24/03/2026
#দাস্তান_এ_মীরা_নিশান
#পর্ব০১
#লেখনীতেঃ_অরুণীকা
🚫কপি করা নিষিদ্ধ
১০ সেপ্টেম্বর ২০১০।দিনাজপুর ব্যস্ত শহর না হলেও দিনাজপুর যেনো এ সময় অতি ব্যস্ত।কেউ,কেউ ছুটছে কাশ বনে,কেউ ছুটছে পদ্মবিলে,আবার কেউ ছুটছে প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করতে,,আর কেউ ছুটছে পেটের খিদের সেই অসহ্য যন্ত্রণা মেটাতে...
দিনাজপুর মডার্ন মোড়-নিউ টাউন রোড এলাকা...
মর্ডান মোড় থেকে নিউটাউন রোডের দিকে গেলেই একটা আবহ পাওয়া যায়।দিনাজপুর শহরের তুলনামূলক অভিজাত ও আধুনিক আবাশিক এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এখানে ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিদেশ ফেরত মানুষদের বসবাস। রাস্তাগুলো চওড়া, সন্ধ্যায় স্ট্রীট লাইটের আলো- যা একটি নিয়ন্ত্রিত, শান্ত শহরের সৌন্দর্য। বেশিরভাগ বাড়ি দুই বা তিনতলা, গেটওয়াল, বারান্দা, ছাদে গাছ-ছোট গার্ডেন।
চারপাশে অযথা হইচই নেই-একটি নিরব ক্ষমতাশালী পরিবেশ।
বাড়ির নং ১৭ নিউটাউন রোড মডার্ন মোড় সংলগ্ন, দিনাজপুর তাহিয়ান বাড়ি-রাস্তার অন্যান্য বাড়িগুলোর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং লোকের আকর্ষণ কেড়ে নেয়।
বাড়িটি দুর থেকেই চোখে পড়ার মতো-একটি বিশাল ও রাজকীয় স্থাপনা,যেনো নিজের অস্তিত্বই নীরবে ঘোষণা করে দেয়।চারপাশ জুড়ে বিস্তৃত সবুজ বাগান,সুচারু পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা গাছপালা আর রঙিন ফুলের ভরা সেই প্রাঙ্গণ।দেখে মনে হয়,প্রকৃতিও বুজি এই সৌন্দর্য বাড়াতে নিজে হাত লাগিয়েছে।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি বড় অভিজাত সদর গেট।গেটটি শক্ত লোহার তৈরি,তাতে সূক্ষ্ম নকশা নিখুঁত করে খোদাই করা-মজবুত হলেও দৃষ্টিনন্দন।সেই গেট পর হতেই শুরু দীর্ঘ বাগানের পথ।দুপাশে সারি সারি গাছ,ফুলের বেড আ মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া পাথরের রাস্তা যেনো অথিতিকে ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে দিকে টেনে নিয়ে যায়।
বাগান পেরিয়েই আরেকটি আধুনিক ডিজাইনের গেট,যেটা পার হলেই সরাসরি বাড়ির মূল অংশে ঢোকা যায়। বিশাল ছাদ প্রশস্ত বারান্দা আর খোলা জালানা-সব মিলিয়ে বাড়িটি আলো আর বাতাসে ভরা।বাড়িটির পাশে রয়েছে বিশাল গাড়ি পার্কিং স্পেস।একসাথে একাধিক গাড়ি রাখা। ছাওনির নিচে রাখা গাড়িগুলো যেন বাড়ির অভিজাত্যের আরেকটি নিঃশব্দ প্রমাণ। চারটি গাড়ির মধ্যে বামপাশ থেকে দুই নম্বর গাড়িটি BMW। পাশে ছোট একটি স্টোর রুম।
বাড়ির ভিতরে ঢুকলেই যে জিনিসটি সবচেয়ে আগে নজর কেড়ে নেয়,তা হলো নিচ তোলার বিশাল ডাইনিং হল। চারপাশে খোলা,উঁচু ছাদ, বড় জালানা দিয়ে বাগানের সবুজ আলো এসে পড়ে মেঝেতে। মাঝখানে বড় ডাইনিং টেবিলটি পারিবারিক উষ্ণতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশেই রয়েছে আধুনিক ডিজাইনের কিচেন।
ডাইনি হলের এক পাশে রয়েছে আধুনিক ডিজাইনের সিঁড়ি।
মার্বেলের তৈরি ধাপ, কাচ আর স্টিলের রেলিং, আর দেয়ালে বসানো নরম আলো-সব মিলিয়ে সিঁড়িটা শুধু উপরে ওঠার পথ নয়,বরং বাড়ির সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে নিচের ডাইনিং হোলটি পুরোটা চোখে পড়ে,যেন বাড়ির ভেতরে জীবনকে উপর থেকে দেখা যায়।
