17/05/2026
The Mohadan Washington Times 24 bd. com
শুভেন্দুর কার্যালয়ে গরু বেঁধে আসার হুমকি
নতুন গো-আইনে হিন্দু খামারিদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল, আত্মহত্যার আকুতি
১৭ মে ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাঙ্গড় থানার অন্তর্গত নারকেলবেড়িয়ার ঘোষপাড়া। প্রথাগতভাবে ডেইরি খামার ও দুগ্ধ ব্যবসার জন্য পরিচিত এই হিন্দু প্রধান জনপদটিতে এখন শুধুই কান্নার রোল। কুরবানির ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে গরু কেনাবেচার ওপর নতুন কঠোর আইনি বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে এখানকার খাটালগুলোর অর্থনীতি। কোটি কোটি টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে শত শত হিন্দু খামারি পরিবার এখন আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে বিষ খেয়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার পথ খুঁজছেন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, ডেইরি ফার্মে দেড়-দুই বছর দুধ দেওয়ার পর যখন একটি গরু অনুৎপাদক হয়ে পড়ে, তখন কুরবানির বাজারে মুসলিম ক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করাই ছিল এখানকার চিরাচরিত অর্থনৈতিক নিয়ম। এই বিক্রির লভ্যাংশ দিয়েই খামারিরা পূর্ববর্তী দেনা শোধ করতেন এবং নতুন গাভী কিনে খামার টিকিয়ে রাখতেন। তবে সাম্প্রতিক নতুন সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে—১৪ বছরের বেশি বয়সী গরু ছাড়া বিক্রি বা কুরবানি করা যাবে না এবং তার জন্য পঞ্চায়েত সভাপতির সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা থাকবে। এই আইনি মারপ্যাঁচে রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে ক্রেতাদের আগমন, যার সরাসরি শিকার হয়েছেন প্রান্তিক হিন্দু ব্যবসায়ীরা।
‘গলায় পা তুলে জিপটা টেনে বার করে নেন’—ঋণগ্রস্ত খামারিদের হাহাকার
ঘোষপাড়ার প্রতিটি খাটাল এখন সারি সারি অবিক্রিত গরুতে ঠাসা। একেকটি খামারে ৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ থেকে কোটি টাকা। খামারিরা ব্যাংক লোন, বন্ধকী সোনা এবং চড়া সুদে বাজার থেকে ঋণ নিয়ে এই পশুদের লালন-পালন করেছেন। বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাওনাদার ও কিস্তি আদায়কারীদের চাপে ঘরছাড়া হওয়ার উপক্রম খামারিদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু খামারিদের কান্নার রোল ও চাপা ক্ষোভে উত্তাল।
তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা থেকে খাটাল ব্যবসায়ী সুমিত অধিকারী বলেন, ‘‘সরকারকে বলব এইভাবে না মেরে আমাদের হাতে বিষ তুলে দিক, আমরা বিষ খাই। ...সরকারের কাছে এটা আবেদন করব এসব গোমাতা ভাতা করে কিচ্ছু হবে না।এভাবে না মেরে আমাদের গলায় পা তুলে জিপটা টেনে বার করে দেন, এভাবে আমরা সহ্য করতে পারবো না। এই কুরবানি না করতে পারলে আমার ঋণও শোধ হবে না, লোক আমাকে ছিঁড়ে খাবে চারিদিক। আমি এইভাবে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাঁচতে পারবো না। আমি যদি মরে যাই দায়ী থাকবে এই সরকার। ভারতের বুকে ইতিহাস হোক এই সরকার আমাকে মেরেছে, আমি আবারও বলছি মিডিয়ার সামনে অন ক্যামেরায় বলছি এই সরকার আমাকে মেরেছে।’’
নারীদের কান্না ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার
খামারের এই বিপর্যয় কেবল পুরুষদের ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, বরং পুরো পরিবারের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। খাটালের কঠোর পরিশ্রমে যুক্ত থাকা নারীরা ব্যাংক লোন শোধ করতে না পেরে এবং সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের আশঙ্কায় দিনরাত চোখের পানি ফেলছেন।
নারী খামারি মামনি ঘোষ তাঁর দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘‘আমাদের ৫০-৬০ বছরের ব্যবসা। মুসলিমদের কাছে বিক্রি করা হয়, কুরবানিতে আমরা একটা পয়সা পাই। তার বাইরে আমাদের ভুসির দোকানে, টোকানে অনেক দেনা হয়ে যায়। এই সময় গরুটা বিক্রি করে আমরা সেই দেনাটা মেটাই। বা ব্যাংকে থেকে ঋণ নিই, গোল্ড লোন নিই, নিয়ে আমরা সেসব দেনা এই সময় মেটাই নিয়ে আবার নতুন করে গরু তুলি। এখন গরু বিক্রি হবে না, সেইটাই তো আমাদের চিন্তা, আমাদের রাতদিন ঘুম নেই।’’
খামারের অন্য এক নারী সদস্য পাওনাদারদের ভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘‘গলায় দড়ি দিতে বলো আর না হলে বিষ আনতে বলো। বিষ তো ফ্রি পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে। সুভেন্দু অধিকারী এসে তুই গদিতে বসে আছিস, তুই কি করছিস? ও গরু লাভার চোখ? ও চোখ আটকেছে? ও খাওয়া দিতে পারবে? একথাল গোবর ফেলতে পারবে? আমার ৫ লাখ টাকা লোন নেওয়া, সব মহিলারা এসেছে আমার বাড়িতে এসে বলছে লোন শোধ করো, আমি কি করে করব? চল আমার বাড়িতে!’’
