21/09/2026
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সুবাদে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে আমার যাতায়াত নিয়মিত। আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ট্রেনের টিকিট পাওয়া মানে সত্যি এক 'সোনার হরিণ'। কারণ সব টিকেট থাকে কালোবাজারিদের হাতে। অধিকাংশ সময়ই ভাগ্যে জোটে স্ট্যান্ডিং টিকিট, আর শুরু হয় কামরার এক কোনায় দাঁড়িয়ে কিংবা গাদাগাদি করে গন্তব্যে পৌঁছানোর লড়াই। কিন্তু যাত্রীদের এই তীব্র সংকট আর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ট্রেনগুলোতে যে কতটা বিষাক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা এই রুটে নিয়মিত যাতায়াত না করলে বাইরে থেকে অনুধাবন করা কঠিন।
রেলওয়ে ম্যানুয়াল বা চাকরির শর্ত অনুযায়ী ট্রেনের একজন স্টুয়ার্ড বা এটেনডেন্টের মূল কাজ কী? খুব সাধারণ নিয়ম, যাত্রীদের ব্যাগ ও মালামাল ওঠানামায় সাহায্য করা, বয়োবৃদ্ধ বা সুবিধাবঞ্চিতদের নির্ধারিত সিট খুঁজে দেওয়া, বগির পরিচ্ছন্নতা তদারকি করা এবং সার্বিক যাত্রীসেবা সুনিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এই এটেনডেন্টদের বড় একটি অংশ আজ সেবা দেওয়ার ভূমিকা ছেড়ে নেমে পড়েছে অবৈধ টিকিট ও সিট বাণিজ্যে। জনবল সংকট বা অসাধু টিটিদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এদের অনেকেই গায়ে কালো ব্লেজার চাপিয়ে, হাতে একটি নোটখাতা নিয়ে টিটি বা ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনারের রূপ ধরে বগিতে বগিতে ঘোরেন। টিকিট না পাওয়া নিরুপায় যাত্রীদের জিম্মি করে, পুলিশ ও জরিমানের ভয় দেখিয়ে বাসের কন্ডাক্টরের মতো টাকা তোলাই যেন এদের মূল পেশা।
সংবাদমাধ্যমে এদের কারসাজি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়াটাও নতুন কোনো ঘটনা নয়। যেমনটা চট্টলা এক্সপ্রেসের মোহন নামের এক এটেনডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। ১৪তম গ্রেডের একজন কর্মচারী হয়েও তিনি হাতে খাতা নিয়ে ঘুরে ঘুরে টিটি সেজে যাত্রীদের থেকে টাকা তুলছেন, আসনবিহীন যাত্রীকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অন্যের সিটে বসিয়ে দিচ্ছেন। সাংবাদিক ক্যামেরা ধরলে ক্ষমা চেয়ে মাফ চান, অথচ বছরের পর বছর একই কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন (এখনো প্রায় দেখা হয়)। শুধু তা-ই নয়, এটেনডেন্টদের পুরোনো আরেকটা কুখ্যাত ব্যবসা হলো বগির দুই পাশের খালি জায়গায় বালতি উল্টো করে রেখে সেখানে যাত্রী বসানো এবং টিকিটের দুই থেকে তিন গুণ টাকা পকেটে ভরা। কোনো যাত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে কটু কথা বলা বা আসল টিটি ও পুলিশ এনে ভয় দেখানোর মতো ঘটনা নিত্যদিনের। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের জন্য এই অভিজ্ঞতা চরম অপমানজনক ও হয়রানিমূলক।
এখন বড় প্রশ্ন জাগতেই পারে, সংবাদমাধ্যমে নাম-ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কেন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না? উত্তরটা সহজ, এটি কেবল একজন এটেনডেন্টের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি একটি সুসংগঠিত এবং গভীর সিন্ডিকেট। এটেনডেন্টদের তোলা এই অবৈধ টাকার ভাগ পৌঁছে যায় অসাধু টিটি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে। ফলে এরা একে অপরকে ঢাল হয়ে রক্ষা করে। একদিকে অসাধু কর্মচারীরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিন প্ল্যাটফর্ম ও বগিতে নিঃশব্দে নিপীড়িত হচ্ছে।
আর এই পুরো অরাজকতার মধ্যে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী বা আরএনবির ভূমিকা কী? সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন দেওয়া হয় ট্রেন ও স্টেশনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে, তাদের আচরণ আজ চরম ভয়াবহ ও নির্লজ্জের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে নিজের চোখের সামনে দেখা এক ঘটনার কথা মনে পড়ে। প্ল্যাটফর্মে ২ থেকে ৩ জন লোক মিলে এক সাধারণ মানুষকে টেনে হিঁচড়ে মারধর করছিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরএনবি সদস্যদের বিষয়টি দেখতে বললে উনাদের নির্লিপ্ত উত্তর ছিল, "আজাইরা খাইয়া কাম নাই, যা ইচ্ছা হোক, একটু পর এমনিতেই জানতে পারমুনে।" শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়, এরা এখন কতটা বেপরোয়া আর হিংস্র হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ মিলল গতকালই। গতকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে আরএনবি সদস্যরা তাকে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যার চেষ্টা করেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় সে এখন আইসিইউতে ভর্তি, সে আদৌ বাঁচবে কিনা তা নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে। আল্লাহ যেন ভাইটিকে দ্রুত সুস্থ করে তুলুন এবং আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। যে বাহিনীর কাজ ছিল সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা, তারা এখন নিজেরাও রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো আচরণ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এবং এই দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের এবার চরম শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। ট্রেনের এটেনডেন্টরা সেবা দেওয়ার কর্মী, টিকিট পরীক্ষা করা বা জরিমানা আদায়ের কোনো আইনি অধিকার তাদের নেই। রেলওয়ে প্রশাসনকে অবিলম্বে এসব তথাকথিত নকল টিটি, সিট বাণিজ্যের সিন্ডিকেট এবং রক্তচক্ষু দেখানো আরএনবি সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ওপর হামলাকারী অপরাধী আরএনবি সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আমরা যদি আজ সশব্দে প্রতিবাদ না করি, তবে এই রাষ্ট্রীয় সেবা খাতটি এবং আমাদের যাতায়াতের পথগুলো পুরোপুরি ঘাতকদের দখলে চলে যাবে।
– শিক্ষার্থী, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি