29/03/2026
#আধারের_বুকে_এক_ফালি_চাঁদ_সিজন_২
শেষ পর্ব
পুরো বাড়িটা আজ আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। গেট থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত বেলি আর রজনীগন্ধার স্নিগ্ধ সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। ঠিক যেমনটা মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ চেয়েছিল।মেয়ের বিয়ে হবে রাজকীয়, কোনো কমতি থাকবে না আয়োজনে। দুই বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে রোদেলা আজ ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভার্সিটিতে পা রাখবে, আর আজই তার জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু এত আলো, এত জাঁকজমকের মাঝেও যেন এক গভীর বিষাদপুরী হয়ে আছে চৌধুরী ভিলা।
বাড়ির এক কোণে একটি বড় বাঁধানো ছবির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ ও রোদেলার সপ্ন রা। ভালো বাসার মানুষেরা।আয়ান, আহান, মায়া, রুহানি, ইয়াসির, শিহাব, শিপ্রা আর রামিসা—কারো চোখে পানি আটকে নেই। আনন্দের এই দিনে সবার হৃদয়ে যেন কেউ সজোরে আ*ঘাত করছে।
সবাই আজ একজনের দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়।
আয়ান বাবা হয়েছে। ছেলের নাম রাখা হয়েছে মুরতাসিম চৌধুরী আহাজ। মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর সাথে মিল রেখে এই নামটা যেন আজ সবার প্রাণের স্পন্দন। আহাজ।
শিশুটির দিকে তাকালে সবাই কেমন যেন দিশেহারা হয়ে যায়, অবিকল তাদের বাবার মতো দেখতে। অজান্তেই সবাই ওকে ‘বাবা’ বলে ডেকে ওঠে।
রুহানি এগিয়ে এলো ছবিটির সামনে। কাঁপাকাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে দিলে ছবির সেই পরিচিত মুখ দুটোর ওপর। আঙুলগুলো যখন আয়াজের চেহারার ওপর পড়ল, তখন আর বাঁধ মানল না রুহানির বুকের ভেতর চেপে রাখা আগ্নেয়গিরি। হু হু করে কেঁদে উঠলো রুহানি।
বড় বড় অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়তে লাগল। রুহানি আর্তনাদ করে বলল
"বাবা... মা... আজ তোমাদের সেই স্বপ্নের দিন। তোমাদের আদরের রুহানির বিয়ে।পাপা তোমার পরী বাচ্চা বিয়ে পাপা।কথা ছিল তোমার হাত ধরে বিয়েতে কবুল বলবে ! সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করবে, মা তুমি বরণ করে নেবে তোমার জামাইকে, আর পাপা তুমি আমাকে বুকে নিয়ে বিদায় দিবে।ইয়াসির কে বলবে না," আমার পরী বাচ্চা তোমার হাতে দিলাম।আমার মেয়ের চোখে এক ফোঁটা অস্রু ঝরলে আই উইল কি*ল ইউ!"কিন্তু আজ এই রাজপ্রাসাদ সম বাড়িতে সব আছে, শুধু তোমরা নেই। কেন আমাদের এই ভাই-বোনদের মাঝসমুদ্রে একা ফেলে চলে গেলে? কেন আমাদের এভাবে এতিম করে দিলে মা? কেন বাবা? তোমাদের একটু বেশিদিন কি আমাদের সাথে থাকা যেত না?"
