18/08/2024
সংখ্যালঘু/লীগ/দল/শিবির/জঙ্গী হবেন নাকি নাগরিক হবেন?
আমাদের দেশের কিছু মানুষ সংখ্যালঘু বলে নিজের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেয় আবার কেউ সত্য হোক কিংবা নাটক করে হোক বিপদে পড়লে সংখ্যালঘু বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে নজর কাড়ার জন্য ব্যবহৃত শব্দটি যতটা না আপনাদের সুবিধা দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি ছোট করছে এমনটি আপনার দুর্বলতাটাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। এ দেশে যখন আদমশুমারি হয় তখন রিপোর্টটা আসে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি। সেখানে বলা হয় না সংখ্যালঘু এত জন আর সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক এতজন। আপনাদের সংখ্যালঘু বলে পরিচয় দেয়াটা অনেকটা ভিক্ষা, দয়া কিংবা করুণার নামান্তর। আপনারা কেন বলতে পারেন না যে আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আপনার উপর নির্যাতন হলে কেন আর দশটা সাধারণ নাগরিকের উপর নির্যাতনের মতো করে আপনারা নিজেদের সমস্যা বা ইস্যুকে এড্রেস করতে পারেন না। অফিস আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জায়গায় মুসলিম ব্যতীত অন্য ধর্মের যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে তাদের মুখ থেকে কখনো শোনা যায় না “আমি সংখ্যালঘু...আমার সাথে এটা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে”-টাইপের বস্তাপচা সংলাপ। বরংচ ওদেরকে সবাই কলিগ হিসেবে ট্রিট করে। এদেশের সমান অধিকার নিয়ে থাকা একজন নাগরিক হিসেবে ট্রিট করে। আপনারা যারা এই শব্দ দিয়ে বেঁচে থাকাটা বা বরং বলা চলে টিকে থাকাটাকে অপরিহার্য বানিয়ে ফেলেছেন তাদের প্রতি অনুরোধ - দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। দেখবেন আপনার বিপদে শুধু তথাকথিত সংখ্যালঘুরাই নয় বরং প্রতিবেশী প্রত্যেকে সে লঘু হোক কিংবা গরিষ্ঠ সবাই একযোগে আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
শুধু সংখ্যালঘু বলাদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ!!! এদেশে সাধারণ মানুষ তথা নাগরিকের বড় অভাব। বাংলাদেশ একটা আশ্চর্যজনক দেশ যেখানে হাতে গোনা কিছু নাগরিক নিয়ে দেশটা চলে। এখানে সবাই আলাদা একটা পরিচয় বহন করে যেটা এদেশের নাগরিক পরিচয় দেয়ার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ - এট লিস্ট পরিচয়দানকারী ব্যক্তিদের পরিচয় দেয়ার স্টাইলে বোঝা যায়। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পরিচয় হলোঃ
আমি লীগ করি, আমি দল করি, আমি শিবির করি, আমি অমুক পার্টি করি, তমুক পার্টি করি ইত্যাদি।
যেখানে আগে আমার দেশের পরিচয় প্রাধান্য পাবার কথা সেখানে মুল গাছ বাদ দিয়ে আগাছার পরিচয়ে বাঁচতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। কেউ আবার গর্বে গর্বিতও হন। ধিক্কার এসব মন-মানসিকতাকে। ১৯৪৭ এ ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনে কিংবা জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক দল খোঁজে নাই, ১৯৭১ এ নয় এমনকি সদ্য অর্জিত ২০২৪ও সেই একট দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে সবাইকে। পরাধীনতার শেকল ভেঙ্গে স্বাধীনতা পাবার জন্য লড়াই করবে সবাই, রক্ত ঝরাবে সবাই, শহীদ যে হবে তার একটাই পরিচয় এদেশের গর্বিত নাগরিক। অথচ স্বাধীনতার পর আমরা নিজেদের মতো করে একজন আইডল বানাতে ব্যস্ত থাকি। সেটা নিজের এলাকায় হোক, জেলায় হোক কিংবা দেশে। নিজের গলায় রশি বেঁধে সেই আইডলের হাতে রশিটা দিয়ে বলি আমার ভাগ্য এখন আপনার হাতে। জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া পরাধীনতার শেকল ভেঙে আমরা নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় সঁপে দেই অন্য আরেক পরাধীনতার শৃঙ্খলে।
১৯৪৭ এর পর ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে পরলাম পাকিস্তানি আর ভারতীয়দের হাতে। ১৯৭১ এ পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও মুক্তি মেলেনি ভারতীয়দের হাত থেকে। ফলাফল একনায়কতন্ত্র, বাকশাল, অরাজকতা আর গণতন্ত্রের মৃত্যু। কার বা কাদের হাত ধরে এসব ঘটনা ঘটেছে, আর অন্তরালের কুশীলব কারা সে কথায় না গেলাম। যারা অন্ধ ভক্ত তারা অন্য ব্যাখ্যা দিবেন। তবে যে ব্যাখ্যাই দেন না কেন দেশ স্বাধীনের মাত্র ৪ বছর পর এক নেতার মৃত্যু তার ৬ বছর পর অন্যজনের তাও স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, সেটাকে কীই ব্যাখ্যা দিবেন? এরশাদ, খালেদা, হাসিনা, খালেদা, স্বৈরশাসন এবং সর্বশেষ হাসিনার শাসন এবং প্রত্যেকের পরাজয়। মাঝখানে জামায়াতকে দেখা যায় একবার হাসিনার সাথে তো আরেকবার খালেদার সাথে। এসব কিছুই এ জাতি দেখেছে, ভোগ করেছে কিন্তু শিক্ষা হয়নি একটুও। না শিক্ষা নিয়েছে এই দলগুলোর নেতারা না আমরা সাধারণ জনগণেরা - কেউই না। মাত্রই পরাধীনতার চরম একটা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে না পেতেই বিষফোঁড়ার মতো জায়গায় জায়গায় বিষাক্ত হুল ফোঁটাচ্ছে বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদল লুটপাট, চাঁদাবাজি - এসব করে ১৮ বছরের ক্ষুধা যেন ১ বছরেই মেটানোর পণ। সদ্য সাবেক হওয়া আওয়ামী-যুব ও ছাত্রলীগের পোলাপান আছে জ¦ালাও-পোড়াও, নির্যাতন করে দেশটাকে অস্থিতিশীল করে সুবিধা নেয়ার ধান্দায়।
এই যখন পরিস্থিতি তখন আমাদের সাধারণ জনগণ ৩ ভাগে বিভক্ত। প্রথম দলঃ এদের চামড়া সাধারণত গন্ডারের চামড়ার মতো হয়ে থাকে। তাদের চিন্তাধারা হলো দেশ যেদিকে খুশি সেদিকে যাক আমি আমার পিঠ বাঁচিয়ে কোনমতে আজরাইলের সাক্ষাৎ পাবার আগ পর্যন্ত বহাল তবিয়তে চলতে পারলেই হলো। এরা আগে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে।
দ্বিতীয় দলঃ এই দলের লোকদের মাঝে আবার দুই গ্রুপ - অপটিমিস্ট ও পেসিমিস্ট।
পেসিমিস্টদের উল্লেখযোগ্য মতামত - প্রধান উপদেষ্টা সুদখোর...তার কাছ থেকে আর কীইবা আশা করা যায়; কেউ আবার এককাঠি উপরে...ওনারতো রাজনৈতিক কোনো অভিজ্ঞতা নাই, বেশিদিন টিকতে পারবে না; আর কেউ বলে উপদেষ্টা প্যানেল তৈরি হয়েছে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব আর অনভিজ্ঞ ও কম যোগ্যতা সম্পন্ন লোকদের দিয়ে; আর কেউ অলরেডি ধরেই নিছে দেশটা আফগানিস্তান হতে যাচ্ছে। আর অপটিমিস্টদের বক্তব্য - ভাই আপনারা চুপ থাকেন। এতদিন গর্তে লুকাই ছিলেন এখনো গর্তেই থাকেন। ১৬ বছরে যখন মুখ খোলার হেডম হয় নাই এখনও খুইলেন না; কেউ বলছে - ইটস ট্যু আর্লি টু কমেন্ট, ওয়েট এন্ড সি।
