16/09/2025
'Civilization' যা 'Civis' বা 'Civitas' শব্দ থেকে এসেছে। আর 'Civitas' শব্দের অর্থ নাগরিক বা Citizen । প্রখ্যাত দার্শনিক ভলতেয়ার সর্বপ্রথম সভ্যতা বা 'Civilization' শব্দটি ব্যবহার করেন। সাধারণত সভ্যতা হচ্ছে মানুষের উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতি, কার্যপ্রণালি, স্থাপত্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং কৌশলাদির সমষ্টি। আর ব্যাপকার্থে, সভ্যতা হচ্ছে কোন একটি অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর উন্নততর জীবনব্যবস্থার প্রয়োজনে উদ্ভাবিত লিখন পদ্ধতি, আইন, সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক
ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য, নব প্রযুক্তি, শিক্ষা ও ধর্মীয় দর্শনাদির সমষ্টি।
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও নৃবিজ্ঞানী সভ্যতার বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন যা নিম্নরূপ: মন্টেস্কু এবং হ্যান্টিংটন (Montesquieu & Huntington) বলেন, "সভ্যতা হচ্ছে ভৌগোলিক তথা প্রাকৃতিক পরিবেশের আশীর্বাদপুষ্ট এক ফসল।" আলফ্রেড ওয়েবার (Alfred Waber) বলেন, "Civilization is meant primarily scientific and technical knowledge and the command which they give over natural resources."
সমাজবিজ্ঞানী ইবন খালদুন তার রচিত বিশ্ববিখ্যাত Al Muqaddimah-গ্রন্থে সভ্যতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন:
«الحضارة هي أحوالٌ زائدةٌ على الضروري من أحوال العمران، وهي التفنن في الترف واستجادة أحواله والكمال في صنائعته.»
*(Muqaddimah, Vol.1, p. 47)*
অর্থ: সভ্যতা হলো মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত উন্নত অবস্থা, যেখানে শিল্পকলা, বিজ্ঞান,
জীবনযাত্রা ও আচার-আচরণের উৎকর্ষ প্রকাশ পায়। আর ইসলামী সভ্যতা এই উন্নতিকে ইসলামি নৈতিকতা ও শরীয়াহ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করে।
“ইসলামী সভ্যতা” (al-ḥaḍārah al-islāmiyyah) হলো সেই সামগ্রিক জীবনধারা, যেখানে মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌত উন্নতি—সবকিছুই কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে পরিচালিত হয়।
স্যার সাইয়্যেদ আমীর আলী তার বিখ্যাত বই The Spirit of Islam-এ লিখেন: “Islamic civilization is not merely the political power of Muslims, rather it is the moral, intellectual and social system which Islam introduced into human society.”
অর্থ: ইসলামী সভ্যতা কেবল মুসলিম শাসনব্যবস্থার নাম নয়, বরং একটি নৈতিক, জ্ঞানমূলক ও সামাজিক কাঠামো, যা ইসলাম মানব সমাজকে প্রদান করেছে।
ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তার Introduction to Islam-এ ইসলামী সভ্যতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:
“Islamic civilization is the material and spiritual progress achieved under the guidance of Islamic teachings.” অর্থ: ইসলামী সভ্যতা হলো ইসলামি শিক্ষা দ্বারা পরিচালিত মানবজাতির বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন।
ড. আলী মাযরুই তার গ্রন্থ Islamic Civilization: The Making and Unmaking এ বলেন: “Islamic civilization is a synthesis of faith and reason, revelation and experience, which has shaped diverse societies under the umbrella of Islam.”
অর্থ: ইসলামী সভ্যতা হলো ঈমান ও যুক্তি, ওয়াহী (আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান) ও মানব অভিজ্ঞতার সমন্বয়; যার মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজ ইসলামের ছায়াতলে এক হয়ে গড়ে উঠেছে।
মহানবী (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদার সময়ে ইসলামী সভ্যতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়। অনেক পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে উমাইয়া, আব্বাসীয়, সালজুক, ফাতিমীয় ও উসমানী খিলাফতেও
ইসলামী সভ্যতা সুস্পষ্ট। ইসলামী সভ্যতার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ :
১. তাওহীদের ভিত্তি – আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসই ইসলামী সভ্যতার মূল।
২. নৈতিকতা ও আখলাক – সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা।
৩. জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা – কুরআন ও হাদীস ও অন্যান্য জ্ঞানের চর্চা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করেছে সর্বাত্মকভাবে।
৪. আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুগত উন্নয়নের ভারসাম্য – শুধু দুনিয়া নয়, আখিরাতের সাফল্যও লক্ষ্য।
৫. সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমন্বয় – আরব, ফারসি, তুর্কি, ভারতীয়, আন্দালুসীয় ইত্যাদি ঐতিহ্য মিলিয়ে একটি বিশ্বজনীন সভ্যতা।
৬. ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা – যেখানে শাসক জনগণের খেদমতগার।
৭. মানবকল্যাণে বিজ্ঞান ও শিল্প – চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, স্থাপত্য, সাহিত্য প্রভৃতিতে অগ্রগতি সাধন।
আরেফিন আল ইমরান
১৪-০৯-২০২৫