28/03/2026
মুক্তিযুদ্ধে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন… এই বিবরণগুলোর তথ্যসূত্র পোস্টের নিচে দিলাম।
১. একাত্তরের বাংলাদেশে কোনো কোনো মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছে।
২.এক একটি গণধর্ষণে ৮/১০ থেকে শুরু করে ১০০ জন পাকসেনাও অংশ নিয়েছে।
৩. ধর্ষিতা মেয়েরা চিৎকার করে আমাদের বলতেন 'আমরা তো মরে যাব, আপনারা যদি কেউ বেঁচে যান তাহলে আমাদের কথা আমাদের বাড়িতে গিয়ে বলবেন।'... পাকিদের নির্যাতনের ধরন ছিল বীভৎস। তারা মেয়েদের স্তন কেটে ফেলত, যৌনাঙ্গে রাইফেল ঢুকিয়ে গুলি করত; এমনভাবে নির্যাতন করত যে সে প্রক্রিয়া আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না, এসব আমি নিজের চোখে দেখেছি।
৪. পাকিস্তানী সেনারা প্রত্যেক মহিলাকে অবর্ণনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে ধর্ষণ করে। এরপর তাদের হত্যা করে। ধোপা যেভাবে কাপড় কাচে সেভাবে রেললাইনের ওপর মাথা আছড়ে, কখনও দু'পা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে দু'টুকরা করে হত্যা করেছে শিশুদের। স্বাধীনতার অনেকদিন পরেও সেখানে মহিলাদের কাপড়, ক্লিপ, চুল, চুলের খোঁপা ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে আমি আমার ছোট বোনের ফ্রকের এক টুকরো কাপড় খুঁজে পাই।
৫. টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের ছাব্বিশা গ্রামের মানুষ বেগম বলেছিলেন, "আমাদের পাশের বাড়ির একটি মেয়ে। সদ্য মা হয়েছে, আট দিনের বাচ্চা কোলে। ঐ সময় সে বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াচ্ছিলো। এমন সময় বাড়িতে আক্রমণ। ঘরে তখন কেউ ছিলো না। এরপর যা হবার তাই হলো, মেয়েটির উপর চলল অমানসিক নির্যাতন। এরমধ্যেই দুপুর গড়িয়ে এল, পাকিরা খাবার খেতে চাইল। ঘরে কিছু না থাকায় ক্ষেত থেকে বেগুণ এনে দিতে বলল। ভীত মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটির আসতে দেরি হচ্ছিলো দেখে পাকিরা তার বাচ্চাকে গরম ভাতের হাঁড়িতে ছুঁড়ে দিয়ে ঘর থেকে নেমে গেল।"
৬.মুক্তিযুদ্ধের মার্চ মাসে মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি না হলে প্রথমে বাবা এবং ছেলে কে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সাথে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
৭. নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার নিজে আত্মহত্যা করেন।
৮. খুলনার একটি ক্যাম্প থেকে কাচের জারে ফরমালিনে সংরক্ষিত রাখা মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায় যা খুব নিখুঁতভাবে কাঁটা ছিলো। এটা পুরোটাই ছিলো পাকিস্তানি সেনাদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে। তারা পরখ করতো মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেমন!
৯. আমাদের সংস্থায় আসা ধর্ষিত নারীদের প্রায় সবারই ছিল ক্ষত-বিক্ষত যৌনাঙ্গ। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিড়ে ফেলা রক্তাক্ত যোনিপথ, দাঁত দিয়ে ছিড়ে ফেলা স্তন, বেয়োনেট দিয়ে কেটে ফেলা স্তন-উরু এবং পশ্চাৎদেশে ছুরির আঘাত নিয়ে নারীরা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসতো।"
১০. বিচারপতি এম এ সোবহান লিখেছেন, ‘১৮ ডিসেম্বর মিরপুরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একজনকে খুঁজতে গিয়ে দেখি মাটির নিচে বাঙ্কার থেকে ২৩জন সম্পূর্ণ উলঙ্গ, মাথা কামানো নারীকে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে পাক আর্মিরা।’ উল্লেখ্য মিরপুর স্বাধীন হয়েছিল বাহাত্তর সালের ৩০ জানুয়ারি।
১১. এক টর্চার সেলের প্রায় ১০ হাজার বাঙ্গালীকে নির্যাতন করেছিলো পাকিস্তানীরা। যার ফলে সেই মেঝেতে ৩ ইঞ্চি উঁচু রক্তের জমাট বেঁধে গিয়েছিলো।
১২. কর্ণেল নাদির আলী নামের এক পাকিস্তানী অফিসার লিখেছিলেন,
