17/09/2026
ফেসবুকের এই ফাঁদে পড়ছেন না তো?
সময় এবং অর্থ নষ্টের এক ভয়াবহ ফাঁদ এখন ফেসবুক।
যারা সব ছেড়েছুড়ে ফেসবুকে আয়ের কথা ভাবে তাদের ক্ষতি হচ্ছে।
গত এক বছরে আমার যত ভিউ হয়েছে, প্রত্যেক ভিউয়ার যদি মাত্র একটা করেও টাকা দিতো, তাও বড়লোক হয়ে যাইতাম।
ভাগ্যিস পেইজটা শুধু শখের বসে রেখেছি। নাহলে কি পরিমাণ হতাশ হওয়া লাগতো আল্লাহ জানে।
ফেসবুকের কারসাজি বোঝা একদমই সহজ না! কিন্তু বুঝতে পারলে হাস্যকর লাগবে। বোকা বোকা মনে হবে নিজেকে। জানিনা এসব লেখার জন্য আবার রেস্ট্রিকশন দিবে কিনা! এমনকি প্রোফাইলও গায়েব করে দিতে পারে। পূর্ণ ঝুঁকি নিয়েই লিখছি। এমনিও ফেসবুক আমার রিচ ভিউ মনমতো বাড়ায় কমায়। বিভিন্ন সাজেশন দেয়, এভাবে ভিডিও করো সেভাবে করো। তার কিছুই আমি মানি না।
গত এক বছরের পর্যবেক্ষণে একটা জিনিস বেশ বুঝেছি। এখন যে এত এত কনটেন্ট ক্রিয়েটর দেশজুড়ে এর কারণটা কি?
ফেসবুক প্রথমেই আপনাকে টাকা দিবে না, কিন্তু স্বপ্ন দেখাবে।
দিবে দিবে করবে। এই সেই ইজি চ্যালেঞ্জ দিবে। আপনাকে ইনভলভ করবে। আপনাকে উস্কানি দেবে।
আপনাকে বাধ্য করবে Professional Dashboard active করতে। আপনাকে কনটেন্ট মনিটাইজ করার প্রলোভন দেখাবে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করবে যে আপনি ভাববেন আরেহ কি অল্পেই না সবকিছু পাওয়া যায়!
কোনো একটা পোস্ট হঠাৎ একটু বেশি ভাইরাল করে দিবে।
কোনো ভিডিওতে অস্বাভাবিক রিচ আসবে। হয়তো সেটাই আপনার দ্যা মোস্ট ইউজলেস ভিডিও! আপনি এত এফোর্ট ও দেন নাই। সেটাই সামান্য কিছু ডলার আসবে। কখনো কখনো বোনাস দিবে। আপনাকে বোঝাবে যে হ্যা হ্যা টাকা আসে। ওয়েট।
আপনি ভাববেন, woww! এখানে তো টাকা আসবে। হ্যাঁ অনেকেরই এসেছে কিন্তু সেই অনেকেই সব সময় আপনি হবেন না। ফেসবুকে সফল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ৯০% এর আলাদা বিজনেস থাকে। এবং এরাই বুদ্ধিমান এবং সফল। আমার মতে খুব বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে ফেসবুক ভিউকে নিজের ব্যাবসার প্রচারের কাজে ইউজ তাছাড়া শুধু কনটেন্টে তেমন আয় হয়না।
মনে আছে কয়েক বছর আগে কোভিডের সময় "উই" নামক একটা গ্রুপ ছিল। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সবাই তখন উদ্যোক্তা! অপ্রয়োজনে জিনিস কিনে, সবার পোস্টে গিয়ে খামাখা ১০০ কমেন্ট করে আসে, বয়স্ক সব মহিলারা রাত জেগে ইংলিশ ফর টুডে পড়ে, সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকে। অনেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অনেকের ঘরেই টাকা এসেছে। কিন্তু অনেকেই যে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে সে খবর কয়জন রাখে? অনেকেই ভুলভাবে সময়, টাকা ব্যায় করেছেন।
ফেসবুক নিজেও সেরকম একটা scam!