উপরের তলায় ছিল বাড়ির সব রুমগুলো।প্রতিটি ঘর ছিল প্রশস্ত,আলো-বাতাসে ভরা,আর জালানা বা বারান্দা দিয়ে বাগানের দিকে তাকালেই মনটা শান্ত হয়ে যায়।
মাস্টার বেডরুম গুলো ছিল আলাদা করে নজর কাড়ার মত-আরাম,নীরবতা আর সৌন্দর্যের নিখুত সমন্বয়।
পুরো বাড়িটি এমন ভাবে তৈরি,যেনো এখানে শুধু মানুষ থাকে না-এখানে স্মৃতি তৈরি হয়,গল্প জন্ম নেয়।এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল,প্রতিটি পথ আর প্রতিটি জ্বালানোর মত লুকিয়ে আছে অনুভূতি আর না বলা কথা।
বেডরুমের সাথে অ্যাটাচ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে নিচের বাগানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তাহিয়ান বংশের বড় কন্যা মিফতাহুল তাহিয়ান মীরা। সবুজ ঘাসের বুক চিরে নেমে যাওয়া পথ, নিঃশব্দে দুলছে পাতা, ঘুরঘুর করে ডাকতে থাকা মেঘ, কালো মেঘগুলো যেন ব্যস্ত হয়ে থেমে গিয়েছে-হঠাৎই ঝিমঝিম করে বৃষ্টি হতে শুরু করে।
এতক্ষণে মিরা কোন যেন ভাবনায় ডুবেছে।
বাতাসে ঝাপটে আসা বাওচি মীরার মুখে এসে পড়তেই তার ভোর কাটে।একটু পেছনে সাইডে রাখা রাউন্ড গ্লাস টপ টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই দেখে সাতটি মিস কলের নোটিফিকেশন ভাসছে ফোনের স্ক্রিনে।
ফোন ভাইব্রেশনে থাকায় মীরা তা বুঝতে পারিনি। আতৎকে ওঠে কল ব্যাক করে তার পিতা মুরশিদুল তাহিয়ান কে। দুই তিনবার রিং যেতে কল রিসিভ হয়।
ফোনের ওপাস থেকে দু-চারটে ধমক ভেসে আসে মীরার কানে,,,,
"কতবার বলেছি কল একবারেই রিসিভ করবা..."কোই ছিলা? ব্যস্ত থাকলে কোল রিসিফ করে বলতে পারোনা?আর কিসের এতো ব্যস্ততা তোমার?...
"ফোন ভাইব্রেশনে ছিলো।"আব্বু।
তাই বুঝতে পারিনি...
"ফোন ভ্রাইভেশন করে রাখো কেনো তুমি?
ফোনা ভ্রাইভেশন করে রাখতে মানা করেছি...Next যেনো না হয় এরকম..."
'হুম'
"যাই হোক যেটা বলার জন্য কল করেছি,,,
আজ রাত ১০:০০ টায় তোমার বড় আব্বুরা ঢাকা
থেকে দিনাজপুরে উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে।"
তোমার বড় আব্বু আর ভাইয়ার রুমটা পরিষ্কার করে দিতে বলিও দিয়া খালাকে,,,,
আর শুনো…
'হু'আব্বু বলো…
"তারা দিনাজপুরে পৌঁছাতে সকাল সাতটা বা আটটা বাজতে পারে, জার্নি করে আসবে মন্দ খাবার খাওয়ানো যায় না। আমি রাজীব আঙ্কেলের দ্বারা বাজার পাঠিয়ে দিচ্ছি।....."
আ..আ.. ভাইয়ার রুম মানে!?
'হুম'তোমার ভাইয়াও আসবে...
কিন্তু…ভাইয়াতো…
আমি নিজেই কিছু বুঝতে পারছিনা,,তোমার ভাইয়া একবার এই চলে আসছে Bangladeshe...
______
এতক্ষণ ধরে মুরশিদুল তাহিয়ান এর বলা কথা এবং ধমকে মীরার রাগ বা মন খারাপ না হলেও…তার বড় আব্বুর সাথে ভাইয়া আসবে শুনে মীরা 'থো' লাগে,,,
সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।কিছু একটা বুঝে উঠতেই, তার হৃদস্পন্দন বাড়তে শুরু করে,,, শীরা-উপশীরায় রক্ত চলাচল যেন বন্ধ হতে থাকে। হাত থরথর করে কাঁপতে শুরু করে তার।হঠাৎ করে বসে পড়ে সে দাঁড়িয়ে থাকা এই মুহূর্তে অসম্ভব।।
কিছুক্ষণ পর মীরা স্বাভাবিক হতে ই সে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং মনে মনে বিরবিরায়...
