31/07/2026
রাত প্রায় দুইটা। পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূরের আলো দেখছিলাম।
আজ আমার কাছে টাকা আছে, সম্মান আছে, সাফল্য আছে। কিন্তু শান্তি নেই।
কিছু ক্ষত সময়ের সাথে শুকিয়ে যায়। কিছু ক্ষত মানুষ লুকিয়ে রাখতে শিখে যায়। আর কিছু ক্ষত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বুকের ভেতর রক্ত ঝরায়।
আমার জীবনেও এমন একটা ক্ষত আছে। একটা নাম, একটা মুখ, একটা প্রতিশোধ, আর একটা ভালোবাসা। যে ভালোবাসা আমাকে মানুষ বানিয়েছে।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটার দিকে তাকালাম। ছবিতে একটা মেয়ে হাসছে। সাদা সালোয়ার, মায়াবী চোখ, নরম একটা হাসি।
ছবিটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
আমিঃ তুমি জিতে গেছো, মেহরিন। আমাকে ধ্বংস করতে এসে তুমি আমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেছো।
আমার চোখের কোণ ভিজে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল ছয় বছর আগের সেই দিনটা।
যেদিন আমি ছিলাম শহরের সবচেয়ে বখাটে ছেলে। রাগ ছিল আমার পরিচয়, অহংকার ছিল আমার শক্তি, আর মানুষের চোখের পানি ছিল আমার কাছে তুচ্ছ।
আমি জানতাম না, একদিন আমার একটা ভুল আমার পুরো জীবন বদলে দেবে। আর সেই ভুলের নাম ছিল—মেহরিন ইসলাম।
ছয় বছর আগে...
ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় আমাদের বাড়ি। বিশাল তিনতলা বাংলো। সামনে বাগান। গ্যারেজে কয়েকটা দামি গাড়ি।
কিন্তু ওই বাড়ির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলাম আমি।
সকাল এগারোটা।
আমার ঘুম ভাঙলো ফোনের রিংটোনে।
চোখ না খুলেই ফোনটা কানে ধরলাম।
রনি ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
রনিঃ কই তুই? সবাই কলেজে চলে আসছে।
আমিঃ সকালে মানুষের ঘুম নষ্ট করতে তোর ভালো লাগে?
রনিঃ সকাল? ভাই, এগারোটা বাজে।
আমিঃ তাহলে তো এখনও সকালই।
রনিঃ তুই আসবি নাকি?
আমিঃ আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি।
ফোন কেটে উঠে বসলাম।
ঠিক তখন মা রুমে ঢুকলেন।
মাঃ এখন উঠেছিস?
আমিঃ হুম।
মাঃ কলেজে যাবি না?
আমিঃ যাবো।
মাঃ এভাবে আর কতদিন চলবে বাবা?
আমিঃ আবার শুরু করো না তো।
মাঃ তোর বাবার এত বড় ব্যবসা। একদিন তোকে সব সামলাতে হবে।
আমিঃ বাবা সামলাক। আমি তো বলিনি ব্যবসা করতে।
মায়ের মুখটা মলিন হয়ে গেল।
কিন্তু তখন এসব দেখার সময় কোথায় আমার?
আমার মাথায় তখন শুধু বন্ধু, আড্ডা আর দাপট।
নিচে নামতেই বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
আমাকে দেখেই কাগজটা ভাঁজ করলেন।
বাবাঃ আজও দেরি?
আমিঃ হুম।
বাবাঃ কলেজে পড়তে যাস নাকি নাটক করতে যাস?
আমিঃ আবার শুরু হলো।
বাবাঃ আমি সিরিয়াস।
আমিঃ কিন্তু আমি না।
বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
বাবাঃ একদিন বুঝবি।
আমিঃ ওই ডায়লগটা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে।
আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেলাম।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।
আজ বুঝি...
