AsU ই-বুক "মাই কোরিয়ান হাসবেন্ড"
https://link.boitoi.com.bd/0hKr9

৯.চাঁদের আলোয় মাখা নিঝুম ছাদে যখন আসির আর রিধি পরস্পরকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ির শেষ ধাপের অন্ধকার পেরিয়ে...
14/08/2026

৯.চাঁদের আলোয় মাখা নিঝুম ছাদে যখন আসির আর রিধি পরস্পরকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ির শেষ ধাপের অন্ধকার পেরিয়ে ছাদে এসে দাঁড়ালেন রিধির মা—রেহানা বেগম।

​গায়ে হলুদের এত আনন্দ-উৎসবের মাঝে রিধিকে বেশ কিছুক্ষণ দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে তাকে খুঁজতেই উপরে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ছাদের দরজায় পা রাখতেই তাঁর চোখের সামনে যে দৃশ্য ফুটে উঠল, তাতে তাঁর পায়ের নিচের মাটি যেন এক মুহূর্তে সরে গেল!

​তাঁদের চৌধুরীবাড়ির সুশৃঙ্খল, কঠিন ও গম্ভীর মেঝো ছেলে আসির—যার এক ধমকে পুরো পরিবার তটস্থ থাকে—সে আজ তাঁদের ঘরের ছোট মেয়ে রিধিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে! আর রিধিও কোনো দ্বিধা ছাড়া আসিরের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!

​রেহানা বেগমের হাতের চুড়িগুলোর ঝংকার এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাঁর চোখ দুটো বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের চরম দোলাচলে স্থির হয়ে রইল। গলার স্বর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও তিনি কঠোর ও কাঁপানো কণ্ঠে ডেকে উঠলেন, "আসির! রিধি!"

​মায়ের সেই তীব্র কড়া ডাক ছাদের নীরবতা চিরে যেন এক বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল।

​রিধি চমকে উঠে আসিরের বুক থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ভয়ে ও লজ্জায় ওর মুখের রক্ত যেন এক নিমেষে শুষে নেওয়া হলো। সে কাঁপতে কাঁপতে আসিরের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

​আসিরও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। আসির ধীর পায়ে রেহানা বেগমের দিকে পা বাড়াল, তার চেহারায় কোনো অপরাধবোধ নেই, তবে আছে এক গভীর গম্ভীরতা।
​"আম্মা..." আসির নরম গলায় কথা বলতে চাইল।

​"চুপ কর আসির!" রেহানা বেগম হাত তুলে আসিরকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছিল। তিনি রিধির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, "রিধি! নিচে চল এখনই! তোর সাথে আমার কথা আছে!"

​রিধি কান্নায় ভেঙে পড়ে মাথা নিচু করে মায়ের পেছনে পেছনে নিচে নেমে গেল। আসির কিছু বলতে চেয়েও রেহানা বেগমের সেই কঠোর চাহনির সামনে নিজেকে আপাতত আটকে রাখল। তবে সে বুঝতে পারল, ঝড়ের পূর্বাভাস শুরু হয়ে গেছে।

​হলঘরের হৈচৈ আর কোলাহলের তোয়াক্কা না করে রেহানা বেগম রিধিকে সোজা তিনতলার এক কোণের ফাঁকা ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকিয়েই তিনি সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।

​"এসব কী দেখলাম আমি রিধি?" রেহানা বেগমের গলা কাঁপছিল, "আসিরের সাথে তুই এত রাতে ছাদে একা কী করছিলি? আর ও তোকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরেছিল কেন? জবাব দে আমাকে!"

​রিধি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, "আম্মু... তুমি ভুল বুঝছ। আকাশ ভাইয়া ছাদে এসে আমার সাথে নোংরামি করছিল... আসির ভাইয়া শুধু আমাকে বাঁচাতে এসেছিল..."

​"চুপ কর! একদম মিথ্যা কথা বলবি না!" রেহানা বেগম চরম ক্ষোভে রিধির বাহু চেপে ধরলেন, "আমি তোদের চোখের ভাষা চিনি রিধি! শুধু বাঁচানোর দৃশ্য ছিল না ওটা! আমি স্পষ্ট দেখেছি আসির তোকে কেমন ভালোবাসার চোখে আগলে রাখছিল, আর তুইও ওর বুকে মুখ গুঁজেছিলি! ছিঃ রিধি, আসির তোর ভাই, এই বাড়ির অভিভাবক সমতুল্য! তুই ওর সাথে এসব কুণ্ডলী পাকাচ্ছিস?"

​"আম্মু, আসির ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে, আর আমিও—"

​কথাটা শেষ করার আগেই ঘরে আছড়ে পড়ল এক বিশাল ঝড়!

​রেহানা বেগম নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। এক তীব্র সশব্দে রেহানা বেগম রিধির গালে এক কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন!

​থাপ্পড়ের ধাক্কায় রিধি খাটের ওপর গিয়ে পড়ল। গালটা এক মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল।

​"একদম মুখের ওপর মুখে জবাব দিবি না!" রেহানা বেগম ফুঁসে উঠলেন, "তোর ওই ভালোবাসা আমি একদিনে বের করছি! এই চৌধুরীবাড়ির সম্মান, তৌসিরপর মান-সম্মান আমি তোর এই সস্তা আবেগের জন্য ধুলোয় মিশতে দেব না! ভালো চাস তো কাল সকালে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়া মাত্র বাড়ি ফিরে যাবি। আর আসিরের দিকে যদি কোনোদিন চোখ তুলে তাকিয়েছিস, তবে তোর মা মরা মুখ দেখবে!"

​কথাটা বলেই রেহানা বেগম আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ধপ করে দরজা আটকে দিলেন। খাটে বসে রিধি দুহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে আসির তাকে বাঁচাল, সেই আসিরের ভালোবাসাই আজ ওর জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল!

​এদিকে অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। ড্রয়িং রুমে তখন পরিবারের বড়রা ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন।

​রেহানা বেগম নিচতলার করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আসিরকে দেখতে পেলেন। আসির তখনো চন্দনের সুবাস আর রক্তের ছিটে লাগা পাঞ্জাবিটা পাল্টে নিজের ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তবে তার চোখ ঘুরছিল রিধিকে খোঁজার জন্য।

​"আসির, একটু শোন।" রেহানা বেগমের শান্ত অথচ বিষাক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো।

​আসির থামল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে রেহানা বেগমের মুখোমুখি হলো, "বলো আম্মা।"

​"পেছনের লাইব্রেরি রুমে আয়। তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।"

​দুজন লাইব্রেরি রুমে ঢুকতেই রেহানা বেগম দরজাটা হালকা ভিড়িয়ে দিয়ে আসিরের দিকে ফিরলেন। তাঁর মুখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু আছে চরম এক অহংকার আর কঠিন জেদ।

​"ছাদে আমি যা দেখেছি, সেটার কোনো ব্যাখ্যা তোর কাছ থেকে আমি শুনতে চাই না আসির," রেহানা বেগম সোজাসুজি কথা শুরু করলেন, "আমি শুধু তোকে একটা কথাই বলতে এসেছি—রিধি এই বাড়ির ছোট মেয়ে, আর তুই এই পরিবারের বড়দের একজন। তোর প্রতি আমাদের সবার একটা সম্মান আর বিশ্বাস ছিল।"

​আসির শান্ত গলায় বলল, "আম্মা, তুমি যা ভাবছো ব্যাপারটা তেমন কোনো অন্যায় নয়। আমি রিধিকে ভালোবাসি। আমি ওকে সম্মান দিয়ে, সবাইকে জানিয়ে নিজের করে পেতে চাই।"

​রেহানা বেগম এক কুৎসিত হাসলেন, "ভালোবাসো? আর আমাদের পরিবার? সমাজের মানুষ যখন জানবে ঘরের বড় ছেলে নিজের ছোট ভাই বা কাকার ঘরের মেয়েকে এইভাবে আগলে বেড়াচ্ছে, তখন তৌসিরের আর তোদের বাবার, মান-সম্মান কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা ভেবেছিস? চৌধুরীবাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে, একটা সম্মান আছে আসির!"

​"সম্মানের দোহাই দিয়ে তুমি ভালোবাসাকে অন্যায় বলতে পারেন না আম্মা," আসিরের কন্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল, "আমি রিধির সাথে কোনো অসভ্যতা করিনি। আজ আকাশে নোংরামি না করলে আমি হয়তো কখনো তোমারর সামনে এভাবে আসতাম না। কিন্তু আমি রিধিকে রক্ষা করেছি এবং আমি ওকে সততার সাথেই নিজের জীবনে স্থান দিতে চাই।"

​"কিন্তু আমি তা হতে দেব না!" রেহানা বেগমের গলার স্বর কঠিন থেকে কঠিনতর হলো, "পরিবারের এই সম্মান নষ্ট হতে আমি কিছুতেই দেব না আসির! রিধির বিয়ের জন্য ভালো ভালো সম্বন্ধ আসছে। আগামী মাসেই আমি ওর বিয়ে অন্য কোথাও দিয়ে দেব। তুই যদি সত্যিই এই পরিবারকে নিজের মনে করিস, তবে রিধির জীবন থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়াবি।"

​আসিরের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বিপজ্জনকভাবে সংকুচিত হয়ে এলো। তার ভেতরে সুপ্ত জেদ আর কঠোরতা জেগে উঠল।

​"ক্ষমা করবেন কাকিমা," আসির বরফশীতল কণ্ঠে বলল, "বড়দের সম্মান আমি চিরকাল করে এসেছি, এখনো করি। কিন্তু রিধির জীবনের সিদ্ধান্ত বা ওর ভালোবাসার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমি কাউকে দেব না—এমনকি আপনাকেও না। আপনার পরিবার বা সমাজের তথাকথিত মিথ্যে সম্মানের দোহাই দিয়ে আমি আমার শালিক পাখিকে অন্যের হাতে তুলে দেব না।"

​কথাটা শুনে রেহানা বেগমের মাথার ভেতরের রক্ত যেন ছিটকে উঠল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি নিজের হাত সামলাতে পারলেন না!

​'থাপ্পড়!'
​এক প্রচণ্ড জোরে রেহানা বেগম আসিরের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিলেন!

​লাইব্রেরি রুমের থমথমে বাতাসে সেই থাপ্পড়ের শব্দটা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরল। আসিরের মাথাটা একদিকে সামান্য হেলে গেল। যে আসির চৌধুরীকে পুরো চৌধুরীবাড়ি বা হসপিটালের কেউ কোনোদিন একটা কড়া কথা বলার সাহস পায়নি, সেই আসির আজ শান্তভাবে এক থাপ্পড় খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

​রেহানা বেগম রাগে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "তোর এই চরম অহংকার আর বেয়াদবি আমি মেনে নেব না আসির! পরিবার আর সমাজ কী জিনিস তা আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেব! আজ থেকে রিধির দিকে যদি এক পা-ও বাড়িয়েছিস, তবে চৌধুরীবাড়িতে যে রক্তগঙ্গা বইবে তার জন্য তুই দায়ী থাকবি!"

​কথাটা বলেই রেহানা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

​আসির গালের ওপর হাত রাখল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম অবজ্ঞার হাসি।

​গালের এই আঘাত বা হুমকিতে আসির চৌধুরী পিছিয়ে যাওয়ার পাত্র নয়। আসির মনে মনে পণ করল—পরিবারের এই মিথ্যে সম্মানের দেওয়াল যদি আসির আর রিধির মাঝখানে দাঁড়ায়, তবে সেই দেওয়াল ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হলেও সে তার শালিক পাখিকে নিজের বুকে আগলে রাখবে।

#তোর_আমার_গল্প
#আশু

নিজের কিডন্যাপকারীকে বিয়ে করতে হচ্ছে ফিহার তাও আবার পরিবারের সম্মতিতে। ড্রাইং রুম থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের সুরটা ফিহার কান...
14/08/2026

নিজের কিডন্যাপকারীকে বিয়ে করতে হচ্ছে ফিহার তাও আবার পরিবারের সম্মতিতে।

ড্রাইং রুম থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের সুরটা ফিহার কানে বিষের মতো বিধছে। লাল বেনারসি, হাতে মেহেদি আর ভারী গহনায় মুড়ে সে কাঁচের আয়নার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী সাহেব আসবেন, সই হবে কাবিননামায়। অথচ মাত্র তিন দিন আগেও এই দৃশ্যটার কথা সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় হয়রনি হলো, যে মানুষটার হাতে আজ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সে অন্য কেউ নয়—তার নিজের খালাতো ভাই, ফারদিন তালুকদার।

আয়নায় নিজের রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে ফিহার বারবার মনে পড়ছে তার জীবনটা মাত্র কয়েকটা দিনে কীভাবে তছনছ হয়ে গেল। তার দুই বছরের ভালোবাসার মানুষটার সাথে বিয়ে প্রায় চূড়ান্তই ছিল। কিন্তু হঠাৎই বদলে গেল দৃশ্যপট।

​তিন দিন আগে ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে গাড়ি আটকে মুখ চেপে ধরে যখন ওকে ঢাকার বাইরের এক ফার্মহাউসে আটকে রাখা হয়েছিল, ফিহা ভেবেছিল তার জীবন শেষ। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা পর ঘরের আলো জ্বলতেই মাস্ক খুলে যখন সামনে এসে দাঁড়ায় ফারদিন, তখন ফিহার পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল। ফারদিন তখন অত্যন্ত শান্ত গলায় বলেছিল, "অন্য কারো হওয়ার দুঃসাহস করবি না ফিহা। তুই শুধু ফারদিন তালুকদারের।"

ফিহা যখন কিডন্যাপ হয়, তখন পুরো পরিবারে তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারের পর ফিহা যখন বাড়ি ফেরে, ততক্ষণে সব শেষ। সমাজে জানাজানি আর মেয়েকে নিয়ে কটু কথার আশঙ্কায় আগের পাত্র পক্ষ এক বাক্যে এই বিয়ে ভেঙে দেয়। মেয়ের এমন বিপদে যখন পরিবার পুরোপুরি বিচলিত ও দিশেহারা, ঠিক সেই সুযোগটাই নেয় ফারদিন তালুকদার।

​ফারদিন ফিহার নিজের খালাতো ভাই। মাস্টার্সে সবেমাত্র ভর্তি হলেও পড়াশোনার পাশাপাশি সে বাবার বিজনেস সামলাচ্ছে দক্ষতা দিয়ে। পরিপাটি, দায়িত্বশীল আর একদম পারফেক্ট ছেলে হিসেবে পরিবারে ফারদিনের আলাদা একটা মর্যাদা আছে। তাই পরিবার যখন সংকটে, ফারদিন এগিয়ে এসে ফিহাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।

​প্রস্তাব শুনে সবাই যেন একমুহূর্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ফিহার বাবা-মা তো বটেই, খালা আরিদা বেগম এবং খালু ফরিদ তালুকদারও অত্যন্ত খুশি মনে মেনে নেন। ফারদিনের ছোট ভাই ফাহিম তো আনন্দে সারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। সবার চোখে ফারদিন একজন মহানায়ক, যে বিপদের দিনে পুরো পরিবারের সম্মান বাঁচাল।

​একমাত্র ফিহাই জানে আসল সত্যটা। যে মানুষটাকে সবাই আজ মাথ তুলছে, ৩ দিন আগে মুখ চেপে ধরে গাড়ি থামিয়ে তাকে কিডন্যাপ করা লোকটাও অন্য কেউ নয়—এই ফারদিন!