ব্যাপার কি? আফ্রিকা থেকে ঢাকা কবে আসলো বংশের বড়ওওও... পত্র,,, সবাই জানতো না নাকি শুধু আমি...!?
হুর...
চোখ শুরু করে বীরবিরায় শেষ করে কথাগুলো অতঃপর কাঁচের স্লাইডিং দরজা পেরিয়ে প্রবেশ করে নিজের রুমে, বিছানায় ফোনটা ফিকে দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা পা বাড়ায় ডাইনিং হলের পাশে কিচেনের দিকে, সোজা গিয়ে থামে জয়নব তাহিয়ান এর পেছনে,,,
পেছনে কারোর উপস্থিতি টের পেতেই জয়নব ঘুরে তাকান,
কি হলো? কিছু বলবা?
'হুম' ভাইয়ারা আসবে জানো তুমি?
'কোন ভাইয়া!?'
Sorry,,,, কোন ভাইয়া তুমি জানো না!? বড়ো আব্বুরা আজ ১০: ০০টায় গাড়িতে উঠবে সাথে বংশের বড় পুত্র আসছে,,,
এই কথাটা কি তুমি জানতা?
বেশ রাগিস্বরে প্রথমের কথাগুলো বললেও শেষের লাইন নরম স্বরেই বলে মীরা,,
প্রতি উত্তরে জয়নব তাহিয়ান বলেন,
'হুম'জানতাম...মাত্রই জেনেছি...তোমার আব্বু Call করেছিলো,,,
মীরা চোখ মুখ কুঁচকে বলে,,,
আজিব!তোমাকেই যেহেতু কল করে জানাবে তাহলে আমাকে কেন কল করেছিলো,শুধু শুধু ঝাড়ি খেতে হলো সাথে ব্যাড নিউস, সারা দিন খারাপ যাবে।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলেই স্থান ত্যাগ করে মীরা,তার কথায় জয়নব তাহিয়ান বলল,,,
তুমি ফোন vibration করে রাখলে আমাকে কল দিবে নাতো কাকে কল দিবে,আর Bad news কিরে?
কথাগুলো একটু উঁচু স্বরেই বললেন জয়নব তাহিয়ান,যেনো কথাগুলো মীরার কানে পর্যন্ত যায়,হয়তোবা গিয়েছে তাই মীরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতেই বিরক্তির-স্বর নিয়ে বলে,,,
''তুমি বুঝবে না কেনো Bad news...''
"খেয়ে যাও মীরা" জয়নবের এই কথাটুকু শুনল কিনা কে জানে!!
________
বৃষ্টি থেমে গিয়েছে একটু আগেই। আকাশে তখনও হালকা ধূসর রং লেগে আছে, যেন মেঘগুলো পুরোপুরি সরে যেতে ভুলে গিয়েছে। বাতাসে একটা ঠান্ডা সোঁদা গন্ধ-ভেজা মাটি,ভিজে থাকা পাতা আর দূরের গাছপালার মিশ্র সুবাস। রোদের দেখা নেই কিন্তু আলো আছে-নরম,শান্ত,চোখে লাগেনা এমন আলো। চারপাশে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, যেন প্রকৃতি নিজেও একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।
রাস্তার পাশে জমে থাকা পানির উপর হালকা বাতাস লাগতেই ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে এখনো জল ঝরে পড়ছে, সেই শব্দটা আশেপাশের নীরবতাকে আরো গভীর করে তুলছে। দূরে কোথাও পাখি ডাকছে, বৃষ্টির পরে এই ঠান্ডার সময় নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার মতো করে।
এই আবহাওয়ার ভিতর দিয়ে একটা গাড়ি চলছে-কোন তাড়াহুড়ো নেই, নিজের ছন্দে,নিজের গতিতে। চাকার নিচে ভেজা রাস্তা নরম শব্দ করে সরে যাচ্ছে। গাড়ির কাঁচে জমে থাকা জল রেখাগুলো ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে,ঠিক যেন সময়ও একটু ধীর হয়ে গিয়েছে। ভেতরে বসে থাকা মানুষগুলো নীরব,বাইরে তাকিয়ে এক ঠান্ডা ভেজা পৃথিবীটাকে অনুভব করছে।
সব মিলিয়ে, এই বৃষ্টির পরে আবহাওয়াটা যেন ক্লান্ত মনকে শান্ত করে দেওয়ার জন্যই তৈরি-না খুব আনন্দের,না খুব বিষন্ন;বরং এক ধরনের গভীর,নীরব স্বস্তি।
#চলবে
[ফাস্ট টাইম লিখেছি ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন]
#দাস্তান_এ_মীরা_নিশান #মীরা #নিশান #অরুণ্ীকা #দাস্তান_এ_মীরা_নিশান