ওই নীরব চোখ দুটোতে কত কষ্ট ছিল।
কিন্তু তখন আমি বুঝিনি।
তখন আমি শুধু নিজের কথাই ভাবতাম।
কলেজে পৌঁছাতেই সবাই আমার দিকে তাকাতে শুরু করলো।
কারণ আমি আরিয়ান চৌধুরী।
কলেজের সবচেয়ে ভয়ংকর ছেলে।
সিনিয়ররা আমাকে এড়িয়ে চলতো।
জুনিয়ররা আমাকে দেখে রাস্তা বদলাতো।
শিক্ষকেরাও অনেক সময় ঝামেলা এড়িয়ে যেতেন।
আর আমি এসব নিয়েই গর্ব করতাম।
গাড়ি থেকে নামতেই রনি আর তার দল এগিয়ে এলো।
রনিঃ আজ নতুন একটা ছেলে ভর্তি হয়েছে।
আমিঃ তারপর?
রনিঃ নাকি খুব বেশি ভাব নেয়।
আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।
আমিঃ তাহলে আজ একটু শিক্ষা দিতে হবে।
রনি হেসে উঠলো।
আর আমি হাঁটতে শুরু করলাম।
কলেজে ঢুকতেই সবাই রাস্তা ছেড়ে দিল। যেন আমি কোনো ছাত্র না, এলাকার কোনো সন্ত্রাসী।
সত্যি বলতে, তখন এসবই আমার ভালো লাগতো।
মানুষ আমাকে সম্মান করে না, ভয় পায়—এটাই ছিল আমার অহংকার।
রনি আর তার বন্ধুরা আমার পেছন পেছন হাঁটছিল।
রনিঃ নতুন ছেলেটা ক্যান্টিনে বসে আছে।
আমিঃ নাম কী?
রনিঃ সিয়াম।
আমিঃ চল।
আমরা সরাসরি ক্যান্টিনে ঢুকে পড়লাম।
এক কোণে একটা ছেলেকে বসে থাকতে দেখলাম। শান্তভাবে নাস্তা খাচ্ছে।
আমি গিয়ে তার সামনে বসলাম।
ছেলেটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।
আমিঃ তুই নতুন?
সিয়ামঃ জি ভাই।
আমিঃ আমাকে চিনিস?
সিয়ামঃ না ভাই।
চারপাশে হঠাৎ সবাই চুপ হয়ে গেল।
আমি মুচকি হেসে বললাম,
আমিঃ এই কলেজে ভর্তি হয়েছিস, আর আমাকে চিনিস না?
সিয়ামঃ দুঃখিত ভাই।
আমিঃ দুঃখিত হলে হবে না। আগে সিনিয়রদের চিনতে শিখ।
সিয়াম কিছু বললো না।
ওর এই চুপ করে থাকা আমার আরো রাগ লাগিয়ে দিল।
আমিঃ দাঁড়া।
সিয়াম উঠে দাঁড়ালো।
আমিঃ আমার জুতা মুছ।
সিয়াম হতবাক হয়ে গেল।
সিয়ামঃ কী বললেন ভাই?
আমিঃ কানে কম শুনিস?
সিয়ামঃ আমি এটা করতে পারবো না।
আমি রেগে গেলাম।
পুরো ক্যান্টিন নিস্তব্ধ।
আমিঃ কী বললি?
সিয়ামঃ আমি কাউকে অসম্মান করিনি। কিন্তু এটাও করবো না।
রনি আমার দিকে তাকালো।
সে বুঝতে পারছে আমি এখন বিস্ফোরিত হবো।
আমি সিয়ামের কলার চেপে ধরলাম।
আমিঃ সাহস কম না তোর।
ঠিক তখন একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
স্যারঃ আরিয়ান!
আমি ঘুরে তাকালাম।
কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল দাঁড়িয়ে আছেন।
বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
স্যারঃ আবার শুরু করেছো?
আমিঃ কিছু না স্যার।
স্যারঃ কিছু না?
