02/09/2025
ঘটনাটা ১৯৫৫ সালের, কুমিল্লার বিজয়পুর বাজার এর অজপাড়া গ্রামে। এখন হয়তো আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু সেসময় সেখানে বিদ্যুৎ তো দূরের কথা, সন্ধ্যার পরেই গা ছমছমে অন্ধকার নেমে আসত। সে গ্রামে থাকতেন রহস্যঘেরা এক বৃদ্ধ, নাম তার সলিমুল হক। বয়স হবে তখন আশির কাছাকাছি।
প্রতি সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন তরুণ বট গাছের নীচে জড়ো হতাম তার ভৌতিক গল্প শুনতে। একদিন, হালকা বৃষ্টির পর বট গাছের নীচে কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল। এমন আবহে সলিমুল হক হঠাৎ বললেন,
— “আজ তোমাদের এমন এক ঘটনার কথা বলব, যা নিজ চোখে দেখেছি... আর যেটা আজও আমার হাড় হিম করে দেয়।”
সবাই নীরব হয়ে গেল। তিনি শুরু করলেন—
“ঘটনাটা রাবেয়া নামের এক মেয়েকে নিয়ে। বয়স তখন পনেরো পেরোয়নি। সুন্দরী, শান্ত স্বভাবের, খুব আদরের ছিল তার মা-বাবার কাছে। রাবেয়ার বাবা করিম বকশ ছিলেন গ্রামে বেশ নাম করা তান্ত্রিক প্রকৃতির লোক। লোকজন তাকে ভয় করত, আবার মান্যও করত। হঠাৎ করেই তিনি একদিন ঘোষণা দিলেন— রাবেয়ার বিয়ে হবে আগামিকাল। পাত্রের নাম শাফায়েত, গ্রামের কেউ তাকে চেনে না। এমনকি তার ছবি পর্যন্ত কেউ দেখেনি। বলাবাহুল্য, সবাই অবাক হলেও কেউ কিছু বলার সাহস করেনি।"
বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল সন্ধ্যার ঠিক পর পর। সেই সন্ধ্যায় ঝড়-বৃষ্টির ভেতর বরের পক্ষ এসে পৌঁছায়। পাত্রের সঙ্গে আসে মাত্র দুজন— এক আত্মীয় ও তার বাবা। সবাই চুপচাপ, যেন কোনো অভিশপ্ত মিশনের লোক। রাবেয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয় খুব স্বল্প পরিসরে।
সলিমুল হক একটু থেমে কাশি দিয়ে বললেন,
— “পাত্রকে যখন দেখলাম, মনে হল চোখ দুটো কেমন যেন... কুয়াশায় ঢাকা। চেহারায় একটা অস্বাভাবিকত্ব ছিল— যেন কোনো মানুষ নয়, রক্তমাংসের খোলসে ঢুকে বসে আছে কিছু।”
বিয়ে শেষে সবাই চলে যায়। রাত গভীর হলে রাবেয়া নিজের নতুন ঘরে যায়। ঘরে হ্যারিকেনের মৃদু আলো জ্বলছিল। পাত্র তখনও ঘরে ঢোকেনি। কয়েক মিনিট পরে, পায়ের আওয়াজ শুনে সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, বরটি এসে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে। কুয়াশাচোখে তাকিয়ে আছে। রাবেয়া হারিকেনের মৃদু আলোয় দেখে বরের দুটো পায়ের পাতা উলটো!
রাবেয়া অস্বস্তি বোধ করে। তার চোখেমুখে ভয়। হঠাৎই পাত্র ঝটকায় হ্যারিকেন নিভিয়ে ফেলে। ঘর নিমিষেই অন্ধকারে ঢেকে যায়। তারপর নিঃশব্দে তার পাশে এসে বসে। রাবেয়ার শরীরটা যেন জমে যায়, শ্বাস আটকে আসে।
“যখন ছেলেটি তাকে ছুঁলো,”— বললেন সলিমুল হক— “সে বলে, হাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা আর লোমশ ছিল... একেবারে পশুর মতো।”
রাতে আর কিছু মনে নেই রাবেয়ার। সে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন ভোরে গ্রামের এক প্রান্তে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙে। রাবেয়ার ঘরের দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। দরজা খুলতেই সে দেখে তার বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কারণ?
পাত্র শাফায়েত ও তার দুই আত্মীয় যাদের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল— তাদের তিনজনের মরদেহ সকালে পাশের নদীতে ভেসে উঠেছে। নৌকা ডুবে যাওয়ায় তারা নাকি আগের দিন বিকেলেই মারা গিয়েছিল।
রাবেয়া শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
গ্রামে রটে যায়— যাকে রাবেয়া বাসর রাতে পেয়েছিল, সে মানুষ ছিল না।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয়— কয়েক মাস পর রাবেয়া গর্ভবতী হয়। সন্তান জন্মায়— এক ছেলে। চেহারায় আশ্চর্য মিল সেই রাতের অচেনা পাত্রের সঙ্গে— কুয়াশায় ঢাকা চোখ, নিঃশব্দে তাকানোর ভঙ্গি, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
ছেলেটি বড় হয়..
Continue!!