29/08/2026
হযরত পাহাড়পুরী রহ: আমলে ও আখলাকে বিরল ব্যক্তিত্ব
মাওলানা আশরাফুজ্জামান পাহাড়পুরী
আমার শ্রদ্ধাভাজন আব্বাজান হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন আমল ও আখলাকের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। ৬৮ বছরের জীবনের পথ চলায় ত্যাগ ও মুজাহাদার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গিয়েছেন জীবন পথের পাথেয় লাভের ক্ষেত্রে, এটা আমাদের জন্য এক অসাধারণ নমুনা।
বুযূর্গ নানার সান্নিধ্যে দুরন্ত শৈশব
একেবারে শৈশবে আপন নানাজান কুমিল্লার ধামতির পীর সাহেব হযরত মাওলানা আজিম উদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি এর তত্ত্বাবধানে যে মুজাহদার সূচনা, মায়ের স্নেহের বন্ধন থেকে আলাদা হয়ে নানাজানের আমল ও ইবাদত দেখে দেখে তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলোতে বুযূর্গ নানাজানের তত্ত্বাবধান, তাঁর আমল আখলাক ও মুজাহাদার দৃশ্যগুলো আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কচি মনে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। একজন শিশুর শৈশব জীবনের স্বাভাবিক দুরন্তপনা, খেলাধুলা ইত্যাদি কাজে অনেক সময় শিশুমনে অন্যায় ও গোনাহের কাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পথ তৈরি হয়ে যায়, যা পরবর্তী জীবনে অভ্যস্ততায় পরিণত হয়। হযরত আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি জীবন সফরের সেই শৈশবেই গোনাহমুক্ত আদর্শের দীক্ষা নিয়ে গড়ে উঠেছেন।
উস্তাযগণের চোখের মণি
পাহাড়পুর মাদরাসায় যখন পড়াশোনা করতেন তখন ওস্তাদদের চোখের মনি হয়ে তাঁদের ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ‘বড় হুজুরের সন্তান তিনি’- আচরণ, উচ্চারণে তার লেশমাত্র প্রকাশ পেত না। বরং বিনয়, নম্রতা ও মুজাহাদার এমন উদাহরণ তিনি ছিলেন যে, অন্যরা তার থেকে শিক্ষা গ্রহণের পাথেয় লাভ করত। লেখাপড়ায়, ওস্তাদের খেদমতেও উত্তম আমলে আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী।
শৈশবেই গভীর অধ্যাবসায়
পড়াশোনায় এমন মনোযোগী ছিলেন যে অধিকাংশ সময় আসরের পর পল্লী গ্রামের দূরবর্তী কোন মসজিদে কিতাব নিয়ে চলে যেতেন। ফিরতে ফিরতে গভীর রাত হয়ে যেত। কখনো এমন হতো যে, দাদাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সন্তানের খোঁজে বের হয়ে যেতেন। লক্ষ্য করতেন যে পড়াশুনা করতে করতে আদরের সন্তানটি ঘুমিয়ে পড়েছে। কখনো লক্ষ করতেন, অসুস্থতায় কলিজার টুকরা সন্তানটি অচেতন হয়ে আছে।
হাফেজ্জী হুযুরের সান্নিধ্যে ‘নতুন জীবন’
এভাবেই পাহাড়পুর মাদরাসার পড়াশোনা শেষ করে চলে আসেন হযরত হাফিজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহির সান্নিধ্যের ভালোবাসায় জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগে। লালবাগ জামেয়ায় এসে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির তত্ত্বাবধান ও মহান আসাতেযায়ে কেরামের সাহচর্যে আব্বাজানের জীবনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।
মেশকাত ও দাওরায়ে হাদীস এ দু’বছরের প্রতিটি মুহূর্তই যেন ছিল ইলম, আমল ও আখলাকের সর্বোচ্চ মহিমা লাভের সোনালী সময়! হযরত হাফিজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির যেই দ্বীনি মজলিসগুলো লালবাগ শাহী মসজিদে অনুষ্ঠিত হতো। প্রতিটি মজলিসে উপস্থিত থেকে হযরত রহ. এর আধ্যাত্মিক নিসবত ও ভালোবাসা লাভ করেন। আব্বাজান বলেন, কোনো মজলিসে আমি অনুপস্থিত থাকলে হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহ আলাইহি গুরুত্বের সাথে আমার খোঁজখবর নিতেন।
