17/07/2026
প্রিন্সেস ডায়ানা: রূপকথার বিয়ে ও ট্রাজিক বিচ্ছেদ
প্রিন্সেস ডায়ানা (ডায়ানা স্পেন্সার) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় এবং আলোড়িত ব্যক্তিত্ব। সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও সহানুভূতির জন্য তাকে বলা হতো "পিপলস প্রিন্সেস" বা জনগণের রাজকুমারী। তবে পর্দার সামনে তার জীবন যতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, পর্দার পেছনের বাস্তব চিত্র ছিল ততটাই বিষাদময়।
প্রেমের শুরু ও "রূপকথার বিয়ে"
১৯৭৭ সালে প্রিন্স চার্লসের (বর্তমান রাজা চার্লস) সাথে ডায়ানার প্রথম পরিচয় হয়। তখন চার্লস ডায়ানার বড় বোন সারাহর সাথে ডেট করছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং চার্লস তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে এক রাজকীয় আয়োজনে তারা বিয়ে করেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ টেলিভিশনে এই বিয়ে দেখেছিল। বাইরে থেকে এটিকে নিখুঁত রূপকথা মনে হলেও, বিয়ের শুরু থেকেই তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্বের দেয়াল তৈরি হতে শুরু করেছিল।
স্বামী প্রিন্স চার্লস কেন তাকে ত্যাগ করেছিলেন?
চার্লস ও ডায়ানার দাম্পত্য জীবন ভেঙে যাওয়া এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পেছনে মূলত কয়েকটি বড় কারণ ছিল:
ক্যামিলা পার্কার বোলসের উপস্থিতি: চার্লস বিয়ের আগে থেকেই তার প্রাক্তন প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলসের (বর্তমানে যুক্তরাজ্যের কুইন কনসর্ট) প্রেমে মগ্ন ছিলেন। রাজপরিবারের অমতের কারণে তিনি তখন ক্যামিলাকে বিয়ে করতে পারেননি। কিন্তু ডায়ানার সাথে বিয়ের পরও চার্লস ক্যামিলার সাথে তার সম্পর্ক বজায় রাখেন। ডায়ানা নিজেই তার বিখ্যাত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:
"আমাদের এই বিয়েতে আসলে আমরা তিনজন ছিলাম, তাই একটু বেশিই ভিড় ছিল।"
বয়সের ব্যবধান ও ব্যক্তিত্বের অমিল: ডায়ানা যখন বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর, আর চার্লসের বয়স ছিল ৩২। দুজনের বয়সের এই বড় ব্যবধান এবং চিন্তা-ভাবনার অমিল তাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। চার্লস ছিলেন অন্তর্মুখী ও বইপ্রেমী, অন্যদিকে ডায়ানা ছিলেন প্রাণোচ্ছল এবং মানুষের সাথে মিশতে ভালোবাসতেন।
ডায়ানার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা: ডায়ানা যেখানেই যেতেন, সাধারণ মানুষ ও মিডিয়া চার্লসকে উপেক্ষা করে ডায়ানাকে নিয়েই মেতে থাকত। নিজের স্ত্রীর এই বিপুল জনপ্রিয়তা চার্লসের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও ঈর্ষার জন্ম দিয়েছিল, যা তাদের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
মানসিক দূরত্ব ও পারস্পরিক পরকীয়া: স্বামীর অবহেলা এবং রাজপ্রাসাদের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে পড়ে ডায়ানা তীব্র মানসিক বিষণ্ণতা এবং ‘বুলিমিয়া’ (খাওয়াদাওয়ার একটি মানসিক ব্যাধি) রোগে আক্রান্ত হন। সম্পর্কের এই চরম অবনতির একপর্যায়ে চার্লস যেমন ক্যামিলার কাছে ফিরে যান, ডায়ানাও তেমনি পরবর্তীতে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
সম্পর্কের করুণ পরিণতি
১৯৯২ সালে চার্লস ও ডায়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার ঘোষণা দেন। এরপর ১৯৯৫ সালে ডায়ানা বিবিসি-কে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে রাজপরিবারের ভেতরের অশান্তি ও চার্লসের পরকীয়া নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। এই সাক্ষাৎকার রাজপরিবারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।
পরবর্তীতে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের পরামর্শে ১৯৯৬ সালে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) হয়।
ডিভোর্সের মাত্র এক বছর পর, ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসে পাপারাজ্জিদের (সাংবাদিক) গাড়ি থেকে বাঁচতে গিয়ে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৩৬ বছর বয়সে প্রিন্সেস ডায়ানা মারা যান। চার্লসের সাথে তার প্রেম ও বিয়ে হয়তো সুখের হয়নি, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে ডায়ানা আজও এক অনন্য রানী হয়ে আছেন।