06/03/2026
বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ:
আবেগ নয়, বাস্তবতার হিসাব–
বর্তমান বিশ্বে তেল ও জ্বালানি ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি সচল রাখা প্রায় অসম্ভব। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তাই সহজভাবে বলা যায়, তেল ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্থনীতি খুব দ্রুতই স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানির প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। বিপুল জনসংখ্যা, দ্রুত শিল্পায়ন এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ফলে তারা যদি কোথাও থেকে কম দামে বা বেশি লাভজনক উপায়ে জ্বালানি কিনতে পারে, তাহলে সেই সুযোগ গ্রহণ করাই তাদের জন্য যৌক্তিক।
এখানে বিষয়টি বন্ধুত্ব, সহায়তা বা তথাকথিত ঐতিহাসিক সম্পর্কের নয়—বরং এটি সম্পূর্ণ একটি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কৌশল।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে স্যাংশনের সম্ভাবনা কি তৈরি হয় না? বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য এবং বাজারের গুরুত্ব অনেক বড় বিষয়।
চীন ও ভারতের জনসংখ্যা বিশাল, আর সেই সঙ্গে তাদের বাজারও অত্যন্ত বড়। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি এখনো এমন অবস্থানে পৌঁছায়নি যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সব দিক দিয়ে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ফলে ভারতকে সরাসরি বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে পশ্চিমারা এখনো দেখছে না। বরং ভারতের বিশাল বাজার পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সহজে তারা ভারতের ওপর কঠোর স্যাংশন দিতে আগ্রহী নয়।
অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনকে পশ্চিমা বিশ্ব অনেক বেশি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে এই দুই দেশকে প্রায়ই পশ্চিমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণেই তাদের ওপর নানা ধরনের স্যাংশন ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়।
তবে এখানেও একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে—বিশ্ব অর্থনীতি আজ এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা প্রায় অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আবার পশ্চিমা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো চীনের সহজলভ্য শ্রমশক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সেখানে কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করে থাকে। চিপ, প্রযুক্তি পণ্য কিংবা বিভিন্ন শিল্পজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে দেশগুলোকে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। তাই রাশিয়া বা চীনের ওপর কিছু স্যাংশন আরোপ করা হলেও তা অনেক সময় সীমিত পর্যায়েই থাকে।
যদি সত্যিই কোনো দেশকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার ইচ্ছা থাকতো, তাহলে উত্তর কোরিয়ার মতো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতো—যেখানে প্রায় সব ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
সবকিছু বিবেচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বরাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই আবেগ বা বন্ধুত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না। প্রত্যেক দেশই তার নিজস্ব স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ এবং কৌশলগত সুবিধা বিবেচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
সুতরাং কোনো দেশের পদক্ষেপ নিয়ে অতিরিক্ত আবেগ বা অযথা প্রশংসায় ভেসে যাওয়ার আগে মনে রাখা দরকার—
সব দেশই মূলত নিজেদের স্বার্থের জন্য কাজ করে, ঝুঁকি নেয়, সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়।
ছবি-নয়া দিগন্ত ও ডিবিসি