23/09/2026
এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের অনুরোধে একটা বিশেষ ধরনের পারিবারিক মিটিংয়ে গিয়েছিলাম। ছোট ভাইয়ের ভাতিজী রাগ করে শ্বশুর বাড়ি হতে বাবার বাড়ি চলে এসেছে এবং আর যেতে চাইছে না।
আজ স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন মুরুব্বী আসবেন এবং বউকে আবার উনাদের হাতে তুলে দেয়া হবে। আমি যখন পৌঁছেছি তখনো ছেলেপক্ষ আসেনি। ওদের আসতে শুনলাম আরো ৪০-৪৫ মিনিট মত লাগবে। আমাকে মেয়েপক্ষের মুরুব্বিদের একজন হিসেবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। ছেলেপক্ষের সাথে ছেলের ভুল ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করে ঝগড়া-ঝাটি মিটিয়ে দিয়ে মেয়েকে আবার ওদের হাতে তুলে দিতে হবে।
মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি আবার ফিরে যেতে চাইছে না, তাই মেয়ের বাবা অনেক রেগে আছেন। উনি আগের দিন রাতে মেয়েকে মারধরও করেছেন যাতে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায়। উনার সাফ কথা হল, শ্বশুরবাড়িই হল মেয়েদের আসল বাড়ি। বাবার বাড়ি বেড়াতে আসতে পারে কিন্তু স্থায়ীভাবে আসলে সেটা আসবে ওর মৃত্যুর পর।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, মেয়ের বয়স মাত্র ১৮ পেরিয়েছে। বছর দুই আগে ওর বয়স যখন ১৬ পেরিয়েছে, তখন ছোট ভাইটা ওর ভাতিজীর বিয়ের ব্যাপারে মতামত চেয়েছিল। ছেলের বয়স মাত্র ২১ আর নিজে তেমন কিছু করত না। বড় ৩ ভাইয়ের পারিবারিক ব্যবসায় টুকটাক সাহায্য করত আর ভাইরা ওকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিত, এতটুকুই। ওদের ভাল পারিবারিক সম্পত্তি আছে যার একটা অংশ ছেলেটাও পাবে, পজিটিভ দিক বলতে এতটুকুই। কিন্তু আমার মানা করায় তখন লাভ হয়নি, ওরা শুনেনি। মেয়ে সচ্ছল আর নিরাপদ থাকবে মনে করে বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল।
ড্রইংরুমে মেয়েপক্ষের ৩-৪ জন মুরুব্বী বসা। ওদের সাথে আলাপ আলোচনা শুরু হল। জিজ্ঞেস করলাম,
- মেয়ে কি কি ইস্যুতে অভিযোগ করেছে?
- ছেলে অন্য একটা মেয়ের সাথে মেলামেশা করে, জুয়া খেলে আর মাঝেমধ্যে চোখ লাল লাল করে নাকি বাসায় আসে। ছেলের কাছে বেশী কিছু জানতে চাইলে খুব রেগে যায়।
বললাম, মেয়েকে একটু ডাকেন। মেয়েটা সামনে এলো। সবার সামনেই একটা সোফায় বসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
- অন্য মেয়েটার সাথে সম্পর্ক কবে হতে?
- বিয়ের আগে হতে। এই দুই বছরেও ছুটে নাই।
- চোখ লাল করে ফিরে মানে কি নেশা করে? মদ, গাঁজা, ইয়াবা, চরস, কোকেন....?
- জি নেশা করে, কিন্তু কি খেয়ে আসছে জিজ্ঞেস করলে মারধর করে।
- কি দিয়ে মারে?
- হাতে মারে, কখনো কখনো লাঠি বা অন্য কিছু দিয়েও মারে। হাতের কাছে যা পায়....
- জুয়া খেলে বলতেছ, টাকা পায় কই?
- ভাইয়েরা যা দেয়, সব উড়ায়। আমার হাতে কিছু দেয় না। আর টাকা না পেলে চুরি করে।
- কি চুরি করে?
- আমার বাবা-মায়ের দেয়া সব স্বর্ণ চুরি করে জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হইছে। দামী যা কিছু পায় বেচে দেয়...
- ওই মেয়েটার সাথে কি দেখাও করে?
- জি, মেয়ের বাড়িতে ধরাও খাইছে দুইবার। মোবাইলে দুজনেই খারাপ খারাপ ছবি পাডায়। আমি দেখছি, ছবি নিয়ে জিজ্ঞেস করছি বলেও মারছে। অনেক চেষ্টা করেও ছুটাইতে পারি নাই।
- তুমি এগুলো তোমার বাবা-মায়ের কাছে জানাইছ?
