05/09/2026
জজ মিয়া জিয়াউল আহসান ও সাগর রুনি হত্যার ১৪ বছর পর বিচারের নামে হাস্যকর প্রহসন - সুমি খান
Surjobartanews.com Saturday 05 September Saturday : মিথ্যাচারের ও সীমা থাকে।
দেশ ও সমাজকে সুস্থভাবে এগিয়ে নিতে দল মত নির্বিশেষে সৎ নাগরিকদের মূল্যায়নে ব্যর্থ হলে পরিণতি ভোগ করতে হয় সমাজ তথা সারা জাতিকে।
যার করুণ চিত্র আজকের বাস্তবতা।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ২ টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে নিজেদের ঘরেই রান্নাঘরের ভোঁতা ছুরি ও বটির আঘাতে আনাড়ি হাতে নির্মমভাবে খুন হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি।
ঘনিষ্ঠ পরিচিত আনাড়ি লোকের বাইরে কেউ তাদের খুন করেনি।
কারণ অপরিচিত কেউ খুন করলে কিচেনের ভোঁতা কাঠের হাতলের চাকু,আর বঁটি দিয়ে আঘাত করার কথা নয়, সেটা একটা সাধারণ মানুষ এ বোঝে। নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে দিলেন না কোন উদ্দেশ্যে??
সাগর-রুনি হত্যা নিয়ে তাঁকে পুরোপুরি আড়ালে রাখলো কেন রুনির পরিবার? আহা রে জননী! একমাত্র পুত্রের শোকে ক্ষুব্ধ জননী তাঁর পৌত্রকে কাছে পান নি কেন??
কিসের ভয়ে তাঁর সাথে কখনো মেঘকে বসতে দেয়া হলো না??
মনের হতাশা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাগরের দুর্ভাগা জননী সালেহা মনির।
তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।রুনির পরিবারের ভূমিকা নিয়ে।
সাগর-রুনির মৃত্যুর পর একটি রাতও তিনি পৌত্র মেঘকে পাশে নিয়ে সেই রাতের কথা জানবার সুযোগ পান নি কেন??
কিসের ভয় রুনির পরিবারের??
তাঁর কি জননী হিসেবে সন্তানের হত্যার প্রকৃত ঘটনা জানবার কোন অধিকান ছিল না??
প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সে রাতের ঘটনা তিনি নাতির মুখ থেকে শুনতে পারেন নি।
রুনির পরিবার সব সময় সময় মেঘকে সাগরের পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে রাখলো কেন??
এ প্রসঙ্গে সাগরের বোন যুগান্তরকে বলেছেন, "আমি মেঘকে দেখতে ওদের বাসায় গেলে রোমান কেমনে যেন টের পেয়ে যায়। আমরা যাবো এমন সংবাদ পেলেই রোমান মেঘ কে সরিয়ে ফেলতো। আমরা যখন গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, 'মেঘ কোথায়?' তখনই বলেছে, "মেঘ বাইরে গেছে।" আমরা ওদের ঘরে যাবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রোমান কোথা থেকে চলে আসতো। এসেই বলে, 'এই মেঘ, চলো, রেডি হও, বাইরে যাবো।' তখন আমি নিরুপায় হয়ে কান্নাকাটি করতে করতে চলে আসি।.." (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
সাগর-রুনি হত্যা মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারার দায় অবশ্যই ঘটনার সময় রাষ্ট্র পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগ সরকার এবং সর্বোচ্চ সুবিধাপ্রাপ্ত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে নিতে হবে,যারা সত্য আড়াল করে নাটক করেছেন বিচার দাবি করার নামে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেন সত্য প্রকাশ করে নি??
সুযোগ পেয়ে ও সমাধান করে নি।
সাগর-রুনির সন্তান মেঘকে প্লট দান করে কি খুনিকে/ দের বাঁচিয়ে ' গরু মেরে জুতা দান' হলো না?
তৎকালীন সরকার প্রধান ইউনুস সত্য আড়াল করে কী বার্তা দিলেন?
যে কোন হত্যাযজ্ঞের তদন্তে তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী নিরীহ মানুষদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রকৃত ধর্ম পালন করে সরকার দলীয় লোকদেরও ছাড় দেন নি জিয়াউল আহসান।কঠোর ন্যায়বিচার তিনি প্রমাণ করেছেন তকী হত্যা এবং নারায়নগঞ্জের এইট মার্ডার তদন্তে সঠিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল পেছাল ১২৯ বার।অথচ তাদের ই রান্নাঘরের ভোঁতা ছুরি আর বটি দিয়ে কোন বাইরের শত্রু হত্যা করবে আনাড়ি হাতে?
গত ২ বছরে একের পর এক আজব গল্পে আদালত, বিচারব্যবস্থার কলঙ্কের দায় ভয়ঙ্কর পরিণতি ভোগ করবে একদিন,যা বিশ্বের গোয়েন্দা গল্প ও ন্যায়বিচারের ইতিহাসে কলঙ্কিত বিচারব্যবস্থার নজির তৈরি করবে।দেশের সৎ, দেশপ্রেমিক মানবিক সন্তানদের জন্য কী দৃষ্টান্ত রাখা হচ্ছে গত ২০২৪ জুলাই থেকে? দুই সাংবাদিক হত্যার পুরো দায় সরকারের ঘাড়ে বা তদন্ত কর্মকর্তাদের ঘাড়ে চাপানোর অন্যায় অপরাধের সুযোগ কাদের এবং কেন দেয়া হলো??