কিন্তু ফিহা চাইলেও এই সত্য পরিবারকে বলতে পারবে না। ছোটবেলা থেকেই ফারদিন আর ফিহার সম্পর্কটা ‘সাপ-নেউলে’। সারাক্ষণ ঝগড়া লেগে থাকত। এখন যদি সে বলে ফারদিন তাকে কিডন্যাপ করেছিল, তবে সবাই একে ফিহার বাহানা বা কোনো নতুন পাগলামি ভেবে উড়িয়ে দেবে। কেউ বিশ্বাস করবে না যে এমন শান্ত ও আদর্শ একটা ছেলে নিজের বোনকে কিডন্যাপ করতে পারে।

দরজা খোলার শব্দে ফিহার ভাবনার জট খোলে। বিয়ের পাঞ্জাবি গায়ে দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ফারদিন। ঠোঁটের কোণে বিজয়ের সেই চেনা তীক্ষ্ণ হাসি। পাশ থেকে আরিদা বেগম হেসে উঠে বললেন, "ফারদিন, ভেতরে আয়। কাজী সাহেব রেডি।"

​সবাই রুম থেকে বের হতেই ফারদিন ধীর পায়ে এসে ফিহার ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি হতেই সে একটু ঝুঁকে ফিহার কানে ফিসফিস করে বলে, "তোর ওই দুই বছরের রিলেশনের ভূত আমি এক দিনেই নামিয়ে দিয়েছি, ফিহা। পুরো পরিবার আজ আমায় মাথায় তুলে রাখছে, আর তুই চাইলেও কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারবি না। বলছিলাম না রাঙা বউ, তুই শুধু ফারদিন তালুকদারের?"

​ফিহা ক্ষোভে ও কষ্টে বেনারসির আঁচল চেপে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে। আজ থেকে সে নিজের শত্রুর ঘরেই বন্দি হতে চলেছে, তা-ও আবার পরিবারের শতভাগ খুশিমনে দেওয়া সম্মতিতে।

চলবে.....

#রাঙা_বউ
#লেখিকা_আশু

২.সান নিজের গালে হাত দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইল, আর সোয়া তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাংলোর মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। সানের ঠোঁটের...
12/08/2026

২.সান নিজের গালে হাত দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইল, আর সোয়া তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাংলোর মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। সানের ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে উঠল এক নির্মম, বিপজ্জনক হাসি।

​"এর হিসাব তো আমি কড়ায়-গণ্ডায় কষে নেব, আমার চড়ুই পাখি! তোর আর তোর পুরো পরিবারের কাছ থেকে!" বিড়বিড় করে কথাটা বলেই সান পকেট থেকে ফোন বের করল।

​"রানা, চড়ুই যেন নিরাপদে বাড়ি পৌঁছায়। তবে ওর ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখবি। আর হ্যাঁ, আজাদ চৌধুরীকে জানিয়ে দে, তার ধ্বংসের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে।"

​গাড়িতে বসে সোয়ার তখনও রাগে হাত-পা কাঁপছিল। কিন্তু রাগ কমতেই তার মনে হাজারটা প্রশ্ন ভিড় জমাতে শুরু করল। সানের চোখ দুটোতে সে শুধুই রাগ দেখেনি, দেখেছিল এক পৈশাচিক ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুন। কিন্তু কেন? সান ভাইয়া... না, মিস্টার সান ওকে 'নরপশুর মেয়ে' বলল কেন? তার বাবা তো একজন সম্মানিত ব্যবসায়ী!

​বাড়ি পৌঁছে সোয়া সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। কিন্তু তার মন মানছিল না। কিছু একটা তো গোপন করা হচ্ছে তার কাছ থেকে।

​রাত তখন গভীর।
সোয়া আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে তার বাবার স্টাডি রুমের দিকে এগোল। দরজাটা সামান্য ফাঁক করা ছিল, ভেতরে আলো জ্বলছে। সোয়া উঁকি দিয়ে দেখল, তার বাবা আজাদ চৌধুরী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন মুখে ঘরে পায়চারি করছেন আর কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছেন।
​আজাদ চৌধুরীর গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক, "তুমি বলছ সান ফিরে এসেছে? কিন্তু কীভাবে? দশ বছর আগে তো সালমান চৌধুরীর পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে শহর ছেড়েছিল! ও এত ক্ষমতা, এত টাকা কোথায় পেল?"
​সোয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সালমান চৌধুরী—সানের বাবা!

​আজাদ চৌধুরী আবার বলে উঠলেন, "শোনো, কোনোভাবেই যেন সালমান চৌধুরীর পুরনো কেসের ফাইলটা রিওপেন না হয়! ওটা যদি সামনে আসে, তবে আমি আর জেলে যাওয়া থেকে বাঁচব না। সান যদি জানতে পারে যে সালমান চৌধুরীর মিলে আগুন আমি লাগিয়েছিলাম, আর ওর বাবাকে ব্ল্যাকমেইল করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিলাম—তবে সান আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে!"

​দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোয়ার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। তার আদর্শ বাবা... একজন খুনি? একজন জালিয়াতিবাজ?

​সোয়া ভয়ে ও স্তম্ভিত হয়ে দুই পা পিছিয়ে আসতেই তার পা গিয়ে লাগল পাশে রাখা একটা ফুলদানিতে। সশব্দে ফুলদানিটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল!

​"কে ওখানে?" আজাদ চৌধুরী চমকে উঠে দরজা খুলে বাইরে এলেন।

​সামনে সোয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আজাদ চৌধুরীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সোয়ার চোখে তখন অঝোর ধারায় জল ঝরছে।

​"বাবা... তুমি... তুমি সান ভাইয়াদের সাথে এটা করেছিলে?" সোয়ার গলা কাঁপছিল।

​আজাদ চৌধুরী নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বললেন, "সোয়া! তুই এত রাতে এখানে কি করছিস? ওসব ব্যবসায়িক কথা, তুই বুঝবি না। ঘরে যা!"

​"আমি সব শুনেছি বাবা!" সোয়া চিৎকার করে উঠল, "তুমি সান ভাইয়ার বাবাকে মেরে ফেলেছ! তুমি ওদের রাজপ্রাসাদ থেকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিলে! তাই সান ভাইয়া আজ আমাকে বলছিল আমি নরপশুর মেয়ে!"

​আজাদ চৌধুরী কঠোর হয়ে সোয়ার হাত চেপে ধরলেন, "চুপ একদম চুপ! যা শুনেছিস সব ভুলে যা। কাল সকালেই তোকে আমি লন্ডনে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই শহরে তোর থাকা আর নিরাপদ নয়।"

​"আমি কোথাও যাব না!" সোয়া হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে ভেতর থেকে লক করে দিল।
​সারা রাত সোয়া একফোঁটাও ঘুমাতে পারল না। একপাশে তার বাবার চরম পৈশাচিক সত্য, আর অন্যপাশে সানের সেই ভয়ঙ্কর হিংস্র চাহনি। সোয়া বুঝতে পারছিল, সান কেন তাকে আজকে 'নরপশুর মেয়ে' বলেছে। সানের ঘৃণার পেছনে যে কতটা বিশাল এক অবিচার লুকিয়ে আছে, তা ভেবে সোয়ার নিজের অস্তিত্বের ওপর ঘৃণা হতে লাগল।

​পরদিন সকালে...
​সোয়া ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হতেই দেখল বাড়ির বাইরে দুটো কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে এলো সানের ডানহাত রানা।

​"ম্যাডাম, বস আপনাকে ডেকেছেন," রানা শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল।

​"আমি যাব না," সোয়া শক্ত গলায় বলল।
​রানা একটা ট্যাবলেট স্ক্রিন সোয়ার সামনে ধরল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে আজাদ চৌধুরীর অফিসের সমস্ত নথিপত্র সানের লোকজনের দখলে। সান স্ক্রিনে ভেসে উঠে ঠোঁট কামড়ে বলল, "আসবি না চড়ুই? তাহলে কি তোর প্রিয় বাবাকে এখনই পুলিশের হাতে তুলে দেব? তোর বাবার ১০ বছর আগের কেসের সব অরিজিনাল ফাইল এখন আমার টেবিলে।"

​সোয়া চোখ বুজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, সানের পাতানো জালে সে আর তার পরিবার পুরোপুরি আটকে গেছে।

​সোয়া ধীর পায়ে গাড়িতে গিয়ে বসল।
​আধ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি এসে থামল সানের সেই রহস্যময় বাংলোর সামনে। সোয়া যখন সানের বিশাল স্টাডি রুমে ঢুকল, সান তখন রিভলভার পরিষ্কার করছিল।

​সোয়াকে দেখে সান অস্ত্রটা টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

​"তো, আমার চড়ুই পাখি নিজের পায়ে উড়ে এসেছে দেখা যাচ্ছে," সান তাচ্ছিল্যের সুর তুলে বলল।

​সোয়া সানের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখে আর কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক গভীর বিষাদ।

​"আমি সব জেনে গেছি সান ভাইয়া," সোয়া খুব নিচু সারে বলল।

​সান সামান্য চমকাল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের উগ্র ভাব বজায় রেখে বলল, "ওহ! জেনে গেছিস যে তোর বাবা কত বড় একটা শয়তান? জেনে গেছিস যে তুই একটা খুনি আর প্রতারকের রক্ত বয়ে বেড়াচ্ছিস?"

