10/08/2026
সুন্দরবনে একটি বিষয় গত বছর খানেক থেকে আমার চোখে বেশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে—ভোদর ও রামগুই এখন মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক দূর থেকে নৌকার শব্দ শুনেও অনেক সময় তাদের আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ জায়গায় ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে।
যারা নিয়মিত সুন্দরবনে যান, তারা জানেন—এই দুই প্রাণী সাধারণত মানুষের উপস্থিতিকে খুব একটা ভয় পায় না। কটকার মতো পর্যটন এলাকাতেও এখনো মানুষের আশপাশে তাদের স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। করমজলেতো রামগুই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। কিন্তু সুন্দরবনের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় চিত্রটি যেন একেবারেই ভিন্ন। সেখানে মানুষের সামান্য উপস্থিতি টের পেলেই তারা দ্রুত আড়ালে চলে যাচ্ছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে অতিরিক্ত শিকার ও বিভিন্ন ভাবে নিয়মিত বিরক্তি করা। বিশেষ করে শিবসা নদীর পশ্চিম পাড়ের সাতক্ষীরা সুন্দরবন এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে ভোদর ও গুইসাপ এখন খুব কমই চোখে পড়ে। দেখা গেলেও মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুহূর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে।
ভোদর শিকার সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রামগুই—অর্থাৎ বড় গুইসাপ—মেরে টুকরো করে কাঁকড়া ধরার ফাঁদে টোপ হিসেবে ব্যবহারের কথা স্থানীয়দের কাছ থেকে আগেও বহুবার শুনেছি। এবার মাঠ পর্যায়ে তার প্রমাণও পাওয়া গেল।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের তালিকায় ফাইশা জাল, চরপাটা জাল কিংবা বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো আরও একটি গুরুতর বিষয় হলো অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁকড়া ধরার পদ্ধতি। পূর্ব সুন্দরবনে এসব কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় এখনো এগুলো ব্যাপকভাবে চলছে বলে মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কাঁকড়া ধরার ফাঁদে গুইসাপের দেহের অংশ টোপ হিসেবে ব্যবহারের ঘটনাটিও পশ্চিম সুন্দরবনেই পাওয়া গেছে। এর ফলে শুধু একটি প্রাণী নয়, সুন্দরবনের সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবনের প্রতিটি প্রাণীরই এই বাস্তুতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই গুইসাপের মতো প্রাণীকে শিকার কিংবা টোপ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
আশা করি, পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলেদের বিকল্প ও টেকসই কাঁকড়া ধরার পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে শুধু বাঘ নয়—এই বনভূমির প্রতিটি ছোট-বড় প্রাণীকেই রক্ষা করতে হবে।
ছবি ভিডিও থেকে নেয়া- প্রসেঞ্জিত দেববর্মণ