আজ একটা পোস্ট করলেন, কাল আরেকটা। সেম টাইপের কনটেন্ট। আজকে হলো ১০ হাজার ভিউ কালকে ১ লাখ আবার পরশু ১ হাজার ও না। এক রিলসে ৫ হাজার ভিউতে ১ সেন্ট দেয়, কোনো রিলসে ১ লাখ ভিউতে ২ সেন্ট দিবে। সত্যি তাই।
তারপর আপনি নিজের অজান্তেই ফেসবুকের জন্য জীবনটাকে কনটেন্ট বানাতে শুরু করবেন।
পাহাড়ে গেলেন? ভিডিও। সমুদ্রে গেলেন? রিল। বৃষ্টিতে ভিজলেন? রিলস। ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ, কালকের পোস্টে কত ভিউ হলো? শেয়ার করে কে কি লিখলো।
একসময় ভিউটা আর ভিউ থাকে না।
এটা হয়ে যায় ডোপামিনের একমাত্র উৎস।
আরেকটু আসুক। আরেকটু রিচ হোক। আরেকটু ভাইরাল হই। এই যে আরেকটু শব্দটা, এটাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি খাটায়।
তবে ফেসবুকের ভিউ আর ফেসবুক থেকে আয়, দুটো এক জিনিস নয়। ভিউ হচ্ছে আপনার সাইনবোর্ড। পরিচিত হওয়ার মাধ্যম মাত্র। পরিচিত হয়ে আপনি কী করবেন সেটা আসল জিনিস। এই পরিচিতি কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ বিজনেস সেল বাড়ায়। আর কেউ শুধু মনে মনে খুশি থাকে।
ফেসবুক আপনাকে পরিচিতি দিতে পারে। কিন্তু পরিচিতিকে অর্থে রূপান্তর করার কাজটা সবসময় ফেসবুক করে না, ও আপনাকেই করতে হবে।
আপনার তৈরি করা audience-ই একসময় আপনার আসল সম্পদ হয়ে উঠতে পারে যখন আপনার কোনো দক্ষতা থাকে, পণ্য থাকে, ব্যবসা থাকে, সার্ভিস থাকে, বই থাকে, কোর্স থাকে, ব্র্যান্ড থাকে কিংবা কোনো বৈধ promotional opportunity থাকে।
ভিউ মানেই টাকা নয়। ভিউ হলো সম্ভাব্য ক্রেতা, পাঠক, দর্শক বা অনুসারীর দরজায় পৌঁছানোর সুযোগ। এক মিলিয়ন মানুষ আপনার রান্নার ভিডিও দেখলেই ফেসবুক আপনাকে এক মিলিয়ন টাকা দিয়ে দিবে না। অনেক অনেক ভিউ দেখে মনের সুখ আরকি।
ফেসবুক আপনাকে একটা মঞ্চ দিতে পারে। প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে। মাইক্রোফোন দিতে পারে। দর্শক জোগাড় করে দিতে পারে। কিন্তু আপনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে কী বলবেন, মানুষ কেন আপনার কথা শুনবে এবং সেই মনোযোগকে কীভাবে বাস্তব মূল্যতে রূপ দেবেন, সেটাই আসল দক্ষতা।
ফেসবুক মানুষের মনোযোগ আপনার দিকে এনে দেয়। আর আপনি যদি সেই মনোযোগকে মূল্য দিতে পারেন, ধরে রাখতে পারেন তখনই সেটা সম্পদ। না হলে?
আপনি সারাদিন পাহাড়ে যাবেন, সমুদ্রে যাবেন, ১৭টা রিল বানাবেন, ৪ ঘণ্টা এডিট করবেন, রাতে ঘুমাবেন না, সকালে উঠে দেখবেন ভিউ ১,৭৮,৪৩২ আর ইনকাম: $0.03!! মানে ভাবুন একবার, মাত্র ৪ টাকা। আরেকটা তথ্য দেই। সেম ভিউয়ে বাংলাদেশী পেইজে যেখানে ১০ সেন্ট দেয় সেখানে এমেরিকান বা ইউরোপীয় পেইজে প্রায় ১৫-২০ ডলার দেয় ফেসবুক। আমাদের মত নিম্নআয়ের দেশে ফেসবুক শুধু নিজেদের প্রফিট ই বাড়ায়। বিনিময়ে আপনাকে যা দেয় তা অতিসামান্য। আমি এই পোস্টের ভিউ আর আর্নিং স্ক্রিনশট দিব। আপনারাই দেখবেন ফেসবুকে আর্নিং ব্যাপারটা কেমন আসলে।
অনেকে আবার হাজার হাজার টাকা খরচ করে মনিটাইজেশন পাওয়ার জন্য online কোচিংয়ে ভর্তি হয়। বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে কিভাবে ব্যাংক সেটাপ করবেন! অথচ তার ইনকাম হয়েছে ১০ সেন্ট! এক দুইবার বোনাস ফিলাপ করে হয়তো ৪০ ডলার হয়েছে। কিন্তু সারাবছর আর তেমন আয় নেই। কিন্তু সেও কোর্স করায়।
দলে দলে তারা ইনকাম ট্যাক্স এর Tin certificate নেয়। তারা জানেই না এর পরবর্তী ফলাফল টা কি! TIN নিলে যে বছর বছর রিটার্ন ফাইল জমা দিতে হবে এই সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা নাই।
এর উপর নতুন ব্যাবসা শুরু হয়েছে ফেসবুক কন্টেন্ট বানানোর কোর্স। কোর্সে শিখায় ছবি এডিটিং, ভিডিও এডিটিং, পোস্ট করার টুকটাক নিয়ম। এসব আপনি ইউটিউব ঘাটাঘাটি করলেই জানতে পারতেন। কিন্তু আপনার মনে হলো মাত্র ১ হাজার টাকাই তো। করি কোর্স। আপনাকে আপনার মেন্টর বলবে তার ফেসবুক থেকে আয় ২ লাখ টাকা। ভিডিও আর ছবির ভিউ থেকেই নাকি এত আয়। কিন্তু আপনি হিসাব করে দেখেন। সে প্রতি ব্যাচে ১০০ জন, দিনে ৫ টা ব্যাচের ক্লাস ৫ ঘন্টা, কোর্সের মেয়াদ ৫ দিন। জনপ্রতি ১০০০ টাকা ফি হলে তার মাসিক আয় কত? তার ইনকাম তার ভিউ থেকে হয় নাকি আপনার কোর্স ফি থেকে?
