23/05/2026
ভাবীকে দেখতাম, ভাইয়া রাতে দোকান বন্ধ করে ফেরার ঠিক আগের সময়টাতে আয়নার সামনে দাঁড়াতেন। পরিপাটি করে সেজেগুজে তবেই দরজা খুলতেন। আমি আড়ালে হাসতাম। একদিন ধরা পড়ে গেলাম। ভাবি ম্লান হেসে বললেন,
-হাসছিস কেন নিশা? শোন, তোর ভাইয়া সারাদিন দোকানে শত শত সাজগোজ করা সুন্দরী কাস্টমার দেখে। ঘরে ফিরে যদি সে আমাকে এলোমেলো অবস্থায় দেখে, তবে ধীরে ধীরে আমার প্রতি তার আকর্ষণ আর মনোযোগ দুটোই কমে যাবে।
আমি তখন কিশোরীসুলভ চপলতায় বলেছিলাম,
-ভাবী, তুমি তো পরকীয়াকে হাইলাইট করছ। ভাইয়া বাইরে প্রেমে পড়বে বলে তুমি ঘরে সেজে বসে থাকো!
ভাবি গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন,
-যাদের পরকীয়া করার, তারা ঘরে হুরপরী থাকলেও করবে।
ভাবীর কথাগুলো আমার কাছে স্রেফ নাটক মনে হয়েছিল। ঠিক যেমন নাটক মনে হয়েছিল বড় আপার আচরণ।
আপা আর দুলাভাই যখন বাড়িতে বেড়াতে এলেন, খাওয়ার টেবিলে দেখলাম দুলাভাই এক চামচ পোলাও তুলে দিতেই আপা একদম ন্যাকামির সুরে বলল,
-আরে না না, আর দিও না, আমি একদম খেতে পারব না।
আমার চোখ রসগোল্লার মত বড় বড় হয়ে গেল। কি বলে এই মেয়ে! এই মেয়ে তো এক গামলা ভাত একবারে খেয়ে ফেলে। আর পোলাও তো ওর খুব প্রিয় তবুও ওখানে কথাটা বললাম না। পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে যখন একই চিত্র দেখলাম পরে আপাকে ডেকে কথাটা বললাম,
-কিরে আপা, তোর হয়েছেটা কি?ডায়েট করছিস নাকি!
-ডায়েট না হাতি। শোন তোকে একটা কথা বলি, যখনই হাজবেন্ডের সামনে খুব বেশি খাওয়া-দাওয়া করবি, প্রথম প্রথম সে খুশিই হবে কিন্তু তারপর যখন একটু মোটা হয়ে যাবি তখনই দেখা যাবে সে হাসির ছলে-তাচ্ছিল্যের ছলে সবার সামনে ছোট করে বলছে যে, তুই কি পরিমান খাস? এত বেশি খাস যে তার বেতনের সব টাকা চাল কিনতে কিনতেই শেষ হয়ে যায়।
ওই কথাটা শুনতে কি তোর ভালো লাগবে?
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,
- মানেটা কি! তাহলে কি বিয়ের পর সারা জীবন ডায়েট করে থাকবো?
-না স্বামী যদি ভাল হয় তাহলে তুই এক গামলা কেন, এক বালতি খা কোন সমস্যা নেই। কিন্তু স্বামীর মনের মধ্যে যদি তোর প্রতি বিন্দু পরিমাণ অসম্মান থাকে, ভালোবাসার ঘাটতি থাকে তাহলে সবার সামনে তোকে হেসে হেসে অপমান করা তার জন্য ডাল ভাতের ব্যাপার। তোর দুলাভাই ওই ধাঁচের। আমি ডায়েট করি না কিন্তু ও যখন বাড়িতে থাকেনা তখন নিজের মন মত খেয়ে নেই। আপার কন্ঠটা কেমন যেন শোনালো!
আমি হাঁ করে গেলাম। আমার বোন এত নাটক জানে! মানে ও চুরি করে খায় শ্বশুরবাড়িতে? কি অদ্ভুত!
স্কুল লাইফের প্রাণের বান্ধবী ছবি ইদানিং ফোন ধরে না, সোশ্যাল মিডিয়াতেও একটিভ থাকে না। তাই একদিন ওর শ্বশুরবাড়িতে উপস্থিত হলাম। আমরা দুজন একেবারেই এক রকম কিন্তু ওকে দেখে আমি থমকে গেলাম। চুপচাপ, কেমন যেন গুটিয়ে গেছে।
আমি হেসে বললাম,
- কি রে আমি তো ভেবেছিলাম তুই আমাকে দেখে লাফিয়ে উঠবি, তোর-আমার সেই বিখ্যাত ননস্টপ হাসিটা চলতে থাকবে।
-এখন মেপে হাসতে হয় রে। ছবির কন্ঠে দীর্ঘশ্বাস।
-মানে?
ও একটু চুপ থেকে বলল,
- তোর দুলাভাই একদম পছন্দ করে না আমি বেশি কথা বললে, বেশি হাসলে। ওর ভাষায় “বেশি এক্সপ্রেসিভ” মেয়েরা নাকি ভালো না।
-তাই বলে তুই এমন চুপচাপ হয়ে যাবি?
-কি করবো বল? প্রথম প্রথম আমি আগের মতোই ছিলাম। ওর ফ্রেন্ডরা বাসায় এলে আমি গল্প করতাম, হাসতাম। পরে একদিন সবাই চলে যাওয়ার পর ও নোংরা ভাষায় বললো,
এত হাসাহাসি আর ঢলে পড়ার অভ্যাস থাকলে আমি যেন রেড লাইট এরিয়াতে গিয়ে এসব করি ।
ছবির কথা শুনে আমি আঁতকে উঠলাম। কোন হাসবেন্ড তার ওয়াইফ কে এটা বলতে পারে! আমি তড়িঘড়ি করে উঠে এলাম।
ভাবী নিজেকে সাজিয়ে রাখতেন ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে,
আপা নিজেকে আটকে রাখতেন অপমান এড়াতে,
আর ছবি, সে নিজের স্বাভাবিক সত্তাটাকেই ধীরে ধীরে মুছে ফেলছে, শুধু ভালো স্ত্রী হওয়ার জন্য।
জীবন বড় অদ্ভুত শিক্ষক। আমার বিয়ে হলো দীপ্তর সাথে। সরকারি চাকরি করা অত্যন্ত লাজুক আর মেধাবী একটা ছেলে।
বিয়ের প্রথম কিছুদিন যেন রঙিন বাতাসের মতো ছিল। আমি হাওয়ায় ভাসছিলাম। একরাতে দীপ্ত পাশে শুয়ে বললো,
-নিশা, তুমি অনার্স পাশ করা একটা মেয়ে। সবসময় কচি খুকি সেজে থাকার ভান করো কেন? এত হাসাহাসির কি আছে সবার সাথে, বিশেষ করে আমার চাচাতো ভাই দের সাথে? শোন আমি সরকারি চাকরি করি, আমার বৌ হবে রিজার্ভড। সে সব জায়গায় গিয়ে ঢলে পড়বে না। তোমার দেখি ঢলে পড়াটাই স্বভাব।
আমার মাথায় তখন ছবির কথাগুলো ঘুরছিল। দীপ্ত কি এখন আমাকেও রেড লাইট এরিয়াতে দাঁড় করিয়ে ছাড়বে তার কথা দিয়ে।
অবশ্য ও এমন কিছু বললো না। আমার খুব কাছে চলে এলো। কাল পর্যন্ত আমার কাছে যা ভালোবাসা, আদর মনে হচ্ছিল আজ কেন যেন নিজেকে সেই রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে মনে হলো। আচ্ছা, দীপ্তর স্পর্শে আমি তো সাড়া দিই নি আজ, তাহলে ও আমার শরীর দখল করলো কেন? এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো চোখ থেকে।
তার কিছুদিন পর দীপ্তর বদলি হয়ে গেল রংপুরে, আমিও সাথে গেলাম। ওখানেই নিজের আলাদা সংসার সাজিয়ে নিলাম। প্রায় দু'বছর কেটে গেল।
ছুটির এক সকালে নাস্তার টেবিলে বসে দীপ্ত বলল,
-শোনো নিশা আমি একটু বের হব, আমার ফিরতে ফিরতে রাত হবে। এক কলিগের বিয়ের দাওয়াত আছে।
-কই আমাকে তো বললে না?
-এইতো বললাম।
-আমি যাব না?