রুহানির কান্নার শব্দে পরিবেশটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আয়ান তার কোলের আহাজকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট আহাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সবার দিকে, যেন সে বুঝতে পারছে আবেগ টা। রুহানির বিয়ের সানাই বাজছে দূরে, কিন্তু সেই সুর যেন আজ আনন্দের নয়, বরং এক অনন্ত বিরহের হাহাকার হয়ে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
চারপাশে আতর আর গোলাপজলের খুশবু। বসার ঘরে সাদা চাদর বিছানো হয়েছে, যেখানে মুখোমুখি বসে আছে রুহানি আর ইয়াসির। মাঝখানে শুধু এক টুকরো ফুলের দেয়াল—একটু পরেই যা ‘কবুল’ শব্দের মাধ্যমে চিরতরে ঘুচে যাবে।
রুহানির দুপাশে দুই ভাই—আয়ান আর আহান। যেখানে আজ থাকার কথা ছিল মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর সেখানে আজ বড় ভাই আয়ান শক্ত হাতে বোনের হাত ধরে বসে আছে। বাবার অভাব সে কোনোদিন বুঝতে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু আজ এই বিদায়বেলায় রুহানির মনে হচ্ছে, ভাই আর বাবার স্পর্শের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার লুকিয়ে আছে। বাবার জায়গা তো আর কেউ নিতে পারে না।
মায়া ভাবি হিসেবে নয়, বরং রুহানির মায়ের অভাব পূরণ করতে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোদেলা হওয়া কি এতই সহজ? ঠিক যেমন সহজ নয় মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ হওয়া। তবুও আয়ান নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রেখেছে রুহানি আর আহানকে।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। কাজি সাহেবের প্রশ্নের জবাবে কাঁপা কাঁপা গলায় তিনবার ‘কবুল’ বলে ফেলল রুহানি। বলা শেষ হতেই বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। পাশে ভাই আয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে সে যেন তার সবটুকু বিষাদ ঢেলে দিল। আয়ান পরম মমতায় রুহানির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
"চুপ আমার পরী বাচ্চা আর কাদে না।"বললো আয়ান।
বিদায়ের ঘণ্টা বাজল। শিহাব আর শিপ্রা এগিয়ে এলেন ইয়াসিরের বাবা-মায়ের কাছে। শিহাব ইয়াসিরের বাবার হাত ধরে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, "আজ আয়াজ বেঁচে থাকলে হয়তো এই দায়িত্বটা সেই পালন করত। আজ ওর হয়ে আমরা আমাদের কলিজার টুকরাকে আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। খেয়াল রাখবেন, আমার রুহানি যেন কোনোদিন চোখের পানি না ফেলে।"
ইয়াসিরের বাবা-মাও এখন আর আগের মতো নেই। রোদেলা আর আয়াজ জীবিত থাকাকালীন তাদের সাথে সব মান-অভিমান মিটিয়ে নিয়েছিলেন। রুহানি আর ইয়াসিরের ভালোবাসার গভীরতা দেখে তারা সানন্দে সব মেনে নিয়েছেন। তারা আশ্বস্ত করে বললেন, "চিন্তা করবেন না, ও এখন আমাদেরও মেয়ে। আমরা ওকে আগলে রাখব।"
আয়ান এবার ইয়াসিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। ইয়াসিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে রুহানির হাত সেখানে সঁপে দিল। কিন্তু আয়ানের চোখে তখন বন্ধুত্বের নরম আভা নয় বরং এক কঠোর ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি।আয়ান গম্ভীর গলায় বলল,"শোন ইয়াসির, তুই আজ থেকে শুধু আমার বন্ধু না, তুই আমার বোনের স্বামী, আমাদের বাড়ির জামাই। আমার পরী বাচ্চা কে তোর হাতে তুলে দিলাম। কিন্তু আ*ল্লাহর কসম, যদি কোনোদিন তোর অবহেলায় আমার বোনের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি পড়ে, সেদিন আমি নিজের হাতে তোকে খু*ন করবো।আমার বাবা যা করত, আমি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু করব। তোর ক*লিজা ছিঁড়ে আনব যদি আমার বোনকে কষ্ট দিস। হয়তো কোনো ভাই তার বোনের বিদায়লগ্নে এমন কথা বলে না, কিন্তু আমি বলছি—কারণ মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর আমানত আমার কাছে।ওর মূল্য দিস, ওকে ভালো রাখিস।"
ইয়াসির বললো," আমার কলিজা ই তো তোর বোন।মেরে দিস যদি রুহানির চোখের জলের কারন আমি হই! এই খুন আমি মাফ করে গেলাম ! যেমন করে মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ ভালোবেসেছিল তার রোদেলা রানী কে তেমন করে ভালবাসার চেষ্টা করবে ইয়াসির তার রুহানিকে ।যতক্ষণ রুহানি আছে পৃথিবীতে ঠিক ততক্ষণই থাকবে ইয়াসির এটি আমি ওয়াদা করে বললাম।"
আহান রুহানির হাত ধরে বললো," কাঁদছিস কেন পাগ*লী?
