এক বসায় ১০ পারা কুরআনুল কারীম মুখস্ত শোনাতে হতো।
উল্লেখ্য বর্তমানে অনেকেই পিএইচডি করছেন যেমন শায়খ রেজাউল করিম,শেখ সাদী মাদানী,শায়খ আবদুল্লাহ আল কাফী,মিজানুর রহমান ভাই প্রমুখ।আল্লাহ তাদের হিফাজত করুন।
১১- শায়খের আরবী বই মোট ৬ টি। এর মধ্যে একটি বই হচ্ছে তাঁর মাস্টার্সে লেখা, যেটি ১৭০০ পৃঃ ৩ খন্ডে । আরেকটি বই হচ্ছে তাঁর পিএইচডি থিসিস, এটিও ৩ খন্ডে । এই থিসিসটি হিন্দুধর্মের উপরে । মদীনায় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপরে অনেক কাজ হয়েছে । কিন্তু হিন্দু ধর্মের উপরে তখনও কোন কাজ হয়নি তাই তাঁরা হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে ভুল পড়াতো।তিনি তাঁর উস্তাদদের বললেন এগুলো তো ভুল,হিন্দুদের আকিদা তো এমন নয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উস্তাদগণ শায়খকে হিন্দু ধর্মের উপরে লেখার অনুরোধ করে, তখন তিনি এই বইটি লিখেন এবং আরব বিশ্বে এটি হিন্দু ধর্মের রেফারেন্স বুকের খালি স্থান পূরণ করে নেয়। আলহামদুলিল্লাহ উল্লেখিত দুটি বইই গোটা আরব বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত । কিছুদিন আগে একটি ভিডিওতে সৌদি এক শায়খকে পিএইচডি থিসিসের বইটির অনেক প্রশংসা করতে দেখা যায় । এ ছাড়াও তাঁর আরো ৪ টি বই রয়েছে।
১২- তাঁর রচিত আরবি একটি বই বিশ্বব্যাপী পরিচিত মাকতাবাতুশ শামিলায় রয়েছে । মাকতাবাতুশ শামিলাতে ইসলামের স্বর্ণযুগের আলিমদের বই থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি বিখ্যাত হাজারো আরবী বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে । এ পর্যন্ত বাংলাদেশের আরো ২ জন আলিমের বই স্থান পেয়েছে । তাঁরা দুজন হচ্ছে এক সময়কার বাইতুল মুকাররমের খতীব ও ঢাকা আলিয়ার উস্তায মুফতী আমীমুল ইহসান রহ. এবং আরেকজন মুসলিম বিশ্বের নোবেল প্রাইজ খ্যাত বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ড প্রাপ্ত শায়খ মেহের আলী রহ.। এ দুজনের সাথে তাঁর বইও স্থান পেয়েছে ।
১৩- শায়খের প্রায় ১০০০ সংখ্যক লিখিত,অনুদিত ও সম্পাদিত বই রয়েছে । এই বইগুলোর অধিকাংশই রয়েছে ইসলাম হাউস ডট কম islamhouse. com) এর বাংলা বিভাগে । ইসলাম হাউস ডট কমের প্রধানদের দিক-নির্দেশনাতেই এখানের অধিকাংশ বই রচিত হয় । ইসলাম হাউস ডট কম হচ্ছে এমন একটি ওয়েবসাইট যেটি পৃথিবীর
১১৫ টি ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে।সমগ্র পৃথিবীব্যাপী তাওহীদ প্রচারে যার অবদান অতুলনীয়। বই ছাড়াও এখানে অসংখ্য অডিও, ভিডিও, কুরআন তিলাওয়াত সহ আরো নানান রকমের বিষয় রয়েছে । এখানের অডিও ও ভিডিওগুলোও সম্পাদনা করা হয় এবং সেগুলোর অধিকাংশই শায়খের করা । এটি ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ থেকে পরিচালিত হয় । শায়খ হচ্ছেন বাংলা বিভাগে যারা কাজ করে তাদের একজন।
১৪- মদীনার খাদেমুল হারামাইন শারীফাইন বাদশাহ ফাহাদ কমপ্লেক্স থেকে বাংলায় ফ্রী বিতরণ যোগ্য তাফসীর লেখার জন্য মদীনার শাইখগণ তাঁকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং তাফসীরটিতে বর্তমান সউদী আরবের তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী শায়খ সালিহ বিন আবদুল আযিয আলেশাইখ হাফিঃ ভূমিকা লিখে দেন। এ থেকেও বুঝা যায় তিনি কতটা নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত আলিম হারামাইন শারীফাইন ও সউদী আরবের উলামাদের নিকট।
বাংলাভাষী কয়েক হাজার মদীনা,মক্কা,রিয়াদ ও কিং আবদুল আযিয ও সউদী আরবের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে ওনাকে বাছাই করে নিয়েছেন মদীনার শায়খগণ।
১৫- তিনি পরিবার থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার
দূরে শুধু ইলমের খিদমতের জন্য অবস্থান করেন। বার্ধক্যের কাছাকাছি সময়ে পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকা যে কতটা কষ্টের তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে।তিনি প্রতি সপ্তাহে এক/দুদিন বিরতিতে আপ-ডাউন সহ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সফর করেন।
১৬- শায়খের ব্যাক্তিগত আচরণের কথা এখানে লিখে শেষ করা যাবে না বরং উনার সাথে মিশেছেন তারাই বলতে পারবেন।শায়খ অত্যন্ত অমায়িক এবং সহজেই মানুষকে আপন করে নেন। শায়খের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগে শায়খের কাছে সেই কথাগুলো এখনো মনে আছে।
শায়খকে যখন কিছু দিন আগে আমার দোকানে নিয়ে আসছিলেন সেদিনটি ছিল আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর অন্যতম।সেদিন যে আমার কি আনন্দ হচ্ছিল তা আমি ভাষায় বুঝাতে পারবনা।
অনেকের কাছেই এসব শুনে আশ্চর্য লাগতে পারে।কিন্তু বাস্তবতা হল আমাদের কাছে জাতীয়ভাবে কেউ চিনেনা ও জীবনে পাসপোর্টও করা লাগেনা, সে হয়ে যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসির,আর বিজ্ঞ আলেমগণ সমাজে অপরিচিত ও অবহেলিত থাকেন।
আবার মাঝে মাঝে মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা অনুষদের ডিন শাইখ ড.সালিহ বিন সা'দ আসসুহাইমির মত আলেমদের থেকে আকিদার সনদ পাওয়া বিজ্ঞ আলেমদের আকিদা ও মানহাজ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেন ও তাদের আকিদা-মানহাজ স্পষ্ট করার দাবি জানান।মনে হয় যেন হারামাইনের শাইখগণ আকিদা-মানহাজ না জেনেই কাউকে সনদ দিয়ে দেন।
আল্লাহ আমাদের সবার অজ্ঞতাকে দূর করুন ও আলেমদের সম্মানহানি থেকে আমাদের জিহ্বাকে হিফাজত করুন।আল্লাহ আমাদের শাইখের হায়াত বৃদ্ধি করুন,সুস্থ রাখুন,শাইখের ইলমকে স্থায়ী করুন ও আমাদেরকে সে ইলম থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন,শাইখকে ও তাঁর পরিবারকে সকল বিপদাপদ থেকে হিফাজত রাখুন ও মৃত্যু পর্যন্ত সিরাতুল মুসতাকিমের উপর অটল রাখুন,শাইখের উস্তাদদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন
©️