- জি কিছু কিছু জানাইছি, লাভ হয় নাই। উনারা কিছুই শুনতে চায় না। খালি বলে, সব ঠিক হই যাবে। এর আগেও ৩ বার বাবার বাড়ি আসছি রাগ কইরা। আমারে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া খালি ফেরত পাডায়। কিন্তু কোন কিছু বদলায় নাই।
- তুমি আর যেতে চাও না?
- জি না।
- তোমার এইসব ঘটনার প্রমাণ আছে?
- জি কিছু কিছু আছে, সাক্ষীও আছে।
মেয়ের বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
- ছেলে মাদকাসক্ত, জুয়া খেলে, পরকিয়া করে, চুরি করে আর বউকে মারধরও করে। নিজের কোন উপার্জনও নাই। অল্পস্বল্প খাটে, ভাইরা কিছু টাকা দেয়, সেগুলাও উড়ায়। আপনারা কেন মেয়েকে ফেরত পাঠাতে চান? এর আগেও ৩ বার সুযোগ দেয়া হয়েছে, ছেলের কোন পরিবর্তন তো হয় নাই। ছেলের কি অভাব ছিল, মেয়ের জন্য এত গুণবান ছেলে কই পেলেন?
আমি লিখে দিব ভবিষ্যতেও এই ছেলের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসবে না। ছেলেটা বিয়ের আগেও প্রায় এরকমই ছিল। ওরা ভেবেছিল, বিয়ে করালেই এই ছেলের স্বভাব ঠিক হয়ে যাবে। এজন্য ওরা একটা মেয়ের জীবনও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
মেয়ের বাবা-মা আমতা আমতা করতে লাগলেন দেখে বললাম,
- আপনারা কি চান, আপনাদের মেয়ের লাশ কদিন পর ঘরে আসুক? একটা মাদকাসক্ত জুয়াড়ি যার বউ পিটানোর অভ্যাস আছে তার হাতে কি আপনাদের মেয়ে নিরাপদ? মেয়ের অভিযোগগুলো আপনারা আগে শুনেন নাই কেন? অনেক আগেই তো ফিরিয়ে আনার দরকার ছিল৷। আমার মেয়ে হলে শুরুতেই নিয়ে আসতাম।
একটু চুপ থেকে আবার যোগ করলাম,
- আপনাদের ভাগ্য ভাল, ওদের এখনো সন্তান হয়নি। মেয়ে আপাতত পড়ালেখা করুক। এসএসসির আগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, একটা অপরাধ করেছেন। তখন কারো কথা শুনেননি। এখন নিজ পায়ে দাঁড়াতে দেন, ওর পড়ালেখার জন্য আমরাও সাহায্য সহযোগিতা লাগলে করব ইনশাআল্লাহ। মেয়েকে বোঝা নয়, সম্পদে পরিণত করুন। পরিবারের সাপোর্ট পেলে মেয়ে আর ছেলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইদানিং মেয়েদের বরং বাবা-মায়ের জন্য ছেলেদের চাইতেও বেশী সাপোর্ট দিতে দেখি।
বাকি মুরুব্বিরা এতক্ষণ চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিলেন। সব শোনার পর সবাই একমত হয়ে বললেন, এই বিয়ের সম্পর্ক আর কন্টিনিউ করার কোন প্রয়োজন নাই। ওদের আসতে নিষেধ করে দাও। মেয়ে আপাতত পড়বে আর পরে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে সময়-সুযোগ বুঝে আবার বিয়ে করতে পারবে।
ফোন করে ওদের আর না আসতে জানিয়ে দেয়া হল। বলে দেয়া হল, মেয়ে আর কখনোই যাবে না।
মেয়ে তুলে দেয়ার জন্য বিশাল আয়োজন ছিল, প্রায় ১৫-১৬ পদের নাস্তা। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, মেয়েপক্ষের লোকজন ছাড়া আপাতত আমি একাই মেহমান।
তাই পুরো ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে আমাকে বলা হল,
- ভাইজান, আসেন...না খেলে কিন্তু নাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে!! তারপর আমাকে টেবিলে বসিয়ে সবাই মিলে নাস্তা খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কদিন পর আপডেট পেলাম, মেয়েপক্ষ ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছে। আফসোস হল না। একটা সংসার ভাঙ্গল কিন্তু একটা কিশোরীর জীবন তো রক্ষা পেল।
সেদিন মিটিং শেষে ফিরে আসার সময় কিশোরীর অশ্রুসজল চোখে যে কৃতজ্ঞতা আর স্বস্তির ছাপ দেখেছিলাম, সেটা বহুদিন মনে থাকবে।
# ডিভোর্স
সত্য ঘটনা
# আপডেট - অঙ্গীকারের কন্ট্রিবিউশানে মেয়েকে আবার বিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা সন্তান হয়েছে সম্প্রতি। সুখে আছে আলহামদুলিল্লাহ।
Atique UA Khan