দীপ্ত এক ঢোকে গ্লাসের পানি শেষ করে খুব অদ্ভুত এক রুক্ষ স্বরে বললো,
- না, ও ফ্যামিলিসহ ইনভাইট করলেও তোমাকে নিয়ে যাব না। নিজের চেহারা দেখেছ আয়নাতে? এলোমেলো চুল, কতদিন শ্যাম্পু করো না কে জানে? রুক্ষ ত্বক, ক্রিমটিম মুখে কিছু মাখো না নাকি! কেমন দেখা যায় তোমাকে? বিয়ের আগে তো কেমন পুতুল পুতুল লাগতো, এখন এই অবস্থা কেন?
আমি "থ" হয়ে গেলাম, দীপ্ত উঠে চলে গেল। বিয়ের আগে বলা ভাবীর কথা গুলো মনে পড়ে গেল। তারমানে সত্যিই এরকম হয়। আমি গুছিয়ে থাকলে আজকে দীপ্ত হয়তো আমাকে এই কথাগুলো বলতো না হয়তো!
এমনিতে আমি খাবার কম খাই, কিন্তু প্রেগনেন্সির শুরুর দিকে ক্ষুধা বেড়ে গেল। তখন আমার প্রেগনেন্সির চার মাস চলছে। ঈদের ছুটিতে শ্বশুরবাড়িতে এসেছি। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই আমাকে খুব আদর করেন। আমার ননদ রিনি খুব যত্ন করে খাবার তুলে দিচ্ছিল।
ঠিক এমন সময় দীপ্ত হাসতে হাসতে বললো,
-রিনি, তুই ওর প্লেটে খাবার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাবি, ওটা ওকেই তুলে নিতে দে। দেখছিস না ফুলেফেপে কি অবস্থা?
গর্ভকালীন অবস্থায় মেয়েদের শারীরিক যে পরিবর্তন আসে সেই অনুযায়ী আমারও ওজন খানিকটা বেড়েছে কিন্তু সেই কথা যে আমাকে এইভাবে শুনতে হবে বুঝতে পারিনি।
রিনি চুপ করে গেল। শাশুড়ি ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন, যা কিছুই হোক না কেন ছেলেই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। দীপ্ত খাচ্ছিল সাথে হো হো করে হাসছিল, তার হাসি আর থামতেই চায় না। মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলতে লাগলো,
-আরে লজ্জা করোনা, খাও... খাও...
আমার চোখে কেমন পানি চলে এলো, সেটা ঠেকিয়ে রাখতে আমাকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয়েছিল সেদিন। বড় আপার কষ্টটা সেই দিন বুঝেছিলাম, তার নাটকের মানে সেই দিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তার ন্যাকামির অর্থ সেই দিন ধরতে পেরেছিলাম।
সেই রাতেই আচমকা ব্লিডিং শুরু হলো। আমার বাচ্চাটা জন্মের আগেই মরে গেল। বেশ কিছুদিন লাগলো হাসপাতালে ডাক্তার টেস্ট এসব করতে। দীপ্ত রংপুরে চলে গেছে, তার ছুটি শেষ। আমি কিছুটা সুস্থ হলে রংপুর যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। শাশুড়ি বললেন, আমার চাচাতো দেবর আমাকে দিয়ে আসবে। এই শরীরে একা জার্নি করা ঠিক হবে না। আমি রাজী হতে গিয়েও হলাম না। কারন দীপ্ত সেটা পছন্দ করবে না, তার মত সরকারি অফিসারের বৌ অন্য কারো সাথে জার্নি করছে হোক সে যতই তার ভাই এটা তার চোখে অশোভন। একাই রওনা দিলাম।
আমি বুঝলাম আমিও ছবির মতো হয়ে গেছি। কবে, তা ঠিক বুঝতে পারি নি। আমিও এখন মেপে কথা বলি, মেপে হাসি।
পৌঁছে সব কাজ সেরে নিজে গোসল করে পরিপাটি হয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম ঠিক ভাবীর মতো। ও এলে হাসিমুখে দরজা খুললাম।
রাতে খাবার সময় আমি হাফ চামচ ভাত নিলাম আর এক টুকরো মাছ। খাওয়াও শেষ হয়ে গেল দ্রুত। আমি হাত ধুয়ে এসে দেখি দীপ্ত তখনো খাচ্ছে আর টিভি দেখছে।
- কি ব্যাপার, তোমার শরীর খারাপ নাকি? প্রশ্ন করলো।
- না তো
- এত কম খেলে যে!
- আমি তো কমই খাই। ওটা তো গর্ভবতী অবস্থায় ক্ষুধা বেড়ে গেছিল।
- ভালোই হয়েছে, নয়তো প্রতিদিন চাল কিনতে হতো। দীপ্ত কেমন দানবের মত হাসতে লাগলো। আমি দুই হাত আমার পেটে রাখলাম যেখানে আমার ছোট্ট সোনামনি ছিল।
এই রুটিন চলতে লাগলো। কিন্তু কানে ভেসে এলো এক গুঞ্জন... পরকীয়ার গুঞ্জন। দীপ্ত নাকি তার কোন কলিগের সাথে...
সন্দেহ খুব খারাপ জিনিস। এতদিন যা করিনি তাই করলাম, ফোন ঘাটলাম। পাসওয়ার্ডটা আগে একবার দেখেছিলাম। আমার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেল। মহিলাটির নাম মিনু, তার সাথে দীপ্তর বিশ্রী অশালীন সব মেসেজ। গ্যালারি তে ঢুকতেই আমি স্তম্ভিত, ছবি ভিডিওর ছড়াছড়ি। বলাই বাহুল্য সেগুলো সবই ছিল অশ্লীল।
ফোনটা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ছাদে উঠে গেলাম। হঠাৎ আমার কাজিন রুম্পা আপুর ফোন। আমাদের বোনদের মধ্যে ও দেখতে একটু কালো আর হাইটটাও সামান্য কম অন্যদিকে ওর হাজব্যান্ড দুধে আলতা, লম্বা, হ্যান্ডসাম। এই কথা সেই কথার পর একপর্যায়ে জানতে চাইলাম,
-আচ্ছা আপু, তুমি ভাইয়ার সামনে সবসময় পরিপাটি থাকো ?
- তা কেন! যখন ইচ্ছে হয় তখন সাজগোজ করি যখন ইচ্ছে হয় না তখন ঢোলাঢালা কাপড় পরে চুল এলিয়ে সোফায় পা তুলে বসে চিপস খাই। এমন কথা কেন বলছিস?
উত্তর না দিয়ে বললাম,
- ধরো এক আধ দিন তোমার বেশি ক্ষুধা পেলে ভাইয়ার সামনে খেতে লজ্জা পাও? নাকি আড়ালে খাও?
ও হাসতে লাগলো, কন্ঠে কিশোরীসুলভ চপলতা।
- তোর কি হয়েছেও বলতো? তেমন কিছুই না। কি যে আবোল তাবোল কথা বলিস না।
আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দিলাম। আমি বুঝলাম খাওয়া, ওজন, সৌন্দর্য কিছুই ম্যাটার করে না যদি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে।
ছাদ থেকে নেমে আমি আর কাঁদিনি। আমি বুঝে গেছি, যে ভালোবাসা অর্জনের জন্য নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে হয়, সে ভালোবাসা আসলে একটা মরীচিকা।
পরদিন সকালে দীপ্ত শাওয়ারে গেলে ওর ফোনের সমস্ত অশালীন মেসেজ, কল রেকর্ড আর মিনু নামের সেই কলিগের সাথে তোলা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও নিজের ফোনে ট্রান্সফার করে নিলাম। প্রতিটি প্রমাণ গুছিয়ে রাখলাম ।
এরপর আমি ফিরলাম নিজের সত্তায় । রাতে খাবারের টেবিলে আমি আর আধা চামচ ভাত নিয়ে বসে রইলাম না। নিজের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পেট ভরে খেলাম, বহুদিন পর। দীপ্ত অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারছি।
ও অফিস থেকে ফেরার সময় আর কৃত্রিম পরিপাটি হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলাম না। বরং ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক পরে, চুলগুলো এলোমেলো খোঁপা করে নিজের প্রিয় একটা বই পড়তে লাগলাম। পাশের বাসার ভাবীর সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রাণখুলে হাসলাম, যা দীপ্তর ভাষায় ছিল ঢলে পড়া।
অবশ্য দীপ্তর বিরক্তি চরমে পৌঁছাতে দেরি হলো না। একদিন খাবার টেবিলে যখন দ্বিতীয়বার ভাত নিতে গেলাম, দীপ্ত সশব্দে গ্লাসটা টেবিলে রেখে গর্জে উঠল,
-কি শুরু করেছ এসব নিশা? চেহারা তো আগেই গেছে, এখন দেখছি রাক্ষসের মতো খাওয়া শুরু করেছ। আবার পেট বাধিয়েছো নাকি? কই আমার তো কোন প্ল্যান নেই। কার সাথে কি করেছো? অবশ্য বাইরের মানুষের সাথে ইদানিং আবার তোমার ঢলাঢলি বেড়েছে। বলে খুব কুৎসিত ভাষায় একটা গালি দিল আমাকে।
আমি শান্ত গলায় উত্তর দিলাম,
- ওটা আমি করি না, তুমি করো। অফিসে, বাইরে, ফোনে, কোন এক মিনুর সাথে। মিনু নামটা যেন দাবানলের মত কাজ করল। হঠাৎ করেই দীপ্ত আমার ওপর চড়াও হলো। চড়, লাথি, ঘুসি একনাগাড়ে দিয়ে চলল। আমি আছড়ে পড়লাম দেয়ালে। ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল, হাত ও কাঁধে কালশিটে দাগ পড়ে গেল, পা মচকে গেল। কিন্তু আমি এবার আর চিৎকার করে কাঁদলাম না। কোনোমতে পা টানতে টানতে ঘরে গিয়ে নিজের ফোন আর প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে খুব কষ্টে সোজা থানায় হাজির হলাম।
খুব দ্রুতই আমাকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলো। রিপোর্ট আসার পর ওসি ফাইলটা কিছুক্ষণ নীরবে দেখলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন,
-প্রমাণগুলো খুব স্ট্রং।
একটা ছোট্ট বিরতির পর তিনি নির্দেশ দিলেন,
-আসামিকে নোটিশ পাঠাও। প্রয়োজন হলে ইমিডিয়েট অ্যাকশন।
সেদিন বিকেলেই দীপ্তর ফোনে থানার কল গেল।
-আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আসতে হবে।
দীপ্ত প্রথমে ব্যাপারটা খুব হালকাভাবে নিলেও থানায় ঢোকার পর পরিস্থিতি আর সেরকম থাকলো না।
ওসি সরাসরি ফোনটা সামনে রেখে বললেন,
-এগুলো আপনার?
দীপ্তর মুখের রং বদলে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-পার্সোনাল ব্যাপার স্যার।
-কারও শরীরে হাত তোলাও পার্সোনাল? ওসি কড়া গলায় বললেন।
তারপর আমার মেডিকেল রিপোর্টটা সামনে রাখা হলো।
কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর বাইরের জগতের বদলে দীপ্তর রাতটা কাটলো থানার লকআপে।
একজন দক্ষ আইনজীবীর মাধ্যমে দীপ্তর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের ডিজিটাল প্রমাণসহ মামলা ঠুকে দিলাম সেই পুলিশ অফিসারের সাহায্যে। পুরো সময়ে আমি একবারও কাঁদি নি।
সরকারি অফিসার হওয়ার কারণে দীপ্তর ওপর চাপ আরও বেড়ে গেল। পুলিশি তদন্তে তার ফোনের সমস্ত ডিলিট করা তথ্যও উদ্ধার করা হলো। বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর দীপ্তর এতদিনকার মুখোশ হঠাৎ করেই সবার সামনে খুলে গেল। তার সেই ‘ভদ্র’ আর ‘মেধাবী’ ইমেজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য রূপটা সমাজ ও সহকর্মীদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। সরকারি চাকরিতে নৈতিক স্খলন আর ফৌজদারি মামলার কারণে দীপ্তকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
যেদিন তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হলো সেই দিনটাতে আদালতের কক্ষ ভর্তি মানুষের মাঝখানে দীপ্ত মাথা নিচু করেছিল কেন যেন আমার একটু খারাপ লাগছিল তারপরেও আমি দৃঢ়ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে বসে রইলাম।
ম্যাজিস্ট্রেট ফাইলটা খুলে এক এক করে দেখছিলেন।
মেডিকেল রিপোর্ট,ছবি, চ্যাট প্রিন্ট। সব দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকালেন। আদালত কক্ষ তখন নিস্তব্ধ।
বেশ অনেকটা সময় ধরে দুই আইনজীবির মধ্যে তর্কবিতর্ক হতে লাগলো। দীপ্তর আইনজীবী জামিনের প্রার্থনা করলেও তার জামিন মঞ্জুর হলো না।
দীপ্ত স্তব্ধ। পুলিশ তাকে আবার ধরে নিয়ে যেতে লাগলো।
যাওয়ার সময় সে আগুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আইনী লড়াইয়ে আমার জয় হলো। আদালত থেকেই দেনমোহর ও ভর্তুকি সহ ডিভোর্স টা হলো, সাথে শারীরিক নির্যাতনের জন্য দীপ্তর ছয় মাসের জেল সাথে জরিমানা হলো। এমনিতেই সে সাসপেন্সনে আছে তবে এর পরে আবার নাকি ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি হবে তাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তার চাকরিটা থাকবে কি থাকবে না, তাতে এখন আর আমার কিছু যায় আসে না। অন্যদিকে শুনেছি মিনু নামের সেই তিন বাচ্চার মাকে তার বর ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে।
আমি এখন মুক্ত। আসলে কারো মনে জায়গা পেতে হলে নিজেকে বদলে ফেলতে হবে এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল।
তবে মজার ব্যাপার হলো আমার সেই বদলে যাওয়া জীবনের ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ল ভাবীর মনের জগতে। সেদিন সন্ধ্যায় ভাইয়া দোকান থেকে ফেরার সময় ভাবী আর কনসিলার ফেস পাউডার নিয়ে বসলেন না। বরং রান্নাঘরেের ঘামে ভেজা কপালে হাত দিয়ে সোফায় এসে আরাম করে বসলেন। ভাইয়া ঘরে ঢুকে যখন ভ্রু কুঁচকে ভাবীর অগোছালো অবস্থার দিকে তাকালেন, ভাবী শান্ত স্বরে বললেন,
-সারাদিন দোকানের কাস্টমারদের সাজগোজ দেখে এসে এখন আমাকেও কাস্টমার ভেবো না। আমি তোমার স্ত্রী, শোপিস নই। আজ থেকে আমি এভাবেই থাকব, যদি ভালোবাসা থাকে তবে এই আমাকেই ভালোবাসতে হবে। যেদিন নিজের ইচ্ছা হবে সেদিনই কেবল নিজেকে সাজিয়ে তুলব। ভাইয়া থমকে গেলেন, কারণ ভাবীর চোখে আজ ভয়ের বদলে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
অন্যদিকে বড় আপার ঘরেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগল। সে দুলাভাইয়ের সামনেই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া করে।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটা ঘটলো ছবির জীবনে। এক ঘরোয়া পার্টিতে ছবি যখন তার এক বান্ধবী ও বান্ধবীর বরের সাথে প্রাণখুলে হাসছিল, তখন তার স্বামী আড়ালে ডেকে নিয়ে বিষাক্ত স্বরে কানে কানে বলল,
-এই যে বেশি হাসাহাসি আর ঢলে পড়া শুরু করেছ, সবার সামনে কি নিজেকে রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে প্রমাণ করতে চাও?
ছবি এবার আর আঁতকে উঠল না। সে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে যেখানে সবাই উপস্থিত ছিল, সেখানে উচ্চস্বরে বলল,
-শোনেন সবাই, আমার স্বামী মনে করেন যে সকল মেয়েরা পরিচিতজনদের সাথে হাসাহাসি করে কিংবা কথা বলে তারা হচ্ছে রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে। সেই সুবাদে এখানে দাঁড়ানো প্রত্যেকটি মেয়ে কিন্তু রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আপনারাই বলুন, আপনাদের স্ত্রীদেরকে রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে হিসেবে আমার হাজব্যান্ড বিবেচনা করছে কি অদ্ভুত তাই না! ছবির বর পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল সে বুঝতেও পারেনি ছবি এই কাজটি করবে। উপস্থিত মেহমানরা সবাই ছবির হাজবেন্ডের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বের হয়ে গেল। ছবিও তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টি নিয়ে ওর হাজবেন্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এসব ছবিই আমাকে ফোন করে বলেছে। এখন বুঝি, যে ভালোবাসা পেতে প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হয়, সেই ভালোবাসা আসলে মরীচিকা। প্রকৃত ভালোবাসা মানে আপস নয়, বরং একে অপরের সবচেয়ে অগোছালো আর দুর্বল রূপটাকেও পরম মমতায় আগলে রাখা। যে ফুল নিজেকে সুবাসিত করে কেবল অন্যের তৃপ্তির জন্য, সে অসময়েই ঝরে যায়। কিন্তু যে ফুল নিজের টবে নিজের স্বকীয়তায় ফুটে থাকে, তার সৌরভই চিরস্থায়ী। অন্যকে খুশি করার আগে নিজেকে ভালোবাসতে হয়, তবেই পৃথিবী আমায় সম্মান করতে বাধ্য হবে।
অস্তিত্বের_জয় :
সুবর্না শারমিন নিশী