আরে কোথায় যাচ্ছিস? এই তো একটু দূরে। এতদিন শুধু আমাদের দুই ভাইয়ের ক*লিজা চিবিয়ে খেয়েছিস, এবার গিয়ে ইয়াসিরের ক*লিজা খা। তুই যে কত বড় ডা*ইনি, সেটা তো আমরা জানি! তাই তো দুলাভাইকে একটু ভয় দেখিয়ে রাখলাম, যেন তোর ওপর কোনো শব্দ করতে না পারে।"
রুহানি কান্নার মাঝেই আহানের বুকে কয়েকটা কি*ল-ঘু*ষি বসিয়ে দিল। আহান আদরের ছোট বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চু*মু খেল।
তারপর এগিয়ে এসে ভাঙা গলায় শুধু বলল, "দুলাভাই, রুহানি যেন কখনো কষ্ট না পায়।"
সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটা এলো যখন রুহানি আর আহান মুখোমুখি হলো।বিদায়ের সময়।যমজ ভাই-বোন তারা; সারাজীবন যারা খুনসুটি আর ঝগড়া করে বাড়ি মাথায় তুলেছে, আজ তাদের বিচ্ছেদের সময়। রুহানি আহানকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। আহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দুষ্টুমির ছলে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করল। সে ম্লান হেসে বলল,"ভালোবাসি রুহানি... তোকে ভীষণ ভালোবাসি। কোনোদিন বলা হয়নি আজ বলে দিলাম। তোকে ছাড়া বাড়িটা একদম খাঁ খাঁ করবে।সবার পরী বাচ্চা তুই। কিন্তু জীবন মরনের সাথী তুই আমার।যাকে বলে নারী ছেড়া সম্পর্ক।একই দিন আমরা পৃথিবীর বুকে এসেছি।তোর একটু কষ্ট তে আমার বুকের ভিতর লাগে।"
আয়ান রুহানি কে বুকে নিয়ে গাড়ীর কাছে আনলো।
গাাড়িতে ওঠার সময় রুহানি শেষবারের মতো পেছনের দিকে তাকালো। বিশাল এই চৌধুরী ভিলার প্রতিটি ইটে যেন তার বাবা-মায়ের স্মৃতি মিশে আছে। আজ সে এক নতুন গন্তব্যে পা বাড়াচ্ছে, কিন্তু পেছনে রেখে যাচ্ছে দুই ভাই আর এক আকাশ সমান ভালোবাসা।
গাড়ির পেছনের সিটে রুহানিকে নিজের বুকের ভেতর আগলে ধরে রেখেছিল ইয়াসির। পুরোটা রাস্তা একটিবারের জন্যও সে রুহানিকে একা বোধ করতে দেয়নি। রুহানি মাঝেমধ্যে ফুঁপিয়ে উঠছিল, আর ইয়াসির পরম মমতায় ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছিল। আপাতত ইয়াসিরদের পারিবারিক বাড়িতেই তাদের কদিন কাটাতে হবে, তবে ইয়াসির তার নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে গত দুই বছরে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর জেদ নিয়ে সে এক বিশাল অট্টালিকা বানিয়েছে তার ‘পরী বাচ্চা’ রুহানির জন্য। যেখানে থাকবে শুধু তাদের দুজনের সাজানো সংসার।
এদিকে চৌধুরী ভিলার ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল জিহাদ আর রামিসা। জিহাদ আড়চোখে রামিসার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কাঁদছো কেন এত? এর পরের সিরিয়াল কিন্তু তোমার!"
রামিসা চোখের পানি মুছে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। রেগে গিয়ে বলল, "খবরদার! একদম বাজে কথা বলবেন না। আমার কলিজার টুকরা বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেল, আমার মন খারাপ, আর আপনি আসছেন রসিকতা করতে?"
জিহাদ একটু মুচকি হেসে চোখের ইশারা করল। শান্ত গলায় বলল, "আরে বাবা, তোমার বান্ধবীর কাছে তোমাকে পাঠানোর জন্যই তো এই সব আয়োজন। আমার কথা কি একটুও ভাববে না?" রামিসা রাগ করার ভান করলেও জিহাদের কথায় ওর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই বিষাদপুরীতেও যেন এক চিলতে নতুন প্রেমের গুঞ্জন।
ভেতরের ঘরে মায়া পরম মমতায় ছোট্ট আহাজকে বিছানায় ঘুম পাড়াচ্ছে। আর আয়ান? সে তখনো দাঁড়িয়ে আছে বাবা-মায়ের সেই বড় ছবিটার সামনে। বুক পকেট থেকে সযত্নে ভাজ করা সেই পুরোনো চিঠিটা বের করল সে। আয়াজের লিখে যাওয়া শেষ চিঠির অক্ষরগুলো এখন আয়ানের মুখস্থ, তবুও প্রতিদিন একবার না পড়লে ওর ঘুম আসে না। চিঠিটা বুকে চেপে ধরে আয়ান চোখ বন্ধ করল। ওর গাল বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ছবির ফ্রেমের ওপর। মায়া দরজার আড়াল থেকে দেখল সবটা, কিন্তু কিছু বলল না। সে জানে, এই কান্নাটুকুই আয়ানের একমাত্র শান্তি, ওর বেঁচে থাকার জ্বালানি।
অন্যদিকে বাসর ঘরের নিস্তব্ধতায় রুহানি একা বসে আছে। হাতে সেই ডায়েরিটা, যেটা রোদেলা ওকে দিয়ে গিয়েছিল। শর্ত ছিল—বিয়ের দিন ছাড়া এটা খোলা যাবে না। কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরির প্রথম পাতাটা উল্টালো রুহানি। সেখানে রোদেলার হাতের লেখায় জলজ্বল করছে একটি ছোট্ট নোট:
"আমার রুহানি, আমার মুনতাসির সাহেবের পরী বাচ্চা... তুমি কখনো ভেবো না মা তোমাকে আমি কম ভালোবেসেছি। যেখানে তোমার বাবার একটা পুরোনো জুতো পর্যন্ত আমি বুকের ভেতর আগলে রাখি, সেখানে তুমি তো আমার মুনতাসির সাহেবেরই অংশ। আমি হয়তো আর বেশিদিন থাকব না মা, আর তোমার বাবাও থাকবে না। ওই পা*গলাটে লোকটা আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচে না, সেটা আমি ভালো করে জানি।পাপা কে স্বার্থপর ভেবো না। পাপা তোমাদের অনেক ভালো বাসে।আমাকে একটু বেশি বাসে এই যা।আজ তুমি যখন এই ডায়েরিটা পড়ছো, তার মানে আমি সশরীরে তোমার পাশে নেই। কিন্তু জেনো মা, আমার দোয়া আর ভালোবাসা সবসময় তোমার ছায়া হয়ে থাকবে। ইয়াসির ছেলেটা খুব ভালো, ও তোমাকে আগলে রাখবে। আমার আর তোমার বাবার পক্ষ থেকে অনেক অনেক দোয়া রইল। আমার সো*না বাচ্চা, মা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে।"
পড়া শেষ করে রুহানি ডায়েরিটা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। রোদেলা সামনাসামনি কোনোদিন এভাবে আবেগ দিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলেনি, কিন্তু আজ এই লেখার প্রতিটি অক্ষরে রুহানি তার মায়ের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। সে ডায়েরিটা বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বিড়বিড় করে বলল, "মা, আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। বাবাকে সবসময় বলেছি, কিন্তু তোমাকে বলা হয়নি। আমি তোমাদের অনেক মিস করছি মা!"
ঠিক সেই মুহূর্তে কখন যে ইয়াসির ঘরে ঢুকেছে রুহানি টেরও পায়নি। ইয়াসির নিঃশব্দে রুহানির পেছনে এসে বসল। রুহানি অনুভব করল এক জোড়া চেনা হাতের স্পর্শ। কোনো সংকোচ না করে সে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল ইয়াসিরের চওড়া বুকে। ইয়াসির পরম নির্ভরতায় তার সহধর্মিনীকে দুহাতে আগলে নিল। বাইরের আকাশে তখন চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে, আর ঘরের ভেতরে শুরু হলো এক নতুন জীবনের গল্প—যেখানে বিরহ থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
॥ মুনতাসির: চলো রোদেলা রানী।শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে না?
রোদেলা: সঙ্গী তো আপনি হয়েছেন। মুনতাসির সাহেব!
মুনতাসির: ভালোবাসি রোদেলা রানী !
রোদেলা: আপনাকে আমার ভিষন পছন্দ মুনতাসির সাহেব!
মুনতাসির: ছোট বেলায় তোমার ডায়পার আমি চেন্জ করেছি বে*য়াদপ ! (মুচকি হেসে)
রোদেলা: ভালো বাসি মুনতাসির সাহেব! চলুন এই পৃথিবী ছেড়ে মহাকালের যাত্রায়। ॥
আমেরিকার বোস্টন শহর। চার্লস নদীর তীরে বিকেলের ম্লান রোদ খেলা করছে। নদীর কিনারায় আছড়ে পড়া ছোট ছোট ঢেউগুলোর সাথে ভেসে এসেছে একটি কাঁচের বোতল। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন কোনো এক প্রাচীন রহস্যের সংকেত বুকে নিয়ে এটি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এখানে এসে ঠেকেছে।
ষোল বছর বয়সী এক কিশোরী কন্যা নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল। স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপটায় তার অবাধ্য চুলগুলো উড়ছে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল বালুর ওপর পড়ে থাকা সেই বোতলটি। কৌতূহলী হয়ে সে নিচু হয়ে বোতলটি কুড়িয়ে নিল। ভেতরে একটি পুরনো হলদেটে কাগজ দেখা যাচ্ছে—চিঠি! কর্কের ছিপিটা খুলতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল তার সারা শরীরে। মেয়েটি বাঙালি, হাজার মাইল দূরে থাকলেও তার হৃদস্পন্দনে আজও মিশে আছে বাংলার মাটি আর ভাষার টান।
বুক ধকধকানি নিয়ে সে চিঠিটি বের করে পড়তে শুরু করল। প্রথম লাইনটি দেখেই তার চোখের পলক স্থির হয়ে গেল:
"মুনতাসির সাহেব, আপনি আমার জীবনের প্রথম ভালোলাগা, প্রথম শিহরণ। সেই পঞ্চদশী বয়সে, যখন আমি স্রেফ এক কিশোরী, তখন আমার হৃদয়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়া প্রথম পুরুষটি ছিলেন আপনি। আর হয়তো কিছুদিন আমি বেঁচে থাকব, তারপর আমার ভালোবাসার পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু আমি চাই আমার এই ভালোবাসা আজন্ম বেঁচে থাকুক। তাই এই চিঠিটি রেখে গেলাম—যদি কোনোদিন কোনো এক পঞ্চদশী বা ষোড়শী কন্যা এই চিঠিটি পায়, তার বুকেও যেন এক হাহাকার জাগে। সে যেন জানতে পারে, এই পৃথিবীতে রোদেলা নামের কেউ একজন ছিল, যার হৃদয়ে আকাশসম ভালোবাসা ছিল তার মুনতাসির সাহেবের জন্য। রোদেলার জীবনে তো মুনতাসির সাহেব এসেছিল, পৃথিবীর বুকে কি এমন আর কোনো মুনতাসির সাহেব আছে, যাকে অন্য কোনো কিশোরী তার হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পাবে? যেমনটা আমি আপনাকে পেয়েছিলাম?"
চিঠিটা পড়া শেষ করে কিশোরীটি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক অজানা আবেগে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে চিঠিটি নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। কী অদ্ভুত এক সমাপতন! এই চিঠিটি যে লিখেছে তার নাম ছিল রোদেলা, আর যে আজ এই বোস্টনের নদীর তীরে দাঁড়িয়ে চিঠিটি পড়ছে, তার নামও যে ‘রোদেলা’!
নামের এই মিল কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি নিয়তি তাকে কোনো সংকেত দিচ্ছে? কিশোরী রোদেলা দুচোখ বন্ধ করে গভীর এক শিহরণ অনুভব করল।মনে মনে ভাবল—তাহলে কি কোথাও কোনো এক মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ আছে? যে এই রোদেলার হৃদয়ের অধিপতি হবে? যে রোদেলার ভাগ্যে এই চিঠি জুটেছে, তার ভাগ্যে কি সেই মানুষটি জুটবে না? নিশ্চয়ই কোথাও আমার মুনতাসির সাহেব আছে, যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
লেখিকার কলমে কিছু কথা:
প্রিয় পাঠক, এই আবেগঘন মুহূর্তের মাধ্যমেই শেষ হলো ‘আঁধারের বুকে এক ফালি চাঁদ: সিজন টু’। এই গল্পের রেশটুকু শুধু রয়ে গেল সেই পুরনো চিঠির পাতায়। এর পরের গল্পে আপনারা পাবেন সম্পূর্ণ নতুন এক প্রেক্ষাপট। সেখানে আবারও ফিরে আসবে আপনাদের সবার প্রিয় মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এবং রোদেলা।
তবে মনে রাখবেন, আগের গল্পের সাথে এই নতুন সিজনের কোনো সরাসরি মিল নেই। যোগসূত্র শুধু ওই একটি রহস্যময় চিঠি। এই যান্ত্রিক পৃথিবীর কোনো এক কোণে কীভাবে তারা একে অপরকে খুঁজে বের করবে, কীভাবে এক কিশোরীর কল্পনা আর এক পুরুষের গাম্ভীর্য মিলেমিশে একাকার হবে—সেই নতুন আখ্যান নিয়ে শীঘ্রই আসছি। আগের মতোই আপনাদের ভালোবাসা সাথে থাকবে, এই প্রত্যাশা রইল।