14/08/2026
৯.চাঁদের আলোয় মাখা নিঝুম ছাদে যখন আসির আর রিধি পরস্পরকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ির শেষ ধাপের অন্ধকার পেরিয়ে ছাদে এসে দাঁড়ালেন রিধির মা—রেহানা বেগম।
গায়ে হলুদের এত আনন্দ-উৎসবের মাঝে রিধিকে বেশ কিছুক্ষণ দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে তাকে খুঁজতেই উপরে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ছাদের দরজায় পা রাখতেই তাঁর চোখের সামনে যে দৃশ্য ফুটে উঠল, তাতে তাঁর পায়ের নিচের মাটি যেন এক মুহূর্তে সরে গেল!
তাঁদের চৌধুরীবাড়ির সুশৃঙ্খল, কঠিন ও গম্ভীর মেঝো ছেলে আসির—যার এক ধমকে পুরো পরিবার তটস্থ থাকে—সে আজ তাঁদের ঘরের ছোট মেয়ে রিধিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে! আর রিধিও কোনো দ্বিধা ছাড়া আসিরের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
রেহানা বেগমের হাতের চুড়িগুলোর ঝংকার এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাঁর চোখ দুটো বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের চরম দোলাচলে স্থির হয়ে রইল। গলার স্বর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও তিনি কঠোর ও কাঁপানো কণ্ঠে ডেকে উঠলেন, "আসির! রিধি!"
মায়ের সেই তীব্র কড়া ডাক ছাদের নীরবতা চিরে যেন এক বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল।
রিধি চমকে উঠে আসিরের বুক থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ভয়ে ও লজ্জায় ওর মুখের রক্ত যেন এক নিমেষে শুষে নেওয়া হলো। সে কাঁপতে কাঁপতে আসিরের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
আসিরও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। আসির ধীর পায়ে রেহানা বেগমের দিকে পা বাড়াল, তার চেহারায় কোনো অপরাধবোধ নেই, তবে আছে এক গভীর গম্ভীরতা।
"আম্মা..." আসির নরম গলায় কথা বলতে চাইল।
"চুপ কর আসির!" রেহানা বেগম হাত তুলে আসিরকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছিল। তিনি রিধির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, "রিধি! নিচে চল এখনই! তোর সাথে আমার কথা আছে!"
রিধি কান্নায় ভেঙে পড়ে মাথা নিচু করে মায়ের পেছনে পেছনে নিচে নেমে গেল। আসির কিছু বলতে চেয়েও রেহানা বেগমের সেই কঠোর চাহনির সামনে নিজেকে আপাতত আটকে রাখল। তবে সে বুঝতে পারল, ঝড়ের পূর্বাভাস শুরু হয়ে গেছে।
হলঘরের হৈচৈ আর কোলাহলের তোয়াক্কা না করে রেহানা বেগম রিধিকে সোজা তিনতলার এক কোণের ফাঁকা ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকিয়েই তিনি সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
"এসব কী দেখলাম আমি রিধি?" রেহানা বেগমের গলা কাঁপছিল, "আসিরের সাথে তুই এত রাতে ছাদে একা কী করছিলি? আর ও তোকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরেছিল কেন? জবাব দে আমাকে!"
রিধি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, "আম্মু... তুমি ভুল বুঝছ। আকাশ ভাইয়া ছাদে এসে আমার সাথে নোংরামি করছিল... আসির ভাইয়া শুধু আমাকে বাঁচাতে এসেছিল..."
"চুপ কর! একদম মিথ্যা কথা বলবি না!" রেহানা বেগম চরম ক্ষোভে রিধির বাহু চেপে ধরলেন, "আমি তোদের চোখের ভাষা চিনি রিধি! শুধু বাঁচানোর দৃশ্য ছিল না ওটা! আমি স্পষ্ট দেখেছি আসির তোকে কেমন ভালোবাসার চোখে আগলে রাখছিল, আর তুইও ওর বুকে মুখ গুঁজেছিলি! ছিঃ রিধি, আসির তোর ভাই, এই বাড়ির অভিভাবক সমতুল্য! তুই ওর সাথে এসব কুণ্ডলী পাকাচ্ছিস?"
"আম্মু, আসির ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে, আর আমিও—"
কথাটা শেষ করার আগেই ঘরে আছড়ে পড়ল এক বিশাল ঝড়!
রেহানা বেগম নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। এক তীব্র সশব্দে রেহানা বেগম রিধির গালে এক কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন!
থাপ্পড়ের ধাক্কায় রিধি খাটের ওপর গিয়ে পড়ল। গালটা এক মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল।
"একদম মুখের ওপর মুখে জবাব দিবি না!" রেহানা বেগম ফুঁসে উঠলেন, "তোর ওই ভালোবাসা আমি একদিনে বের করছি! এই চৌধুরীবাড়ির সম্মান, তৌসিরপর মান-সম্মান আমি তোর এই সস্তা আবেগের জন্য ধুলোয় মিশতে দেব না! ভালো চাস তো কাল সকালে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়া মাত্র বাড়ি ফিরে যাবি। আর আসিরের দিকে যদি কোনোদিন চোখ তুলে তাকিয়েছিস, তবে তোর মা মরা মুখ দেখবে!"
কথাটা বলেই রেহানা বেগম আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ধপ করে দরজা আটকে দিলেন। খাটে বসে রিধি দুহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে আসির তাকে বাঁচাল, সেই আসিরের ভালোবাসাই আজ ওর জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল!
এদিকে অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। ড্রয়িং রুমে তখন পরিবারের বড়রা ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন।
রেহানা বেগম নিচতলার করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আসিরকে দেখতে পেলেন। আসির তখনো চন্দনের সুবাস আর রক্তের ছিটে লাগা পাঞ্জাবিটা পাল্টে নিজের ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তবে তার চোখ ঘুরছিল রিধিকে খোঁজার জন্য।
"আসির, একটু শোন।" রেহানা বেগমের শান্ত অথচ বিষাক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো।
আসির থামল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে রেহানা বেগমের মুখোমুখি হলো, "বলো আম্মা।"
"পেছনের লাইব্রেরি রুমে আয়। তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।"
দুজন লাইব্রেরি রুমে ঢুকতেই রেহানা বেগম দরজাটা হালকা ভিড়িয়ে দিয়ে আসিরের দিকে ফিরলেন। তাঁর মুখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু আছে চরম এক অহংকার আর কঠিন জেদ।
"ছাদে আমি যা দেখেছি, সেটার কোনো ব্যাখ্যা তোর কাছ থেকে আমি শুনতে চাই না আসির," রেহানা বেগম সোজাসুজি কথা শুরু করলেন, "আমি শুধু তোকে একটা কথাই বলতে এসেছি—রিধি এই বাড়ির ছোট মেয়ে, আর তুই এই পরিবারের বড়দের একজন। তোর প্রতি আমাদের সবার একটা সম্মান আর বিশ্বাস ছিল।"
আসির শান্ত গলায় বলল, "আম্মা, তুমি যা ভাবছো ব্যাপারটা তেমন কোনো অন্যায় নয়। আমি রিধিকে ভালোবাসি। আমি ওকে সম্মান দিয়ে, সবাইকে জানিয়ে নিজের করে পেতে চাই।"
রেহানা বেগম এক কুৎসিত হাসলেন, "ভালোবাসো? আর আমাদের পরিবার? সমাজের মানুষ যখন জানবে ঘরের বড় ছেলে নিজের ছোট ভাই বা কাকার ঘরের মেয়েকে এইভাবে আগলে বেড়াচ্ছে, তখন তৌসিরের আর তোদের বাবার, মান-সম্মান কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা ভেবেছিস? চৌধুরীবাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে, একটা সম্মান আছে আসির!"
"সম্মানের দোহাই দিয়ে তুমি ভালোবাসাকে অন্যায় বলতে পারেন না আম্মা," আসিরের কন্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল, "আমি রিধির সাথে কোনো অসভ্যতা করিনি। আজ আকাশে নোংরামি না করলে আমি হয়তো কখনো তোমারর সামনে এভাবে আসতাম না। কিন্তু আমি রিধিকে রক্ষা করেছি এবং আমি ওকে সততার সাথেই নিজের জীবনে স্থান দিতে চাই।"
"কিন্তু আমি তা হতে দেব না!" রেহানা বেগমের গলার স্বর কঠিন থেকে কঠিনতর হলো, "পরিবারের এই সম্মান নষ্ট হতে আমি কিছুতেই দেব না আসির! রিধির বিয়ের জন্য ভালো ভালো সম্বন্ধ আসছে। আগামী মাসেই আমি ওর বিয়ে অন্য কোথাও দিয়ে দেব। তুই যদি সত্যিই এই পরিবারকে নিজের মনে করিস, তবে রিধির জীবন থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়াবি।"
আসিরের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বিপজ্জনকভাবে সংকুচিত হয়ে এলো। তার ভেতরে সুপ্ত জেদ আর কঠোরতা জেগে উঠল।
"ক্ষমা করবেন কাকিমা," আসির বরফশীতল কণ্ঠে বলল, "বড়দের সম্মান আমি চিরকাল করে এসেছি, এখনো করি। কিন্তু রিধির জীবনের সিদ্ধান্ত বা ওর ভালোবাসার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমি কাউকে দেব না—এমনকি আপনাকেও না। আপনার পরিবার বা সমাজের তথাকথিত মিথ্যে সম্মানের দোহাই দিয়ে আমি আমার শালিক পাখিকে অন্যের হাতে তুলে দেব না।"
কথাটা শুনে রেহানা বেগমের মাথার ভেতরের রক্ত যেন ছিটকে উঠল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি নিজের হাত সামলাতে পারলেন না!
'থাপ্পড়!'
এক প্রচণ্ড জোরে রেহানা বেগম আসিরের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিলেন!
লাইব্রেরি রুমের থমথমে বাতাসে সেই থাপ্পড়ের শব্দটা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরল। আসিরের মাথাটা একদিকে সামান্য হেলে গেল। যে আসির চৌধুরীকে পুরো চৌধুরীবাড়ি বা হসপিটালের কেউ কোনোদিন একটা কড়া কথা বলার সাহস পায়নি, সেই আসির আজ শান্তভাবে এক থাপ্পড় খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রেহানা বেগম রাগে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "তোর এই চরম অহংকার আর বেয়াদবি আমি মেনে নেব না আসির! পরিবার আর সমাজ কী জিনিস তা আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেব! আজ থেকে রিধির দিকে যদি এক পা-ও বাড়িয়েছিস, তবে চৌধুরীবাড়িতে যে রক্তগঙ্গা বইবে তার জন্য তুই দায়ী থাকবি!"
কথাটা বলেই রেহানা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।
আসির গালের ওপর হাত রাখল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম অবজ্ঞার হাসি।
গালের এই আঘাত বা হুমকিতে আসির চৌধুরী পিছিয়ে যাওয়ার পাত্র নয়। আসির মনে মনে পণ করল—পরিবারের এই মিথ্যে সম্মানের দেওয়াল যদি আসির আর রিধির মাঝখানে দাঁড়ায়, তবে সেই দেওয়াল ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হলেও সে তার শালিক পাখিকে নিজের বুকে আগলে রাখবে।
#তোর_আমার_গল্প
#আশু