13/07/2026
অতিবৃষ্টির সময় মুমিনের করণীয় পাঁচ আমলঃ
বৃষ্টি মহান আল্লাহর অন্যতম বড় নিয়ামত। এর মাধ্যমে মৃত ভূমি জীবিত হয়, ফসল উৎপন্ন হয় এবং মানুষ ও প্রাণিকুল জীবনধারণের উপকরণ পায়।
মহান আল্লাহর এই বিশেষ নিয়ামতের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আকাশ থেকে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তা দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও উদগত করি শস্য।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ৯)
তবে কখনো কখনো এই রহমতের বৃষ্টিই অতিবৃষ্টিতে রূপ নেয়, এমনকি বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের জন্য কষ্ট ও পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ রকম পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের করণীয় কী, সে বিষয়ে আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।
১। ধৈর্য ধারণ করাঃ
অতিবৃষ্টিকে আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
অতএব অতিবৃষ্টিতে কোনো মুমিনের ঘরবাড়ি, ফসল বা সম্পদের ক্ষতি হলে তার করণীয় হলো, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদানের আশা রাখা। কেননা মুমিনের কোনো অবস্থাই প্রকৃতপক্ষে তাকে লোকসানে ফেলতে পারে না।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের অবস্থা ভারি অদ্ভুত। তার সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যবস্থা নেই। তারা আনন্দ (সুখশান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তার জন্য কল্যাণকর হয়।
👉সহীহ মুসলিম হাঃ ২৯৯৯; মুসনাদে আহমাদ হাঃ ২২৮৪৮।
২। দোয়া করাঃ
বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া সুন্নত।
রাসুল (সাঃ) বৃষ্টি নেমে এলে বলতেন, اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
‘আল্লাহুম্মা সইয়্যিবান নাফিআ’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! মুষধারায় কল্যাণকর বৃষ্টি দাও।’
👉সহীহ বুখারি হাঃ১০৩২
আর যদি অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিত, তখন রাসুল (সাঃ) এই দোয়া করতেন, اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِرَابِ وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা, আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াজ জিরাবি, ওয়া বুত্বনিল আউদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার।’
অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে, আমাদের ওপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা, মালভূমি, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন।’
👉সহীহ বুখারি হাঃ ১০১৪
৩। মানুষের পাশে দাঁড়ানোঃ
বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। অতিবৃষ্টিতে অনেক মানুষ খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা সংকটে পড়ে। এ সময় সাধ্যমতো প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটিও মহান আল্লাহর রহমত ও সাহায্যপ্রাপ্তির একটি মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার বান্দার সাহায্য করেন।
👉আবু দাউদ হাঃ৪৯৪৬
৪। সংকট নিরসনে স্বেচ্ছাসেবক হওয়াঃ
যাদের মহান আল্লাহ সুস্থতা ও শক্তি-সামর্থ্য দিয়েছেন, বিশেষ করে যুবসমাজ, তাদের উচিত— জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ। প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সরানো, ড্রেন পরিষ্কার করা, জলাবদ্ধতা নিরসনে সহযোগিতা করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে মানুষকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। মানুষের কষ্ট লাঘবে আত্মনিয়োগ করা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়ক হয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। যে (পৃথিবীতে) রাস্তার মধ্য থেকে একটি গাছ কেটে সরিয়ে দিয়েছিল, যেটি মুসলিমদের কষ্ট দিচ্ছিল।
👉সহীহ মুসলিম হাঃ ১৯১৪; সহীহুল জামে হাঃ ১৫৫২।
৫। গুজব থেকে দূরে থাকাঃ
দুর্যোগের সময় গুজব থেকে বিরত থাকা। দুর্যোগের সময় অনেকে আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে আরো বিপদে ফেলার চেষ্টা করে, কেউ রাজনৈতিক ফায়দা নেয়, কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে ভিউ ব্যবসা করে। অথচ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করা জঘন্য অপরাধ। যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের খবর বিশ্বাস করা ও প্রচার করাও নিষেধ।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যেন তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদের অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)
অতিবৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই দুর্যোগের সময় বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার, দোয়া, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ সবাইকে এই কাজগুলো করার তাওফিক দিন। আমিন।