আমাদের বড়ো করেছে যে, ওকে বুয়া ডাকতাম। বাল্যশিক্ষা মুখস্থ ছিল,ছড়ায় ছড়ায় কথা বলতো মিরসরাই ভাষায়। বলতো, "এমন মানুষদের জজমিয়া বানায়, মানষে হুনলে কাইশবো, বিলাই হুনলে হাইস্- বো...(হাসবে) !" সাধারণ শ্রমজীবি দের মুখে ও একথা সারা দেশে!
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান একজন দক্ষ সৎ এবং প্রকৃত ধর্মপরায়ন সেনা কর্মকর্তা।তিনি সাংবাদিক সাগর রুনিকে হত্যা করবেন কেন??
তিনি কি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তাদের? তারা তো ক্রাইম রিপোর্টার ও ছিলেন না কেউ। দু'জনের কারোইএমন কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছিল না, যা ঘাতকের মতো শত্রু তৈরি করতে পারে পেশাগত কাজে।
সৎ নিবেদিতপ্রান শিক্ষক মায়ের সৎ সন্তানদের অন্যতম জিয়াউল আহসান বরাবরই তাঁর পেশাগত জীবনে প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মানুষ বাঁচাতে, দেশ বাঁচাতে জঙি্গবাদের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে এ পর্যন্ত অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন, সেটা্ইই অপরাধ?? আইনের প্রতি আস্থা রেখে দেশ ছেড়ে যান নি।
সেটা আজকের বাস্তবতায় 'অপরাধ' বটে!তাঁর বোন আইনজীবী নাজমুন নাহার, শামসুন নাহার, তাঁর স্ত্রী,সন্তান স্বজন পুরো পরিবার কী অপরাধে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগে স্বজনের প্রতি এমন অন্যায় সহ্য করবেন?
সারা দেশ,মসজিদ,মন্দির ধর্ষণ বলাৎকার হত্যাযজ্ঞের মৃত্যুপুরী। কবে বন্ধ করবেন?? কোন সরকার, সংসদ কি ভূমিকা রাখছে কোন?? জনগণ ঘাস খায় না! বিবেচনাবোধ বিবেকবোধ জাগাতে হবে। তবেই ধর্ম রক্ষা হবে।
#২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত নিহত রুনির মা নূরুন্নাহার মির্জা, ভাই নওয়াজিশ আলম রিমন ও সন্তান মাহির সরোয়ার মেঘের ১৬৪ ধারার জবানবন্দী রেকর্ডের জন্য আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক উল্লিখিত তিনজনের জবানবন্দী রেকর্ডের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাদী রোমানের অনীহার কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারেছ আলী মিয়া লিখিতভাবে আদালতকে জানান, 'সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিতে নওয়াজেশ আলম রিমনসহ তিনজন আদালতে যেতে ইচ্ছুক নয়। বাদী নওশের আলম রোমান নিজেও ওই তিনজনকে আদালতে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন।
রুনি'র তিন ভাইয়ের সর্বকনিষ্ঠ কিশোর। রিমন। মাদকাসক্ত বলে তার অস্বাভাবিক আচরণ সকলে প্রত্যক্ষ করেছে হত্যাকান্ডের দিন সকালেই। সূত্রমতে,
পুলিশ হেফাজতে আটক রিমনকে ছাড়ানো হয় এটিএন বাংলার মালিক এবং সাংবাদিক নেতাদের কারো কারো চাপে।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে দৈনিক যুগান্তর সাগর-রুনি হত্যার ওপর দুই পর্বে ১০ টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতা থমকে দিলো কারা? কেন তৃতীয় পর্ব প্রকাশ প্রকাশিত হয় নি?? যুগান্তরের
প্রতিবেদনগুলো আর্কাইভে সংরক্ষিত। সব কি গায়েব করা যাবে??
রুনিদের আবাসিক ভবনের বিভিন্ন বাসার পুরনো গৃহকর্মী দেলোয়ারা ও তিন তলার বাসিন্দা সাহিদা রাজ্জাক সকালবেলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কী সাক্ষ্য দেন পুলিশকে??
গৃহকর্মী দেলোয়ারা জানান, ভোর ছয়টা থেকে সাড়ে ছয়টার মধ্যে দেলোয়ারা কাজের জন্য সাগর-রুনির বাসায় যান। তিনি পুরো বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি পরিষ্কার করেন। পরিষ্কার করতে করতে পাঁচ তলায় গিয়ে দেখেন সাগর রুনির ফ্ল্যাটের দরজা হাল্কা খোলা। অন্যদিন খোলা থাকে না।
কৌতুহলবশত তিনি ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখেন মেঘের নানী সোফায় বসে মেঘের সাথে কথা বলছেন। বাবা-মা ব্যস্ত থাকায় মেঘকে ওর নানীই স্কুলে নিয়ে যায়।
দেলোয়ারা ভেবেছেন প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি করছেন তিনি মেঘকে। দেলোয়ারা নিচে যান। নিচে যাওয়ার পর সাগর-রুনির ফ্ল্যাট থেকে জোরে চিৎকার শুনতে পান। চিৎকার শুনে তিনি সাগর-রুনির ফ্ল্যাটে যান এবং রুনির মাকে জিজ্ঞাসা করেন, কি হয়েছে, চোর এসেছিলো নাকি? রুনির মা খুব স্বাভাবিকভাবে বলেন, "কিছু হয় নি, তুমি যাও৷ "অথচ পাশের রুমে তখন কন্যা রুনি ও জামাতা সাগরের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত নিথর দেহ রক্তে ডুবে আছে। মেঘের মামা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো। দেলোয়ারাকে ধমক দিয়ে তিনি ওখান থেকে সরিয়ে দেন। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
দেলোয়ারা উপর থেকে নিচে নেমে আসতেই বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নেতা নুরুন্নবী দেলোয়ারাকে বলেন, "এতো সকালে কে চিৎকার করছে দেখে আসো, কেউ অসুস্থ হলে তো দেখতে হবে আমাদের।" দেলোয়ারা ছুটে আবার সাগর-রুনির ফ্ল্যাটে যায়। রনির মা'কে এতো চিৎকার করার কারণ জানতে চায়। রুনির ভাই তখন দেলোয়ারাকে ইশারায় ভেতরে র ঘরে যেতে বলে। ভেতরে গিয়ে দেলোয়ারা দেখেন, মেঝেতে সাগর-রুনির রক্তাক্ত নিথর লাশ পড়ে আছে। বীভৎসতায় আতঙ্কিত দেলোয়ারা প্রাণপণে ছুটে নুরুন্নবীকে খবর দেয়।
নুরুন্নবী অন্য ফ্ল্যাট মালিকদের জানাতে বলে। দেলোয়ারা গিয়ে রাজ্জাক সাহেব নামের এক ফ্ল্যাট মালিককে জানায়। তিনি খবর শুনে তাঁর স্ত্রী সাহিদা রাজ্জাককে পাঠান। সাহিদা রাজ্জাক যখন রুনির ঘরে ঢোকেন, তখনো রুনির মা ও ভাই রিমন একদম স্বাভাবিক ছিলো। কোনো অস্থিরতা, কান্নাকাটি কিছুই তাদের নেই।
রুনির ছোট ভাই কিশোর নওয়াজেশ আলম রিমন সাহিদা রাজ্জাককে বলেন, আন্টি, ছুঁয়ে দেখেন তো, জীবিত আছে কি না! এরপর তিনি সাহিদা রাজ্জাককে রান্নাঘরে গ্রিলের একটি কাটা অংশ দেখিয়ে বলেন, এই গ্রিল দিয়েই চোরের দল বেরিয়ে গেছে। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
গ্রিলের যতটুকু অংশ কাটা ছিলো তা দিয়ে কোনো মানুষের বের হওয়া সম্ভব নয়। এটা গৃহকর্মী দেলোয়ারা বলেছেন, সাহিদা রাজ্জাক বলেছেন, তদন্তকারী র্যাব কর্মকর্তা বলেছেন, পরবর্তীতে রুনির ভাইয়েরাও বলেছেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাগর-রুনির হত্যাকে চুরির ঘটনার রূপ দেওয়ার আগে রুনির ভাই নওয়াজেশ আলম রিমন এটাকে আত্মহত্যা হিসেবেও প্রচারের চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে রুনির ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ও সহকর্মী নাদিয়া কিরণ বলেন, রুনীর ছোটো ভাই রিমন আমাকে ফোন দেয়। টাইমটা এক্সাক্ট বলতে পারবো না। তবে সাতটা কিংবা সাড়ে সাতটা হবে। রিমন আমাকে বললো, নাদিয়া আপা, আপু তো নাই। আমি তাকে বললাম, "আপু তো নাই মানে?"
