Sima Afroz

Sima Afroz Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Sima Afroz, Digital creator, Dhaka.

​🌿 সীমা আফরোজ (কাঠগোলাপ) 🌿
বইয়ের পাতায় জীবন সাজাই, গল্পের অক্ষরে আবেগ। 📚❤️
পর্দার আড়ালে থেকে অনুভূতির কারিগর। 🧕✨
ডিজিটাল ক্রিয়েটর। উপন্যাস এবং জীবনের টুকরো রিলস দেখতে আমার পাতায় স্বাগতম। 🍃🎥
ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে থাকুন। 🤝💌

 #আধারের_বুকে_এক_ফালি_চাঁদ_সিজন_২শেষ পর্ব  পুরো বাড়িটা আজ আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। গেট থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত বেলি আর রজ...
29/03/2026

#আধারের_বুকে_এক_ফালি_চাঁদ_সিজন_২
শেষ পর্ব

পুরো বাড়িটা আজ আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। গেট থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত বেলি আর রজনীগন্ধার স্নিগ্ধ সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। ঠিক যেমনটা মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ চেয়েছিল।মেয়ের বিয়ে হবে রাজকীয়, কোনো কমতি থাকবে না আয়োজনে। দুই বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে রোদেলা আজ ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভার্সিটিতে পা রাখবে, আর আজই তার জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু এত আলো, এত জাঁকজমকের মাঝেও যেন এক গভীর বিষাদপুরী হয়ে আছে চৌধুরী ভিলা।
বাড়ির এক কোণে একটি বড় বাঁধানো ছবির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ ও রোদেলার সপ্ন রা। ভালো বাসার মানুষেরা।আয়ান, আহান, মায়া, রুহানি, ইয়াসির, শিহাব, শিপ্রা আর রামিসা—কারো চোখে পানি আটকে নেই। আনন্দের এই দিনে সবার হৃদয়ে যেন কেউ সজোরে আ*ঘাত করছে।
সবাই আজ একজনের দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়।

আয়ান বাবা হয়েছে। ছেলের নাম রাখা হয়েছে মুরতাসিম চৌধুরী আহাজ। মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর সাথে মিল রেখে এই নামটা যেন আজ সবার প্রাণের স্পন্দন। আহাজ।

শিশুটির দিকে তাকালে সবাই কেমন যেন দিশেহারা হয়ে যায়, অবিকল তাদের বাবার মতো দেখতে। অজান্তেই সবাই ওকে ‘বাবা’ বলে ডেকে ওঠে।
রুহানি এগিয়ে এলো ছবিটির সামনে। কাঁপাকাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে দিলে ছবির সেই পরিচিত মুখ দুটোর ওপর। আঙুলগুলো যখন আয়াজের চেহারার ওপর পড়ল, তখন আর বাঁধ মানল না রুহানির বুকের ভেতর চেপে রাখা আগ্নেয়গিরি। হু হু করে কেঁদে উঠলো রুহানি।
বড় বড় অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়তে লাগল। রুহানি আর্তনাদ করে বলল

"বাবা... মা... আজ তোমাদের সেই স্বপ্নের দিন। তোমাদের আদরের রুহানির বিয়ে।পাপা তোমার পরী বাচ্চা বিয়ে পাপা।কথা ছিল তোমার হাত ধরে বিয়েতে কবুল বলবে ! সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করবে, মা তুমি বরণ করে নেবে তোমার জামাইকে, আর পাপা তুমি আমাকে বুকে নিয়ে বিদায় দিবে।ইয়াসির কে বলবে না," আমার পরী বাচ্চা তোমার হাতে দিলাম।আমার মেয়ের চোখে এক ফোঁটা অস্রু ঝরলে আই উইল কি*ল ইউ!"কিন্তু আজ এই রাজপ্রাসাদ সম বাড়িতে সব আছে, শুধু তোমরা নেই। কেন আমাদের এই ভাই-বোনদের মাঝসমুদ্রে একা ফেলে চলে গেলে? কেন আমাদের এভাবে এতিম করে দিলে মা? কেন বাবা? তোমাদের একটু বেশিদিন কি আমাদের সাথে থাকা যেত না?"

রুহানির কান্নার শব্দে পরিবেশটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আয়ান তার কোলের আহাজকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট আহাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সবার দিকে, যেন সে বুঝতে পারছে আবেগ টা। রুহানির বিয়ের সানাই বাজছে দূরে, কিন্তু সেই সুর যেন আজ আনন্দের নয়, বরং এক অনন্ত বিরহের হাহাকার হয়ে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।

চারপাশে আতর আর গোলাপজলের খুশবু। বসার ঘরে সাদা চাদর বিছানো হয়েছে, যেখানে মুখোমুখি বসে আছে রুহানি আর ইয়াসির। মাঝখানে শুধু এক টুকরো ফুলের দেয়াল—একটু পরেই যা ‘কবুল’ শব্দের মাধ্যমে চিরতরে ঘুচে যাবে।
রুহানির দুপাশে দুই ভাই—আয়ান আর আহান। যেখানে আজ থাকার কথা ছিল মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর সেখানে আজ বড় ভাই আয়ান শক্ত হাতে বোনের হাত ধরে বসে আছে। বাবার অভাব সে কোনোদিন বুঝতে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু আজ এই বিদায়বেলায় রুহানির মনে হচ্ছে, ভাই আর বাবার স্পর্শের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার লুকিয়ে আছে। বাবার জায়গা তো আর কেউ নিতে পারে না।

মায়া ভাবি হিসেবে নয়, বরং রুহানির মায়ের অভাব পূরণ করতে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোদেলা হওয়া কি এতই সহজ? ঠিক যেমন সহজ নয় মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ হওয়া। তবুও আয়ান নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রেখেছে রুহানি আর আহানকে।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। কাজি সাহেবের প্রশ্নের জবাবে কাঁপা কাঁপা গলায় তিনবার ‘কবুল’ বলে ফেলল রুহানি। বলা শেষ হতেই বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। পাশে ভাই আয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে সে যেন তার সবটুকু বিষাদ ঢেলে দিল। আয়ান পরম মমতায় রুহানির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
"চুপ আমার পরী বাচ্চা আর কাদে না।"বললো আয়ান।

বিদায়ের ঘণ্টা বাজল। শিহাব আর শিপ্রা এগিয়ে এলেন ইয়াসিরের বাবা-মায়ের কাছে। শিহাব ইয়াসিরের বাবার হাত ধরে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, "আজ আয়াজ বেঁচে থাকলে হয়তো এই দায়িত্বটা সেই পালন করত। আজ ওর হয়ে আমরা আমাদের কলিজার টুকরাকে আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। খেয়াল রাখবেন, আমার রুহানি যেন কোনোদিন চোখের পানি না ফেলে।"

ইয়াসিরের বাবা-মাও এখন আর আগের মতো নেই। রোদেলা আর আয়াজ জীবিত থাকাকালীন তাদের সাথে সব মান-অভিমান মিটিয়ে নিয়েছিলেন। রুহানি আর ইয়াসিরের ভালোবাসার গভীরতা দেখে তারা সানন্দে সব মেনে নিয়েছেন। তারা আশ্বস্ত করে বললেন, "চিন্তা করবেন না, ও এখন আমাদেরও মেয়ে। আমরা ওকে আগলে রাখব।"

আয়ান এবার ইয়াসিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। ইয়াসিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে রুহানির হাত সেখানে সঁপে দিল। কিন্তু আয়ানের চোখে তখন বন্ধুত্বের নরম আভা নয় বরং এক কঠোর ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি।আয়ান গম্ভীর গলায় বলল,"শোন ইয়াসির, তুই আজ থেকে শুধু আমার বন্ধু না, তুই আমার বোনের স্বামী, আমাদের বাড়ির জামাই। আমার পরী বাচ্চা কে তোর হাতে তুলে দিলাম। কিন্তু আ*ল্লাহর কসম, যদি কোনোদিন তোর অবহেলায় আমার বোনের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি পড়ে, সেদিন আমি নিজের হাতে তোকে খু*ন করবো।আমার বাবা যা করত, আমি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু করব। তোর ক*লিজা ছিঁড়ে আনব যদি আমার বোনকে কষ্ট দিস। হয়তো কোনো ভাই তার বোনের বিদায়লগ্নে এমন কথা বলে না, কিন্তু আমি বলছি—কারণ মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এর আমানত আমার কাছে।ওর মূল্য দিস, ওকে ভালো রাখিস।"

ইয়াসির বললো," আমার কলিজা ই তো তোর বোন।মেরে দিস যদি রুহানির চোখের জলের কারন আমি হই! এই খুন আমি মাফ করে গেলাম ! যেমন করে মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ ভালোবেসেছিল তার রোদেলা রানী কে তেমন করে ভালবাসার চেষ্টা করবে ইয়াসির তার রুহানিকে ।যতক্ষণ রুহানি আছে পৃথিবীতে ঠিক ততক্ষণই থাকবে ইয়াসির এটি আমি ওয়াদা করে বললাম।"
আহান রুহানির হাত ধরে বললো," কাঁদছিস কেন পাগ*লী?
আরে কোথায় যাচ্ছিস? এই তো একটু দূরে। এতদিন শুধু আমাদের দুই ভাইয়ের ক*লিজা চিবিয়ে খেয়েছিস, এবার গিয়ে ইয়াসিরের ক*লিজা খা। তুই যে কত বড় ডা*ইনি, সেটা তো আমরা জানি! তাই তো দুলাভাইকে একটু ভয় দেখিয়ে রাখলাম, যেন তোর ওপর কোনো শব্দ করতে না পারে।"

রুহানি কান্নার মাঝেই আহানের বুকে কয়েকটা কি*ল-ঘু*ষি বসিয়ে দিল। আহান আদরের ছোট বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চু*মু খেল।

তারপর এগিয়ে এসে ভাঙা গলায় শুধু বলল, "দুলাভাই, রুহানি যেন কখনো কষ্ট না পায়।"

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটা এলো যখন রুহানি আর আহান মুখোমুখি হলো।বিদায়ের সময়।যমজ ভাই-বোন তারা; সারাজীবন যারা খুনসুটি আর ঝগড়া করে বাড়ি মাথায় তুলেছে, আজ তাদের বিচ্ছেদের সময়। রুহানি আহানকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। আহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দুষ্টুমির ছলে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করল। সে ম্লান হেসে বলল,"ভালোবাসি রুহানি... তোকে ভীষণ ভালোবাসি। কোনোদিন বলা হয়নি আজ বলে দিলাম। তোকে ছাড়া বাড়িটা একদম খাঁ খাঁ করবে।সবার পরী বাচ্চা তুই। কিন্তু জীবন মরনের সাথী তুই আমার।যাকে বলে নারী ছেড়া সম্পর্ক।একই দিন আমরা পৃথিবীর বুকে এসেছি।তোর একটু কষ্ট তে আমার বুকের ভিতর লাগে।"

আয়ান রুহানি কে বুকে নিয়ে গাড়ীর কাছে আনলো।

গাাড়িতে ওঠার সময় রুহানি শেষবারের মতো পেছনের দিকে তাকালো। বিশাল এই চৌধুরী ভিলার প্রতিটি ইটে যেন তার বাবা-মায়ের স্মৃতি মিশে আছে। আজ সে এক নতুন গন্তব্যে পা বাড়াচ্ছে, কিন্তু পেছনে রেখে যাচ্ছে দুই ভাই আর এক আকাশ সমান ভালোবাসা।

গাড়ির পেছনের সিটে রুহানিকে নিজের বুকের ভেতর আগলে ধরে রেখেছিল ইয়াসির। পুরোটা রাস্তা একটিবারের জন্যও সে রুহানিকে একা বোধ করতে দেয়নি। রুহানি মাঝেমধ্যে ফুঁপিয়ে উঠছিল, আর ইয়াসির পরম মমতায় ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছিল। আপাতত ইয়াসিরদের পারিবারিক বাড়িতেই তাদের কদিন কাটাতে হবে, তবে ইয়াসির তার নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে গত দুই বছরে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর জেদ নিয়ে সে এক বিশাল অট্টালিকা বানিয়েছে তার ‘পরী বাচ্চা’ রুহানির জন্য। যেখানে থাকবে শুধু তাদের দুজনের সাজানো সংসার।

এদিকে চৌধুরী ভিলার ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল জিহাদ আর রামিসা। জিহাদ আড়চোখে রামিসার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কাঁদছো কেন এত? এর পরের সিরিয়াল কিন্তু তোমার!"
রামিসা চোখের পানি মুছে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। রেগে গিয়ে বলল, "খবরদার! একদম বাজে কথা বলবেন না। আমার কলিজার টুকরা বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেল, আমার মন খারাপ, আর আপনি আসছেন রসিকতা করতে?"
জিহাদ একটু মুচকি হেসে চোখের ইশারা করল। শান্ত গলায় বলল, "আরে বাবা, তোমার বান্ধবীর কাছে তোমাকে পাঠানোর জন্যই তো এই সব আয়োজন। আমার কথা কি একটুও ভাববে না?" রামিসা রাগ করার ভান করলেও জিহাদের কথায় ওর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই বিষাদপুরীতেও যেন এক চিলতে নতুন প্রেমের গুঞ্জন।

ভেতরের ঘরে মায়া পরম মমতায় ছোট্ট আহাজকে বিছানায় ঘুম পাড়াচ্ছে। আর আয়ান? সে তখনো দাঁড়িয়ে আছে বাবা-মায়ের সেই বড় ছবিটার সামনে। বুক পকেট থেকে সযত্নে ভাজ করা সেই পুরোনো চিঠিটা বের করল সে। আয়াজের লিখে যাওয়া শেষ চিঠির অক্ষরগুলো এখন আয়ানের মুখস্থ, তবুও প্রতিদিন একবার না পড়লে ওর ঘুম আসে না। চিঠিটা বুকে চেপে ধরে আয়ান চোখ বন্ধ করল। ওর গাল বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ছবির ফ্রেমের ওপর। মায়া দরজার আড়াল থেকে দেখল সবটা, কিন্তু কিছু বলল না। সে জানে, এই কান্নাটুকুই আয়ানের একমাত্র শান্তি, ওর বেঁচে থাকার জ্বালানি।

অন্যদিকে বাসর ঘরের নিস্তব্ধতায় রুহানি একা বসে আছে। হাতে সেই ডায়েরিটা, যেটা রোদেলা ওকে দিয়ে গিয়েছিল। শর্ত ছিল—বিয়ের দিন ছাড়া এটা খোলা যাবে না। কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরির প্রথম পাতাটা উল্টালো রুহানি। সেখানে রোদেলার হাতের লেখায় জলজ্বল করছে একটি ছোট্ট নোট:

"আমার রুহানি, আমার মুনতাসির সাহেবের পরী বাচ্চা... তুমি কখনো ভেবো না মা তোমাকে আমি কম ভালোবেসেছি। যেখানে তোমার বাবার একটা পুরোনো জুতো পর্যন্ত আমি বুকের ভেতর আগলে রাখি, সেখানে তুমি তো আমার মুনতাসির সাহেবেরই অংশ। আমি হয়তো আর বেশিদিন থাকব না মা, আর তোমার বাবাও থাকবে না। ওই পা*গলাটে লোকটা আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচে না, সেটা আমি ভালো করে জানি।পাপা কে স্বার্থপর ভেবো না। পাপা তোমাদের অনেক ভালো বাসে।আমাকে একটু বেশি বাসে এই যা।আজ তুমি যখন এই ডায়েরিটা পড়ছো, তার মানে আমি সশরীরে তোমার পাশে নেই। কিন্তু জেনো মা, আমার দোয়া আর ভালোবাসা সবসময় তোমার ছায়া হয়ে থাকবে। ইয়াসির ছেলেটা খুব ভালো, ও তোমাকে আগলে রাখবে। আমার আর তোমার বাবার পক্ষ থেকে অনেক অনেক দোয়া রইল। আমার সো*না বাচ্চা, মা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে।"

পড়া শেষ করে রুহানি ডায়েরিটা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। রোদেলা সামনাসামনি কোনোদিন এভাবে আবেগ দিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলেনি, কিন্তু আজ এই লেখার প্রতিটি অক্ষরে রুহানি তার মায়ের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। সে ডায়েরিটা বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বিড়বিড় করে বলল, "মা, আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। বাবাকে সবসময় বলেছি, কিন্তু তোমাকে বলা হয়নি। আমি তোমাদের অনেক মিস করছি মা!"

ঠিক সেই মুহূর্তে কখন যে ইয়াসির ঘরে ঢুকেছে রুহানি টেরও পায়নি। ইয়াসির নিঃশব্দে রুহানির পেছনে এসে বসল। রুহানি অনুভব করল এক জোড়া চেনা হাতের স্পর্শ। কোনো সংকোচ না করে সে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল ইয়াসিরের চওড়া বুকে। ইয়াসির পরম নির্ভরতায় তার সহধর্মিনীকে দুহাতে আগলে নিল। বাইরের আকাশে তখন চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে, আর ঘরের ভেতরে শুরু হলো এক নতুন জীবনের গল্প—যেখানে বিরহ থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।

॥ মুনতাসির: চলো রোদেলা রানী।শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে না?

রোদেলা: সঙ্গী তো আপনি হয়েছেন। মুনতাসির সাহেব!

মুনতাসির: ভালোবাসি রোদেলা রানী !

রোদেলা: আপনাকে আমার ভিষন পছন্দ মুনতাসির সাহেব!

মুনতাসির: ছোট বেলায় তোমার ডায়পার আমি চেন্জ করেছি বে*য়াদপ ! (মুচকি হেসে)

রোদেলা: ভালো বাসি মুনতাসির সাহেব! চলুন এই পৃথিবী ছেড়ে মহাকালের যাত্রায়। ॥

আমেরিকার বোস্টন শহর। চার্লস নদীর তীরে বিকেলের ম্লান রোদ খেলা করছে। নদীর কিনারায় আছড়ে পড়া ছোট ছোট ঢেউগুলোর সাথে ভেসে এসেছে একটি কাঁচের বোতল। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন কোনো এক প্রাচীন রহস্যের সংকেত বুকে নিয়ে এটি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এখানে এসে ঠেকেছে।

ষোল বছর বয়সী এক কিশোরী কন্যা নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল। স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপটায় তার অবাধ্য চুলগুলো উড়ছে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল বালুর ওপর পড়ে থাকা সেই বোতলটি। কৌতূহলী হয়ে সে নিচু হয়ে বোতলটি কুড়িয়ে নিল। ভেতরে একটি পুরনো হলদেটে কাগজ দেখা যাচ্ছে—চিঠি! কর্কের ছিপিটা খুলতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল তার সারা শরীরে। মেয়েটি বাঙালি, হাজার মাইল দূরে থাকলেও তার হৃদস্পন্দনে আজও মিশে আছে বাংলার মাটি আর ভাষার টান।
বুক ধকধকানি নিয়ে সে চিঠিটি বের করে পড়তে শুরু করল। প্রথম লাইনটি দেখেই তার চোখের পলক স্থির হয়ে গেল:

"মুনতাসির সাহেব, আপনি আমার জীবনের প্রথম ভালোলাগা, প্রথম শিহরণ। সেই পঞ্চদশী বয়সে, যখন আমি স্রেফ এক কিশোরী, তখন আমার হৃদয়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়া প্রথম পুরুষটি ছিলেন আপনি। আর হয়তো কিছুদিন আমি বেঁচে থাকব, তারপর আমার ভালোবাসার পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু আমি চাই আমার এই ভালোবাসা আজন্ম বেঁচে থাকুক। তাই এই চিঠিটি রেখে গেলাম—যদি কোনোদিন কোনো এক পঞ্চদশী বা ষোড়শী কন্যা এই চিঠিটি পায়, তার বুকেও যেন এক হাহাকার জাগে। সে যেন জানতে পারে, এই পৃথিবীতে রোদেলা নামের কেউ একজন ছিল, যার হৃদয়ে আকাশসম ভালোবাসা ছিল তার মুনতাসির সাহেবের জন্য। রোদেলার জীবনে তো মুনতাসির সাহেব এসেছিল, পৃথিবীর বুকে কি এমন আর কোনো মুনতাসির সাহেব আছে, যাকে অন্য কোনো কিশোরী তার হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পাবে? যেমনটা আমি আপনাকে পেয়েছিলাম?"

চিঠিটা পড়া শেষ করে কিশোরীটি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক অজানা আবেগে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে চিঠিটি নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। কী অদ্ভুত এক সমাপতন! এই চিঠিটি যে লিখেছে তার নাম ছিল রোদেলা, আর যে আজ এই বোস্টনের নদীর তীরে দাঁড়িয়ে চিঠিটি পড়ছে, তার নামও যে ‘রোদেলা’!
নামের এই মিল কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি নিয়তি তাকে কোনো সংকেত দিচ্ছে? কিশোরী রোদেলা দুচোখ বন্ধ করে গভীর এক শিহরণ অনুভব করল।মনে মনে ভাবল—তাহলে কি কোথাও কোনো এক মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ আছে? যে এই রোদেলার হৃদয়ের অধিপতি হবে? যে রোদেলার ভাগ্যে এই চিঠি জুটেছে, তার ভাগ্যে কি সেই মানুষটি জুটবে না? নিশ্চয়ই কোথাও আমার মুনতাসির সাহেব আছে, যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

লেখিকার কলমে কিছু কথা:

প্রিয় পাঠক, এই আবেগঘন মুহূর্তের মাধ্যমেই শেষ হলো ‘আঁধারের বুকে এক ফালি চাঁদ: সিজন টু’। এই গল্পের রেশটুকু শুধু রয়ে গেল সেই পুরনো চিঠির পাতায়। এর পরের গল্পে আপনারা পাবেন সম্পূর্ণ নতুন এক প্রেক্ষাপট। সেখানে আবারও ফিরে আসবে আপনাদের সবার প্রিয় মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এবং রোদেলা।
তবে মনে রাখবেন, আগের গল্পের সাথে এই নতুন সিজনের কোনো সরাসরি মিল নেই। যোগসূত্র শুধু ওই একটি রহস্যময় চিঠি। এই যান্ত্রিক পৃথিবীর কোনো এক কোণে কীভাবে তারা একে অপরকে খুঁজে বের করবে, কীভাবে এক কিশোরীর কল্পনা আর এক পুরুষের গাম্ভীর্য মিলেমিশে একাকার হবে—সেই নতুন আখ্যান নিয়ে শীঘ্রই আসছি। আগের মতোই আপনাদের ভালোবাসা সাথে থাকবে, এই প্রত্যাশা রইল।

 #মায়ার_বাঁধনে_ভালোবাসা #পর্ব_১৯ #সীমা_আফরোজসময় এখন আর নদীর মতো বহমান নয়, বরং এক শান্ত সরোবরের মতো স্থির। মায়াবী নীড়ের দ...
29/03/2026

