30/07/2026
এভাবেই কি চলবে দেশ?
"জুলাইয়ের ঐক্য ধরে রাখাই হোক নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার"
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডার নয়, তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা। যখন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে হামলা, ভাঙচুর কিংবা সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে- এভাবেই কি চলবে দেশ?
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা শেষে তাদের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে। এনসিপির অভিযোগ অনুযায়ী, হামলায় তাদের কয়েকজন মিডিয়া কর্মী আহত হয়েছেন, গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং ক্যামেরা, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। অন্যদিকে অভিযুক্তদের বক্তব্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে- এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। কিন্তু মতের অমিল যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি দল নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতি।
জুলাই আন্দোলনের কথা আজও মানুষের মনে তাজা। সেই আন্দোলনে নানা রাজনৈতিক মত, পেশা ও সামাজিক শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি অধিক জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র। সেই ঐক্যের শক্তিই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়েছিল। যদি সেই অর্জনের পর আবার রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও বিভাজনই প্রধান বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
বিশেষ করে তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ যেন সংঘর্ষের নয়, নেতৃত্ব, যুক্তি এবং সেবার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়- এটাই সময়ের দাবি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের অংশ; কিন্তু সহিংসতা কখনো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও জনগণের আস্থা অটুট রাখা জরুরি। যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যদি তারা আইন সমভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তবে জনগণের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে। আর যদি কোনো ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগ ওঠে, সেটিও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন নতুন কোনো বিভাজন নয়, নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে বিরোধ থাকবে কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; প্রতিবাদ থাকবে কিন্তু সহিংসতা থাকবে না।
জুলাইয়ের ঐক্য- সবার জন্য:
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল ঐক্য। সেই ঐক্য কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পদ নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অর্জন। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করতে হলে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বামপন্থী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তি এবং নাগরিক সমাজকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সহনশীলতার পথে এগিয়ে আসতে হবে।
যদি আমরা জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে চাই, তবে আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে যেখানে রাজনৈতিক কর্মীকে তার মতের কারণে হামলার শিকার হতে হবে না, সাংবাদিককে ক্যামেরা হারাতে হবে না, আর রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান সহিংসতার প্রতীক হয়ে উঠবে না।
পরিশেষে, একটি সভ্য জাতির পরিচয় প্রতিপক্ষকে দমন করার ক্ষমতায় নয়, বরং ভিন্নমতকে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। আসুন, আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়- সহনশীলতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করি। জুলাইয়ের ঐক্যকে বিভক্ত না করে, সকল পক্ষকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়াই হোক নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
(ছবিটি AI দ্বারা তৈরী)