স্যারঃ পুরো কলেজ জানে তুমি কী করছো।
আমিঃ স্যার, এটা আমাদের ব্যাপার।
স্যারঃ কলেজের ভেতরে যা হবে, সেটা কলেজের ব্যাপার।
আমি বিরক্ত হয়ে সিয়ামকে ছেড়ে দিলাম।
স্যারঃ অফিসে আসো।
আমিঃ পরে আসবো।
স্যারঃ এখনই।
আমিঃ সময় নেই।
স্যার অবাক হয়ে গেলেন।
কারণ কোনো ছাত্র তাকে এভাবে কথা বলে না।
কিন্তু আমি বলতাম।
কারণ আমি জানতাম, কেউ আমার কিছু করতে পারবে না।
আমার বাবার প্রভাব ছিল।
আর সেই প্রভাবের সুযোগ আমি সবসময় নিয়েছি।
কলেজ থেকে বেরিয়ে আমরা একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম।
সেখানে গিয়ে দেখি কয়েকটা মেয়ে বসে আছে।
আমাকে দেখেই হাসতে শুরু করলো।
আমি গিয়ে তাদের টেবিলে বসলাম।
রনি মাথা নাড়লো।
কারণ এগুলো ছিল আমার প্রতিদিনের কাজ।
একজন মেয়ে বললো,
মেয়েঃ আজ এত দেরি কেন?
আমিঃ ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে।
মেয়েঃ কাল কোথায় ছিলে?
আমিঃ মনে নেই।
সবাই হেসে উঠলো।
তখন আমার জীবন এমনই ছিল।
আজ এই মেয়ে।
কাল অন্য কেউ।
কাউকে নিয়ে কোনো অনুভূতি ছিল না।
শুধু সময় কাটানো।
শুধু নিজের আনন্দ।
বিকেলে বাড়ি ফিরতেই দেখি বাবা ড্রইংরুমে বসে আছেন।
আমাকে দেখেই বললেন,
বাবাঃ একটু বসো।
আমিঃ ক্লান্ত।
বাবাঃ বসো।
আমি বিরক্ত হয়ে সোফায় বসলাম।
বাবাঃ আজ কলেজ থেকে ফোন এসেছিল।
আমিঃ তো?
বাবাঃ আর কতদিন এসব চলবে?
আমিঃ আপনার সমস্যা কী?
বাবাঃ সমস্যা তুমি।
আমিঃ তাহলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিন।
মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
মাঃ আরিয়ান!
আমিঃ কী?
মাঃ বাবার সাথে এভাবে কথা বলিস না।
আমিঃ আমি সত্যি কথাই বলছি।
বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
বাবাঃ একদিন নিজের ভুল বুঝবি।
আমিঃ ওইদিন আসলে আমাকে জানাবেন।
আমি উঠে নিজের রুমে চলে গেলাম।
পরের কয়েকদিন স্বাভাবিকভাবেই কাটছিল। কলেজ, আড্ডা, বন্ধুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি আর মাঝে মাঝে ঝামেলা করা—এটাই ছিল আমার রুটিন।
সেদিন দুপুরে কলেজ ছুটি হওয়ার পর আমি আর রনি গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলাম।
রনিঃ আজকে রাতে পার্টি আছে। ভুলিস না।
আমিঃ আমি না গেলে পার্টি জমবে?
রনিঃ জমবে না।
আমি হেসে উঠলাম।
ঠিক তখন সামনের রাস্তায় একটা ছোটখাটো জটলা দেখতে পেলাম।
একজন বয়স্ক লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কারো সাথে তর্ক করছেন।
আমি প্রথমে গুরুত্ব দিলাম না।
কিন্তু কাছে যেতেই দেখি লোকটা একজন রিকশাওয়ালার পক্ষ নিয়ে কয়েকজন ছেলের সাথে কথা বলছেন।
রনিঃ চল যাই।
আমিঃ দাঁড়া দেখি।
গাড়ি থামিয়ে নামলাম।
দেখলাম আমার এক পরিচিত ছেলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে দেখেই সে এগিয়ে এলো।
ছেলেটাঃ ভাই, এই লোকটা অনেক জ্ঞান দিচ্ছে।
আমি লোকটার দিকে তাকালাম।
সাদা পাঞ্জাবি পরা। চোখে চশমা। মুখে ভদ্রতার ছাপ।
লোকটা শান্ত গলায় বললেন,
লোকটিঃ একজন গরিব মানুষকে অন্যায়ভাবে মারধর করা ঠিক না।
আমি বিরক্ত হলাম।
আমিঃ আপনি কে?
