15/07/2026
ফুটবল মাঠে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ছিলেন প্রায় অলৌকিক এক চরিত্র। কিন্তু মাঠের বাইরের জীবনে তিনি ছিলেন ভীষণ জটিল, আবেগপ্রবণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মবিধ্বংসী।
গোল, শিরোপা ও বিশ্বকাপের পাশাপাশি তার জীবনের আরেকটি দীর্ঘ অধ্যায়জুড়ে ছিলেন কয়েকজন নারী- কেউ শৈশবের প্রেমিকা, কেউ স্ত্রী, কেউ সন্তানের মা, আবার কেউ ঝড়ের মতো এসে হারিয়ে যাওয়া সঙ্গী!
ম্যারাডোনার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী নারী ক্লদিয়া ভিয়াফানিয়ে। বুয়েনস আয়ার্সের ভিলা ফিওরিতোর কাছাকাছি এলাকায় কৈশোরেই তাদের পরিচয়।
ম্যারাডোনা তখনও বিশ্ববিখ্যাত হননি। দারিদ্র্য থেকে উঠে আসার সংগ্রাম, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে প্রতিষ্ঠা এবং পরে বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা ও নাপোলিতে যাওয়ার পুরো যাত্রায় ক্লদিয়া ছিলেন তার পাশে।
দীর্ঘ প্রেমের পর ১৯৮৯ সালের ৭ নভেম্বর তারা বিয়ে করেন। তাদের দুই মেয়ে, দালমা ও জিয়ান্নিনা, জন্মেছিলেন বিয়ের আগেই। আর্জেন্টিনায় তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল রীতিমতো তারকাখচিত উৎসব।
কিন্তু বাইরে থেকে রাজকীয় মনে হওয়া সংসারের ভেতরে জমছিল অবিশ্বাস, পরকীয়া, মাদকাসক্তি ও দীর্ঘ অনুপস্থিতির ক্ষত।
শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবু ক্লদিয়া ছিলেন ম্যারাডোনার একমাত্র বৈধ স্ত্রী।
ক্লদিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালেই ইতালিতে ম্যারাডোনার জীবনে আসেন ক্রিস্তিয়ানা সিনাগ্রা।
নাপোলির হয়ে খেলার সময় তাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ১৯৮৬ সালে ক্রিস্তিয়ানা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন- ডিয়েগো আরমান্দো সিনাগ্রা, যিনি পরে ডিয়েগো জুনিয়র নামে পরিচিত হন।
এই সম্পর্ক ম্যারাডোনার ব্যক্তিজীবনের প্রথম বড় কেলেঙ্কারিগুলোর একটি। সন্তানটির পিতৃত্ব তিনি বহু বছর অস্বীকার করেছিলেন। আদালতের সিদ্ধান্তের পরও বাবা-ছেলের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
অবশেষে ২০১৬ সালে ম্যারাডোনা প্রকাশ্যে ডিয়েগো জুনিয়রকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন। তখন তাদের পুনর্মিলনের ছবি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
নব্বইয়ের দশকে ম্যারাডোনার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে ভ্যালেরিয়া সাবালাইনের। সেই সম্পর্ক থেকে ১৯৯৬ সালে জন্ম নেন ইয়ানা ম্যারাডোনা। এখানেও পিতৃত্ব নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই।
ম্যারাডোনা একাধিকবার ডিএনএ পরীক্ষার আহ্বানে হাজির না হওয়ায় আদালত মেয়েটিকে তার পদবি ব্যবহারের অধিকার দেন। বহু বছর দূরে থাকার পর বাবা-মেয়ের যোগাযোগ হয়। জীবনের শেষ দিকে ইয়ানা তার বাবার তুলনামূলক কাছাকাছি এসেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০০০ সালের দিকে মা*কাস/ক্তি/র চিকিৎসার জন্য কিউবায় থাকার সময় ম্যারাডোনার জীবনে আসেন মাভিস আলভারেস রেগো।
পরিচয়ের সময় মাভিসের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর, আর ম্যারাডোনা চল্লিশের কাছাকাছি। পরে মাভিস অভিযোগ করেন, তাদের সম্পর্কে ভালোবাসার চেয়ে নিয়ন্ত্রণ, স/হিং/স/তা ও শো/ষ/ণই বেশি ছিল।
তিনি ম্যারাডোনা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে নি*তন, আটকে রাখা এবং মা*ক গ্রহণে প্ররোচিত করার অভিযোগ তোলেন। এসব অভিযোগ ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে আসে এবং সম্পর্কটির অন্ধকার দিক নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
ক্লদিয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ম্যারাডোনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীদের একজন ছিলেন ভেরোনিকা ওহেদা। তাদের সম্পর্ক শুরু হয় আনুমানিক ২০০৫ সালে। দীর্ঘ কয়েক বছর তারা একসঙ্গে ছিলেন। ভেরোনিকা ম্যারাডোনার মা*ক, স্বাস্থ্যসংকট ও অস্থির জীবনযাপনের বহু পর্ব কাছ থেকে দেখেছেন।
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সময় ভেরোনিকা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ২০১৩ সালে তাদের ছেলে ডিয়েগো ফার্নান্দোর জন্ম হয়। বিচ্ছেদের পর সন্তানের দায়িত্ব, দেখা করার অধিকার এবং ম্যারাডোনার পরিবারের সঙ্গে ভেরোনিকার বিরোধ নিয়মিত সংবাদে এসেছে।
তবু অন্য কয়েক সন্তানের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘ পিতৃত্ব-বিতর্ক হয়েছিল, সেই পথে না গিয়ে ডিয়েগো ফার্নান্দোকে ম্যারাডোনা শুরু থেকেই নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
ভেরোনিকার সঙ্গে সম্পর্কের শেষ পর্যায়েই ম্যারাডোনার জীবনে প্রবেশ করেন তার চেয়ে প্রায় ৩০ বছরের ছোট ফুটবলার রোসিও অলিভা। দুজন একসঙ্গে দুবাইয়ে বসবাস করেন এবং প্রকাশ্যে বিয়ে করার কথাও বলেন। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাদের কাছাকাছি এনেছিল বলে রোসিও জানিয়েছিলেন।
কিন্তু এই সম্পর্ক ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, পুনর্মিলন, অভিযোগ ও প্রকাশ্য ঝগড়ায় ভরা ছিল! একপর্যায়ে ম্যারাডোনা রোসিওর বিরুদ্ধে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগ করেন; পরে অভিযোগ প্রত্যাহারও করেন!
২০১৭ সালে মাদ্রিদের একটি হোটেলে তাদের তীব্র বিবাদের পর পুলিশ উপস্থিত হয়, যদিও কেউ মামলা করেননি। কয়েক দফা ভাঙা-গড়ার পর ২০১৮ সালে সম্পর্কটি স্থায়ীভাবে শেষ হয়।
এ ছাড়া পিম্পিনেলা সংগীতদলের গায়িকা লুসিয়া গালান ম্যারাডোনার সঙ্গে কয়েক মাসের একটি গোপন প্রেমের কথা পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেন।
অভিনেত্রী গ্রাসিয়েলা আলফানোসহ আরও কয়েকজনের নামও আর্জেন্টিনার বিনোদনমাধ্যমে এসেছে। তবে এসব সম্পর্কের অনেকগুলোর সময় ও প্রকৃতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে।
ম্যারাডোনার প্রেমজীবনে আবেগের অভাব ছিল না; অভাব ছিল স্থিতি ও দায়বদ্ধতার। তিনি কাউকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন, আবার একই মানুষকে আ/ঘা/তও করেছেন।
ক্লদিয়া তার শিকড় ও পরিবারকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ক্রিস্তিয়ানা ও ভ্যালেরিয়ার গল্পে ফুটে উঠেছে অস্বীকৃত সন্তানের যন্ত্রণা, ভেরোনিকা ছিলেন সংকটময় মধ্যজীবনের সঙ্গী, আর রোসিও ছিলেন শেষ বড় প্রেমের ঝড়।
ফুটবলের রাজপুত্র তাই ব্যক্তিজীবনে কোনো রূপকথার নায়ক ছিলেন না, বরং ভালোবাসা, পরকীয়া, অনুশোচনা ও অসমাপ্ত সম্পর্কের এক গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ মানুষ ছিলেন তিনি।