ফেসবুকে যদি সত্যিই কিছু তৈরি করতে চান, তাহলে ভিউয়ের পাশাপাশি যেকোনো একটা ব্যবসা দাঁড় করান। নিজের কোন একটা দক্ষতাকে বিক্রি করুন। আয় হলে মেইনলি সেখান থেকে হবে।
সেদিন ফুড আপ্পির একটা ভিডিও টাইমলাইনে এলো। সে দেখাচ্ছে একেকটা ভিডিওতে ১০০, ১৫০, ২০০ ডলার করে আসছে তার। সে কিন্তু একদিনে এই জায়গায় আসেনি। দীর্ঘদিন অলস সময় ইনভেস্ট করেছে, হাজার হাজার জায়গায় গিয়ে খাবার কিনে খেয়েছে, পরিশ্রম করেছে, ধৈর্য ধরেছে, প্রচুর গালি খেয়েছে, তারপর আজকের এই অবস্থানে এসেছে। আপনার সে অবস্থা আছে কিনা সেটা ভাবুন। এত মনোযোগ, এত সময়, ইনভেস্ট করার সুযোগ আপনার আছে কিনা! এতবছর লেগে থাকার মত সামর্থ্য আছে কিনা।
যেকোনো চাকরি কিংবা ব্যবসাতেও প্রথমেই আপনি চূড়ায় উঠে যাবেন না। কিন্তু কোথাও না কোথাও পৌঁছাবেন, সেটার একটা নিশ্চয়তা আছে। কিন্তু ফেসবুকে সে ধরনের কোন নিশ্চয়তা নাই। আপনি হিরো হয়ে যেতে পারেন, আবার জিরোতেই থেকে যেতে পারেন।
আপনার যদি আমার মতো জব থাকে বা নিজস্ব ব্যাবসা থাকে তাহলে আপনি শখে ফেসবুক ইউজ করতে পারেন। এখান থেকে আয় হলেও লাভ না হলেও ক্ষতি নেই। ফেসবুক পেইজের পেছনে আমি এখন এক টাকাও ইনভেস্ট করিনা। ছুটির দিনে হায়েস্ট আধঘন্টা সময় ভিডিও বানাতে ব্যায় করি। অবসর টাইমে ভিডিও করতে আর এডিট করতে ভালো লাগে বলে করি। এই বিশাল পোস্ট আমি এক সপ্তাহ ধরে একদুই লাইন করে লিখসি। একটানা এত সময় ও দিতে পারিনা।
আপনার অন্য কোথাও না কোথাও সম্ভাবনা যদি থাকে আপনি ফেসবুকে এত সময় দিবেন না। এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আপনি একটানা হাঁটবেন না। যারা এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটে তাদের ১০% হয়তো সফল হয়। বাকি ৯০% হতাশ হয়ে ধারাবাহিকতা ছেড়ে দেয়।
কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাস্তব জীবনের যে সম্পর্কগুলো নষ্ট করে, যে সময়টা ফেলে আসে সেটা আর ফেরত পায় কি! বরং ভার্চুয়াল ফেক আনন্দের বিনিময়ে নিজের বাস্তব জীবনটা বিক্রি করে পরে পস্তাতে হয়।
আমার উদ্দেশ্য কাউকে মনে কষ্ট দেয়া না। একটু রিয়েলিটি চেক দেয়া। যতটা আশা করবেন অতটা পূরণ হবে না। নিজের ক্ষতি না করে যেটুক করা যায় করেন, কিন্তু জানপ্রাণ দিয়ে দিয়েন না। ঠিক আছে? ভালো থাকবেন ❤️