লোকটিঃ আমি একজন সাধারণ মানুষ।
আমিঃ তাহলে সাধারণ মানুষের মতো থাকেন।
লোকটিঃ অন্যায় দেখলে চুপ থাকা যায় না।
আমার রাগ বাড়তে লাগলো।
কারণ আমি এমন মানুষ সহ্য করতে পারতাম না, যারা আমাকে উপদেশ দেয়।
আমিঃ আপনি কি জানেন কার সাথে কথা বলছেন?
লোকটিঃ সেটা জানার প্রয়োজন নেই।
আমিঃ কী বললেন?
লোকটিঃ মানুষকে ভয় দেখিয়ে বড় হওয়া যায় না।
চারপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করেছে।
আমি অনুভব করলাম, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমার অহংকারে আঘাত লাগলো।
আমিঃ বেশি কথা বলছেন কিন্তু।
লোকটিঃ সত্য কথা সবসময়ই কষ্ট দেয়।
রনি আমার কানে কানে বললো,
রনিঃ চল চলে যাই।
কিন্তু তখন আমার মাথা গরম হয়ে গেছে।
আমি আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না।
লোকটা আবার বললেন,
লোকটিঃ তোমার বাবা-মা নিশ্চয়ই তোমাকে এমন শিক্ষা দেননি।
এই কথাটা শুনেই আমি বিস্ফোরিত হয়ে গেলাম।
আমিঃ আমার বাবা-মাকে নিয়ে কথা বলবেন না!
লোকটিঃ তাহলে এমন কাজও করো না, যাতে তাদের মাথা নিচু হয়।
আমি দাঁত চেপে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
রনি আমার হাত ধরলো।
রনিঃ আরিয়ান, থাম।
আমিঃ হাত ছাড়।
লোকটিঃ রাগ দিয়ে মানুষ হওয়া যায় না বাবা।
বাবা...
শব্দটা শুনে যেন আরও রেগে গেলাম।
কারণ তখন আমি কাউকে সম্মান করতে শিখিনি।
আমি শুধু নিজের ক্ষমতা দেখাতে জানতাম।
চারপাশে সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে।
আর আমি ধীরে ধীরে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চারপাশে সবাই চুপ হয়ে গেছে।
লোকটিঃ তোমার চোখে অনেক রাগ দেখছি বাবা। কিন্তু এই রাগ একদিন তোমারই ক্ষতি করবে।
আমিঃ আমাকে জ্ঞান দেওয়া বন্ধ করুন।
লোকটিঃ আমি জ্ঞান দিচ্ছি না। শুধু সত্যিটা বলছি।
আমিঃ সত্যি-মিথ্যা শেখানোর জন্য আপনাকে কেউ ডাকেনি।
লোকটিঃ তোমার বয়সে আমিও অনেক ছাত্র দেখেছি। কিন্তু তোমার মতো অহংকারী খুব কম দেখেছি।
এই কথাটা আমার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল।
আমিঃ চুপ!
লোকটিঃ কেন? সত্যি শুনতে কষ্ট হচ্ছে?
আমিঃ একদম চুপ!
লোকটিঃ না হলে কী করবে?
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ভয় পেয়ে গেল।
রনি আবার আমার হাত ধরলো।
রনিঃ আরিয়ান, প্লিজ। চল এখান থেকে।
আমিঃ হাত ছাড়!
রনিঃ ভাই, লোকটা বয়স্ক মানুষ।
আমিঃ আমি কাউকে ছাড়ি না।
লোকটিঃ দেখলে? এটাই তোমার সমস্যা। তুমি মনে করো পৃথিবী তোমার বাবার টাকায় চলে।
আমার মাথা পুরোপুরি গরম হয়ে গেল।
আমি হঠাৎ লোকটার কলার চেপে ধরলাম।
চারপাশে হৈচৈ পড়ে গেল।
লোকটিঃ হাত ছাড়ো।
আমিঃ আমাকে শিক্ষা দিতে এসেছেন?
লোকটিঃ তুমি ভুল করছো।
আমিঃ ভুল আমি করি না!
লোকটিঃ মানুষ ভুল করেই শেখে।
এরপর...
রাগের মাথায় আমি তাকে ধাক্কা দিলাম।
লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে পিছনে পড়ে গেলেন।
কিন্তু ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়নি।
পিছনে একটা লোহার রেলিং ছিল।
সজোরে তার মাথা রেলিংয়ে আঘাত করলো।
ঠাস!
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলাম না কী হয়েছে।
তারপর দেখলাম...
লোকটার মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
রনি চিৎকার করে উঠলো।
রনিঃ আরিয়ান!
চারপাশে মানুষ দৌড়ে এলো।
একজন মহিলার চিৎকার ভেসে এলো।
মানুষঃ হাসপাতালে নিন! দ্রুত হাসপাতালে নিন!
লোকটা অচেতন হয়ে পড়ে আছেন।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
জীবনে অনেক মারামারি করেছি।
অনেককে মেরেছি।
কিন্তু এমন কিছু আগে কখনো হয়নি।
রনি আমার দিকে তাকালো।
রনিঃ তুই কী করলি?
আমিঃ আমি...
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
ঠিক তখন দূর থেকে একটা মেয়ে দৌড়ে আসতে দেখা গেল।
সে ভিড় ঠেলে সামনে এলো।
তারপর মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটাকে দেখে চিৎকার করে উঠলো।
মেয়েটিঃ আব্বু!
মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটার চোখে পানি চলে এলো।
সে বাবার মাথা কোলে তুলে নিল।
মেয়েটিঃ আব্বু! চোখ খোলো! আব্বু!
তার কান্না শুনে আশেপাশের সবার চোখ ভিজে উঠলো।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
প্রথমবারের মতো নিজের কাজ দেখে নিজেই হতবাক।
মেয়েটা হঠাৎ আমার দিকে তাকালো।
তার চোখে তখন শুধু ঘৃণা আর আগুন।
মেয়েটিঃ আপনি করেছেন এটা?
আমি চুপ।
মেয়েটিঃ বলুন! আপনি করেছেন?
রনি কিছু বলতে যাচ্ছিল।
কিন্তু মেয়েটা চিৎকার করে উঠলো।
মেয়েটিঃ আমার বাবার কী ক্ষতি করেছিলেন তিনি?
মেয়েটিঃ কেন মারলেন?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ সত্যি বলতে...
আমার কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
কয়েকজন লোক দ্রুত রফিক ইসলামকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
মেয়েটাও তাদের সাথে চলে গেল।
যাওয়ার আগে একবার আমার দিকে তাকালো।
সেই দৃষ্টিটা আমি আজও ভুলতে পারিনি।
সেই চোখে ছিল না শুধু ঘৃণা।
ছিল প্রতিশোধের আগুন।
সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না।
বারবার সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
লোকটার মাথা রেলিংয়ে আঘাত করা।
রক্ত।
আর সেই মেয়েটার কান্না।
কিন্তু নিজের অহংকারের কারণে আমি কাউকে কিছু বুঝতে দিলাম না।
পরদিন সকালে নিচে নামতেই বাবা আর মা নাস্তা করছিলেন।
মাঃ আয়, নাস্তা কর।
আমিঃ ক্ষুধা নেই।
বাবাঃ আজ এত চুপচাপ কেন?
আমিঃ এমনিই।
বাবাঃ কলেজে কোনো ঝামেলা করেছো?
আমি কিছু বললাম না।
বাবা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আবার নাস্তা করতে লাগলেন।
আমি দ্রুত বেরিয়ে গেলাম।
অন্যদিকে...
ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউর সামনে বসে ছিল মেহরিন।
সারারাত তার চোখে ঘুম নেই।
তার বাবা এখনও অচেতন।
ডাক্তার কয়েকবার এসে দেখে গেছেন।
প্রতিবারই মেহরিনের বুক কেঁপে উঠেছে।
পাশে বসে থাকা তার মা বারবার কাঁদছিলেন।
মেহরিন মায়ের হাত ধরে বললো,
মেহরিনঃ আম্মু, কাঁদবেন না।
মাঃ তোর বাবার যদি কিছু হয়ে যায়?
মেহরিনঃ কিছু হবে না।
মাঃ আল্লাহ ওনাকে ভালো করে দিন।
ঠিক তখন ডাক্তার বের হয়ে এলেন।
মেহরিন দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।
মেহরিনঃ ডাক্তার, আব্বু কেমন আছেন?
ডাক্তারঃ এখন বিপদ কিছুটা কেটেছে। তবে মাথায় আঘাত বেশ গুরুতর।
মেহরিনঃ উনি কি ভালো হয়ে যাবেন?
ডাক্তারঃ সময় লাগবে।
ডাক্তারের কথা শুনে মেহরিন কিছুটা স্বস্তি পেল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার মুখ।
সেই অহংকারী ছেলেটা।
যে বিনা কারণে তার বাবাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
মেহরিন দাঁত চেপে ফেললো।
মেহরিনঃ আমি তোমাকে ছাড়বো না।
মাঃ কাকে বলছিস?
মেহরিনঃ যে মানুষটা আব্বুর এই অবস্থা করেছে।
মাঃ পুলিশে অভিযোগ করবো?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।
মেহরিনঃ না।
মাঃ কেন?
মেহরিনঃ জেলে পাঠিয়ে খুব বেশি শাস্তি হবে না।
মাঃ তাহলে?
মেহরিনের চোখে তখন অন্যরকম আগুন।
মেহরিনঃ আমি ওকে এমন শাস্তি দেবো, যেটা ও সারা জীবন ভুলতে পারবে না।
ওই মুহূর্তেই প্রতিশোধের বীজ বপন হয়ে গেল।
অন্যদিকে আমি কলেজে গিয়ে দেখি সবাই আমার দিকে অন্যরকম চোখে তাকাচ্ছে।
কেউ সামনে কিছু বলছে না।
কিন্তু পেছনে পেছনে ফিসফিস করছে।
রনি এসে পাশে দাঁড়ালো।
রনিঃ খবর পেয়েছি।
আমিঃ কী খবর?
রনিঃ লোকটার নাম রফিক ইসলাম।
আমিঃ তারপর?
রনিঃ কলেজের একজন সম্মানিত শিক্ষক।
আমার বুক ধক করে উঠলো।
আমিঃ কী?
রনিঃ পাশের কলেজে পড়ান।
আমি প্রথমবার একটু ভয় পেলাম।
রনিঃ আর একটা খবর আছে।
আমিঃ কী?
রনিঃ তার একটা মেয়ে আছে।
আমিঃ তো?
রনিঃ গতকাল হাসপাতালে তুই যাকে দেখেছিস, সেই মেয়েটাই।
আমি কিছু বললাম না।
কিন্তু কেন জানি মেয়েটার কান্নাভেজা মুখটা বারবার মনে পড়ছিল।
চলবে...
#গল্পঃ প্রতিশোধের প্রেম যখন সত্যিকারের ভালোবাসা হয়ে গেল
#লেখক #রায়হান
পর্ব–১: