07/02/2026
#ছদ্মবেশ_৩ (পর্ব ২০)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
নিবিড় ও নীলার দিকে তাকিয়ে আছেন ফরিদা আন্টি। থমথমে পরিস্থিতিতে খানিকটা সময় অতিবাহিত হলে ফরিদা আন্টি গম্ভীর স্বরে বলে,
"এই ছিল তোর গুরুত্বপূর্ণ কাজ?"
বলেই খানিকটা থামলেন তিনি। অতঃপর ফের বলে,
"কিভাবে হলো এটা?"
নিবিড় এবার খানিকটা ইতস্তত বোধ করে বলে,
"আমি নিজেও বুঝতে পারিনি আন্টি। তবে তুষারকে ধন্যবাদ, এ ক্ষেত্রে আমাকে হেল্প করার জন্য।"
"এই মেয়ে, সামনে আসো।"
নিবিড়ের কথা উপেক্ষা করে নীলাকে বলল ফরিদা আন্টি। ধীর পায়ে সামনে আসলো নীলা। ফরিদা আন্টি ফের গম্ভীর স্বরে বলে,
"আমাকে চেনো তুমি?"
বিব্রত হলো নীলা। আন্টি এটা কেমন প্রশ্ন ছুড়লেন? তবে কিছু বলার আগেই আন্টি ফের বলে,
"অবশ্য মনে রাখলে তো চিনতে।"
"সরি আন্টি।"
নীলার দৃষ্টি হালকা নত হলো। ফরিদা আন্টি ফের বলল,
"এই ছোট একটা শব্দ বলে তুমি এতদিনের সকল দুঃখ, কষ্ট কি মুছে ফেলতে পারবে?"
এক পা এগিয়ে ফরিদা আন্টির পাশে দাঁড়ালো আরোহী। খানিকটা স্বাভাবিক স্বরে বলে,
"দুঃখ প্রকাশের পেছনে একটা ভুল থাকে আন্টি। আর তার পেছনে থাকে অবশ্যই কোনো কারণ। আমরা তা অবশ্যই জানতে পারবো আন্টি। এখন ওদের জন্য এটা আনন্দের একটা মুহূর্ত। আপনি এভাবে রাগ পুষে রাখলে কারোরই ভালো লাগবে না আন্টি।"
এতটুকু বলতেই আরোহীর দিকে তাকালো ফরিদা আন্টি। হালকা থামলেও আরোহী ফের বলে,
"প্লিজ আন্টি।"
আরোহীর কথার মানে বুঝলেন ফরিদা আন্টি। তবুও সেকেন্ড দুয়েক নীরব থেকে বলে,
"তোমরা আমাকে বোঝাতে আসবে না, আমি অবুঝ নই।"
বলেই নিবিড়ের দিকে চেয়ে বলে,
"এখন যদি বলি আমি এটা কখনোই গ্রহণ করবো না, আর তোকে তোর সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। এটা পারবি?"
ফরিদা আন্টির কথাটার উদ্দেশ্য ছিল মূলত নিবিড় কাকে বেছে নেয় তা যাচাই করা। কারণ নিবিড়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাড়ি খুব কাছেই। সে চাইলেই এটা করতে পারে। অবশ্য করবেও একদিন। কারণ নিজস্ব পরিবার হলে সবাই তো আর একসাথে থাকবে না। তবুও এ মুহূর্তে নিবিড়ের প্রতিক্রিয়া কি হয় তা বুঝতে নীরবে তাকিয়ে রইলেন ফরিদা আন্টি। নিবিড় এবার স্বাভাবিক স্বরে বলে,
"হ্যাঁ, পারবো। তবে আপনাকেও আমার সাথে চলে যেতে হবে।"
"আমি কেন!"
নিবিড় ফের বলে,
"আপনিই তো বলেছেন, আমার সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। এখানে সবাই আমার লাইফে আসার আগে আপনিই তো আমার সবকিছু ছিলেন। আর এখনো আছেন, আমার মায়ের জায়গা টা আঁকড়ে ধরে।"
এবার হঠাৎ মৃদু হাসতে চেয়েও তা লুকালেন ফরিদা আন্টি। যা বুঝতে পেরে পাশ থেকে মৃদু হাসলো রাজ। কারণ, এবার ফরিদা আন্টির হাবভাব মোটামুটি নিশ্চিত। একটা হালকা শ্বাস ছাড়লো রুশানও। কারণ, পরিস্থিতি যেমন ভেবেছিল সে, তেমনটাও না। সব সমস্যার সমাধান সুন্দর ও ঠান্ডা মাথায়ই হোক। এবার মৃদু হেসে হাত বাড়ালেন ফরিদা আন্টি। নিবিড় ও নীলার উপর থেকে যেন পাথর সরে গেলো মুহূর্তেই। স্বস্তিতে দুজনই এক পলক চোখ বুঁজে এগিয়ে এলো ফরিদা আন্টির দিকে। দু'জনকেই দুই হাতে আগলে নিলেন ফরিদা আন্টি। থমথমে পরিস্থিতি যেন মুহূর্তেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। ফরিদা আন্টি মৃদু হেসে নীলাকে বলে,
"ভেবো না ছেড়ে দিয়েছি। তোমাকে অবশ্যই কারণটা বলতে হবে।"
,
,
রাত তখন ৯ টা। খাবার সাজানো লম্বা টেবিলটার প্রধান চেয়ারে বসলো রাজ। যার এক পাশে ফরিদা আন্টি, অন্য পাশে আরোহী। আরোহীর পাশে সারিবদ্ধভাবে মেয়েরা বসা। আর ফরিদা আন্টির পাশে ছেলেরা। আকাশ বসলো নীলয়ের পাশে। তার জন্য এটাই প্রথমবার। কাজেই কেমন যেন অস্বস্তিও লাগছে খানিকটা। অতীতের কথা ভাবলে মাঝে মাঝে নিজের আত্মাই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমি কে? কোথায় ছিলাম? আর কোথায় আছি?
ভাবতেই নীরবে খাচ্ছে সে। সবাই নিজেদের মতো নিয়ে খেলেও তার মাঝে তেমন কিছু লক্ষ করা যাচ্ছে না। নীলয় নিয়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। তা লক্ষ করলো আরোহী। 'ভাইয়াকে মাংস দাও' সাথীকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলতে যাবে তখনই রাজ বলে উঠে,
"আকাশকে মাংস দাও।"
খানিকটা থমকালো আরোহী। অবাক হলো খানিকটা। কারণ, রাজ যেন তার মুখের কথাটাই কেড়ে নিয়েছে। পুরোপুরি মিলে গেলো কিভাবে? ভাবতেই রাজ আকাশের দিকে চেয়ে ফের বলে,
"লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আমরা এখানে যারা একসাথে আছি, আমরা সবাই-ই একটা পরিবার। তোমাকে এ পরিবারের সাথে মিশতে হলে তোমার নিজেকেও এ পরিবারের একজন সদস্য ভাবতে হবে।"
বলেই মৃদু হাসলো রাজ। সবাই রাজকে সমর্থন করলো, রুশান ব্যতীত। নীরবে খাচ্ছে সে। আকাশকে উদ্দেশ্য করে রাজ ফের বলে,
"যেমন এখান থেকেই তোমাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি, তুষারের দিকে তাকাও। লজ্জার ক্ষেত্রে খাওয়ার সময় তুষার ভুলেই যায় তার পাশে কেউ আছে কি না।"
একসাথে হাসলো সবাই। খাবার মুখে নিতে গিয়েও থেমে গেলো তুষার। রাজের দিকে চেয়ে বলে,
"প্রশংসা করলে নাকি অপমান করলে?"
"প্রশংসাই করছি, যেন আকাশ বুঝতে পারে আমাদের ভ্রাতৃত্ব কেমন।"
"তাহলে ঠিক আছে।"
বলেই মাংসের বাটির দিকে তাকালো তুষার। এমন মুহূর্তেই ফারিহা রাজের দিকে চেয়ে বলে,
"ভাইয়া, তিনি একটু পেটুক হলেও খুব বেশি খাদক নয়। যেমন সে ইতিমধ্যেই দুইবার মাংস নিয়ে ফেলেছে, এখন আপনি তাকে আর জোর করে মাংস দিলেও সে নিবে না।"
মাংসের বাটির দিকে হাত বাড়াতে প্রস্তুত হলেও ফারিহার কথায় থেমে গেলো তুষার। এর মাঝে ফারিহা ফের বলে,
"বিশ্বাস না হলে, তাকে জোর করে দেখুন তো আর এক টুকরা খাওয়াতে পারেন কি-না। আপনারা আসলে তাকে যতটা খাদক মনে করেন, সে ততটাও খাদক নয়।"
বলেই খাওয়ায় মন দিল ফারিহা। সবার চোখ তখন তুষারের দিকে। পাশ থেকে নিবিড় চামচ ধরে তুষারকে মাংস দিতে চাইলেও তুষার বাঁধা দিয়ে বলে,
"না না ভাই, আর নিব না। পেট ভরে গেছে।"
নিবিড় তাও জোর করে বলে,
"আরে একটু নে।"
"না ভাই, আর ইচ্ছে করছে না।"
বলেই মনে মনে বলে উঠে,
"তোর বোন তো আগেই ইচ্ছার বিষ মারি দিছে।"
বলেই ফারিহার দিকে তাকালো তুষার। ফারিহা আর একবারও তাকাচ্ছে না তার দিকে। নীরবে খাচ্ছে সে। এদিকে রাগটা কেবল বেড়েই চলছে তুষারের। এবার মনে মনে ফের বলে উঠে,
"মানে,,,,,,,, আমি এখন ভাবছি এ মুহূর্তে তোমাকে গালিটা ঠিক কোন ভাষায় দেওয়া উচিত?"
,
,
রাত তখন ১১টা। দোতলার খোলা বারান্দাটায় বসে আছে রাজ, নীলয় ও আকাশ।রাতের নিস্তব্ধতাকে আপন করে নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত তারা৷ বিষয়বস্তু বারিশ ও বিহান। তাদেরকে কতটুকু বিভ্রান্ত করতে সফল হয়েছে আকাশ। যখন সে তাদের বলেছিল,
"তোমরা কোন তথ্যের উপর আস্থা রাখবে আমি জানি না। তবে সত্যটা হলো, রাজ মালদ্বীপ যাচ্ছে না। তারা যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। রাজ আগেই সব প্রস্তুত করে রেখেছিল। কদিন আগে তার মালদ্বীপের ট্যুর কনফার্ম করাটা ছিল তার একটি চাল মাত্র।"
এ মুহূর্তে আকাশের দিকে নীরব দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে রাজ। সে নিজেই আকাশকে পাঠিয়েছিল এমন তথ্য নিয়ে। যদিও তথ্যটা সত্য। তবে এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বেশ কয়েকটা৷ তার মাঝে একটা হলো, বারিশকে বিভ্রান্ত করা, আরেকটা হলো আকাশের প্রতি তাদের বিশ্বাসকে শক্ত করা। গতকাল রাতে দু'হাত ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে আকাশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল রাজ। আকাশের কৌতুহলের বিপরীতে রাজ শান্ত স্বরে বলেছিল,
"বারিশ নিজেকে যতই সাধু হিসেবে উপস্থাপন করুক না কেন, আমার উপর তার অবশ্যই নজর থাকবে। আর তোমার উপরও বারিশ এত সহজে বিশ্বাস রাখবে না। কাজেই তার নজরদারিকে ব্যবহার করেই আমাদেরকে এ বিষয়ে চাল চালতে হবে। বারিশ মনে করে সে আমাদের চেয়ে এক পা আগে চলে। কিন্তু বাস্তবতার মৃদু হাওয়া গায়ে লাগলে অবশ্যই সে নিজেই তোমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করবে। সে ভাবতে শুরু করবে, আমার বিরুদ্ধে তোমাকে তার প্রয়োজন।"
অতঃপর আকাশ আজ বিকেলে তালুকদার বাড়িতে গিয়েছিল। এ মুহূর্তে রাজ ও নীলয়ের দিকে চেয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলে,
"চিন্তা করো না। বারিশের মনে এখন বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। তোমাদের গন্তব্য থেকেই সে উত্তর খুঁজে পাবে।"
"হ্যাঁ, এবার বাকিটা সময়ই বলে দিবে।"
বলেই হেলান দিয়ে বসলো রাজ। তার দিকে চেয়ে মাথা নাড়লো আকাশ। এর মাঝেই তিন কাপ চা হাতে সেখানে উপস্থিত হলো আরোহী। যা টেবিলে রেখে রাজের দিকে চেয়ে বলে,
"আর কিছু লাগবে?"
"উঁহু।"
"আমি যাচ্ছি তাহলে।"
"হুম যাও, শুয়ে পড়ো। রাত হয়েছে অনেক। আমার ঘুমাতে একটু লেট হবে।"
"আচ্ছা।"
বলেই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো আরোহী। লক্ষ করলো আকাশ এক বারের জন্যও তাকায়নি তার দিকে। অন্য দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে সে। লক্ষ করলেও কিছু বললো না আরোহী। স্বাভাবিক ভাবে পা বাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের মাঝে প্রার্থনার ন্যায় বলে,
"হে আল্লাহ্,, তার জীবনে এমন কাউকে প্রেরণ করুন, যে তার জীবনকে গুছিয়ে দিতে পারবে।"
বলেই একটা শ্বাস ছেড়ে দ্রুত পায়ে হেটে চলে গেলো সে।
,
,
অতিবাহিত হয়ে গেলো দুটি দিন। গতকাল বিকেলেই রওনা দিয়েছিল রাজ ও আরোহী। সকালেই ফরিদা আন্টিকে কল করে জানালো, নিউজিল্যান্ডে নিরাপদেই পৌঁছেছে তারা। আরোহী একটু ক্লান্ত থাকায় আপাতত আজকের দিনটা বিশ্রামেই পার করবে তারা।
এখন দুপুর ২ টা। একসাথে খেবে বসলো বারিশ ও বিহান। তাদের মাঝে আলোচনার প্রসঙ্গ এখন রাজ। কাটা চামচে খাবার নিয়ে মুখে দিল বারিশ। সামনে থেকে বিহান স্বাভাবিক স্বরে বলে,
"আকাশ তাহলে মিথ্যে বলেনি। কিন্তু, আমি ভাবছি রাজের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কারণটা কি? নাকি সে বুঝতে পেরেছিল, মালদ্বীপে আমরা তাকে হত্যা করার প্ল্যান করেছিলাম?"
বিপরীতে বারিশ শান্ত স্বরে বলে,
"আলোচনাটা আমাদের দু'জনের মাঝেই হয়েছিল। যদি রাজ এটা জেনে থাকে, তাহলে আমাদের যেকোনো একজন হতেই এটা লিক হয়েছে।"
খাবার মুখে নিতে গিয়েও থেমে গেলো বিহান। তাকালো বারিশের দিকে। খানিকটা অবাক হয়ে বলে,
"আমাকে সন্দেহ করছো?"
বারিশ ফের শান্ত স্বরে বলে,
"বিষয়টা সন্দেহের না। আমি বোঝাতে চাইছি, এ খবর রাজের কান অবধি পৌঁছায়নি।"
বলেই ফের খাবার মুখে নিল বারিশ। বিহান খানিকটা ভেবে বলে,
"যেহেতু আমরা তার অবস্থান জানি, সেহেতু আমরা সেখানে কেন তাদের মারছি না?"
খানিকটা সময় নিল বারিশ। মুখে নেওয়া খাবারটা খেয়ে বলে,
"এতকিছুর পরও তোমার কি মনে হচ্ছে না, রাজ সতর্কতা অবলম্বন করছে?"
বলেই বিহারের দিকে তাকালো বারিশ। কাটাচামচ ধরা ডান হাতটি পয়েন্ট বোঝানোর হালকা উঁচু করে ফের বলে,
"তারচেয়ে বড় বিষয়, সে আমাদের নিয়ে খেলতে চাইছে। এটা হয়তো আমাদের উদ্দেশ্য বোঝার জন্য তার পাতা একটা ফাঁদও হতে পারে। আমরা পা দিলেই 'কট'।"
বলেই ফের খাওয়ার মন দিল বারিশ। বিহানও প্লেটের দিকে চেয়ে বলে,
"বাবা ঠিকই বলেছিল, রাজ আঘাত করতে গেলেও অন্যদের মতো লাফালাফি করে না। সে ঠান্ডা মাথায় নিজের লক্ষ্য মেপে নেয়।"
বিপরীতে বারিশ মৃদু হেসে বলে,
"আপাতত ছাড় দিলেও আমরা তাকে আর সেই সুযোগ দিব না।"
,
,
বিকেল তখন ৩ টা। মানসিক হাসপাতালে একসাথে পায়চারি করছে নিলয় ও আকাশ। হাঁটার পাশাপাশি আশপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাচ্ছে তারা। ভেতরে থাকা কয়েকজন মানুষের সাথেও কথা বলেছিল দু'জন। তবে নীলয় তাকে হঠাৎ এখানে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যটা বুঝে উঠতে পারছে না আকাশ। কাজেই খানিকটা কৌতুহল রয়ে গেছে মনে।
তার ভাবনার ইতি ঘটিয়ে নীলয় স্বাভাবিক স্বরে বলে,
"তুমি হয়তো ভাবছো, তোমাকে হঠাৎ এখানে নিয়ে আসার কারণ কি।"
বলেই দাঁড়ালো নীলয়। আকাশ আশপাশে একনজর চেয়ে বলে,
"সেটাই ভাবছি আমি।"
নীলয় হালকা হেসে বলে,
"তেমন কোনো কারণ নেই। রাজের কাছে আমি একটা জিনিস শিখেছিলাম, নিজের অবস্থান বোঝা। রাজের একটা অভ্যাস আছে, যখন তার মনে হয় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে তখন সে একটা কবরস্থানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কারণ, মৃত্যু এক চরম সত্য। যা অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। সামনে শুয়ে থাকা মানুষগুলো একসময় আমাদের জায়গায় ছিল আর আমরাও একসময় তাদের জায়গায় থাকবো, এটা তুমি মন থেকে ফিল করতে পারলেই কোনো পাপ করতে পারবে না।"
খানিকটা নীরব রইল আকাশ। অতঃপর একটা শ্বাস ছেড়ে বলে,
"খুব কম মানুষই এই বাস্তবতা অনুভব করতে পারে। যেমন আমি নিজেও আগে কখনো এমনটা অনুভব করতে পারিনি। কেউ বললেও তা কান অবধিই সীমাবদ্ধ থাকতো। কখনোই মন অবধি পৌঁছাতো না।"
বলেই থামলো সে। নীলয় তার দিকে চেয়ে বলে,
"দেখো আমরা সুস্থ সবল মানুষ। না আমাদেরকে কোনো হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে ছটপট করতে হচ্ছে, আর না এখানকার মানুষগুলোর মতো বছরের পর বছর জীবন পার করতে হচ্ছে। কিন্তু স্রষ্টা চাইলে, আমরাও তাদের জায়গায় থাকতে পারতাম। স্রষ্টার যে দয়াটাও আমরা কখনো বুঝি না।"
নীলয়ের কথা শুনে খানিকটা নীরব রইল আকাশ। আশপাশে এক নজর চেয়ে বলে,
"এখন বুঝতে পারছি তোমার আমাকে এখানে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কি।"
বলেই থামলো আকাশ। অতঃপর ফের বলে,
"তবে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে শিক্ষণীয় একটি বিকেল ছিল। যে শিক্ষাটা আমি আমার পরিবার থেকেও কখনো পাইনি।"
গেট পেরিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করলো ভেতরে। আলোচনার সমাপ্তি টেনে সেদিকে তাকালো নীলয় ও আকাশ, দু'জনই। দেখে একটা মেয়েকে নামানো হয়েছে গাড়ি থেকে। বয়স ২০ এর কম-বেশি হবে হয়তো। হালকা চিকন শরীরে ফর্সা গায়ের রং। চেহারাটাও প্রচণ্ড মায়াবী তার। যাকে এখানে দেখে এক মুহূর্তের জন্য আফসোস করবে না, এমন মানুষ মানুষ হয়তো বিরল।
তেমনই খানিকটা আফসোস হলো আকাশেরও। নীরবে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। পাশ দিয়ে দ্রুত পায়ে হেটে যাচ্ছিল একজন ডাক্তার। নীলয় তাকে থামিয়ে বলে,
"কি হচ্ছে এখানে? মেয়েটা কে?"
ডাক্তার স্বাভাবিক স্বরে বলল,
"নাম মেঘলা। মেন্টালি ট্রিটমেন্টের জন্য কদিন আগেই তার পরিবার তাকে এখানে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু গতকাল রাতে সুযোগ পেয়েই পালিয়েছিল। তাই এখন আবার ধরে আনা হয়েছে।"
"ওকে, থ্যাংকস।"
চলে গেলেন ডাক্তারটি। নীলয় তাকালো আকাশের দিকে। আকাশ খানিকটা আফসোস নিয়ে বলে,
"মেয়েটাকে দেখো, তাকে যেন পৃথিবীর সমস্ত মায়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তার সাথে এমনটা হওয়া কি খুব বেশিই প্রয়োজন ছিল?"
নীলয় তাকালো তার দিকে। হালকা রসিকতা করে বলে,
"এক কাজ করতে পারো। তুমি তাকে এখান থেকে নিয়ে বিয়ে করে নাও। পাগলামি না-হয় একটু সহ্য করবে, প্রব্লেম কি?"
নীলয় হেসে কথাটা বললেও আকাশ খানিকটা সিরিয়াস ভাব নিয়ে বলে,
"যদি মেয়েটা খুব বেশি পাগল না হতো, আর তার পরিবার যদি রাজি থাকতো, তাহলে আমি সত্যিই তাকে আমার সাথে নিয়ে যেতাম। সে এখানে থাকার যোগ্য না।"
এবার তীব্র বিস্ময়ে ভ্রূ কুঁচকালো নীলয়। যে বিস্ময় ধরে রেখে বলে,
"তুমি কি সিরিয়াস?"
"হ্যাঁ।"
নীলয় ফের বিস্ময় নিয়ে বলে,
"তোমার মনে 'মায়া' শব্দটা জন্ম নিল কবে ভাই!"
কিছু বললো না আকাশ। বলতে চেয়েও থেমে গেলো। শ্বাস ছাড়লো একটা। অতঃপর বলে,
"চলো, বেরিয়ে যাই। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে আমার সত্যিই খারাপ লাগবে।"
বলেই পা বাড়ালো আকাশ। পা বাড়ালো নীলয়ও। এর মাঝেই মেঘলা নামের মেয়েটার চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালো আকাশ। তার বলা কথাটা যেন আকাশের কানে তিরের মতো বিধলো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে মেয়েটা চিৎকার করে বলে উঠলো,
"আমার চাচাদেরকে বলে দিন, আমার বাবার অর্থ-সম্পদ কিছুই আর আমার প্রয়োজন নেই। সব তাদেরকে নিয়ে যেতে বলুন। আমি তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। তবুও আমাকে মুক্তি দিতে বলুন দয়া করে। আমার এখানে ভালো লাগে না। আমাকে বিশ্বাস করুন প্লিজ, আমি সত্যিই পাগল নই।"
To be continued.................