১৯৭৩ সালে আমি ছয় মাস পাগলাগারদে ছিলাম। আমি কেন পাগল হয়ে গেলাম? আসলে আমি সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের সামষ্টিক অপরাধবোধে ভুগছিলাম, যে গণ-অপরাধ ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যেই বন্ধ করা উচিত ছিল।’
মুক্তিযুদ্ধের আগস্ট মাস।
পশ্চিমবঙ্গের বারাসত হাসপাতাল পরিদর্শনে এলেন মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। তাঁর ঢােকার কয়েক মিনিট আগে অপুষ্টিজনিত রােগে খুলনা জেলার রামপাল নিবাসী প্রমীলা দেবীর শিশু পুত্রটি মারা গেছে।
মৃত ছেলেটা কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন প্রমীলা দেবী। কয়েক দিন আগে এই হাসপাতালে প্রমীলা দেবীর স্বামীও মারা গেছেন। মৃত শিশুটির গালে হাত দিয়ে কেনেডি কী যেন অনুভব করলেন! প্রমীলা দেবীকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই। কেনেডির চোখ তখন ছলছল করছে। বেরিয়ে আসার সময় তার মুখে শােনা গেল; তিনি বলছেন “এরা ভাগ্যহত, এরা ভাগ্যহত।”
জেলা প্রশাসক তাঁকে একটি ছাতার তলায় নেয়ার চেষ্টা করলেন। সিনেটর তা না নিয়ে এগিয়ে চললেন।
প্রচন্ড বৃষ্টি। এর মধ্যেই খালি মাথায় সিনেটর হেঁটে চলেছেন। কোথাও এক হাঁটু জল আবার কোথাও তার বেশি।
হঠাৎ একটি তাঁবুর সামনে দাড়িয়ে কেনেডি এক মহিলার বৃষ্টিতে রান্নার অসুবিধা হচ্ছে কি না, তা খোঁজ নিলেন। ওই মহিলা বললেন, হ্যাঁ অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু এখানে তো ইজ্জত বেঁচে আছে।
পোস্টের এই ছবিটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হওয়া বীরাঙ্গনা শাহানার। ছবিটি তুলেছেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নায়েব উদ্দিন আহমেদ।
তিনি লিখেছেন, ‘শাহানার সেই অর্থহীন, রক্তে ভেজা অবস্থার কথা মনে পড়লেই এখনও আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। হাসপাতালে শাহানার অসহায় চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে। তার বাবা-মায়ের কান্নাও মনে পড়ে। আমি এখনও দেখতে পাই শাহানা পাগলের মতো নিজের চুল ছিঁড়ছে আর চিৎকার করে বলছে—“আমাকে বাঁচাও।” যেন সে আর বেঁচে নেই; যেন সে আগেই মারা গেছে। তাকে দেখলে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি জোরে কাঁদতে চাই, কিন্তু পারি না। আমার হৃদয়ই শুধু কাঁদে।
কয়েকদিন আগেই সে আমাকে বলেছিল—
“নায়েব আংকেল, ব্রহ্মপুত্রের চরে এখন সাদা কাশফুলে ভরে গেছে। আপনি আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে একটা ছবি তুলবেন। আপনি যদি তা করেন, আমি আপনার জন্য একটা গান গাইব— ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা…’
—------------------------------------------------------------------------
তথ্যসুত্রঃ
১. প্রখ্যাত আমেরিকান গবেষক ও সাংবাদিক সুসান ব্রাউনি মিলার তাঁর অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন, উইমেন, অ্যান্ড রেপ বিতে এমনটি লিখেছেন।
২. প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক ডাঃ এম এ হাসান তাঁর বই ‘ওয়ার এন্ড ওমেনে’ লিখেছেন।
৩. ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা একে এম আবু ইউসুফের ভাষ্য।
৪. নীলফামারীর বিনোদ কুমারের সাক্ষ্য।
৫. স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম খণ্ড।
৬. স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম খণ্ড।
৭. পাকিস্তানী জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজার লেখা আত্মজীবনী A Stranger in My Own Country
৮. খুলনার চিকিৎসক ডাঃ বিকাশ চক্রবর্তীর বিবরণী।
৯. - ধর্ষিত বীরাঙ্গনা নারীদের অধিকারের জন্য কাজ করা সমাজকর্মী মালেকা খানের বয়ান।
১০. বিচারপতি কে এম সোবহানের লেখা কলাম ‘সময়ের কথকতা'
১১. একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর - সুকুমার বিশ্বাস
১২. khaki dissident on 1971 by Colonel Nadir Ali.
১৩. ১২ আগস্ট ১৯৭১, আনন্দবাজার পত্রিকা।
©সাংবাদিক আহমাদ ইশতিয়াক