28/04/2025
ছেলেদের ওপর মেয়েদের কিসের এত রাগ? - ডা. মুনমুন জাহান
সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের কাজ করি। সেই সুবাদে গতকাল এই শিরোনামের একটা ভিডিও কয়েকজন নারীর কাছে পাঠিয়েছি। তাদেরই একজন, আমার এক ফিমেইল গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট, ইন রেসপন্স এই কথাগুলো আমাকে ইনবক্সে বলেছে। তার অনুমতি নিয়ে কথাগুলো আপনাদের সাথে হুবহু শেয়ার করছি:
“স্যার, সম্পূর্ণ ভিডিওটা দেখলাম।
ভিডিওর প্রতিটা কথার সাথে আমি একমত। কিন্তু সমস্যা হলো- এগুলো আমি যখন নিজের ক্ষেত্রে এপ্লাই করার কথা চিন্তা করি তখন একটি অন্তর্দ্বন্দ্বে পড়ে যাচ্ছি। কারন আমি তথাকথিত স্বাধীনচেতা ও স্বনির্ভর মেয়ে।
আমি জানি আমার এই স্বাধীনতা এবং স্বনির্ভরতাই আমার সবচেয়ে বড় পরাধীনতার শিকল।
আমি জানি পিসিওএসের কারনে আমার ফার্টিলিটি রেট দিন দিন কমছে, কিন্তু আমি বিয়ে করছি না। কেননা, আমি স্বনির্ভর হতে চাই। ওদিকে আবার ভবিষ্যতে মাতৃত্ব আমার জন্য কতটা কঠিন হবে সেই চিন্তাও আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
আপনি শুনলে অবাক হবেন স্যার, বাংলাদেশে প্রতি ৫ জন মেয়ের মধ্যে ১ জনের পিসিওএস আছে।
আমার ফ্যামিলি যে কোনো ভালো স্ট্যান্ডার্ডের বিয়ের প্রস্তাব (আসার) সাথে সাথে নাকচ করে দেয়। কারন তাদের মেয়ের চাকরি না হওয়া পর্যন্ত (তারা মেয়েকে) বিয়ে দিবে না।
সো বর্তমানে যেমন প্রতি ঘরে দুজন বাচ্চা নরমাল, আরও একযুগ পরে প্রতি ঘরে একটা বাচ্চা থাকাই নরমালে পরিনত হবে। কারন বিয়ের পর বহু ডাক্তারের সাথে কন্সাল্টেশন করে অনেক ওষুধপত্র গিলে কোনোমতে একটা বাচ্চা হবে। এতোকিছু করে একটা বাচ্চা হওয়ার পর আরেকটা বাচ্চা নেয়ার ইচ্ছা থাকবে না কিংবা মেয়েদের তেমন শারীরিক সক্ষমতা থাকবে না।
এবার আসি সংসার জীবনের বিষয়ে।
আমরা মেয়েরা মোটেই এডজাস্টমেন্টের পক্ষে না। কারন আমরা শিক্ষিত সাবলম্বী নারী। আধুনিকায়ন আর প্রযুক্তিও এর জন্য কম দায়ী না।
আমার বাবা-মার সাংসারিক জীবন রীতিমতো ঈর্ষনীয়। আশেপাশের মানুষের কাছে তারা রোল মডেল। এখনো মাঝে মাঝে আমার বাবা আমাদের বলে ‘তোমরা বাসায় থাকো, আমি আর তোমার আম্মু একটু ঘুরে আসি।’ আমার মা ছিলো গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী এবং বনেদী ঘরের মেয়ে। আর বাবা ছিলো অনেক কালো, এবং নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান।
বিয়ের ছবি দেখে আমি এখনো মাকে বলি ‘মা, তুমি কি দেখে বাবাকে বিয়ে করলে?’ তখন কিন্তু মা আফসোস করে না। বরং লজ্জা পেয়ে বলে, ‘তোমার বাবা কালো হলেও মানুষটা ভালো।’ অথচ আমার এই মা-ই বাবার সংসারে এসে হাজারো ঝড়-ঝাপটা, আর্থিক কষ্ট সহ্য করেছে। মাঝে মাঝে বাবার ঝাড়িও খেয়েছে ।
আর এখন? উচ্চশিক্ষিত হয়ে আমাদের কতো অহংকার! আমার কথাই বলি।
আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে কখনো ঝাড়ি মারা তো দূর, একটু উঁচু গলায় কথা বললেই হয়েছে। এর সাথে যে ভবিষ্যতে থাকবো না তা একশোবার বলে ফেলি। আর এক্সপেক্টেশন তো আকাশ ছোঁয়া। বলে দিয়েছি, পাঁচভরি স্বর্ণ না নিয়ে আসতে পারলে যেন বিয়ে করতে না আসে।
আমি জানি এগুলো ঠিক না। কিন্তু এগুলো না হলে তো আমার আত্মমর্যাদা থাকবে না। আমি যে স্বাবলম্বী আর স্বনির্ভর মেয়ে। (যেকোনো মূল্যে) আশপাশের মানুষের কাছে, নিজের পরিবারের কাছে আমার স্ট্যাটাস বজায় রাখতে হবে।
আরও একটা ব্যাপার দেখলাম স্যার, বর্তমানে পুরুষদের মধ্যে গায়রত (মানে, পুরুষত্ববোধ কিংবা আত্মমর্যাদা) কমে যাচ্ছে। আপনি কিংবা আমার বাবা, আপনাদের দেখলে যেমন পুরুষ মনে হয়, বর্তমানের ছেলেরা সেই তুলনায় একেবারেই মেয়েলি। এদের স্বভাব, চরিত্র, সক্ষমতা সবকিছুই মেয়েলি হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা ডিসিশন নেয়ার জন্য এরা মেয়েদের উপর নির্ভরশীল।
বিশ বছর আগে পুরুষরা যেসব পজিশনে ছিলো, সেসব পজিশন এখন মেয়েরা হোল্ড করছে। আমার মনে হয় ভবিষ্যতে সংসার, সমাজ সবকিছুতে মেয়েরাই লিড করবে। আর ছেলেরা গায়রতবিহীন পুরুষ হিসেবে তাদের ঈশারায় চলবে।
এখন এসব সমস্যার কি কোনো সলুশন আছে? না, নেই।
কারন, আমি জানি আমি ভুল। তাও আমি শোধরাচ্ছি না। তাহলে পরিবর্তন কীভাবে আসবে? আমি চিন্তা করছি আমার সামাজিক স্ট্যাটাসের, আমার স্বনির্ভরতার।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও খারাপ হবে। বেশিদিন না, এই আমরাই আমাদের নাতি-নাতনীদের জেনারেশনেই এসবকিছুর পরিনতি দেখে যেতে পারবো।
সো, কোনো আশা নাই।”