22/08/2026
নবাবগঞ্জে ইছামতি নদীতে জমকালো নৌকা বাইচ
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতি নদীর কলাকোপা এলাকায় শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। গ্রামবাংলার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে ঘিরে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে ইছামতির দুই পাড়ে সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন উৎসুক জনতা। বিকেল গড়াতেই সেই ভিড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে—নদীর দুই তীর কার্যত পরিণত হয় লোকে লোকারণ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর মৌসুম বদলের এই সময়টায় নবাবগঞ্জ অঞ্চলে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়ে থাকে, যা এলাকাবাসীর কাছে দীর্ঘদিনের একটি লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনমেলার উপলক্ষ। এবারের আয়োজনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় করেন নদীর পাড়ে। কারও হাতে ছাতা, কারও মাথায় গামছা বাঁধা—তীব্র রোদ উপেক্ষা করেই দর্শনার্থীরা অপেক্ষা করেন বাইচ শুরুর মুহূর্তের জন্য।
নির্ধারিত সময়ে রঙিন কাপড়ে সজ্জিত একের পর এক দীর্ঘ ছিপ নৌকা নদীতে নামতেই বেজে ওঠে ঢাক-ঢোল। মাঝি-মাল্লারা ছন্দবদ্ধ বৈঠার টানে এগিয়ে যান প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। প্রতিটি নৌকায় সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা মাল্লাদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে চিরচেনা মাঝি-মাল্লার গান, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়ে বৈঠার আঘাত। বাইচ যতই এগোতে থাকে, ততই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দুই পাড়ে দাঁড়ানো দর্শকদের মাঝে। প্রিয় নৌকার সমর্থনে করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা নদীপাড়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক। তিনি নৌকা বাইচ প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবুল কালাম এবং নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবু সফিক খন্দকার মাসুদ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল, যুবদল ও কলাকোপা ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃবৃন্দ। তাঁদের উপস্থিতি আয়োজনে যোগ করে বাড়তি মাত্রা, ভিড় সামলাতে বাড়তি তৎপর হয়ে ওঠেন আয়োজকরাও।
কলাকোপা নৌকা বাইচ আয়োজক কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় মোট ৯টি ঘাসী নৌকা ও ৪টি কোষা নৌকা। অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলোর মধ্যে কৈলাইল তুফান মেল, খান বাড়ি, সিকদার বাড়ি ও লিটন-২ ছিল উল্লেখযোগ্য। বাহারি রং আর নামে সজ্জিত নৌকাগুলোর মধ্যকার হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা।
নৌকা বাইচ আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, নৌকা বাইচকে ঘিরে ইছামতী নদীর তীরে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নৌকার ছন্দময় বৈঠার তালে তালে নদীতে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উপভোগ করেন।
তবে আয়োজনের আনন্দের পাশাপাশি উঠে আসে নদী রক্ষার দাবিও। রাশিম মোল্লা বলেন, নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি দীর্ঘদিন ধরে স্লুইচগেট স্থাপনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। পানির অভাবে নৌকা বাইচ আয়োজনেও ভাটা পড়েছে বলে জানান তিনি। এই ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত স্লুইচগেট স্থাপনের পাশাপাশি ইছামতী নদীর নাব্যতা ও পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিপুল এই জনসমাগমে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন না ঘটে, সেজন্য অনুষ্ঠানের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ। নদীর দুই পাড়ে পুলিশের সতর্ক উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়, যদিও অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ইছামতির দুই তীরে গড়ে ওঠে জমজমাট গ্রামীণ মেলা। মেলায় বসে বাহারি মিষ্টি, খেলনা, ঘরোয়া তৈজসপত্র, খাবার ও প্রসাধনীর পসরা নিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য দোকান। শিশু-কিশোরদের আনন্দে মাতিয়ে রাখতে বসে নাগরদোলাসহ নানা রকম বিনোদনমূলক আয়োজনও। ফলে নৌকা বাইচকে ঘিরে গোটা এলাকায় বিরাজ করে এক প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ, যা অনেকটা গ্রামীণ মিলনমেলার রূপ নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীনির্ভর এই জনপদে নৌকা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি তাঁদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামীণ এসব ঐতিহ্য দিন দিন বিলুপ্তির পথে বসলেও নবাবগঞ্জের ইছামতি পাড়ের মানুষ এখনো তা লালন করে চলেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তাঁরা প্রত্যাশা করেন, ভবিষ্যতেও প্রতি বছর এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন অব্যাহত থাকবে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পৃষ্ঠপোষকতায় তা আরও বড় পরিসরে আয়োজিত হবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত উৎসবমুখর এই আয়োজন ঘিরে মুখরিত ছিল নবাবগঞ্জের ইছামতি নদীর কলাকোপা এলাকা। নৌকা বাইচ শেষে বিজয়ী দলকে ঘিরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন সমর্থকরা, আর ধীরে ধীরে জনস্রোত ফিরতে শুরু করে যে যার গন্তব্যে—রেখে যায় আরও একটি স্মরণীয় নৌকা বাইচের স্মৃতি।