29/04/2026
ফিলিঙ্গেলার্জি: অনুভূতির মহামারি
ইদানিং বাংলাদেশে এক অদ্ভুত রোগ ছড়াইয়াছে—নাম তাহার ফিলিঙ্গেলার্জি। রোগটি এমন, যাহা শুনিলে চিকিৎসকগণও চশমা খুলিয়া চোখ মুছেন।
এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মানসিকভাবে অসুস্থ হইতে হইতে শারীরিকভাবে ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া পড়েন। তাহাদের সামনে যদি কেহ “গুপ্ত”, “রাজাকার”, “লাল”, “বট”, “মার্কিন”, “পাকি”, “নূনূস”—ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করে, তাহা হইলে তাহাদের স্নায়ুতন্ত্রে এমন গোলযোগ দেখা দেয়, যেন মস্তিষ্কে বজ্রপাত ঘটিয়াছে।
চোখ লাল হইয়া যায়, চুল খাড়া হইয়া ওঠে, মুখে ফেনা আর আচরণে উন্মাদনা। তারা চিৎকার করে, দেয়ালে মাথা ঠোকে, হাতের কাছে যা পায়—তা দিয়াই শব্দের উৎসের মোকাবেলা করে। কেহ চেয়ার ছোঁড়ে, কেহবা টেবিল ভাঙে, কেহ আবার “বাঁচাও” বলিয়া রাস্তায় দৌড়ায়।
এ রোগের বয়সসীমা নাই—যুবক, মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ—সবাই আক্রান্ত।
তবে আশার কথা, শিশুরা এখনো মুক্ত। তারা এখনো “রাজাকার” শুনিয়া কেবল প্রশ্ন করে—“ওটা কী?”
পণ্ডিতগণ বলিতেছেন, এ রোগটি একেবারে নতুন। আগে যাহা ছিলো “অ্যালার্জি”—ধুলা, ফুল, খাবার, কিংবা আবহাওয়ার কারণে—এখন তাহা হইয়াছে “ফিলিঙ্গেলার্জি”, অর্থাৎ অনুভূতির অ্যালার্জি। যে শব্দে মন কাঁপে, সেই শব্দেই শরীর কাঁপে। যে চিন্তায় মস্তিষ্কে ঝড় ওঠে, সেই চিন্তায় হাত-পা ঝিমঝিম করে।
রোগতত্ত্ব নিরাময় গবেষণা সেলের প্রধান ড. চুনাকিলাল বলিয়াছেন—
“রোগটি নতুন, তবে আগের কিছু রোগের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। আমরা সে লাইনে গবেষণা করিতেছি।”
তাঁহার মতে, এ রোগের উৎস মনোজাগতিক। অর্থাৎ, যাহারা অতিরিক্ত ভক্তি-ভয়ে আক্রান্ত, কিংবা অতিরিক্ত ঘৃণায় ভুগিতেছেন, তাহাদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি।
বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এ রোগ দেখা যায়নি। বাংলাদেশই প্রথম, যেখানে অনুভূতি হইয়াছে ব্যাধি। এটি মৌসুমী কিনা, তাহা এখনো জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যায়, নির্বাচনের মৌসুমে এর প্রকোপ বাড়ে।
যখন টেলিভিশনে বিতর্ক চলে, তখন আক্রান্তরা রিমোট ছুঁড়িয়া টিভি ভাঙে। যখন সামাজিক মাধ্যমে কেউ “বট” বা “নূনূস” লেখে, তখন তাহারা ফোন ছুঁড়িয়া মারে দেয়ালে।
ভুক্তভোগীদের পরিবার বলিতেছে -“এ রোগে আক্রান্তরা যেমন নিজেদের জন্য দুর্ভোগের কারণ, তেমনি সমাজের জন্য দায়।” কারণ, তাহারা শান্তি চায় না, যুক্তি মানে না, কেবল শব্দে প্রতিক্রিয়া দেয়। তাদের সামনে “গুপ্ত” বলিলে তারা “গুপ্তচর” খুঁজিয়া বেড়ায়, “রাজাকার” বলিলে তাহারা “যুদ্ধ” শুরু করে আর “মার্কিন” বলিলে তাহারা “বিরোধ” ঘোষণা করে।
চিকিৎসকরা বলিতেছেন, এ রোগের কোনো ওষুধ নাই। তবে কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে - যেমন, আক্রান্তদের সামনে “নূনূস” না বলা,
যত্রতত্র “বট” না লেখা আর “রাজাকার” শব্দটি কেবল ইতিহাস বইতেই রাখা।
সরকার এখন ভাবিতেছে, এ রোগীদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল স্থাপন করা হইবে। যেখানে তারা শান্তভাবে বসিয়া “গুপ্ত”, “রাজাকার”, “লাল” শব্দ শুনিয়া ধ্যান করিবে। যদি তারা শান্ত থাকে, তাহা হইলে ছাড়পত্র পাইবে।
না থাকিলে, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হইবে।
বাংলাদেশে এখন ফিলিঙ্গেলার্জি এক সামাজিক বাস্তবতা। যেই দেশে অনুভূতি এত প্রবল, সেই দেশে যুক্তি দুর্বল হইবেই। তাই বলা যায়—এ রোগের চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সহনশীলতা।
যে দিন আমরা শব্দ শুনিয়া হাসিব, রাগিব না—সেই দিনই ফিলিঙ্গেলার্জি নামক মহামারি বিলুপ্ত হইবে।
লেখক: এক ক্লান্ত পেন্সিল - বালা মুসিবতে কাতর