লালবাগ জামেয়ার তৎকালীন সময়ের মহান মহান আসাতেযায়ে কেরাম: হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুযুর, মুফতী আব্দুল মুইয, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুমুল্লাহসহ সকল উস্তাদের প্রিয়পাত্র ছিলেন আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।
পরবর্তী জীবনে নূরিয়া মাদরাসার শিক্ষকতা এবং হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে নিজেকে সমর্পণ করার যে ইতিহাস রয়েছে, তার কিছু অংশ আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজের বর্ণনায় আমরা পেয়েছি ‘হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহ আলাইহি ও আমার আব্বাজান’- এই গ্রন্থে। আশা করি পাঠকগণ এই কিতাবটি সংগ্রহ করবেন এবং হযরত পাহাড়পুর রহ. এর মাঝে আপন বাবা ও শায়খের প্রতি কেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল তার এক সুন্দর নমুনা পেয়ে যাবেন।
বড় সন্তান হিসেবে শৈশব থেকে আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে যেমন দেখেছি
আমি যখন একেবারেই ছোট তখন থেকেই আব্বাজান রাহমাতুল্লাহ আলাইহি যেখানে যেতেন সাধারণত আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন। পথ চলতে চলতেই আব্বাজান থেকে আমি অনেক জ্ঞান ও ইলমের পাথেয় লাভ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ। গাড়িতে যখন আব্বার কোলে কিংবা পাশে বসতাম তখন পথের পাশে যা কিছু চোখে পড়তো খুটিয়ে খুঁটিয়ে সেটা আমাকে চিনিয়ে দিতেন এবং প্রাসঙ্গিক শিক্ষামূলক কোনো বিষয় থাকলে সেটাও বলে দিতেন। বলতেন এই যে দেখ কত সুন্দর মসজিদ, এই মসজিদের নাম বাইতুল মোকাররম, এটা হল জাতীয় মসজিদ। এভাবে ছোট ছোট করে ইতিহাস বলতেন।
আব্বাজানের সাথে যখন পাহাড়পুর যেতাম এবং রাস্তার দুপাশের সুন্দর সুন্দর দৃশ্যগুলোর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম, আব্বাজান তখন আমার অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করার চেষ্টা করতেন। বাহ্যিক দৃশ্যের মাঝে অন্তর্নিহিত কী কী শিক্ষা থাকতে পারে কচি হৃদয়ে সেটা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সুবেদারঘাট জামে মসজিদ আলু বাজার মাদরাসায় এবং পশ্চিমগাঁও ডেমরা মাদরাসায় শৈশবে আব্বার সাথে অনেকবার গিয়েছি। এই আসা-যাওয়ার মাঝে বড়দের বহু কথা শুনেছি, তাঁদের আমল ও আখলাকের অনেক নিদর্শন আব্বাজানের সান্নিধ্যে এই শৈশবেই দেখেছি আলহামদুলিল্লাহ।
ছোট্ট একটি ঘটনা
আব্বাজান রহমাতুল্লাহি আলাইহি লন্ডন সফর থেকে ফিরে এসেছেন। আমাকে নিয়ে পাহাড়পুর যাচ্ছেন। দাদা ও দাদীর জন্য অনেক কিছু সাথে নিয়েছেন। আমি গাড়িতে বসে আছি দাউদকান্দি ফেরিতে। আব্বাজান এবং আব্বার সফরসাথী শ্রদ্ধাভাজন মাওলানা ওয়াহিদুল হক (আমাদের প্রিয় ওহিদ ভাই, আব্বাজানের জীবনে এই মহান মানুষটির অনেক বড় অবদান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের শ্রদ্ধাভাজন এই মানুষটিকে সুস্থতার সাথে হায়াতে তাইয়েবা দান করেন। আমিন।) নামাযের জন্য নামলেন। একপর্যায়ে ফেরি দাউদকান্দি ঘাটে পৌঁছে গেল এবং তাঁদেরকে না নিয়েই বাস ছেড়ে দিল। আমার তো তখন কান্নার অবস্থা। পিছনে তাকিয়ে দেখি আব্বাজান ও মাওলানা ওহিদুল হক ভাই ছুটে আসার চেষ্টা করছেন। ইশারা করছেন গাড়ি যেন থামে। আমিও চিৎকার করছি। কিন্তু আমাদের গাড়ি কোনভাবেই থামছিল না। মহৎহৃদয় এক ট্রাকচালকের বদান্যতায় কিছুক্ষণ পর যখন তাঁরা ফিরে এলেন, আমার মনের অবস্থা তখন কেমন ছিল বলাই বাহুল্য! কঠিন এই মুহূর্তেও আমি তখন আব্বাজাজানকে মেজাজ হারাতে দেখিনি। বরং আখলাক ও আদর্শের উত্তম নমুনাই লক্ষ করেছিলাম। আমার শিশুমনে সেটা অনেক বড় দাগ কেটেছিল। এ দৃশ্য থেকে আমি তখন শিক্ষা পেয়েছিলাম মানুষের লোভ লালসার তাড়না কেমন হতে পারে?
