13/08/2026
২৫ আগস্ট। একটি তারিখ, যা রোহিঙ্গাদের কাছে ঘর হারানোর দিন, স্বজন হারানোর দিন, আর একটি জাতির বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত নিপীড়নের ভয়াবহ স্মৃতি।
২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হয়। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচার সহিংসতার মুখে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর আগে কয়েক দশক ধরে চলা বৈষম্য, নাগরিকত্বহীনতা ও সামরিক নিপীড়নের ধারাবাহিকতাই ২০১৭ সালে এসে ভয়াবহ গণহত্যার রূপ নেয়।
আজও কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো সেই অপরাধের জীবন্ত সাক্ষ্য।
রোহিঙ্গা সংকটকে বহু দশক ধরে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও বঞ্চনার ফল।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাঠামো রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত করেছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের বিশাল অংশকে কার্যত রাষ্ট্রহীন করে ফেলে। চলাফেরার স্বাধীনতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের ওপর আরোপ করা হয় নানা বিধিনিষেধ।
অর্থাৎ ২০১৭ সালের গণহত্যা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। তার বহু আগে থেকেই একটি জনগোষ্ঠীকে আইন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল।
গণহত্যা কেবল মানুষ হত্যার নাম নয়; একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তাদের জীবন, পরিচয়, অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়াও এর অংশ। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়ার বহু উপাদানই দৃশ্যমান।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর রাখাইনের পর রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের তথ্য নথিবদ্ধ করে।
হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। অসংখ্য নারী ও শিশু ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়। শত শত গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়।
আর যারা বেঁচে যায়, তাদের সামনে ছিল একটাই পথ—পালানো।
নাফ নদী পেরিয়ে, পাহাড়-জঙ্গল অতিক্রম করে, কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকায় করে লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পৌঁছায়। তাদের অনেকের কাছে তখন আর কোনো ঘর ছিল না, কোনো সম্পদ ছিল না, এমনকি পরিবারের সব সদস্যও ছিল না।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য দায়ী নয়। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি বাংলাদেশ। বিশেষ করে কক্সবাজারের ওপর এই সংকটের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপ বিপুল।
একটি সীমিত সম্পদের দেশে কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় নিশ্চিত করা কোনো ছোট কাজ নয়। খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর ওপর তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী চাপ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত বহন করতে হচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়।
একটি রাষ্ট্র যখন নিজের ভূখণ্ডে বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয় দেয়, তখন সেটি একটি সাময়িক মানবিক সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।
১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে বার্মা কার্যত তার সীমান্তকে বাড়িয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তার সীমানা আজ আর নাফ নদীতে নেই, তা ২০ কিলোমিটার ভেতরে সরে এসে ঢুকে গেছে টেকনাফ-উখিয়ায়। আমাদের ভূখণ্ডের ভেতরে কার্যত বার্মার সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়ে গেছে একটা ‘বাফার যোন’।
বাংলাদেশ তাই একই সঙ্গে মানবিক দায়িত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ—দুই দিক থেকেই একটি কঠিন অবস্থানে রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা।
গণহত্যার পর আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা হয়েছে। তদন্ত হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, অ্যামেরিকা, চীন কিংবা ভারতের কাছে সাহায্য আশা করাটা বোকামি। চীন এবং অ্যামেরিকা, দুজনেরই ভারত মহাসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ দরকার। ভারতের দরকার সেভেন সিস্টার্স-এর সাথে যোগাযোগের বিকল্প পথ।
পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের এই সমীকরণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কান্না কিংবা আমাদের নিরাপত্তার কানাকড়ি মূল্য নেই। যতক্ষণ তাদের স্বার্থে আঘাত না লাগছে, ততক্ষণ তারা কোনো সমাধান হতে দেবে না। আর তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা জাতিসংঘের কাছে এটা একটি এনজিও প্রজেক্ট, যা জিইয়ে রেখে তারা এ অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে চায়।
গণহত্যার সবচেয়ে বড় সাফল্য কখনো কখনো শুধু মানুষ হত্যা করা নয়।
মানুষকে ভুলে যাওয়া।
২০১৭ সালের ভয়াবহতা আজ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে সরে গেছে। বিশ্বে নতুন নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। নতুন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অগ্রাধিকার বদলেছে।
কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া একটি শিশু জানে না তার নিজের দেশ কোথায়। একজন মা জানেন না, তার সন্তান কখনো নিজের পূর্বপুরুষের বাড়ি দেখতে পারবে কি না। এই অনিশ্চয়তাই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা।
একটি প্রজন্ম শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠছে। আর পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।
গণহত্যা কখনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে না। রোহিঙ্গাদের ওপর যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিচার প্রয়োজন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের জবাবদিহি প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োজন। এবং বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তববাদী ও দৃঢ় কূটনৈতিক কৌশল—যাতে একদিকে রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার রক্ষা হয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাও সুরক্ষিত থাকে।