সে বললো, আপু তো সুইসাইড করেছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সাগর কই? ও বললো, "দাদাও (সাগর) তো নাই। "
পরে বললো, "দুজনই সুইসাইড করেছে।"
রিমন এভাবে শুধু নাদিয়া কিরণকেই নয়,তার খালা-খালুকেও জানিয়েছিলো, সাগর-রুনি আত্নহত্যা করেছে। যা রিমনের খালু ইমদাদ হোসেন যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেছে।
রুনির মেজ ভাই নওশের আলম রোমান যখন সাগর-রুনির মৃত্যুর সংবাদ পান তখন তিনি ইটিভিতে প্রডাকশানে কর্মরত। রোমানকে ফোন করে রিমন। অর্থাৎ রোমানকেও রিমন তার বোন ভগ্নিপতি আত্মহত্যার খবর ই দেয়। রোমান অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তার সহকর্মীদের সাগর-রুনির আত্মহত্যার কথা বলে বের হন (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৪ ফেব্রুয়ারি ও ৮ এপ্রিল, ২০১৫)
এর বিপরীত বর্ণনা রুনির মা ও ভাইদের কথায়- ”সকাল ৭ টা ৮ মিনিটে রুনির ফোন থেকে কল যায় তার বন্ধু সৈকতের ফোনে। কথা হয় ৮ সেকেন্ড। সৈকত সাগর-রুনি হত্যা মামলার অন্যতম আসামী। সকাল ৭ টা ২৭ মিনিটে রুনির ফোন থেকে তার মায়ের ফোনে কল যায়। কথা হয় ৪৪ সেকেন্ড। এর ৪ মিনিট পরে অর্থাৎ ৭ টা ৩১ মিনিটে রুনির ফোন থেকে তার মায়ের ফোনে আরেকটা কল যায়, তাতে কথা হয় ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।” রুনির পরিবারের দাবিমতে, এই দু'টি কলের মাধ্যমেই তারা সাগর-রুনির হত্যার সংবাদ পায় এবং রুনির ফোন থেকে তাদের কাছে ফোন করে সাগর-রুনির সন্তান মাহির সরোয়ার মেঘ।
দৌহিত্র মেঘের ফোন কল পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান রুনির মা নূরুন্নাহার মির্জা। এরপর রুনির কনিষ্ঠতম ভাই কিশোর নওয়াজেশ আলম রিমন মায়ের ফোন থেকে বড় ভাই নওশের আলম রোমানকে জানান। রোমান ঘটনাস্থলে যান। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
গণমাধ্যমের সহকর্মী যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন,সকলে দেখেছেন, সাগর-রুনি যেদিন খুন হয় সেদিনই পুলিশ সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে রুনির ছোটোভাই নওয়াজেশ আলম রিমন কে আটক করে। নেশাগ্রস্থ রিমন অস্বাভাবিক আচরন করছিলো। পুলিশ হেফাজত তেকে রিপনকে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের বিশেষ অনুরোধে নিহত রুনির পরিবারের চাপে ছেড়ে দিতে হয়।তবে রিমন পুলিশের সন্দেহ তালিকায় ছিল।
তদন্তের প্রয়োজনে আদালত ১৬৪ ধারায় রুনির মা নূরুন্নাহার মির্জা, ভাই নওয়াজেশ আলম রিমন ও সন্তান মাহির সরোয়ার মেঘের জবানবন্দী দিতে বললে তারা কেউ জবানবন্দী দেন নি। কেন??
এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য।
সৌরদিন সকালেই টিভি স্ক্রলে সারা দেশ ও বিশ্ব জেনে যায়, সাগর-রুনি হত্যা ঘটনা।
সাংবাদিকেরা ছুটে আসে চকিতে, এটিএন নিউজ থেকে সাংবাদিক মুন্নি সাহা আসেন, RAB পুলিশ গোয়েন্দাদল আসে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধানরা সহ সাংবাদিক, উৎসুক জনতা স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা আসেন।
হত্যার আলামত ভোঁতা, জং ধরা ছুরি বিঁধে ছিল সাগর সারওয়ারের কলার বোনে। রুনির পেটের নিড়ি ভুঁড়ি বের করা, ভোঁতা রক্ত মাখা বটি পাশে ফেলে রাখা।পুলিশ ঘটনাস্থলে বেষ্টনী না দেয়ায় অসংখ্য লোকের ভিড় ঠেলে ঢুকে আলামত হাতে ধরে দেখেছে। খুনির হাতের ছাপ রাখা হয় নি তাৎক্ষণিক ভাবে। কেন??এই সময় গ্লাভস পরিহিত ছিলো না। তাদের সতর্কতা ছিল না। নষ্ট হয়ে যায় সাগর-রুনি হত্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো। নয়তো অনেক আগেই মামলার জট খুলতো।
সাগর-রুনির লাশ খালি হাতে ধরে মেঝে থেকে খাটের ওপরে তোলে। ঘরের লাল পর্দা দিয়ে সাগরের হাত-পা বাঁধা ছিল। পরবর্তীতে সেসব সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।তবে অনেকের হাতের ছাপে খুনির চিহ্ন অস্পষ্ট হয়ে যায়। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১০ এপ্রিল, ২০১৫)
সাগর-রুনি হত্যার পরদিন অর্থাৎ ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ছোটো ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তার বোন ও ভগ্নিপতি পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/২/বি ( ইচ্ছাকৃত ভুল নম্বর) বাসায় খুন হয়। সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, ৫৮/বি/২ ঠিকানার পশ্চিম রাজাবাজারের সেই বাড়ির সাথে সাগর-রুনির কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রকৃতপক্ষে সাগর-রুনি খুন হয় পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ তাদের ভাড়া বাসায়। আপাতদৃষ্টিতে সূক্ষ্ম পার্থক্য বা ছোটো ভুল মনে হলেও ঠিকানা ভুল দেয়ার যুক্তি কি মামলাকে দূর্বল করে দেওয়া ও আসামিপক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়??
