26/05/2026
এক গ্রামে এক বুড়ি মা থাকতেন। তাঁর কেউ ছিল না – না স্বামী, না সন্তান। সম্পূর্ণ একা থাকতেন তিনি। বয়সের ভারে ক্লান্ত হলেও, মনে ছিল ভক্তি ও ভালোবাসার অফুরান ভাণ্ডার।
একদিন সেই গ্রামে এক সাধু এলেন। বুড়ি মা তাঁকে খুব যত্ন করে খাওয়ালেন, বসালেন, আর ভক্তিভরে সেবা করলেন। সাধু যখন বিদায় নেওয়ার সময় এলেন, তখন বুড়ি মা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “বাবা, আপনি ভগবানের সেবক, আপনি তো আশীর্বাদ দিতে পারেন! এমন কিছু আশীর্বাদ দিন, যাতে আমার এই একাকীত্ব দূর হয়। আমি আর একা থাকতে পারছি না।”
সাধু হেসে নিজের ঝোলার ভেতর থেকে একটি ছোট্ট বালগোপালের মূর্তি বার করে বুড়ি মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, “মা, এটা তোমার নিজের সন্তান। একে নিজের ছেলের মতো আদরে, ভালোবাসায় লালন-পালন করো। তোমার একাকীত্ব কেটে যাবে।”
এরপর থেকে বুড়ি মা সেই ছোট্ট বালগোপালকে নিজের ছেলের মতো আদরে রাখতেন—ভাত খাওয়াতেন, গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন, স্নান করাতেন, এমনকি গল্পও করতেন। গোটা গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল—বুড়ি মা এখন এক বাচ্চার মা!
একদিন গ্রামের কয়েকজন দুষ্টু ছেলে মজার ছলে মায়ের কাছে এসে বলল, “মা, শোনো! শুনেছি জঙ্গলে থেকে একটা বড় হিংস্র নেকড়ে গ্রামে ঢুকেছে! সে নাকি ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলছে! তুমি সাবধান থেকো, তোমার ছেলেটিকে যেন কিছু না হয়!”
এই কথা শুনে মা আঁতকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে বালগোপালকে কুটিরে রেখে দরজায় লাঠি হাতে বসে পড়লেন। দিন-রাত তাঁর একটাই কাজ—রক্ষা করতে হবে তাঁর প্রিয় লালকে সেই নেকড়ের হাত থেকে।
একদিন গেল, দুই দিন গেল, তিন দিন… এভাবে টানা পাঁচদিন পাঁচ রাত ধরে মা না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, এক পলক চোখ না মিটিয়ে, লাঠি হাতে সন্তানের প্রহরা দিয়ে চললেন।
মায়ের এই নিষ্ঠা দেখে ঠাকুরজি, অর্থাৎ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন—"এই মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আস্বাদ এবার আমি নিজে গিয়ে নিই।" তিনি অপূর্ব রূপে, রাজাধিরাজের সাজে, অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে মায়ের কুটিরে উপস্থিত হলেন।
হঠাৎ পদচারণার শব্দে মা চমকে উঠলেন। ভয়ে ভাবলেন, “নিশ্চয়ই সেই ভয়ংকর নেকড়ে এসেছে!” সাথে সাথে তিনি লাঠি হাতে বললেন, “এই কে? আমার ছেলেকে ছুঁতে পারবি না!”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন মৃদু হেসে বললেন, “মা, আমি তোর সেই বালক—তোর গোপাল! যাকে তুই এতদিন ধরে নিজের ছেলের মতো আগলে রেখেছিস!”
মা বললেন, “কে! তুই? আমার ছেলে? এমন কথা তো অনেকেই বলে! তোর মতো শত শতকে আমি কিছু মনে করিনা। এখন চুপচাপ এখান থেকে চলে যা!”
ঠাকুরজি মায়ের এই সরলতা, নিষ্ঠা, এবং অনন্য ভক্তি দেখে গভীর আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি মায়ের সামনে নিজেকে প্রকাশ করলেন ও বললেন—“মা, আমি ত্রিভুবনের ঈশ্বর—ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তোর ভক্তিতে আমি তৃপ্ত হয়েছি। যা চাই, আমি বর দিতে প্রস্তুত।”
বুড়ি মা হাত জোড় করে বললেন, “ভগবান, আপনি যদি সত্যিই বর দিতে চান, তবে এমন করুন যাতে আমার প্রিয় বালককে নেকড়ে কখনো নিয়ে যেতে না পারে।”
ঠাকুরজি হেসে বললেন, “মা, তুই সত্যিই মহান! আমি তোকে ও তোর বালককে আমার নিজধামে নিয়ে চললাম—সেখানে কোন নেকড়ে নেই, কেবল ভালোবাসা, আনন্দ আর শান্তি।”
এইভাবে ঠাকুরজি মাকে তাঁর চিরসঙ্গী করে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। আজও যারা বিশ্বাস, ভক্তি ও ভালোবাসায় বাঁচে—তাদের মাঝে এই বুড়ি মায়ের আত্মা বিরাজমান।
গল্প থেকে শিক্ষা:
নির্ভেজাল ভক্তি ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কখনো বৃথা যায় না। এক মা তাঁর প্রিয় ‘মূর্তি’কে সন্তান জ্ঞান করে প্রাণপণে আগলে রেখেছিলেন, আর সেই ভালবাসার প্রতিদান স্বয়ং ঈশ্বর তাঁকে নিজ হাতে দিয়েছেন।
Il হরে কৃষ্ণ ll