07/08/2026
ট্রাম্পের ইরান সংকট: যুদ্ধের ৬ষ্ঠ মাসে কোনো সহজ পথ নেই ওয়াশিংটনের সামনে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ০৭ আগস্ট, ২০২৬
ওয়াশিংটন: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে কঠোর সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে আসলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলে যায়নি। বর্তমানে ট্রাম্প মূলত ৩টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি, যার প্রতিটি বিকল্পই তাঁর জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
১. ওমান-ইরান চুক্তি: তেহরানকে বড় ছাড় দেওয়ার ট্রাপ
ইরান এবং ওমানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সমঝোতা বা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এই প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, হরমোজ প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির (Supervision & Control) ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে।
* কৌশলগত ক্ষতি: যুদ্ধের আগে ইরান কখনোই এই প্রণালীতে সরাসরি একক নিয়ন্ত্রণ ভোগ করেনি। যদি আমেরিকা এই চুক্তি মেনে নেয়, তবে এটি হবে তেহরানের জন্য যুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয়।
* প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হরমোজ প্রণালীকে কোনোভাবেই ইরানের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়া হবে না এবং আন্তর্জাতিক এই জলপথ সম্পূর্ণ বাধা ও ফি-মুক্ত রাখতে হবে। তবে ট্রাম্প যদি তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে চুক্তিটি মেনে নেন, তবে নিজের প্রশাসনের নীতির সাথেই বড় বড় সংঘাত তৈরি হবে।
২. সামরিক হামলা জোরদার: মধ্যবর্তী নির্বাচনের বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি
ট্রাম্পের সামনে দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো ইরানের ওপর হামলা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। তবে এই সিদ্ধান্ত মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে:
* মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন: আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে (যেখানে সেপ্টেম্বর থেকেই অনেক রাজ্যে আর্লি ভোটিং শুরু হবে)।
* জনপ্রিয়তার ধস ও জ্বালানি সংকট: মার্কিন বাজারে পেট্রোল ও জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং যুদ্ধে প্রচুর মার্কিন অর্থ ব্যয়ের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান ভোটার এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের বিরোধী।
* ক্ষেপণাস্ত্র ঘাটতি (Missile Stockpile Depletion): রয়টার্স ও ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘ ৫ মাসের এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের টমাহক ক্রুজ মিসাইল ও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টারের মতো উচ্চ-প্রযুক্তিগত ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুদ প্রায় শেষ করে এনেছে। ফলে চাইলেও নতুন করে দীর্ঘ বোমাবর্ষণ চালানো আমেরিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থা (Status Quo) বজায় রাখা
যদি ট্রাম্প চুক্তিতেও না যান এবং বড় কোনো বিমান হামলাও না চালান, তবে তাকে বর্তমানে চলমান নৌ-অবরোধ ও মাঝে মাঝে পাল্টাপাল্টি হামলার কৌশল ধরে রাখতে হবে। তবে এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট বহাল থাকবে, লোহিত সাগর ও হরমোজ প্রণালীতে তেলের ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে এবং আমেরিকানদের কাছে ট্রাম্পের "দ্রুত যুদ্ধ জয়ের" প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি:
সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনাবিদ অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, "ট্রাম্পের সামনে থাকা সমস্ত বিকল্পই খারাপ (Menu of bad options)। তিনি বুঝতে পেরেছেন এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালানো অসম্ভব, তাই তেহরানের নতুন শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া ট্রাম্পের কাছে পথ কম।
"এদিকে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ সতর্ক করেছেন যে, চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মার্কিন এই সীমাবদ্ধতা ও সামরিক দুর্বলতাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে, যা আগামী দিনে বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দেবে।