মাদরাসায়ে নূরিয়ার (বর্তমান জামিয়া নুরিয়া) নাজেমে তালিমাতের দায়িত্ব
আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর নুরিয়া মাদরাসায় এক ভারি জিম্মাদারী পালন করে গিয়েছেন। বড় প্রতিষ্ঠানের এটা এমন এক জিম্মাদারী যা পালন করার ক্ষেত্রে সবার মনোতুষ্টি অর্জন করা একেবারে অসম্ভব। কিন্তু আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অনুপম আখলাক ও আদর্শের নমুনা পেশ করে এত সুন্দরভাবে এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, আমার মনে হয় বাংলাদেশের কওমি অঙ্গনে এটা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
তৎকালীন সময়ের মাদরাসায়ে নূরিয়ার প্রধান মুফতী হযরত মাওলানা শামসুল হক সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে একবার আমি জানতে চেয়েছিলাম, বয়সে বড় হয়ে আপনারা আপনাদের চেয়ে বয়সে ছোট আব্বাজানের সিদ্ধান্তগুলো মেনে নিতে কি কষ্ট হতো না?
আমার এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত মুফতি সাহেব অবাক বিস্ময়ে বলেছিলেন,
‘কি বলো তুমি? তোমার আব্বাজানের আদর্শ ও আখলাক এমনই ছিল যে, কোন আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সকলে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে যেত। ‘পাহাড়পুরী’ এই নামের মাঝেই আল্লাহ তাআলা এক বিশাল মাহাত্ম্য দিয়ে দিয়েছিলেন।’
মানুষ গড়ার কারিগর
মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে এমন হেকমত ও প্রজ্ঞা আব্বাজান রহমাতুল্লাহি আলাইহি অবলম্বন করতেন যে, কত পথহারা তালিবুল ইলম পথ ফিরে পেয়ে জীবন অঙ্গনে কত অবদান রেখেছেন তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বড় বড় বহু ব্যক্তি আমার কাছে একান্তে তাদের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে আব্বাজানের অবদানের কথা ব্যক্ত করেছেন। সে উদাহরণ আমি এখন পেশ করব না। জীবন গড়ার মহান কারিগর আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কত গল্প কত ইতিহাস যে রয়েছে স্বল্প পরিসরে তা ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
আত্মঅহমিকাহীন, বিনয় নম্রতার মূর্ত প্রতীক মহান এই ব্যক্তিত্বের হৃদয়ের তামান্না এমনই ছিল যে, কোনভাবেই যেন তিনি বিখ্যাত না হোন। আল্লাহ তাআলা এটাই হয়তো কবুল করেছেন। জীবন সফরে তিনি নিভৃত ছিলেন। কিন্তু ইন্তেকালের পর তার জানাজা দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর এই জগতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কেমন মর্যাদা তাকে দান করেছেন। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তার এই নেক বান্দার উত্তম শিক্ষাগুলো ধারণ করে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন ইয়া রব্বাল আলামীন।