তৃতীয় দলঃ এই দলে যারা আছেন তাদের কাজ শুধু আঙ্গুল করা সেটা ভালোর বিরুদ্ধে হোক কিংবা মন্দের। এদের জন্ম পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। তারা এতটাই নিচে নেমেছে যে ছাত্র আন্দোলনের কার চরিত্র কেমন, বউ বা গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কে কি কর্মকান্ড করছে জীবনে, উপদেষ্টাদের কার জীবনচরিত কেমন সেগুলো অত্যন্ত দক্ষ ও দ্রুততার সাথে গবেষণা করে বের করে গর্বের সাথে পোস্ট দিচ্ছে এই নেন দিয়ে দিলাম আপনাদের অমুক উপদেষ্টা কিংবা তমুক ছাত্র আন্দোলনের লিডারের বায়োডাটা। এনারা এত বেশি জানেন যে সব বিষয়ে ওনাদের জানার লেভেল দেখে ওনাদেরকে জানোয়ার ছাড়া অন্য কোনো শ্রুতিমধুর শব্দ পাইনা ডাকার মতো। এরা কবে বুঝবে যে, একজনের ৩টা বউ আর ২টা গার্ল ফ্রেন্ড থাকার মানে এই নয় সে দেশ ও জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারবে না আবার ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হুজুর হলেই যে তিনি দুর্নীতি করবেন না।
এখন আপনারা বলবেন সবাই কি খারাপ? কেউ কি দেশের জন্য কাজ করছে না? হ্যা অবশ্যই করছে। অনেকে আছেন দিনে-রাতে ভাবছেন, কাজ করছেন দেশের উন্নয়নের জন্য। ওনাদের কোনো দলে ফেলার মতো গর্হিত কাজ আমি কেমনে করি। কারণ ওরাইতো দেশ। ওরাই বাঁচিয়ে রেখেছে এই দেশকে যে দেশের ইজ্জত-সম্মান আমরা নষ্ট করছি প্রতিনিয়ত আমাদের কোন কাজে, কথায় বা চিন্তায়।
সর্বপরি, একটা বিষয়ের প্রতি সবার আকুল দৃষ্টি কামনা করছি। ভাইরে বিধর্মী হইলেই সংখ্যালঘু না, দাড়ি টুপি থাকলেই শিবির কিংবা জঙ্গী না, বাপ দাদা চৌদ্দ গুষ্টি মুজিরে ফ্যান তাই আমিও লীগ কিংবা জিয়ার ফ্যান তাই আমি দল - এসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্ট থেকে বের হয়ে আসেন। ছোট্ট একটা দেশ আমাদের। কিভাবে এটাকে আরো সুন্দর করা যায় সেটা নিয়ে ভাবেন, আপনার জায়গা থেকে কিভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগতে পারেন সেটা উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য হয়েই হোক অথবা রাস্তা থেকে একটু ময়লা সরিয়ে ডাস্টবিনে ফেলেই হোক - জাস্ট আপনার আমার অংশগ্রহণ দরকার। উস্কানিমুলক, খোঁচাখুঁচি টাইপ কথাবার্তা আর অমুক মতাদর্শ তমুক আইডল প্রতিষ্ঠার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজে আইডল হন। আপনাকে দেখে আপনার ঘরে তৈরি হবে পরবর্তী প্রজন্মের আইডল। যারা দেশকে লিড দেবে।
আপনি এমন মানুষ হন যেন আপনি ও আপনার পরিবার শুধু ক্ষমতার ৫ বছর দাপটের সাথে আর বাকি সময় কুকুরের মতো আস্তাকুড়ে কিংবা ভয় নিয়ে দিন গুনতে না হয়। যেন অপেক্ষায় থাকতে না হয়ে যে আবার কবে ক্ষমতায় আসব, সব মনে রাখা হবে, ক্ষমতায় আসলেই সবকিছুর হিসাব নেয়া হবে।
সর্বশেষ আপনার বিবেকের কাছে একটা প্রশ্ন করে শেষ করছি - “সংখ্যালঘু/লীগ/দল/শিবির/জঙ্গী এবস পরিচয়ে কিংবা তকমা লাগিয়ে বাঁচতে চান? নাকি এসব শাব্দিক খেলা বন্ধ করে স্বাধীন দেশের স্বাধীন ও গর্বিত নাগরিক এবং একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল মানুষের পরিচয়ে বাঁচতে চান?