​"হ্যাঁ, জেনেছি," সোয়া সানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল। "আমার বাবা যা করেছে, তা চরম অন্যায়। কিন্তু সান ভাইয়া... আমার অপরাধটা কোথায় ছিল? আমি তো তোমাকে ভাইয়ের মতো ভালোবেসেছিলাম, শ্রদ্ধা করেছিলাম। তবে আমার ওপর এই ঘৃণা কেন?"

​'ভাই' শব্দটা শুনতেই সানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় টেবিল ডিঙিয়ে সোয়ার কলার চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে টানল!

​"ভাই বলা বন্ধ কর!" সান গর্জনে ফেটে পড়ল। "তুই জানিস না তোর বাবা আমার মায়ের সাথে কি করেছিল? আমার মা হসপিটালে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল তোর বাবার কারণে! আমি প্রতিটা রাতে প্রতিশোধের আগুনে পুড়েছি চড়ুই! তোকে যখনই দেখি, তোর ওই নিষ্পাপ চেহারার পেছনে তোর বাবার পাপের চেহারাটা আমার ভেসে ওঠে!"

​সোয়া কোনো বাধা দিল না। সে সানের বুকের ওপর হাত রেখে সানের চোখের জলের ভেজা ছাপটা দেখল, যা সান লুকানোর চেষ্টা করছিল।

​"তাহলে আমাকে মেরে ফেলো," সোয়া শান্ত গলায় বলল। "আমার বাবাকে জেলে পাঠাও, আর আমাকে মেরে তোমার প্রতিশোধ শেষ করো।"
​সান সোয়ার মুখের দিকে তাকাল। সোয়ার এই আত্মসমর্পণ সানের ক্ষোভকে যেন আরও উসকে দিল। সান সোয়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

​"মেরে ফেলা খুব সহজ চড়ুই," সানের ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। "আমি তোকে মারব না। তোকে আমি এই বাংলোয় বন্দি রাখব। তোর বাবাকে চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখবি তুই। তোর প্রতিটা কান্না, তোর প্রতিটা ব্যাকুলতা হবে আমার প্রতিশোধের খাদ্য!"

​সোয়া বুঝতে পারল, অতীতের এই আগ্নেয়গিরি এখন আর শান্ত হওয়ার নয়। সান প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে গেছে, আর সেই আগুনে সোয়াকে প্রতিনিয়ত পুড়তে হবে।

চলবে..
তবে এই পর্বে প্রত্যাশাস্বরুপ রেসপন্স না আসলে পরের পর্ব আসবে না। দুঃখিত।

#চড়ুই_পাখি
#লেখিকা_আশু

৮.আকাশের ওমন লালসা ভরা চাহনি আর বিষাক্ত কথাগুলো শোনার পর রিধির মাথার ভেতরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে ব্যাকুল হয়ে এদিক-ওদ...
12/08/2026

৮.আকাশের ওমন লালসা ভরা চাহনি আর বিষাক্ত কথাগুলো শোনার পর রিধির মাথার ভেতরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে ব্যাকুল হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল, কিন্তু ছাদের বিশাল নিঝুমতায় তাকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই। পেছনের দেওয়াল আর রেলিং ওর পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে, আর সামনে নরপশুর মতো এক শয়তান।

​আকাশ আর এক মুহূর্তও সময় না দিয়ে কুৎসিত এক হাসি নিয়ে রিধির দিকে হাত বাড়াল, "অনেক ভাব দেখিয়েছো, আর না মেরি জানু—"

​কিন্তু আকাশের হাত রিধির শরীর স্পর্শ করার আগেই যেন বাজ পড়ল নিঝুম ছাদে! ​অন্ধকারের ভেতর থেকে আচমকা প্রকাণ্ড এক হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সাদা-কালো পাঞ্জাবি পরা এক সুপুরুষ ছায়া। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক জোড়া শক্ত, লোহার মতো হাত আকাশের শার্টের কলার চেপে ধরল। আর তার ঠিক পর মুহূর্তেই এক বিকট সশব্দে বাতাসে ভেসে এলো।

​আসিরের দানবীয় শক্তির এক সজোড় ঘুষি গিয়ে লাগল আকাশের নাকের ওপর!

​"আআআহহহ!" বলে বিকট চিৎকার দিয়ে আকাশ পিছিয়ে ছাদের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ওর নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেময়।

​রিধি স্তব্ধ হয়ে ভয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল। আসির ধীর পায়ে আকাশের দিকে এগিয়ে গেল। আসিরের চোখ দুটো তখন আর মানুষের মতো নেই, তাতে জ্বলছে নিখাদ রক্তের তৃষ্ণা, অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডব। পুরোটা সময় সে দূর থেকে রিধিকে চোখে চোখে রেখেছিল, আকাশকে ওর পিছু নিতে দেখেই আসিরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বিপদ সংকেত দিয়েছিল। আর ছাদে এসে আকাশের শেষ বাক্যটা শোনামাত্র আসিরের ভেতরের শান্ত ডাক্তার মানুষটা একদম নিখোঁজ হয়ে গেছে।

​আসির নিচু হয়ে আবার আকাশের কলার টেনে তাকে দাঁড় করাল।

​"আমার... আমার শালিক পাখির দিকে কু-নজর দেওয়ার সাহস তোর কীভাবে হলো রে ?" আসিরের গলা দিয়ে গর্জন চিরে বের হলো।

​একটার পর একটা ঘুষি, লাথি আর চড় বৃষ্টিধারার মতো পড়তে লাগল আকাশের ওপর। আসির যেন পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছে! আকাশের চেঁচামেচি, রক্তে ভেসে যাওয়া মুখ কোনো কিছুই আসিরকে থামাতে পারছিল না। সে আকাশকে ছাদের রেলিংয়ের দিকে চেপে ধরে ঝুলিয়ে দিল।

​"আজকে তোকে এই ছাদ থেকে নিচে ফেলে হাড়গোড় গুঁড়ো করে দেব! তোর সাহস কত বড়—তোর চোখ আমি গাল থেকে উপড়ে নেব!" আসির গর্জাল।

​আকাশ রক্তের বন্যায় ভাসতে ভাসতে বাঁচার জন্য আকুতি জানাতে লাগল, "আমাকে... ছেড়ে দাও... ভাইয়া, ভুল হয়ে গেছে... ছেড়ে দাও!"

​কিন্তু আসিরের মাথায় তখন খুনের নেশা চেপে বসেছে। সে সত্যিই আকাশকে নিচে ফেলে দেওয়ার জন্য হাত তুলল।

​সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে রিধি নিজের সব কান্না আর ভয় ভুলে দৌড়ে এসে আসিরের হাত দুটো পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।

​"আসির ভাইয়া না! ছেড়ে দাও ওকে! মরে যাবে লোকটা, ছাইড়ো না হাত! প্লিজ আসির ভাইয়া!" রিধি চিৎকার করে কেঁদে উঠল, আসিরের পিঠে মুখ গুঁজে সে আকুল হয়ে আকুতি জানাল, "আমার দিকে তাকাও! প্লিজ ওকে ছেড়ে দাও! তোমার হাতে রক্ত দেখতে চাই না আমি!"

​'রিধির ডাকটা আর রিধির বুকের কাঁপুনি আসিরের ওই উন্মাদ মস্তিষ্কে যেন এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢেলে দিল।
​আসির হাত ছেড়ে দিল। আকাশ রক্তে ভেজা মেঝেময় এক বস্তার মতো ধপ করে পড়ে রইল, তারপর কোনোমতে প্রাণের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল।

​ছাদে তখন শুধুই আসিরের হাঁপানোর শব্দ আর রিধির ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ।

​আসির ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল। ওর ডান হাতের কড়াগুলো রক্তে লাল হয়ে আছে, শার্টের হাতায় রক্তের ছিটে। কিন্তু ওর নিজের কোনো খেয়াল নেই, ওর চোখ শুধুই রিধির ওপর। রিধি তখন ভয়ে-আতঙ্কে কেঁদে কুল পাচ্ছে না, ওর হাত-পা সব বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে।

​আসির এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। আজ আর কোনো নীতি-নিয়ম বা ভুলের ভয় ওকে আটকাতে পারল না। সে সজোরে রিধিকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। শক্ত, বেপরোয়া এক আলিঙ্গনে সে রিধিকে নিজের বুকের সাথে মিষে নিতে চাইল।

​"কিচ্ছু হয়নি... কিচ্ছু হয়নি, শালিক পাখি," আসিরের হাঁপাতে থাকা রুদ্ধ স্বর ভেসে এলো রিধির মাথার ওপর থেকে। আসির রিধির মাথায়, চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিল। "আমি থাকতে তোর গায়ে একটা আঁচড় কাটবে, এমন কেউ জন্মেছে এই পৃথিবীতে? একদম কাঁদবি না..."

​রিধিও আজ আর আসিরকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারল না। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, লজ্জা আর আসিরের ওপর জমে থাকা অভিমানের পাহাড়—সব বাঁধ ভেঙে এক নিমেষে ভেসে গেল। সে আসিরের পাঞ্জাবিটা দুহাতে খামচে ধরে ওর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

​"কেন এত ভুল বোঝো আমাকে?" রিধি আসিরের বুকে মাথা কুটে কাঁদতে কাঁদতে অভিমান উগরে দিল, "কেন বোঝো না যে তোমাকে ছাড়া আমার কেউ নেই? না বুঝে থাপ্পড় মেরে দিলে... আবার আজ এভাবে বাঁচালে... আমি কীভাবে বাঁচব তোমার এই পাগলামি নিয়ে, বলো?"

​আসির রিধির মুখটা পরম ভালোবাসায় দুহাতে তুলে ধরল। আসিরের নিজের চোখেও আজ ফোঁটা ফোঁটা জল। সে আঙুল দিয়ে রিধির চোখের জল আর গালের সেই আঘাতের দাগটার ওপর আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল।

​"আর কোনোদিন না..." আসির নিচু, ভারী কিন্তু চরম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ গলায় বলল, "আর কোনোদিন তোকে ভুল বুঝব না। আর কোনোদিন তোর চোখে এক ফোঁটা জল আসতে দেব না। ইন্টারের রেজাল্ট যা-ই হোক রিধি, এই আসির চৌধুরী তোর সব অভিমান মেনে নিয়ে তোকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে পেতে চায়। তুই কি দিবি আমায় সেই অধিকার?"

​চাঁদের আলোয় ভেজা সেই নিঝুম ছাদে, সানাইয়ের দূরবর্তী মিষ্টি সুরের মধ্যে রিধি আসিরের ভেজা চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো সন্দেহ নেই, কোনো অন্যায় নেই আছে শুধুই এক নিঃশ্বাসের ভালোবাসা আর আগলে রাখার অসীম অঙ্গীকার।

​রিধি আর কোনো কথা বলল না। আসিরের শক্ত বুকে নিজের গালটা এলিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে সম্মতি জানাল যেখানে চিরদিনের মতো জমাট বেঁধে গেল এক ডাইনোসর আর তার শালিক পাখির নিখাদ প্রেমের গল্প।

চলবে....

#তোর_আমার_গল্প
#লেখিকা_আশু

৫ বছর পর বিয়েতে পলায়িত নিজের না হওয়া বউকে দেখে থমকে যায় জুবায়ের চৌধুরী রিক। ​ঠিক পাঁচ বছর। পাঁচটা বছর কম সময় নয়। এক যুগে...
11/08/2026

৫ বছর পর বিয়েতে পলায়িত নিজের না হওয়া বউকে দেখে থমকে যায় জুবায়ের চৌধুরী রিক। ​ঠিক পাঁচ বছর। পাঁচটা বছর কম সময় নয়। এক যুগের সমান লম্বা মনে হয় যখন বুকের ভেতর জমে থাকে কোনো অমীমাংসিত হিসেব, কোনো না বলা অভিমান।

​রিকের পিএ শিহাব দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল। হাতে ফাইল। "স্যার, আমাদের নতুন জয়েন করা হেড অব ডিজাইন চলে এসেছেন। মিটিং রুমে ওয়েট করছেন। বোর্ডের সবাই উপস্থিত।"

​রিক না ঘোরেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "হ্যাঁ, আসছি। কন্ট্রাক্ট পেপারস রেডি?"

​"ইয়েস স্যার। দুই বছরের এক্সক্লুসিভ কন্ট্রাক্ট। আপনি যেভাবে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছিলেন—উনার নাম, ব্র্যান্ড ভ্যালু আর সোশ্যাল মিডিয়া প্রেজেন্সের উপর বেস করে অফার দেওয়া হয়েছিল। উনি অলরেডি সই করেছেন।"

​"গুড।"

​গত দুই বছরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম ফেলে দেওয়া ফ্যাশন ব্র্যান্ড 'অনিয়া'স এথনিক'-এর ক্রিয়েটিভ হেডকে অবশেষে তাদের 'চৌধুরী ফ্যাশন হাউজ'-এ নিয়ে আসা গেছে। ইনস্ট্রাগ্রামে মিলিয়ন ফলোয়ার, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সপ্তাহে কাজ করার অভিজ্ঞতা—মেয়েটার কাজ রিক নিজেই বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে শুধুমাত্র ডিজিটাল পোর্টফোলিও আর প্রোফাইল দেখেই সে হায়ার করার সিদ্ধান্ত নেয়, ফেস-টু-ফেস ইন্টারভিউয়ের প্রয়োজন বোধ করেনি। বিজনেস ইজ বিজনেস। যার কাজ নিখুঁত, তার সাথে মুখোমুখি বসার কোনো জরুরি তাগিদ কখনো অনুভব করেনি রিক।

​মিটিং রুমের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল রিক। বোর্ডের সবাইকে সালাম জানিয়ে সে যখন নিজের নির্ধারিত সিটের দিকে এগোল, ঠিক তখনই উল্টো দিকের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল নতুন নিযুক্ত হেড ডিজাইনার।

​"মিট আওয়ার নতুন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, মিস—" শিহাবের কথাটা শেষ হলো না।

​রিকের পা দুটো যেন রুমের শক্ত মেঝেতে আটকে গেল। বুকের ভেতর বিশাল এক তরঙ্গ একসাথে আছড়ে পড়ল, যার ধাক্কায় ঘরের সব আলো, মানুষের উপস্থিতি, বাতাসের আর্দ্রতা—সব কিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল।

​সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির পরনে একদম সাধারণ কিন্তু মার্জিত অফ-হোয়াইট কূর্তি আর জিন্স পরিহিত। চুলগুলো ঢিলেঢালাভাবে পেছনে বাঁধা, কোনো আড়ম্বর নেই। চোখের দৃষ্টিতে একটা অস্বাভাবিক স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস।

"​আনায়া। আনায়া খান অনি।"

​সেই আনায়া, যে আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে গায়ে হলুদ আর বিয়ের ঠিক মাঝের রাতে একটা চিঠি ফেলে রেখে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। রিকের পরিবার, বন্ধুমহল, সমাজের চোখে সেদিন জুবায়ের চৌধুরী রিককে বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এক একাকী, অপমানিত বর্বাদ বর।

​রিকের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ ফুটল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে ভেসে উঠল নীল শিরা। চোখের তারা থমকে গেছে আনায়ার মুখে।
​আনায়াও তাকাল। কিন্তু তার চোখে কোনো অপরাধবোধের ছাপ পাওয়া গেল না। বরং ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক চিলতে শান্ত, পেশাদার হাসি। সে এক ধাপ এগিয়ে এসে রিকের দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিল।

​"হ্যালো মি. চৌধুরী। আই অ্যাম আনায়া খান। থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর দিস অপরচুনিটি।"

​রিক সেই বাড়ানো হাতের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল আনায়ার চোখের গভীরে। ঘরে উপস্থিত সবাই নিশ্চুপ, তারা বুঝে উঠতে পারছে না ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ এত নিচে নেমে গেল কেন।

​রিক হাত মেলাল না। টেবিলের ওপর নিজের ফাইলের ওপর হাত রেখে শান্ত, অথচ বিষাক্ত কণ্ঠে বলল,

"ওয়েলকাম টু চৌধুরী গ্লোবাল, মিস অনি। আশা করি আপনার আগামী দু'বছর আমাদের চুক্তি অনুযায়ী বেশ কাটবে।"

​আনায়া নিজের হাতটা ধীরগতিতে নামিয়ে নিল। কিন্তু তার চেহারায় কোনো ভাঙন ধরল না। সে হালকা হেসে বলল, "আমি কাজের ব্যাপারে সবসময় ১০০ পার্সেন্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, মি. চৌধুরী। আশা করি আপনাকে নিরাশ করব না।"

​মিটিং শেষ হতেই রিক নিজের ব্যক্তিগত কেবিনে ফিরে এলো। দরজায় লক লাগিয়ে দিয়ে সে ধপ করে বসে পড়ল রিভলভিং চেয়ারে। জামার ওপরের বোতামটা খুলে দিল সে, মনে হচ্ছে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

​পাঁচ বছর আগে...
​রিক আর আনায়ার বিয়েটা পারিবারিক হলেও, রিক আনায়াকে ভালোবেসে ফেলেছিল প্রথম দেখাতেই। কলেজ শেষ বর্ষে পড়া সেই চঞ্চল, মেয়েটাকে সে মনের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে নিজের স্ত্রী করতে চেয়েছিল। বিয়ের আয়োজন হয়েছিল রাজকীয়। কিন্তু বিয়ের আগের রাতে আনায়া নিজের ঘর থেকে গায়েব হয়ে যায়। রেখে যায় মাত্র চার লাইনের একটা চিরকুট—

"​‘সরি, আব্বু, আমি এই বিয়েটা করতে পারছি না। আমার নিজের পথ নিজেকেই বেছে নিতে হবে। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না, কারণ তোমরা আমাকে পাবে না। ভুল বুঝে থাকলে ক্ষমা করে দিও।আমি এত তাড়াতাড়ি তোমাদের পছন্দে বিয়ে করতে রাজি নই। যাকে না দেখেছি আর না দেখতে চাই। তোমরাও আমার কথা শুনবে না, আমি নিজের পায় দাঁড়াতে চায়।তাই চলে এলাম। সরি আম্মু’"

​সেদিন রিকের পরিবারের সম্মান ধুলায় মিশে গিয়েছিল। বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আর রিক ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো ছিটিয়ে পড়েছিল ভেতরে ভেতরে। সে শপথ করেছিল, আর কখনো কোনো নারীকে তার জীবনের এত কাছাকাছি আসতে দেবে না। সেই রিক আজ চৌধুরী ফ্যাশন হাউজের একচ্ছত্র অধিপতি—কঠিন, আপসহীন, এবং অনুভূতিহীন।

​আর আজ? সেই আনায়াই এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। তবে কোনো অপরাধী হিসেবে নয়, একজন স্বাবলম্বী, সফল, বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার হয়ে।
​হঠাৎ দরজায় নক পড়ল।

​রিক নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "কাম ইন।"

​ভেতরে এলেন আনায়া। হাতে একটা লেদার ফাইল।
​"আপনার অনুমতি ছাড়া ঢুকে পড়ার জন্য দুঃখিত, মি. রিক। তবে উইন্টার কালেকশনের প্রথম ড্রাফটটা জমা দেওয়া দরকার ছিল।"

​রিক টেবিল থেকে চোখ তুলে আনায়ার দিকে তাকাল। "তুমি জানতে, এটা চৌধুরী ফ্যাশন হাউজ?"

​আনায়া শান্তভাবে চেয়ার টেনে বসল। "অবশ্যই জানতাম। ঢাকা শহরে ‘চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর নাম না জানার কোনো কারণ নেই।"

রিক টেবিল থেকে চোখ তুলে আনায়ার দিকে তাকাল। "তুমি জানতে না, এটা জুবায়ের চৌধুরী রিকের কোম্পানি?"

​আনায়া শান্তভাবে চেয়ার টেনে বসল। "সত্যি বলতে না, মি. চৌধুরী। ইন্টারভিউ বা অফার লেটারে ব্র্যান্ড নেম 'চৌধুরী গ্লোবাল' ছিল। আপনার নাম কোথাও উল্লেখ ছিল না। তবে জানলেও হয়তো আমার সিদ্ধান্তে খুব একটা ফারাক পড়ত না।"

​"ফারাক পড়ত না?" রিকের গলা সামান্য উঁচুতে উঠল। "তোমার একটুও অস্বস্তি হচ্ছে না?"

​"না, হচ্ছে না,কেন হবে?এটা তোহ আমার কাজ" আনায়াকে বিন্দুমাত্র বিচলিত মনে হলো না। "ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট, সবচেয়ে ভালো রিমুনারেশন আর কাজের স্বাধীনতা আমাকে দেওয়া হয়েছে। একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে এই অফার ফিরিয়ে দেওয়া বোকামি হতো।"

​"চুক্তিপত্রটা মনে আছে তো?" রিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আনায়ার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। "টু ইয়ার্স লক-ইন পিরিয়ড। তুমি চাইলেও এই দুই বছর এই কোম্পানি ছেড়ে এক পা-ও বেরোতে পারবে না। অন্য কোনো ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করতে পারবে না।"

​আনায়া রিকের চোখের দিকে চেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। "আমি চুক্তিপত্র পড়ে তবেই সাইন করেছি, মি. রিক। কাজ ফাঁকি দেওয়ার অভ্যেস আমার নেই।"
​"ভালো। তাহলে তৈরি থেকো," রিক কুটিল এক হাসি হাসল। "কারণ কাজের মান একটু নিচে নামলেই চৌধুরী ফ্যাশন হাউজ কোনো রসি নিয়মে চলে না। তোমাকে তোমার প্রতিটা মুহূর্তের যোগ্যতা প্রমাণ করে টিকতে হবে।"

​"আই চ্যালেঞ্জ ইউ, মি. রিক। আপনি কাজের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবেন না।"

​কথাটি বলে আনায়া ফাইলটা টেবিলে রেখে ধীরপায়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। রিক সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার হাত দুটি শক্ত মুষ্টিবদ্ধ। বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত আগ্নেয়গিরি জ্বলছে—প্রতিশোধের, নাকি আবার সেই হারানো মানুষকে কাছে পাওয়ার আকুতির? সে নিজেই জানে না।

#অসমাপ্ত_ক্যানভাস সূচনা পর্ব
#লেখিকা_আশু

রেসপন্স পেলে চলবে....

৭.পরদিন বিকেলের দিকে পুরো চৌধুরীবাড়িতে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছিল। তুলি নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিল, আর সাহেলা বেগম ওর পাশে বস...
10/08/2026

৭.পরদিন বিকেলের দিকে পুরো চৌধুরীবাড়িতে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছিল। তুলি নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিল, আর সাহেলা বেগম ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

​আসির কালকের পর থেকে আর ডিউটিতে যায়নি। নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক কফি শেষ করছিল সে। যে মানুষটা কোনোদিন কারো কাছে মাথানত করেনি, যার এক ধমকে সবাই তটস্থ থাকে, সেই আসির চৌধুরী আজ এক তীব্র অনুশোচনার জালে বন্দি। রিধির সেই শান্ত অথচ বিষাদমাখা চেহারাটা ওর চোখের সামনে বারবার ভাসছিল।

​হঠাৎ আসির ব্যালকনি থেকে দেখল, রিধি একা বাড়ির পেছনদিকের বাগানে এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। পরনে তার সাধারণ একটা হালকা সুতি থ্রি-পিস, চুলগুলো ঢিলেঢালা করে খোঁপা করা। মুখটা একদম থমথমে, কোনো চঞ্চলতা নেই।

​আসির এক মুহূর্তও দেরি করল না। ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে নিচে নেমে এলো। ​বাগানের ঘাসের ওপর আসিরের ভারী পায়ের শব্দ পেয়েও রিধি মুখ তুলে তাকাল না, না সরার কোনো চেষ্টা করল। যেন আসির সেখানে থাকা বা না থাকায় তার আর কিছুই যায় আসে না।

​আসির এসে রিধির ঠিক মুখোমুখি দাঁড়াল। চৌধুরীবাড়ির কঠোর মেঝো ডাক্তার, সুপুরুষ আসির চৌধুরী আজ এক ১৮ বছরের অভিমানী মেয়ের সামনে যেন এক অপরাধী।

​"রিধি..." আসিরের গলাটা বুকভাঙা অনুশোচনায় কাঁপছিল।

​রিধি এবার মুখ তুলে তাকাল। তবে সেই চোখে আর কোনো আগের লাজুক ভাব, ভয় বা ভালোবাসার চঞ্চলতা নেই; আছে শুধু এক গভীর, বরফশীতল শূন্যতা।

​"তুই আমাকে যা শাস্তি দিতে চাস দে," আসির রিধির হাতটা স্পর্শ করতে চাইল, কিন্তু রিধি এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাতটা সরিয়ে নিল। আসিরের হাতটা শূন্যে থমকে গেল।

​আসির চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর নিচু, তীব্র আকুল কণ্ঠে বলল, "আমি জানি আমি যা করেছি তা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়। একজন ডাক্তার হয়ে, তোর অভিভাবক হয়ে, তোকে রক্ষা করার নামে আমি নিজেই তোকে আঘাত করে বসলাম। সেদিন তুলির রক্তাক্ত চেহারা দেখে আমার মাথার ভেতরের সব চিন্তা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, রিধি... আমি বুঝতে পারিনি।"

​রিধি খুব শান্ত, নিস্পৃহ গলায় বলল, "আপনি ক্ষমা চাইছেন কেন? আপনি তো কোনো ভুল করেননি। আপনি তো সবসময় ঠিকই ভাবেন। আমিই তো দায়িত্বজ্ঞানহীন... হাত ছেড়ে দেওয়ার মতো বোকামি তো আমারই করা সাজে।"
​কথাগুলোর পেছনের বিষাক্ত অভিমান আসিরের বুকে যেন ধারালো চাবুকের মতো গিয়ে লাগল।

​"তুই বোকা নোস, রিধি! আমি অন্ধ ছিলাম!" আসির
এই প্রথম নিজের গলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল, ওর গলার স্বর আবেগে রুদ্ধ হয়ে এলো, "আমি খেয়াল করিনি যে তুই নিজেই কতটা শকে ছিলি। আমি তোকে বাঁচাতে গিয়ে তোকেই সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়ে ফেললাম... তুই আমাকে যা ইচ্ছে শাস্তি দে... কিন্তু এভাবে পর হয়ে যাস না, প্লিজ।"

​রিধি আসিরের দিকে তাকিয়ে রইল। আসিরের চোখে আজ সত্যি সত্যি অনুশোচনার জল জমেছে—যে মানুষটার চোখে শৃঙ্খলার কঠোরতা ছাড়া আর কিছু দেখা যেত না, তার চোখে আজ শুধুই মিনতি আর হারানোর ভয়।

​রিধির চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের গালের সেই স্পর্শ করা জায়গাটা ধীর গলায় ধরে বলল, "থাপ্পড়টা গালে লেগেছিল, কিন্তু ব্যথাটা লেগেছে এখানে..." সে নিজের বুকের বাঁ দিকটায় হাত রাখল। "আপনি আমাকে বিশ্বাস করেননি, আসির ভাইয়া। আপনি না দেখেই ভেবে নিলেন আমি বেখেয়ালি।"

​আসির রিধির দিকে হাত বাড়িয়ে ওর চোখের জলটুকু আলতো করে মুছে দিতে চাইল। এবার রিধি সরলো না, কিন্তু আসিরের আঙুল যখন ওর গাল স্পর্শ করল, আসির অনুভব করল রিধির শরীরটা মৃদু কাঁপছে।
​"আমাকে একটা সুযোগ দে, শালিক পাখি..." আসির প্রায় অস্ফুট স্বরে আকুতি জানাল, "তোর এই ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আমি আবার গড়ে তুলব। তুই যা চাবি, তাই হবে।"

​রিধি মুখ নামিয়ে নিল। অভিমানের এই বিশাল পাহাড় এত সহজে গলার নয়, তবে আসিরের চোখের জল আর এই ব্যাকুলতা রিধির হৃদয়ের জমাট বাঁধা বরফটাকে একটু হলেও নাড়া দিল।

​রিধি ওখান থেকে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
"আমাকে একটু সময় দিন।'"

আসিরে চেষ্টা বা মিনতি কোনো কিছুই রিধির জমে থাকা বরফ-শীতল মান ভাঙাতে পারল না। গালের থাপ্পড় আর সেই অন্যায্য সন্দেহের দাগ রিধির মন থেকে এত সহজে মুছে যাওয়ার ছিল না। রিধি এবার নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিল। সে আসিরকে একদম পাত্তা দিল না, যেন এই মানুষটার অস্তিত্বই তার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না।

​আসির কতবার চেষ্টা করেছে রিধির মুখোমুখি হতে। কখনো ড্রয়িং রুমে এসে অহেতুক দাঁড়িয়ে থেকেছে, কখনো রিধির পড়ালেখার টেবিলে নতুন নোটস এনে রেখে গেছে, কিন্তু রিধি একবারের জন্যও আসিরের দিকে ফিরে তাকায়নি। টেবিলের নোটসগুলো যেমন ছিল তেমনই পড়ে রইল, আসির সামনে এসে দাঁড়ালে রিধি নিঃশব্দে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিয়ে দিয়েছে।

​রিধির পুরো মনোযোগ তখন শুধুই তার বই-খাতা আর সামনের পরীক্ষার দিকে। সারাদিন-সারারাত সে নিজের পড়ার ঘরে বন্দি রেখে পড়াশোনা করতে লাগল। আসির ঘরের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় দরজার নিচ দিয়ে আলো জ্বলতে দেখে থমকে দাঁড়াত। কতবার ইচ্ছে হয়েছে নক করে ভেতরের মিষ্টি মুখটা দেখার, কিন্তু রিধির বরফশীতল অবহেলা ওকে প্রতিবার পিছিয়ে দিয়েছে। আসির চৌধুরী আজ নিজের বাড়িতেই নিজের ভালোবাসার কাছে চরমভাবে অবহেলিত ও পরাজিত এক প্রেমিক।

​দেখতে দেখতে এসে পড়ল তমার গায়ে হলুদের দিন। তমাদের পুরোবাড়ি আর বিয়ের হলজুড়ে মেহেন্দি আর কাঁচা হলুদের মৌ মৌ গন্ধ। চারদিকে গান, হাসি আর
উৎসবের কলরব।রিধি ওরা সবাই চলে এসেছে।

​রিধি আজ পরেছে একটা খুব সাধারণ হালকা হলদে শাড়ি। মুখে কোনো গাঢ় সাজ নেই, শুধু হালকা কাজল আর ঠোঁটে সামান্য লিপগ্লস। চুলগুলো খোলা, সেখানে গুঁজে দেওয়া কয়েকটা তাজা গাঁদা ফুল। এই অনাড়ম্বর হালকা সাজেই রিধিকে যেন এক অনবদ্য, স্বর্গীয় রূপসী দেখাচ্ছিল।

​অন্যদিকে আসির পরেছে একটা গাঢ় হলুদ রঙের সুতির পঞ্জাবি। পঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। রিধি যখন ঘর থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল, আসির তখন ড্রয়িং রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা রিধিকে হলদে পরীতে রূপ নেওয়া দেখে আসির এক মুহূর্তের জন্য একদম থমকে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু করে দিল।

​আসির ইচ্ছে করলেই রিধির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারত, কিন্তু গত কয়েকদিনের অবহেলার ভয় ওকে আটকে দিল। আসির আজ আর আগ বাড়িয়ে রিধির সামনে গিয়ে দাঁড়াল না। সে আশেপাশেই ঘুরে বেড়াল, কিন্তু তার দৃষ্টি সারাক্ষণ লেগে রইল রিধির ওপর। রিধি কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে কথা বলছে—সবকিছু আসিরের নজর এড়াতে পারছিল না।

​বিকেলের দিকে উঠোনের এককোণে তুলিকে নিয়ে বসেছিল রিধি। তুলির ছোট ছোট হাতে সাবধানে মেহেন্দি এঁকে দিচ্ছিল সে। তুলি খিলখিল করে হাসছিল আর ফুপি-ভাতিজির এই মিষ্টি মুহূর্ত বেশ জমজমাট ছিল।

​ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হলো তমার ফুফাতো ভাই আকাশ। ছেলেটা শহরের উগ্র আধুনিক মেজাজের, আর রিধির ওপর তার নজর অনেকদিন থেকেই ছিল। আকাশের চালচলন আর চাহনি কোনোদিনই রিধির ভালো লাগেনি।

​আকাশ ধীর পায়ে রিধির ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বলল, "আহা! ফুপি আর ভাতিজির মেহেন্দি উৎসব তো দারুণ জমজমাট! তা রিধি, ফুপি হয়েই থেকে যাবে নাকি নিজের সুন্দর হাত দুটোতে আমার নামের মেহেন্দি পরার শখ আছে?"

​রিধি একবার শুধু আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাল। গা গুলিয়ে ওঠা এক বিরক্তি নিয়ে সে পুরো ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করল। তুলির দিকে তাকিয়ে বলল, "মামনি, ডান হাতটা সোজা করো তো।"

​কিন্তু আকাশ সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। নাছোড়বান্দার মতো সে আরও একটু ঘেঁষে এসে বলল, "আরে! এত ভাব কিসের বলতো? একটু হেসে কথা বললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমি কিন্তু তমাকে বলেছি, এই বিয়েতে কনের চেয়ে কনের রূপসী বোনকেই দেখতেই বেশি ভালো লাগছে।"

​রিধি চোয়াল শক্ত করে তুলির মেহেন্দি দেওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। আকাশের কথার কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে তুলিকে কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল। দূর থেকে আসির এই পুরো ঘটনাটা দেখেছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছিল, হাত দুটো পকেটের ভেতর মুঠো হয়ে উঠছিল।

​সন্ধ্যা নামতেই গায়ে হলুদের আসল ধামাকা শুরু হলো। স্টেজের ওপর বিশাল সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজছিল। আলো ঝলমলে হলরুমে তখন তমার সব ফ্রেন্ডরা স্টেজে উঠে নাচানাচি করছিল। স্টেজের নিচেও রানা, তৌসির ভাইয়া আর অন্যান্য আত্মীয়রা মিলে ধামাকা নাচ জুড়ে দিয়েছে। পুরো হলরুম তখন উল্লাস আর নাচানাচির ভিড়ে সরগরম।

​রিধি এই ভিড় আর কানফাটা আওয়াজ একদম পছন্দ করছিল না। সে হলরুমের এককোণে দেয়াল ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল।

​হঠাৎ নাচের তালে তালে পেছনের ভিড়টা প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেল। কয়েকজন নাচতে নাচতে পিছাতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দিল রিধিকে। রিধি নিজের ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে উল্টে পড়তে গেল!

​ঠিক সেই মুহূর্তে শক্ত দুটো হাত এসে রিধির কোমর আর পিঠ আগলে নিল। রিধি সজোরে গিয়ে ঢলে পড়ল এক চেনা, শক্ত বুকের ওপর। নাকে ভেসে এলো চেনা সেই চন্দন আর কফির সুবাস।

​আসির শক্ত করে রিধিকে বুকের সাথে ধরে রেখেছিল যাতে সে পড়ে না যায়। আসির নিচু, ভারী গলায় রিধির কানের কাছে মুখ এনে বলল, "সামলে..."

​সেই স্পর্শে রিধির শরীরের ভেতর এক বিদ্যুতের ঝলকানি খেলে গেল। কিন্তু মুহূর্তেই মনের ভেতর জমাট বাঁধা সেই অবিচারের রাগটা জেগে উঠল। আসিরের বুকের ভেতর থেকে রিধি নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।

​আসিরের দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে, কোনো প্রত্যুত্তর না করে, রিধি মুখ ঘুরিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।​আসির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার হাত দুটো তখনও শূন্যে ঝুলছিল।

​এদিকে ভিড়ের মধ্যে এককোণে দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আকাশ। রিধিকে একাকী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেতে দেখে আকাশের চোখ দুটো শয়তানি বুদ্ধিতে জ্বলে উঠল। রিধির এই একাকীত্ব আর
বিরক্তিকে সে নিজের সুযোগ হিসেবে ধরে নিল। কারো নজর না এড়িয়ে আকাশ চুপিচুপি রিধির পিছু নিল।
​কোলাহল, নাচগান আর আসিরের স্পর্শের তোলপাড় থেকে বাঁচতে রিধি সোজা চারতলার ছাদের দিকে চলে এলো।

​রাতের খোলা আকাশ, ঠান্ডা বাতাস আর চাঁদের আলোয় ছাদটা একদম শান্ত, নিঝুম হয়ে ছিল। নিচের বিকট বাজনার শব্দ এখানে এসে অনেকটাই মৃদু হয়ে গেছে। রিধি ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

​ঠিক তখনই পেছনে কারও জুতো ঘষটার শব্দ হলো। শান্ত পরিবেশ ভেঙে কেউ একজন কাছে এগিয়ে আসছে। ​রিধি অস্বস্তি নিয়ে পেছনে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে তমার ফুফাতো ভাই আকাশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিধির কপাল কুঁচকে গেল।

​"আপনি? এখানে কী করছেন?" রিধি কঠোর গলায় বলল।

​আকাশ মুখ দিয়ে এক বিশ্রী শিষ দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে রিধির দিকে আসতে লাগল। তার চোখে-মুখে এক লালসা আর অশ্লীলতার ছাপ স্পষ্ট।
​আকাশ গা ঘেষে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বিকৃত হেসে বলল, "কোলাহল ভালো লাগছিল না, তাই না মেরি জানু? আমারও ভালো লাগছিল না। তাই ভাবলাম আমার হবু বউটার সাথে একটু নিরিবিলিতে প্রেম করে আসি।"

​রিধি এক পা পিছিয়ে গিয়ে ধমকে উঠল, "মুখ সামলে কথা বলুন!!! এখান থেকে নামুন, নয়তো আমি চিৎকার করব!"

​আকাশ হা হা করে কুৎসিত হেসে উঠল। সে আরও এক পা এগিয়ে এলো, রিধির পালানোর পথ প্রায় বন্ধ করে দিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিতে বলল, "চিৎকার করবে? করো না! নিচে এত জোরে ডিজে বাজছে যে তোমার চিৎকার কারোর কানেই পৌঁছাবে না। আর শুনো, আজকে ছাদে যদি কিছু হয়েও যায়... কাল সকালে তুমি সোজা আমারই হবে। হয়তো তোমার এই গরম মেজাজী চৌধুরী পরিবার আমাকে দুটো মারধর করবে, বা একটু চেঁচামেচি হবে... কিন্তু শেষমেশ নিজেদের তথাকথিত কুলাঙ্গার সম্মানের দোহাই দিয়ে তোমাকেই তো আমার হাতে তুলে দিবে, মেরি জানু!"

​আকাশের এই নোংরা মানসিকতা আর রূপ দেখে রিধির গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। ভয়ে আর চরম ঘেন্নায় রিধির বুকের ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল।

#তোর_আমার_গল্প
#লেখিকা_আশু

Address

Dhaka

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when AsU posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category