মামলার দুইদিন পর বাদী নওশের আলম রোমান সাগর-রুনির বাসা থেকে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান সম্পদের তালিকা উল্লেখ করে আরেকটি সম্পূরক এজাহার দায়ের করেন। এইব এজাহারে তিনি কোনো ঠিকানাই উল্লেখ করেন নি, যা মামলার ভিত্তি ই থাকে না। দু'টি এজাহারে দেয়া হত্যার সময় ভিন্ন। মামলার ভিত দূর্বল করে দেয়া নয়? (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
যে কারণে বার বার চেষ্টা করেও তাদের আদালতে নেওয়া সম্ভব হয় নি।' কেনো র্যাবকে জবানবন্দী গ্রহণে সহায়তা করা হচ্ছে না জানতে চাইলে রোমান যুগান্তরকে বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দী মারাত্মক কিছু হলেও তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমাদের কি আদালত কোন কাগজ দিয়েছে? র্যাবের কথায় আমরা কেন আদালতে যাব? (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
সাগরের মা একদিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, একদিন মেঘ দিনের বেলা আমার বাসায় এসেছিলো। সেদিন তার প্রচন্ড জ্বর ছিলো। কিন্তু জ্বর অবস্থায় আমার বাসা থেকে রোমান মেঘকে নিয়ে যায়। এরপর জ্বরের খবর নেওয়ার জন্য মোবাইলে রোমানকে ফোন দিই। তাকে বলি, ওকে একটি ডাক্তার দেখিয়ে যত্ন কর। এ কথা বলতেই রোমান হঠাৎ রেগে যায়। চিৎকার করে আমার উদ্দেশ্যে ধমকের সুরে বলে ওঠে, এখনই নিয়ে যান, নিয়ে যান মেঘকে। আমরা কোনো যত্ন নিই না? তখন আমি তাকে বলি, দিয়ে দে আমার নাতিকে। এরপর সে আমাকে ধমকের সুরে বলে, নিয়ে দেখেন মেঘকে, মেঘ থাকবে নাকি! তখন আমি বলি, আমি তো বলি নি, মেঘকে একেবারে দিয়ে দে। ছুটির দিনে এখানে আসলো, থাকলো, আবার স্কুল খুললে চলে গেলো। আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকি? তোর মা তো তোদের নিয়ে আছে। আমি কি নিয়ে বাঁচবো? তখন রোমান ধমকের সুরে বলে, নিয়ে দেখেন না কি করি! ৩ মিনিটের মধ্যে মামলা কিভাবে ঘুরে যাবে! আমি তখন বলি, কেস ঘুরে যাবে মানে? কারো বাবার সাধ্য নেই কেস ঘুরিয়ে দেবার। পরে আমি রাগারাগি করলে আর কোনো কথা বলে নি সে। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
রুনির পরিবারের প্রতি সাগরের মায়ের সন্দেহ এতোটাই প্রবল যে, এই হত্যার কিছুদিন পর যখন দুই পরিবারের সদস্যরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে যায় তখন সাগরের মা শেখ হাসিনাকে কানে কানে বলেন, 'আপা, ওদের ফলো করেন। ওরা সব জানে।' কথাটা সাগরের মা নিজেই যুগান্তরকে জানিয়েছেন। সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, 'আমি যদি বলি, ঘরের ভেতরেই এই ঘটনা ঘটেছে! র্যাবের একজন কর্মকর্তাও (নাম প্রকাশ করা হলো না) আমাকে বলেছেন, তিনি যদি বেঁচে থাকেন তাহলে এটা বের করেই ছাড়বেন। তিনি আমার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। আমি তার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছি।' আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, একদিন আমি আর রুনির মা একসঙ্গে গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম। সেখানে পুলিশও ছিলো, অনেকেই ছিলো। আমি তখন কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে বললাম, আপা, যারা আমাদের বুক খালি করেছে তাদের বিচার একদিন হবেই। এর উত্তরে রুনীর মা বললেন, এটা আর কোনোদিনই বের হবে না। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
সাগরের মায়ের সন্দেহ যে একেবারে অমূলক নয় তা উঠে এসেছে তদন্তকারী র্যাব কর্মকর্তার কথায়, রিমনের ফোনের সিডিআরে ও ডিএনএ টেস্টে। সাগর-রুনি যে রাতে খুন হয় সে রাতে দুইবার রুনির ফ্ল্যাটে যায় রিমন। প্রথমবার রাত ৮ টা ৩৮ মিনিটে ও দ্বিতীয়বার রাত ১০ টায়। দুইবার গিয়ে ওখান থেকে দুটি নাম্বারে কথা বলে, দুটি নাম্বারই সাগর-রুনির হত্যার পর থেকে আর কখনো সচল পাওয়া যায় নি। এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, ঘটনার দুই বছর পরে যখন যুগান্তরের সাংবাদিক রিমনের মুখোমুখি হলে রিমন ওই রাতে বোন রুনির ফ্ল্যাটে যাবার কথা অস্বীকার করে। তবে রিমনের ভাই রোমান (মামলার বাদী) স্বীকার করে রিমন সে রাতে বোন রুনির ফ্ল্যাটে গিয়েছিলো। রোমান বলে, "হ্যাঁ, রিমন সেদিন রুনিদের বাসায় গিয়েছিলো। বাসায় গেলেই কি সে ই যে খুন করেছে, সেটা প্রমাণ হয়? (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ৮ এপ্রিল, ২০১৫)