ভুক্তভোগী খামারিরা জানান, খাঁচায় বা গোয়ালে আটকে রেখে একেকটি গরুর পেছনে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ভুষি ও খড়ের খরচ যোগাতে হচ্ছে। গরু বিক্রি না হওয়ায় ভুষি ও ওষুধের দোকানদাররা খামারিদের নতুন করে বাকি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ তথা এই চাষী অঞ্চলে খোলা মাঠ বা বিহারের মতো চারণভূমি না থাকায় গরুকে মাঠে ছেড়ে পালনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান তারা।
‘‘গরু মোদিকেই কিনতে হবে, নয়তো নবান্নে বেঁধে আসব’’
আইনের মারপ্যাঁচে ক্ষুব্ধ খামারিদের একাংশ এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের প্রতি তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। গরু বিক্রি না হওয়াকে তারা 'গরীবের পেটে লাথি মারা' হিসেবে দেখছেন এবং এর প্রতিকার না হলে বড় ধরনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
খামারি কানাই ঘোষ সরাসরি সরকারের সদর দপ্তরে যাওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘‘ব্যবসাটাই তো এইটা, দুধ শেষ হবে গরু বিক্রি করব—এটাই সিস্টেম। আবার গরু আনব, এটাই সিস্টেম। এর বাইরে তো আমরা যেতে পারব না। বিক্রি না হলে আমাদের দেনা কোভ্থেকে দেব? কি করব, আত্মহত্যা করতে হবে। আমার এক্ষুনি ১৫ লাখ টাকা দেনা আছে। এই এলাকায় ১০,০০০ গরু আছে। এই গরু কি করব তাহলে আমরা? সেটাই তো চিন্তা করছি। আমাদের এই গরু সব নিয়ে গিয়ে আমাদের নবান্নতে (শুভেন্দুর কার্যালয়) ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। নবান্ন কি ক্ষতিপূরণ দেয় দেখা যাবে। কি ক্ষতিপূরণ দেয় দেখব আমরা, সব গরু নিয়ে চলে যাব নবান্ন।’’
একই সুরে অন্য এক উত্তেজিত খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘গরু মোদিকে কিনতে হবে, মোদি খাবে! গরু মোদিকে কিনতে হবে! মোদি গরু কিনুক, নয়তো চাষীদের পথ দেখাক!’’ খামারিদের দাবি, তারা দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির মাধ্যমে এই ব্যবসা করে আসছেন। মুসলিম ক্রেতারা কখনোই তাদের সাথে দুর্ব্যবহার বা টাকা নিয়ে জালিয়াতি করেননি। কিন্তু হঠাৎ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া এই সর্বনাশা আইন চাপিয়ে দেওয়ায় তারা সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে গেছেন।
নারকেলবেড়িয়ার ঘোষপাড়ার খামারিদের এই কান্না এখন পশ্চিমঙ্গের গোটা রাজ্যের ডেইরি শিল্পের প্রতিচ্ছবি। খামারিদের স্পষ্ট দাবি—সরকার যদি তাদের এই কুরবানিতে গরু বিক্রির বিশেষ অনুমতি না দেয়, তবে হাজার হাজার অবিক্রিত পশু নিয়ে তারা রাজ্য সরকারের সদর দপ্তর নবান্নে গিয়ে অবস্থান নিতে বাধ্য হবেন। নয়তো দেনার দায়ে জর্জরিত এই বিশাল হিন্দু খামারি সমাজকে গণ-আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে।
Nur A Azom Kazi Rafiqul Hasan Chowdhury
Editor
The Mohadan Bangla Times 24 bd. com