06/09/2026
পশ্চিমের দিকে আমরা কেন ছুটছি?
আমরা প্রায়ই দেখি, ইউরোপ-আমেরিকার দিকে মানুষের স্রোত ছুটছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট থেকে মানুষ এই অঞ্চলগুলোকে কেন এতো প্রাধান্য দেয়? উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে কিছু কারণ সামনে এসেছে—
১. নিরাপত্তা ও শান্তি: তুলনামূলকভাবে সেখানকার পরিবেশ নিরাপদ, যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। ট্রাফিক জ্যাম, হর্ন বা কোলাহলের যন্ত্রণা সেখানে নেই বললেই চলে। চালকরা নিয়ম মেনে চলে এবং পথচারীরাও নিরাপদবোধ করে।
২. কঠোর আইন ও সিভিক সেন্স: ট্রাফিক রুলস হোক বা পরিচ্ছন্নতা—সব ক্ষেত্রে আইন অত্যন্ত কঠোর। নির্দিষ্ট গতিসীমা এবং পথচারী পারাপারের নিয়ম মেনে চলা সেখানকার সংস্কৃতির অংশ। রাস্তায় ময়লা ফেলা সেখানে চিন্তাই করা যায় না। মানুষের মাঝে 'নিজের কাজে মতলব রাখা'র অভ্যাসও লক্ষণীয়—কে কী করল, পরনিন্দা বা 'গীবত'-এর মতো বিষয়গুলো খুব একটা নেই।
৩. কাজকে সম্মান ও জীবনযাত্রা: সেখানে কোনো কাজকে ছোট করে দেখা হয় না। পেট্রোল পাম্প, গ্রোসারি সুপারশপ বা ম্যাকডোনাল্ডসের মতো জায়গায় পার্ট-টাইম জব করা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই নিজের খরচ নিজে চালানো সেখানকার সংস্কৃতির অংশ। এছাড়া, যদিও খরচ বেশি, কিন্তু মানুষের আয়ও বেশি এবং জীবনযাত্রার মানও ভালো।
তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কি কেবল ইউরোপ-আমেরিকার গুণ গাইছি? অবশ্যই না। তাদেরও সমস্যা আছে—অপরাধ, বৈষম্য, একাকিত্ব, মানসিক চাপ। তবুও কিছু সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক আচরণের কারণে এই অঞ্চলগুলো আকর্ষণীয় হয়েছে—তা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এর পেছনে আমাদের শিক্ষার কী সম্পর্ক?
একসময় মুসলমানরা ছিল জ্ঞান, সভ্যতা ও ইনসাফের আদর্শ। স্পেনের কর্ডোভা বা গ্রানাডা ছিল জ্ঞানের আখড়া। কঠোর নিয়ম ও ইনসাফ কায়েম করে শান্তির সমাজ গড়ে তুলেছিল মুসলমানরা। জ্ঞানচর্চা ও মানবিক আচরণে মুসলিম বিশ্ব এগিয়ে ছিল। আমরা আল-বিরুনি, ইবনে সিনা বা আল-খাওয়ারিজমির নাম জানি, কিন্তু তাদের অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা বা কঠোর জ্ঞানচর্চাকে গ্রহণ করিনি।
আজকের এই চিত্র বদলে গেছে কারণ আমরা ইসলামের শিক্ষাগুলোকে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারিনি। নিরাপত্তা, শান্তি, কঠোর আইন, পরিচ্ছন্নতা—এগুলো কি ইসলামে বলা নেই? অবশ্যই আছে! ইসলাম মানুষের জান, মাল, সম্মান ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নজরের হেফাজত ও হুদুদের নির্দেশ দিয়েছে।
সমস্যা হলো—আমরা মূল্যবোধগুলো শুধু মুখে বলি, কিন্তু কাজে রূপ দিতে পারি না।
আমাদের সংকট কোথায়?
আমরা ন্যায়বিচারের কথা বলি, কিন্তু নিজের স্বার্থে অন্যায় মেনে নিই।
সততার কথা বলি, কিন্তু সুযোগ পেলেই প্রতারণা করি।
পরিচ্ছন্নতার কথা বলি, কিন্তু রাস্তায় ময়লা ফেলি।
সময়ানুবর্তিতার কথা বলি, কিন্তু অন্যের সময়কে মূল্য দিই না।
আমাদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষ নিরাপদ থাকবে, আইন সবার জন্য সমান হবে, দুর্নীতি থাকবে না, এবং প্রতিটি কাজ সম্মান পাবে। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা অগ্রগতির হাতিয়ার হবে। ধর্ম কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের চরিত্রে, পরিবারে, বাজারে, এবং নাগরিক আচরণে তার প্রতিফলন ঘটবে।
তখন মানুষ আমাদের কাছে আসবে—পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য নয়, বরং আমাদের চরিত্র, গবেষণা ও ন্যায়বিচারের জন্য। কোনো মুসলিমকে তখন বক্তৃতা দিয়ে ইসলাম বোঝাতে হবে না; তার আচরণই হয়ে উঠবে তার দাওয়াহ।