এ প্রশ্নের জবাবে তদন্তকারী র্যাব কর্মকর্তা বলেন, বাসায় গেলেই খুন করেছে প্রমাণ হয় না। তবে
ঘটনার দিন রিমন সারারাত জেগে ছিলো। রাত ২ টা ৪৩ মিনিটে তাকে ধানমন্ডিতে অবস্থান করতে দেখা যায়। সকাল বেলা তাকে অ্যাবনরমাল দেখা যায়। তার মা যে সময় খুনের কথা জানতে পারে সে সময় সে এবং তার মা একই বাড়িতে অবস্থান করছিলো। মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে মা দৌড়ে চলে আসে, কিন্তু ছেলে বাসায় থেকেও বোন ভগ্নিপতির হত্যার সংবাদে ছুটে আসলো না কেন? সে আসলো আরো পরে। আসার পর প্রথমে চুরির ঘটনা সাজালো, এরপর আত্মহত্যা দাবি করে ফোন করে জানালো সবাইকে- এই বিষয়গুলো সন্দেহজনক। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ৮ এপ্রিল, ২০১৫)
সাগর-রুনির দাম্পত্য সংকট ছিল। এ প্রসঙ্গ উঠে আসে রুনির বান্ধবী ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী নাদিরা কিরণের কথায়।
সাগর রুনি হত্যা ঘটনার সাত দিন আগে রুনি নাদিরা কিরণসহ আরো কয়েকজনকে সাগরের প্রতি তার ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে নাদিরা কিরণ যুগান্তরকে বলেন, 'আমি সহ এটিএন বাংলার আরো দু'চারজনকে রুনি বলেছিলো, "সাগর চেঞ্জ হয়ে গেছে। সাগর আমাকে ইগনোর করবে সেটা আমি ভাবতেই পারি না। সাগর আর আগের মতো নেই। অনেক বদলে গেছে।...!" নাদিরা কিরণ বলেন, তিনি রুনিকে বুঝিয়েছিলেন, সাগরের বিষয়টা এমন কিছুই না। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
জার্মান থেকে সাগর-রুনি ফিরে আসে ২০১১ সালের শেষের দিকে। তিন ভাইয়ের কোন রোজগার ছিল না। রুনি ই সংসার খরচ দিতো। সাগরের সংসারে একমাত্র ভাই সাগরের জন্যে মা বোনেদের খরচ সামলানো কঠিন হতো। এ রুনির ভাইদের মাদকাসক্তির কারণে সাগরের জার্মান ডলার সহ বেশ বড়ো অংকের টাকা নিয়মিত খোয়া যেতো। এসব নিয়ে রুনির সাথে সাগরের তীব্র মনোমালিন্য হতো। সাগরের সাবেক কর্মস্থলে দৈনিক সংবাদের সহকর্মীদের আলোচনায় ঘটনাস্থলে বিষয়গুলো উঠে আসে। রুটির পিতা তাঁর একটি জমির দলিল সাগরের হাতেই দিয়ে যান মৃত্যুর আগে। সাগর সরওয়ার তাঁর শ্বশুরের সম্মানার্থে দলিলটি সযত্নে রক্ষা করেন। রুনির ভাই সেই জমি টি বিক্রি করে দেবার জন্যে প্রচন্ড চাপে রাখে সাগরে।
এটিএন এর মালিকের ভাইপ্রোমোটার, জমির ব্যবসায়ী। তার থেকে রুটির ভাই ২ লক্ষ টাকা অগ্রিম নেয় কমিটি হস্তান্তর করবে বলে।
কিন্তু রুটির পিতার কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ সাগর সরওয়ার শ্বশুরের জমির দলিল টি কোনভাবেই মাদকাসক্ত শ্যালকদের হাতে দেন নি।
প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি সেই দলিলই রুনি ও তার ভাইদের মূল দাবি ছিল সাগরকে ভোঁতা ছুরির আঘাতে জর্জরিত করে হত্যার নেপথ্যে ??
খুনের ঘটনার কয়েক মাস আগে সাগরের সাথে রাগ করে দু'বার নাদিরা কিরণের বাসায় চলে যান রুনি। এ প্রসঙ্গে নাদিরা কিরণ যুগান্তরকে বলেন, রুনি কিন্তু আমার বাসায় রাগ করে চলেও এসেছিলো। সেদিন আমি সাগর-রুনি দু'জনইকে বুঝিয়েছিলাম। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
রুনির পরিবারের সাথে সাগরের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিলো না।সাগরের বোন জানান, হত্যার ৬-৭ মাস আগেও সাগর-রুনি মেঘের নানির পরিবারের সঙ্গে থাকতো। কিন্তু সাগর কোন কারণে বিরক্ত হয়ে নিজেদের আলাদা বাসায় চলে যেতে চায়। তখন তুমুল ঝগড়া করে রোমান অকথ্য ভাষায় সাগরকে গালাগাল করে। একথা রুনির বড় ভাইয়ের স্ত্রী সাগরের বোনকে জানায়। (যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
সাগর রুনি'র দু'জনের দাম্পত্যে সংকট ছিল, তা উঠে এসেছে সাগরের মায়ের কথায়।
সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, কোরবানির ঈদের দিন সাগর একাই আমাদের বাসায় আসে। ও কোরবানি দুই ভাগ দিয়েছিলো। এক ভাগ ও নিয়ে যাবে, আরেক ভাগ আমাকে দিয়ে যাবে। সাগর একা আসায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মেঘ ও রুনি কই? ওদের নিয়ে আসলি না?"