#মায়ার_বাঁধনে_ভালোবাসা
#পর্ব_১৯
#সীমা_আফরোজ

সময় এখন আর নদীর মতো বহমান নয়, বরং এক শান্ত সরোবরের মতো স্থির। মায়াবী নীড়ের দেয়ালগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের দেয়ালে এখন শ্যাওলার হালকা আস্তরণ পড়েছে, যা বাড়িটিকে এক প্রাচীন ও মায়াবী আভিজাত্য দিয়েছে। বিকেলের রোদে যখন সেই শ্যাওলার ওপর ছায়া পড়ে, মনে হয় বাড়িটি তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো গল্পের গুঞ্জন করছে। আরিশের চুল এখন পুরোপুরি সাদা, যেন শরতের কাশফুল তার মাথায় এসে বাসা বেঁধেছে। মায়ার চোখের চশমার পাওয়ারটা কিছুটা বেড়েছে, যার ফলে মাঝেমধ্যে দূরের জিনিস দেখতে তাকে একটু চোখ কুঁচকাতে হয়। কিন্তু তাদের হৃদয়ের সেই টান, সেই একে অপরের প্রতি অগাধ নির্ভরশীলতা একটুও কমেনি; বরং সময়ের সাথে তা আরও পরিপক্ক হয়েছে।
​সেদিন ছিল আরিশ আর মায়ার বিয়ের ৪০তম বার্ষিকী। চার দশকের এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কত ঝড়, কত অভিমান, আর কত না পাওয়াকে জয় করে তারা আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। রোদেলা আর শাফায়েত মিলে এক বিশাল সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে। তারা চায় বাবা-মাকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে, যেখানে তাঁদের জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে— সেই চিরচেনা নদীর পাড়। যেখানে এক বিকেলে সূর্যাস্তের সাক্ষী রেখে আরিশ প্রথম মায়ার হাত ধরেছিল এবং অস্ফুট স্বরে বলেছিল, "সারাজীবন কি এভাবেই পাশে থাকবে?"
​গাড়িতে ওঠার সময় মায়া একটু ইতস্তত করছিলেন। তিনি আরিশের কানে কানে বললেন, "আরিশ , এই বয়সে আবার সেই নদীর পাড়ে যাওয়া কি ঠিক হবে? লোকে দেখলে কী ভাববে?" আরিশ মৃদু হেসে মায়ার হাতটা আলতো করে চেপে ধরলেন। তার সেই স্পর্শে আজও মায়া সেই বিশ বছরের তরুণীর মতো শিহরিত হন। আরিশ বললেন, "লোকে কী ভাববে তা নিয়ে তো আমরা কোনোদিন ভাবিনি মায়া। আজ শুধু আমাদের দিন। আজ স্মৃতিদের ফিরে দেখার দিন।"
​আরিশ আর মায়া যখন সেই পুরনো নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল, সূর্য তখন দিগন্তে পাটে বসেছে। আকাশের রং নীল থেকে সিঁদুরে লাল হয়ে গেছে, যেন কোনো শিল্পী তার ক্যানভাসে আবীর ছিটিয়ে দিয়েছেন। নদীর জল আগের মতোই কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলেছে। তবে ঘাটের সিঁড়িগুলো আগের চেয়ে অনেকটা খয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরেছে। কিন্তু নদীর সেই গন্ধ, সেই স্নিগ্ধ বাতাস একদম আগের মতোই আছে।
​আরিশ মায়ার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি হাসলেন। তার চোখের কোণে জমে থাকা বলিরেখাগুলো যেন সেই হাসির সাথে কথা বলছিল। তিনি বললেন, "মায়া, মনে পড়ছে এই জায়গাটার কথা? সেদিন তোমার পরনে ছিল সেই আকাশী রঙের শাড়িটা। বাতাসে তোমার আঁচল বারবার অবাধ্য হয়ে উড়ে যাচ্ছিল, আর তুমি তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলে। আজও আমার চোখে সেই দৃশ্যটা একদম পরিষ্কার। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা।"
​মায়া আরিশের বাহু জড়িয়ে ধরল। বার্ধক্যের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও অনুভূতির তীব্রতা কমেনি। তিনি বললেন, "কেমন করে ভুলব আরিশ ? এই নদীটাই তো আমাদের জীবনের কত না বলা কথা শুনেছে। আমাদের মান-অভিমান, আমাদের স্বপ্ন দেখা—সবই তো এই জলের স্রোতে মিশে আছে। জীবনটা তো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফুরিয়ে এল, তাই না? মনে হয় যেন সেদিন এই বাড়িতে নতুন বউ হয়ে এলাম, আর আজ চল্লিশ বছর পার হয়ে গেল!"
​আরিশ মায়ার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সময় ফুরিয়ে যায়নি মায়া, সময়টা আমাদের স্মৃতির ডালি সাজিয়ে দিয়েছে। দেখো, আজ আমাদের পাশে রোদেলা আছে, আয়ান আছে। আমাদের ভালোবাসা শুধু আমাদের দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটা এখন একটা বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আমরা যা বুনেছিলাম, তার ফল আজ আমাদের চোখের সামনে।"
​ঠিক তখনই রোদেলা দৌড়ে এল এক খুশির খবর নিয়ে। রোদেলার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আভা, যা কেবল আসন্ন মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া কোনো নারীর মুখেই দেখা যায়। সে শাফায়াতের হাত ধরে লাজুক মুখে বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়ালো। রোদেলার ঠোঁটে ছিল জয়ের হাসি, আর চোখে আনন্দের ঝিলিক। সে খুব নিচু স্বরে বলল, "মা, বাবা... আমি তোমাদের নানা আর নানু বানাতে চলেছি। আমাদের মায়াবী নীড়ে আবার ছোট ছোট পায়ের শব্দ শোনা যাবে। আবার সেই বারান্দায় নতুন কারো কান্নার শব্দ আর হাসির রোল উঠবে!"
​এই সংবাদটি যেন মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলল। মায়া আরিশের দিকে তাকালো। দুজনের চোখেই টলমল করছে আনন্দাশ্রু। এই যেন জীবনের এক পরম চক্র পূর্ণ হলো। রাবেয়া বেগম পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অনেক বছর হলো। তার শূন্যতা মায়া প্রতিদিন অনুভব করেন। কিন্তু আজ মায়ার মনে হলো, প্রকৃতির নিয়মেই এক প্রাণ যায় আর অন্য প্রাণ আসে। রাবেয়া বেগমের জায়গা নিতে আবার নতুন এক ছোট প্রাণ আসছে এই সংসারে।
​মায়া রোদেলার কপালে পরম মমতায় একটি দীর্ঘ চুমু খেলেন। তার হাত দুটো রোদেলার পেটের ওপর আলতো করে রেখে আশীর্বাদ করলেন। তিনি ধরা গলায় বললেন, "এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছু হতে পারে না রে মা। আজ আমাদের ৪০ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় সার্থকতা খুঁজে পেলাম। আমাদের এই মায়ার বাঁধনটা তবে আরও এক প্রজন্ম এগিয়ে যাবে। মায়াবী নীড় কোনোদিন প্রাণহীন হবে না।"
​সেদিন রাতে নদীর পাড়ে খোলা আকাশের নিচে সবাই মিলে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। মোমবাতির আলো আর চাঁদের মায়াবী রোশনাই মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। মুহিত আর তিথিও এই বিশেষ মুহূর্তে যোগ দিয়েছিল। মুহিত এখন বেশ বয়স্ক, চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু বড় দিদির সামনে সে আজও সেই চঞ্চল ছোট ভাইটি। সে মায়ার পাতের থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে হাসাহাসি করছিল, যেন তারা আবার সেই শৈশবে ফিরে গেছে।
​আড্ডার মাঝে এক সময় চারপাশটা কিছুটা নিঝুম হয়ে এল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। মায়া খুব শান্তভাবে আরিশের কাঁধে মাথা রেখে বললেন, "আরিশ সাহেব, আমার যদি আবার জন্ম হয়, আর সৃষ্টিকর্তা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কী হতে চাই, তবে আমি যেন আবারও আপনার এই সাধারণ সংসারের সাধারণ এক মায়া হয়েই আসি। আপনার ওই খিটখিটে মেজাজ আর আমার এই সাধারণ জীবন—এটাই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ।"
​আরিশ আকাশের উজ্জ্বল ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগে বললেন, "আর আমি যেন প্রতিবারই তোমাকে খুঁজে নিতে পারি মায়া। এই পৃথিবীতে অনেক জাঁকজমক আছে, অনেক প্রাচুর্য আছে। কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে মানুষ হয়তো প্রাসাদ গড়ে, কিন্তু দিনশেষে তারা বড্ড একা হয়ে যায়। আমাদের এই সাদামাটা ভালোবাসা, আমাদের এই অল্পতে তুষ্টি—এটাই আমাদের কোনোদিন একা হতে দেয়নি। আমাদের সম্পদ তো আমাদের স্মৃতি আর আমাদের এই সন্তানরা।"
​রাত যখন গভীর হলো, তারা বাড়ির পথে রওনা দিল। গাড়ির পেছনের সিটে বসে মায়া দেখলেন, রোদেলা শাফায়াতের কাঁধে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রোদেলার চোখের পাতায় সেই একই স্বপ্ন আর অনাগত দিনের প্রতি ভালোবাসা স্পষ্ট, যা একদিন মায়ার নিজের চোখে ছিল। তিনি বুঝলেন, মায়ার বাঁধন কোনোদিন ছিঁড়ে যায় না; এটা শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে সঞ্চারিত হয়। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে মায়ার এই সুতোটা বোনা হতে থাকে।
​'মায়াবী নীড়' আজ শুধু ইট-কাঠের একটি বাড়ি নয়, এটি একটি আদর্শের নাম, একটি আশ্রয়ের নাম। যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়ার হিসাব মেলানো নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে একে অপরকে পূর্ণ করা।
​বাড়ি ফিরে সব যখন নিস্তব্ধ হয়ে গেল, মায়া তার পুরনো ডায়েরিটা বের করলেন। ধীর হাতে কলম ধরলেন তিনি। ডায়েরির শেষ পাতায় তিনি আজকের দিনের অনুভূতিগুলো লিখে রাখতে চাইলেন। তিনি লিখলেন— "ভালোবাসা মানে শুধু প্রাপ্তি নয়, ভালোবাসা মানে একে অপরকে সবটুকু দিয়ে আগলে রাখা। জীবনটা খুব সাদামাটা হতে পারে, আড়ম্বরহীন হতে পারে, কিন্তু সেই জীবনের মায়া যদি অটুট থাকে, তবে সেটাই পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ। আমি সেই স্বর্গেরই এক নগণ্য অধিবাসী হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিলাম।"
​জানালার বাইরে তখন একঝাঁক জোনাকি জ্বলছিল। মায়া ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক তৃপ্তির হাসি হাসলেন। তার মনে হলো, রাবেয়া বেগম ওপর থেকে দেখছেন আর হাসছেন। মায়াবী নীড় আজ সত্যিই মায়ায় পরিপূর্ণ।

আধারের বুকে এক ফালি চাঁদ সিজন ২পর্ব ১০১হিমশীতল অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে পাশাপাশি শুয়ে আছে দুটি নিথর দেহ—মুনতাসির চৌধুরী আয...
16/03/2026

আধারের বুকে এক ফালি চাঁদ সিজন ২
পর্ব ১০১

হিমশীতল অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে পাশাপাশি শুয়ে আছে দুটি নিথর দেহ—মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এবং তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় রোদেলা রানী।তিন দিন ধরে ফ্রিজিং করে রাখা শরীর দুটোর শুভ্রতা যেন অপার্থিব এক মায়ায় ঢাকা। বাইরে তখন শোকাতুর মানুষের ভিড়, প্রত্যেকের মনে একটাই প্রশ্ন—কতটা ভালোবাসলে একজন মানুষ তার মৃত স্ত্রীর মুখ দেখে হাসিমুখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারে? বিয়োগান্তক এই সমাপ্তির মাঝেও যেন এক অলৌকিক প্রশান্তি খেলা করছে তাদের অবয়বে।

গতকাল রাতেই খবর পেয়ে আয়াজের বোন সারা চৌধুরী, রাতুল এবং হুমায়রা আজ বিকেলে এসে পৌঁছেছেন। আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী—সবাই উপস্থিত, কিন্তু সবার মাঝেই এক স্তব্ধতা। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভেঙে আয়ান কথা বলল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা, কিন্তু সিদ্ধান্তে অনড়।

"নানা ভাই, আর দেরি করবেন না। আমার বাবা-মার কষ্ট হচ্ছে। কারো জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন নেই, তাড়াতাড়ি জানাজার ব্যবস্থা করুন।"

আয়াজের বিশ্বস্ত সেক্রেটারি মিস্টার এলেক্স তখন কাঁপাকাঁপা হাতে একটি ব্রিফকেস খুললেন। সেখান থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে আয়াজ ও রোদেলার স্মৃতিবিজড়িত ব্যক্তিগত সামগ্রী—এক জোড়া ইয়ারিং, ডায়েরি, আর আয়াজের সেই প্রিয় হাতঘড়িটি। রুহানি দূরে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল। ডায়েরির ওপরের প্রচ্ছদে আয়াজের নিজের হাতে খোদাই করা ছিল—"আমার ভালোবাসার মানুষেরা।"

ডায়রী টা রোদেলার।রুহানি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দৌড়ে এসে বাবার শেষ স্মৃতি হাতঘড়িটি বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।ইয়াসির রুহানির মাথা নিজের ববক্ষে রাখলো।বললো," কাঁদো রুহানি।"

আয়ানের কাঁপা কাঁপা হাত যখন ঘড়িটি স্পর্শ করলো সে লক্ষ্য করল কাঁটাগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে স্থির হয়ে আছে। এই সেই বিশেষ ঘড়ি, যা আয়াজের হৃদস্পন্দনের সাথে সংযুক্ত ছিল। ঘড়ির কাঁটা বলছে—১২ই মার্চ, রাত ১১টা। অর্থাৎ ওই মাহেন্দ্রক্ষণেই আয়াজের বিশাল হৃদপিণ্ডটি তার স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছিল।আয়ান চোখ বন্ধ করলো।

মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে আয়াজ কাঁপাকাঁপা পায়ে রোদেলার শিয়রে এসে বসেছিল। রোদেলার সেই চিরচেনা শান্ত মুখ, যে মুখে দুদিন আগেও কত হাসি লেগে ছিল। দুদিন আগেও রোদেলা তার মুনতাসির সাহেব এর বুকে ছিলো।আয়াজ কাঁদেনি; বরং এক চিলতে হাসি নিয়ে রোদেলার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।আয়াজের মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রথম পরিচয়ের ক্ষন সেই ছাদ, গাজীপুর রিসোর্টের সেই নির্জন বিকেল, আর সর্বশেষ তাদের পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক ছবিটি।যেখানে ইয়াসির যুক্ত হয়ে ছিলো।

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে আয়াজ অস্ফুট স্বরে নিজের সন্তানদের আশীর্বাদ করে গিয়েছিল। তার মনে পড়েছিল রুহানির কথা, আয়ানের দায়িত্ববোধ আর ছোট আহানের অভিমানী মুখটির কথা। আহান হয়তো ভাবত পাপা তাকে ভালোবাসে না, কিন্তু আয়াজ তার শেষ চিঠিতে লিখে গেছে—"আহান, তুমি আমার রোদেলার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। রুহানি আমার পরী বাচ্চা।ইয়াসির তোমাকে ভালো রাখবে আমার চেয়ে বেশি না হলেও কম না।"
রাত ১১টার সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে, যখন ধরিত্রীর সমস্ত কোলাহল থেমে গিয়েছিল, আয়াজ রোদেলার আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়েছিল। পরম মমতায় তার কপালে একে দিয়েছিল শেষ চুমু। ঘড়ির কাটায় টিকটিক টিক। হঠাৎ টিকটিক শব্দ আর হৃদয়ের ধুকপুকানি—দুটোই একসাথে স্তব্ধ হয়ে গেল।আয়াজের বুকে রোদেলা রানী।শেষ হলো জীবন কিন্তু শুরু হলো এক মহাকালের কাল যাত্রা। দুনিয়ার লীলা ভঙ্গ হলো। সাঙ্গ হলে পার্থিব প্রেম। পরকালের যাত্রায় একে অপরের হাতে হাত রেখে খুশি মনে ছুটি নিলো এই পৃথিবী থেকে।
যে প্রেম এই ধরিত্রী তে শুরু হলো তার সমাপ্তি হলো না।শেষ হয়েও হইলো না শেষ এই কালজয়ী প্রেমের।

গাড়ির পাশে নিথর হয়ে বসে আছে শিহাব, যেন পাথরের এক মূর্তি। শিপ্রা ছলছল নয়নে দেখছে রোদেলা যে প্রথম মা বলে ডেকেছিলো শিপ্রা কে।আয়াজ ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। বুকের ভিতর হুহু করে উঠলো শিপ্রার।

রামিশার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। তার সেই প্রিয় 'হ্যান্ডসাম জিজাজি', যাকে সে বাবার পরে সবথেকে বেশি ভালো বাসতো। প্রথম পুরুষ যাকে অবলীলায় ভালো বাসি বলতে বাধতো না রামিসার।সে আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মায়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে, রোদেলা কি তবে আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল? তাই কি যাওয়ার আগে সব গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছিল?
মৃত্যু হয়তো তাদের শরীরকে আলাদা করতে পেরেছে, কিন্তু এই অসম প্রেমের কোনো সমাপ্তি নেই। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তারা এখন এমন এক যাত্রার পথিক, যেখানে বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই। ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সের সেই কাঁচের ওপারে শুয়ে থাকা আয়াজ আর রোদেলা যেন প্রমাণ করে গেল—ভালোবাসা কেবল বেঁচে থাকায় নয়, একসাথে ফুরিয়ে যাওয়াতেও সার্থকতা পায়।

মিস্টার এলেক্স অতি সন্তর্পণে রোদেলার সেই কারুকার্যখচিত ডায়েরিটি আয়ানের হাতে তুলে দিলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল ধরা-গলা, তাতে মিশে ছিল গভীর এক শ্রদ্ধাবোধ। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, “আয়ান বাবা, ম্যাম এই ডায়েরির প্রতিটি পাতায় তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা লিখে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন এটি যেন আপনার হাতেই পৌঁছায়। আর এই যে খামগুলো দেখছেন—শিহাব, আহান, রুহানি, মায়া, ইয়াসিন—সবার জন্য আলাদা আলাদা করে চিঠি রেখে গেছেন স্যার আর ম্যাম। এমনকি একটি উইলও আছে এতে।”

আয়ানের হাত দুটি কাঁপছিল। সে ডায়েরি আর খামগুলো বুকে চেপে ধরল। তার মনে একটি প্রশ্ন বারবার বিঁধছিল—তবে কি বাবা-মা আগে থেকেই জানতেন যে এমন কিছু ঘটতে চলেছে? মুনতাসির চৌধুরী আয়াজের রেখে যাওয়া প্রতিটি জিনিস আজ অমূল্য, একেকটি স্মৃতি যেন হৃদয়ের র*ক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করার সাধ্য কার?

অবশেষে এলো সেই বুকফাটা মুহূর্ত—আয়াজ ও রোদেলার চিরবিদায়ের ক্ষণ। শুভ্র কাফনে মোড়ানো দুটি দেহ যখন পাশাপাশি রাখা হলো, মনে হচ্ছিল তারা যেন কোনো এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, যেখানে কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো জাগতিক পিছুটান। জানাজা শেষে যখন তাদের খাটিয়া তোলা হলো, তখন আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে কান্নার রোল উঠল।
রুহানি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল, তার কান্নার শব্দে উপস্থিত সবার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আহান ছোট হাতে বাবার খাটিয়াটি শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। সে অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে সেই খাটিয়ার দিকে, যেখান থেকে তার পাপা আর কোনোদিন তাকে ভালোবেসে আগলে নেবে না।মা পরম মমতাব ওর পক্ষ নেবে না।

ইয়াসির শিহাব, রাতুল , আহান আয়ান একে একে সবাই কাঁধ দিল সেই শেষ যাত্রায়। এমনকি মিস্টার এলেক্স, যার সাথে এই মাটির বা সংস্কৃতির কোনো আত্মিক যোগ নেই, তিনিও অশ্রুসজল চোখে খাটিয়াটি ছুঁয়ে রইলেন। এটি কেবল এক মালিকের প্রতি অনুগত থাকার দায় নয়, বরং এক অপার্থিব ভালোবাসার প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল দুটি খাটিয়া। যে বাড়িটি একদিন রোদেলার হাসিতে মুখর থাকত, যে বাড়িতে আয়াজের গম্ভীর কিন্তু স্নেহময় পদচারণা ছিল—সেখানে আজ কেবল খাঁ খাঁ শূন্যতা।

আর কোনোদিন এই বাড়ির স্টাডি রুমে নিভৃত কোনো সন্ধ্যায় তাদের ভালোবাসার খুনসুটি হবে না। হবে না কোনো দুষ্টুমি, যেখানে বাবা-মায়ের রোমান্স দেখে ছেলে লজ্জায় সরে যেতো।সেই মায়াবী ঝগড়া, সেই মান-অভিমান—সবকিছু আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দি হয়ে গেল।

পারিবারিক গোরস্থানে যখন তাদের পাশাপাশি শায়িত করা হলো, তখন যেন প্রকৃতির বুকেও শোকের ছায়া নেমে এলো। এই ধরণীর বুকে তাদের প্রেমের উপাখ্যান হয়তো এখানেই শেষ, কিন্তু মহাকালের যাত্রায় তারা হাত ধরাধরি করে রওনা হয়েছে এক অনন্ত পথে। পার্থিব জগতের সকল সীমানা পেরিয়ে, আয়াজ আর রোদেলা এখন এমন এক জগতে, যেখানে বিচ্ছেদ শব্দটি কোনো অভিধানে নেই।
পিছনে পড়ে রইল এক বিশাল শূন্যতা, কিছু অমূল্য চিঠি ডায়েরি, আর কতগুলো না বলা কথা। মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ আর রোদেলার এক টুকরো প্রেমের মহাকাব্য সমাপ্ত হলো এক অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে।

👉মুনতাসির চৌধুরী আয়াজ এবং রোদেলার এই অসমাপ্ত গল্পের এক অধ্যায় শেষ হলেও নতুন শুরুর আভাস ।তাদের না বলা কথা, ডায়েরির পাতা আর চিঠির খামগুলো শেষ পর্যন্ত উন্মোচিত হবে পরবর্তী পর্বে।

 #মেঘলা_বিকেলের_এক_চিলতে_রোদ #পর্ব_৫ #সীমা_আফরোজ​পার্টি থেকে ফেরার পর পুরো রাস্তা সোহেল সাহেব একটা কথাও বলেননি। মমর বুকে...
13/03/2026

#মেঘলা_বিকেলের_এক_চিলতে_রোদ
#পর্ব_৫
#সীমা_আফরোজ

​পার্টি থেকে ফেরার পর পুরো রাস্তা সোহেল সাহেব একটা কথাও বলেননি। মমর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। সোহেল সাহেবের গাড়ি চালানোর ভঙ্গি আজ অন্যরকম—একদম শান্ত কিন্তু ভেতরে যেন ঝড় বইছে। বাসার গেটে পৌঁছানো পর্যন্ত মম জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছিল। আজ রাতের আকাশটা বড্ড ভারী মনে হচ্ছে তার কাছে।
​বাসায় ঢুকেই সোহেল সাহেব ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বালিয়ে মমর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তীব্র আলোর নিচে সোহেল সাহেবের মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। তার শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলার স্বর মমর ভয় বাড়িয়ে দিল।
​— "মম, আরশাদ আমার বন্ধু। ওর কাছে তোকে পাঠিয়েছিলাম কাজ শিখতে, জীবন নষ্ট করতে নয়। ছাদে তুই ওর অত কাছে দাঁড়িয়ে কী করছিলি? আমার চোখে ধুলো দেওয়া কি এতই সহজ মনে করিস?"
​মম মাথা নিচু করে রইল। আজ আর তার মুখে কোনো হাসি নেই, নেই সেই চঞ্চলতা। সোহেল সাহেব ধমক দিয়ে বললেন—
​— "উত্তর দে! আরশাদ কি তোকে কিছু বলেছে? নাকি তুই ওকে কোনোভাবে বিরক্ত করছিস? মনে রাখিস মম, আরশাদ চৌধুরীর আভিজাত্য আর আমাদের অবস্থানের মধ্যে এক বিশাল দেয়াল আছে। ওর সাথে আমাদের কোনো তুলনা হয় না। তুই কি চাস আমার বন্ধু মহলে আমি মুখ দেখাতে না পারি?"
​মম এবার মাথা উঁচু করল। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে, কিন্তু গলায় এক অদ্ভুত জেদ ভর করেছে। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল—
​— "বাবা, আরশাদ সাহেব আমায় কিছুই বলেননি। আর বিরক্তির কথা যদি বলো, তবে বলব— ভালোবাসা যদি বিরক্তির কারণ হয়, তবে আমি তাঁকে বিরক্ত করছি। কারণ আমি তাঁকে ভালোবাসি, বাবা। এটা কোনো সাময়িক আবেগ নয়।"
​সোহেল সাহেব থমকে গেলেন। তিনি কল্পনাও করেননি তার শান্ত মেয়েটা এত সরাসরি এই কথা বলবে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন—
​— "ভালোবাসা! কার সাথে? যে তোর বাবার বয়সী, যার সাথে আমাদের আভিজাত্যের আকাশ-পাতাল পার্থক্য? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? লোকে জানলে হাসাহাসি করবে মম। কাল থেকে তুই আর অফিসে যাবি না। এটা আমার শেষ কথা। আমি কালই তোর ফোন নিয়ে নেব।"
​মম নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সারা রাত কাঁদলো। বালিশ ভিজে একাকার হয়ে গেল তার চোখের জলে। সে ভাবছিল আরশাদ সাহেবের সেই শীতল চোখের চাহনি আর ছাদের সেই মুহূর্তটির কথা। কিন্তু মম হার মানার মেয়ে নয়। তার চোখের জলের আড়ালে এক তীব্র প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল।
​পরদিন সকালে আরশাদ চৌধুরী অফিসে বসে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। নয়টা বেজে দশ মিনিট, এখনো মমর কোনো খবর নেই। আরশাদের হাতের কলমটা টেবিলের ওপর বারবার ঠকঠক শব্দ করছে। তার মেজাজ আজ তুঙ্গে। তিনি ইন্টারকমে সেক্রেটারিকে ডাকলেন।
​— "মম কোথায়? এখনো আসেনি কেন? ও কি জানে না আজকের মিটিংটা কতটা জরুরি?"
​সেক্রেটারি ভয়ে ভয়ে বলল, "স্যার, মমর ফোন বন্ধ। আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। ওর বাসা থেকেও কেউ কিছু বলেনি।"
​আরশাদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। জানালার ওপাশে তাকিয়ে তার মনে হলো, আজ ব্যস্ত অফিসটা বড্ড ফাঁকা, বড্ড নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচের প্রতিবিম্বে তিনি নিজেকেই যেন চিনতে পারছেন না। সোহেল কি কিছু বুঝতে পেরেছে? আরশাদের মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল শায়লার নাম। আরশাদের মা আর শায়লার পরিবার মিলে আজ বিকেলে বাগদানের তারিখ পাকা করতে চায়। আরশাদ ফোনের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তিক্ততা অনুভব করলেন। কেন যেন শায়লার মিষ্টি কণ্ঠস্বরও আজ বিষের মতো লাগছে তার কাছে।
​বিকেল বেলা আরশাদ আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সরাসরি সোহেল সাহেবের বাসায় হাজির হলেন। দরজায় নক করতেই সোহেল সাহেব দরজা খুললেন। আরশাদকে দেখে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত, কিছুটা রুক্ষ।
​— "আরে আরশাদ! তুই এই সময়ে? হঠাৎ কী মনে করে?"
​আরশাদ কোনো ভূমিকা না করেই ভেতরে ঢুকে বললেন—
​— "সোহেল, মম অফিসে যায়নি কেন? আমার একটা ইমপর্ট্যান্ট প্রজেক্ট মাঝপথে আটকে আছে। ও যে ফাইলগুলো রেডি করছিল সেগুলো ছাড়া কাজ এগোচ্ছে না। তুই ওকে কেন আসতে দিসনি?"
​সোহেল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, "ও আর অফিসে যাবে না আরশাদ। আমি চাই না আমার মেয়ে কোনো অবাস্তব স্বপ্ন দেখুক। তুই আমার বন্ধু হতে পারিস, কিন্তু তোর অফিসে গিয়ে ও নিজের সীমা ভুলে যাচ্ছে। ওর বিয়ের কথাবার্তা আমি শুরু করেছি। পাত্র আমার চেনা, ভালো বংশের ছেলে।"
​কথাটা শুনে আরশাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো বুকের ভেতর কেউ যেন শক্ত করে চেপে ধরেছে। তিনি নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন—
​— "বিয়ে? কার সাথে? মম কি রাজি? সোহেল, তুই ওকে জোর করতে পারিস না। ও একটা শিক্ষিত মেয়ে, নিজের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা ওর আছে।"
​সোহেল সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, "বন্ধু হিসেবে বলছি আরশাদ, তুই দূরে থাক। ও তোকে 'আরশাদ সাহেব' ডাকে, শ্রদ্ধা করে, আর তুই ওর পক্ষ নিচ্ছিস? এটা ভালো দেখাচ্ছে না। লোকে আড়ালে অনেক কথা বলছে, তুই কি সেগুলো শুনতে চাস?"
​ঠিক তখনই মম তার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল।এক রাতের তার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, মুখটা ফ্যাকাসে, কিন্তু দৃষ্টি এখনো ধারালো। সে আরশাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলে
​— "আপনি এখানে কেন এসেছেন আরশাদ সাহেব? আজ তো আপনার বাগদান হওয়ার কথা। শায়লা আপু আপনার জন্য শাড়ি পরে অপেক্ষা করছে না? আপনি সেখানে না গিয়ে আমার বাড়িতে কেন এসেছেন?"
​আরশাদ মমর দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন। সোহেল সাহেবের সামনেই তিনি মমর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
​— "আমার বাগদান হবে কি হবে না, সেটা ঠিক করার অধিকার আমি শুধু একজনকেই দিয়েছি। কিন্তু সে আজ অফিসে না এসে ঘরে বসে নাটক করছে। মম, পালিয়ে গিয়ে কোনোদিন জয়ী হওয়া যায় না।"
​মম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরশাদের কথার অর্থ উদ্ধার করতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। আরশাদ এবার সোহেল সাহেবের দিকে ফিরে বললেন—
​— "সোহেল, মম অফিসে যাবে। ওর ক্যারিয়ার নষ্ট করার অধিকার তোর নেই। ও যদি ভুল করে থাকে, তবে সেই দায় আমার ওপরও বর্তায়। আর রইল আমার বিয়ের কথা— ওটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তুই বন্ধু হয়েই থাক, আমার অভিভাবক হওয়ার চেষ্টা করিস না। কাল সকালে মমকে আমি অফিসে দেখতে চাই।"
​আরশাদ গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। সোহেল সাহেব পাথর হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, যুদ্ধটা শুধু মমর একার নয়; আরশাদ চৌধুরীও এই অদৃশ্য মায়ার টানে জড়িয়ে গেছেন। আভিজাত্যের চেয়ে আজ ভালোবাসার জেদ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
​রাতের বেলা আরশাদ তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাজিয়া বেগম যখন শায়লার গুণগান আর বাগদানের কথা তুললেন, আরশাদ শান্ত কিন্তু অবিচল গলায় বললেন—
​— "মা, এই বিয়েটা আমি করব না। আরশাদ চৌধুরীকে টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব, কিন্তু তার মনটা অন্য কারো কাছে বন্ধক দেওয়া হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমি যদি বিয়ে করি, তবে আমার পছন্দমতো কাউকেই করব।"
​রাজিয়া বেগম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বাড়ির বড় ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুরু হলো এক নতুন নীরব যুদ্ধের।

চলবে-------

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sima Afroz posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share