15/02/2025
রাত নামছে। ঢাকার জাপান গার্ডেন সিটির রাস্তাগুলো যেন একটা পুরনো ইংরেজি সিনেমার দৃশ্য—অন্ধকার গভীর, বাতাসে বয়ে যাচ্ছে মরচে পড়া লোহার সাথে বৃষ্টির কাঁচা গন্ধ। পথে পথে ঘুরছে কুকুরগুলো—যোদ্ধার মতো ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। বিড়ালগুলোও শিকারি, নীরব আর ছায়ার মতো। একসময় বনে রাজত্ব করত তারা।
এখন?
এই শহরে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই।
ঠিক তখন অন্ধকারের মধ্যে একজন লোক সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত বাড়ায়। সেই হাতে খাবার—আশার প্রতীক। কুকুরগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। বিশ্বাসের আলো জ্বলে ওঠে চোখে।
অবলা প্রাণী না জেনে বড় ভুল করে বসে। নীরব, নির্মম প্রতারণায় বিষ মেশানো খাবার তারা খায়। কয়েক মুহূর্ত পরই শরীর কেঁপে ওঠে। শুরু হয় যন্ত্রণা। রক্ত বমি। দশটা কুকুর। একটা বিড়াল। এটাই তাদের জীবনের শেষ রাত।
মৃত্যুর আগে তাদের চোখ—বড় বড়, প্রশ্নে ভরে যায়। উত্তর তো আর পাবে না। বলতেও পারবে না কে করল, কেন করল। শুধু নীরবতা—নির্মম, কঠিন নীরবতা। ভাষাহীন শিকার। সহজ টার্গেট।
নৃশংসতার গল্পটা কোথায় শুরু হয়?
এফবিআই রিপোর্ট। ১৯৯৭। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। ওদের কাছে সব হিসাব আছে। সিরিয়াল কিলার, স্কুল শ্যুটার—প্রথমেই তারা মানুষের ওপর শুরু করে না। তাদের প্রথম শিকার কুকুর। বিড়াল।
আমেরিকার ৪৩% স্কুল শ্যুটার আগে পশুদের ওপর চালিয়েছে তাদের নৃশংসতা। ভাবুন একবার।
ফিরে আসা যাক ঢাকায়। আলাদা রাস্তা, একই নৃশংসতা।
এখানে একে বলে “মব জাস্টিস।” রাস্তায় পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলা আজকাল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু যখন মানুষ হাতের কাছে নেই তখন শিকার হয় কুকুরগুলো। গরম পানি। ছুরি। বিষ মেশানো খাবার। সবকিছু জড়িত। প্রত্যেকটা মুখ সুযোগের অপেক্ষায় থাকা সম্ভাব্য খুনি। ।
ফ্ল্যাশব্যাক: রাজবাড়ী, একটা হরর শো।
একটা ঘোড়া বাঁধা। বাঁশ ঢুকিয়ে দেওয়া হলো এমন এক জায়গায় যেখানে ঢোকানোর কথা নয়।
কিন্তু কেন?
প্রতিশোধ।
ঘোড়ার ওপর নয়—ওর মালিকের ওপর। ঘোড়াটার জায়গায় একটা শিশুকে কল্পনা করুন।
তারপর ধরুন, বগুড়া। কাহালু। রাসেল। রুবেল। শরীরে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা। নাম আলাদা, পদ্ধতি একই।
নৃশংসতা শুধু পশুদের জন্য না। এটা একটা রিহার্সাল। বড় কিছু আসার আগে ছোটখাট ট্রেনিং। আর একদিন বড় মঞ্চে মানুষ হয়ে যাবে সেই শিকার।
বাংলাদেশে আইন আছে। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যান আইন । কাগজে কলমে ভালোই শোনায়। কিন্তু বাস্তবে?
এক চিলতে হাসির মত ।
আমার কাছে এ বিষয়ক আইনগুলো একটা ঠাট্টার মত লাগে।
কেউ আইনটার কথা তুললে মানুষ হাসে। ঠিক যেমন জাপান গার্ডেন সিটির পোস্টারগুলোতে লেখা:
“কুকুরপ্রেমীদের বাসায় সব বেওয়ারিশ কুকুর পাঠিয়ে দিন!”
“পরিচ্ছন্নতার জন্য কুকুরের মলমূত্র কুকুরপ্রেমীদের বাসায় পাঠান!”
যেখানে পশুর প্রতি মমতা নিয়ে মজা করা হয়, সেখানে কেউ নিরাপদ নয়।
সত্যি কথা বলতে, এই নৃশংসতা শুধু পশুদের জন্য না। এটা একটা সতর্ক সংকেত। উপেক্ষা করলে একদিন দেখবেন, রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে কোনো কুকুর না—বরং আপনার চেনা কেউ।
------------------------------------------------------------------------------------
লেখা©ফেরদৌস আকিক এলিন
৩০ নভেম্বর, ২০২৪
গেন্ডারিয়া, ঢাকা।