তখন সাগর বলেছিল, "মা থাক না। যে যেভাবে ভালো থাকে, থাকুক।" (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের ছোটভাই মাকসুদুর রহমান রঞ্জু আবাসন ও জমির ব্যবসা করেন। তিনি সাগর রুনবি হত্যায় অন্যতম সন্দেহভাজন।
রঞ্জুর সাথে রুনি ও তার ভাইদের যোগাযোগ ছিল। রুনির বাসায় নিয়মিত যেতেন রঞ্জু। যদিও রঞ্জু ও রুনির মা দু'জনেই এটা প্রথমে অস্বীকার করেন, তবে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রুনির মা একবার যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আসলে রঞ্জু অনেকবারই রানিদের বাসায় গেছেন। রুনির সাথে রঞ্জুর এসএমএস এর প্রমাণ পেয়েছি আমরা। রঞ্জুর মোবাইলের তিন মাসের কল লিস্ট আমাদের কাছে ছিল। রুনির সঙ্গে রঞ্জুর কথাবার্তার প্রমাণও আছে। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১১ এপ্রিল, ২০১৫)
এ বিষয়টি এসেছে র্যাবের তদন্তেও। র্যাবের তদন্তকারী এক কর্মকর্তা জানান,তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো, প্রতিবেশী রা জানতো।হত্যাকান্ডের রাতেও তাদের মধ্যে চিল্লাহল্লা হয়, কেউ এগিয়ে আসে নি, এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই তাদের মধ্যে ঘটতো। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
সাগর-রুনি হত্যার পর তদন্তের প্রয়োজনে সাগরের হাত-পা বাঁধা লাল পর্দা দুটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন পরিচালিত ল্যাবে পাঠানো হয়। ল্যাবরিপোর্টে উঠে আসে সাগর-রুনি হত্যার সবচেয়ে স্পর্শকাতর তথ্য।
সাগরের হাত পা বাঁধা তাদের ঘরের লাল পর্দায় শুধু রুনির ডিএনএ পাওয়া যায়।হাত বাঁধা পর্দা ও টি-শার্টে অজ্ঞাত দুজন পুরুষের ডিএনএ পাওয়া যায়। হাত বাঁধা পর্দায় শুধু রুনির ডিএনএ পাওয়ার বিষয়টি র্যাবের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়কে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরের অনুসন্ধান টিমকে বলেন, খুনের সঙ্গে অন্যতম সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মিলাতে পারলে খুনিদের চিহ্নিত করা সহ পুরো রহস্যের জাল উন্মোচন করা যাবে।এজন্যে র্যাবের উচিত একে একে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে তাদের ডিএনএ দ্রুত সম্পন্ন করা।
সম্ভবত র্যাব কর্মকর্তা এখানে 'সন্দেহভাজন' বলতে রুনির ভাই রিমনকে বুঝিয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাগরের পা বাঁধা পর্দায় রুনির ডিএনএ ছিল ;ধারণা করা হয় সাগর খুন হওয়ার সময় রুনির সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। আর, সাগর খুন হওয়ার পরে রুনি খুন হয়। এ কারণে রুনির মৃত্যুর বিষয়টিও রহস্যে ঘেরা। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
র্যাব কর্মকর্তার দাবী, ঘরের মধ্যে যে বা যারা ছিল (নাম উল্লেখ করলেও তা প্রকাশ করা হলো না) তারা সাগরকে মেরেছে। সাগরকে আনাড়ি হাতে ছুরিকাহত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, রুনির মৃত্যুটা রহস্যের। পেটে বঁটির মোচড় দিয়ে ভুঁড়ি বের করে দেয়া, তাও আবার ডানদিকে। ধারালো বটির আঘাত কারণে তার পেটের মেইন আর্টারি কেটে যায়। তা না হলে এক আঘাতেই মারা যাওয়ার কথা। ব্যাপক রক্তপাতে রুনির মৃত্যু হয়।
রুনির পরনে ছিল টি-শার্ট,শর্টস ,ঘুমানোর পোশাক। সেই টি-শার্ট সরে গেছে, বটির আঘাত লাগে নি তাতে, তাই সেটা কাটেনি। দক্ষ খুনির ধারালো এবং বাইরের অস্ত্রের আঘাত থাকার কথা খুনিদের শরীরে। যা দিয়ে খুন করা হয়েছে দু’টাই রান্নাঘরে বহু ব্যবহৃত নিয়মিত ব্যবহারের ছুরি বঁটি। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
সাগর সরওয়ারের কলার বোনে আনাড়ি হাতে ভোঁতা জংধরা ছুরির ২৪টি আঘাত এবং বিঁধে থাকা ভোঁতা জংধরা ছুরিতে টর্চার করে খুন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন," সাগরকে আনাড়ি হাতে খুন করা হয়েছে। তার ঘাড়েও আঘাত আছে। আবার সামনেও আছে। যে ব্যক্তি বা যারা সাগরের শরীরে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে তারা কিন্তু প্রবল ভাবে উন্মাদের মতো আঘাত করে। কোন স্বাভাবিক দক্ষ হাতে ধারালো অস্ত্রে আস্তে আস্তে বা একবারে হত্যা করা হয় নি।কোন দুর্বল হাতে সর্বোচ্চ জোর দিয়ে অসংখ্য আঘাতে হত্যা। ইচ্ছামতো জোর দিয়ে দুর্বল শক্তিতে এর বেশি করতে পারে নি। শেষ মুহূর্তে সাগরের শরীরে বড় যে স্ট্যাব (Stab) গুলো করা হয়েছে সেখানে প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে অন্যরা অংশ নিয়েছে বলে মনে হয়। কারণ সাগরের collar Bone এ শেষ stab টি আগের ক্রমাগত অসংখ্য আঘাতের ধারাবাহিকতায় অনেক গভীরে ঢুকে যায়। সাগরের উপর অমানুষিক টর্চার হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, রুনির শরীরের অন্য কোথাও কোন প্রকারের টর্চার করা হয় নি। রুনির পেটের ডান পাশে একটা মাত্র স্টেপ। তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর, ১২ এপ্রিল, ২০১৫)
গত ১৪ বছরে সাগর-রুনি হত্যা সম্পর্কে মহিউদ্দিন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কিছুটা খোলামেলা বলেছিলেনএই দম্পতির জীবনযাপন সম্পর্কে নানা রকম নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আমরা মেঘের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এ সম্পর্কিত কোনো বিবরণ বাইরে বলি না এবং যে পুলিশ তদন্ত করছে তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট নির্দেশ, যারা চলে গেছেন তো গেছেন। এই ছেলেটি আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। ভবিষ্যতে সে যাতে মাথা তুলে চলতে পারে এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ পায় সেই স্বার্থে আমরা বিষয়টা যথাসম্ভব গোপন রাখবো।'
এরপরের অভিজ্ঞতা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের জন্য মোটেও সুখকর ছিলো না। এমন হেনস্থা করা হয়, যেন শুধু গায়ে হাত তোলা বাকি ছিল।
২০২৫ সালে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সিরাজুল হোসাইন লিখেছিলেন, 'যদি বলি সাগর-রুনি হত্যায় খুন হয়েছে একজন? তাহলে কিন্তু এই মামলার তদন্ত সঠিক পথে এগোয়। কিন্তু সেটা করা যাবে না কারণ আমরা 'উয়োক সংস্কৃতি'তে প্রবেশ করেছি। 'উয়োক সংস্কৃতি'তে সব দোষ সরকারের।'
সেই পোস্টে নিহত সাংবাদিক সাগর সরোয়ারের ভাগিনা মুহিত হাসান মন্তব্য করেছিলেন, 'আপনি যা লিখেছেন সেই সত্য আমরাসহ অনেকেই জানেন। আওয়ামী লীগ সরকার দাবী করেছিলো, মেঘের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা সত্য গোপন করছে।
০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও ডিবি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দীর্ঘ সময় র্যাবের তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট মামলাটির তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। পিবিআই প্রধানকে ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়। বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের অধীনেই মামলার তদন্ত চলছে।
তবে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় টাস্কফোর্সকে বেশ কয়েক দফায় সময় দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট আরও ছয় মাস সময় দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১২৯ বার পিছিয়েছে।এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তারা রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খান।তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল জামিনে মুক্ত। অন্যরা কারাগারে।
সত্য আড়াল করে পিতৃ-মাতৃহীন শিশু মেঘের কোন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হলো?আওয়ামী লীগ বা যে দল ই ক্ষমতায় থাকুক, সত্য প্রকাশের দায় সরকারের। তাদেরও দায়িত্ব ছিলো সাগর-রুনি হত্যার মূল রহস্য উন্মোচন। কেন তারাও ব্যর্থ হলো??
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান সরকার কী চায়?
মানবিক বোধ বিলুপ্ত ঘাতকের তান্ডবে উন্মত্ত মব, ঘাতকদের দমন করতে হবে। কারামুক্ত করে দিন নিরীহ সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা বিচারপতি রাজনীতিবিদ এবং প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা সহ সকল সাংবাদিককে।
অযথা মিথ্যার পর মিথ্যার নড়বড়ে ভিতে নিজেদের আর তলিয়ে দেবেন না। প্রকৃত অপরাধীদের ন্যায়বিচারের মুখোমুখিকরে দেখান। পারবেন??
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার